রবিবারের পড়া: সমাজের যে কোনো আঘাতে কেঁপে উঠতেন কবি বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

0

তপন মল্লিক চৌধুরী

তাঁর সমস্ত উচ্চারণই হয়তো বা স্লোগান, শব্দগুলির জন্মও যেন উঁচু ঘাড়, ফোলানো শিরা আর উঁচু পর্দা থেকে, কিন্তু তা আপাদমস্তক কবিতা। কেবলই স্লোগান নয়, প্রতিবাদ নয়, ধিক্কার নয়। সমস্ত অসাম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ঝংকারে বেজে ওঠা রণহুংকার। সমস্ত লাঞ্ছনার উলটো দিকে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড আর্তনাদ। দেশভাগ, পার্টিভাগ, খাদ্য আন্দোলন থেকে শুরু করে নকশালবাড়ি আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, বন্দিমুক্তি আন্দোলন – তার পর একের পর এক লড়াই, আন্দোলন, সংগ্রামের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে, মধ্যবিত্ত মন-মেজাজ-মানসিকতাকে চাবকে শাসনের পর বিধ্বস্ত দেহের হাঁপিয়ে ওঠা হৃদযন্ত্র থেকে ছিটকে বেরোনো রক্তমাখা শব্দমালা তবু একটি সত্যিকারের প্রেমের কবিতা যা মানুষের জীবনে প্রেমের চেয়ে নির্মল…।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: সখী ভালোবাসা কারে কয়?

একেবারে গোড়ায় প্রচ্ছন্ন ভাবে হলেও তাঁর কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব ছিল, অন্তত ‘পূর্বাশা’য় প্রকাশিত কবিতাগুলির মধ্যে সে রকমটাই তো লক্ষ করা যায়। যেন তিনি জীবনানন্দের মাঠ থেকেই জেগে উঠলেন, ঘুম থেকে উঠে বসে বলতে থাকলেন, ‘এমন ঘুমের মতো নেশা’ কিংবা ‘এমন মৃত্যুর মতো মিতা’…এ সব ছেড়ে আর কোনো জীবন যে তিনি চান না। তখন তাঁর প্রায় সমস্ত কবিতার ভুবন ভরে ছিল জীবনানন্দের নদী-মাঠ-ঘাস-ফুল-পাতা, শালিখ-চড়ুই, শীত, চাঁদ, হাওয়া। তাঁর কবিতায় তখন ‘শরবতের মতো সেই স্তন’…তিনি লিখছিলেন ‘ক্লান্তি ক্লান্তি’র মতো কবিতা।

কবি বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সেই আবহ থেকে ফের একদিন জেগে উঠে দেখলেন – ‘দুপুরে বাঘ পাড়া কাঁপায়’, ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’, ‘বছরের পর বছর বিনা বিচারে বন্দিদের নিয়ে চলে প্রহসন’, ‘খেয়া পারাপার করে ডাকিনীরা’, ‘কোথাও মানুষ উঁচু হতে হতে হঠাৎ ভয়ঙ্কর বেঁটে হয়ে যায়’…কিন্তু আচমকা একদিন তো নয়, ঘুরে দাঁড়ানো, মৃত্যুর দিক থেকে ফিরে আসা, ক্ষুধার্ত জীবনের দিকে তাকানো, লাঞ্ছনায় আর্তনাদ করে ওঠা, যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠা, প্রতিবাদে গর্জে ওঠা – কোনোটাই হঠাৎ একদিন নয়। হতেই পারে তাঁর কবিতা আর হেমন্তের পথে হেঁটে আলো-আঁধারের ছায়াময় ধানের খেতে এসে দাঁড়াল না। তাঁর কবিতায় এল স্পষ্ট উচ্চারণ, রুক্ষ হয়ে উঠল ভাষা, শব্দবন্ধ যেন রূঢ় সময়ের সঙ্গে পাঞ্জা কষল, সময়কে অশ্বারোহী করতে হাতে নিল নির্মম-নিষ্ঠুর চাবুক।

টালমাটাল সময়ের গায়ে ওড়না না জড়িয়ে শরীরে চাবুকের আঘাত দিলেন এই ভাবে – ‘রাজা আসে যায় আসে আর যায়/শুধু পোশাকের রং বদলায়/শুধু মুখোশের ঢং বদলায়/… দিন বদলায় না৷’ একটানা কয়েকটি দশক ধরে চলা অস্থিরতা, অসাম্যের শিকার হওয়া সময়, লাঞ্ছনার শিকার হওয়া সময় নিদারুণ অত্যাচারে, নিষ্ঠুরতায় নিষ্পেষিত হতে হতে প্রতিবাদ কিংবা প্রতিকারের শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলতে বসেছিল। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সেই সময়কে ধিক্কার জানাল অগ্নুৎপাত হয়ে, লাভাস্রোতের মতো উচ্চারিত পংক্তিমালায় – ‘নাচো হার্লেমের কন্যা, নরকের উর্বশী আমার/বিস্ফারিত স্তনচূড়া, নগ্ন উরু, …লিতবসনা/মাতলামোর সভা আনো, চারদিকের নিরানন্দ হতাশায়,/ হীন অপমানে/ নাচো ঘৃণ্য নিগ্রো নাম মুছে দিতে মাতলামোর জাত নেই,/পৃথিবীর সব বেশ্যা সমান রূপসী৷/নাচো রে রঙ্গিলা, রক্তে এক করতে স্বর্গ ও হার্লেম৷’

দেশে জরুরি অবস্থা জারি থাকার সময়ে প্রেস সেনসরশিপ মুক্ত ভাবনা, মত প্রকাশ থেকে শুরু করে সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছিল। সেই অবস্থা বোঝাতে কবি বলেছিলেন – ‘ঝড়ের মতোই সে এসে ঘরে ঢুকল। যে শৌখিন আয়নাটায় প্রতিদিন ভোর না হতেই আমি নিজেকে আবিষ্কার করি; আমার সেই গভীর ভালোবাসার আয়নাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে সে এসে দাঁড়াল রূপকথার দৈত্যের মতো।

তার পর শরীর থেকে একে একে তার চোখ, কান, মুখ, পায়ের পাতা, বুকের হাড়গুলো খুলে নিয়ে কিছুক্ষণ দুহাতে লোফালুফি খেলতে লাগল সে। এক সময় হাত দুটিও অবশ হয়ে গেল, আর অবশিষ্ট অদ্ভুত জড়পিণ্ড থেকে বেরিয়ে এল ভীষণ অস্বাভাবিক এক বোমা ফাটানো শব্দ: ‘বলো তো আমি কী ভাবে বেঁচে আছি?’ (‘ম্যাজিক’)।

কেবল সময়ের অস্থিরতা নয়, সমাজের যে কোনো আঘাতে কেঁপে উঠেছেন কবি বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, সময় বা ঘটনার উত্তাপ বিবেচনার সময় হাতে না রেখেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন স্রোতে, ভেঙে ফেলতে চাইতেন ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান। কারণ সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির রোষ থেকে যে ছাড় পাবে না কেউই। তাই ভয়ংকর সেই মুহূর্তে তিনি এসে দাঁড়ান আর বলে ওঠেন – ‘ভুবনেশ্বরী যখন শরীর থেকে/একে একে তার রূপের অলংকার/খুলে ফেলে, আর গভীর রাত্রি নামে/তিন ভুবনকে ঢেকে…’

কখনও তাঁর উচ্চারণ শ্লোগান হয়েও যেমন কবিতা, কখনও আবার চিৎকার হয়েও তা মন্ত্র, কবিতার মন্ত্র- ‘অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ / অন্নই চেতনা / অন্ন ধ্বনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা৷ / অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা, / অন্ন অগ্নি বায়ু জল নক্ষত্র সবিতা৷ / অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার / অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওংকার / সে অন্নে যে বিষ দেয়, কিংবা তাকে কাড়ে / ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে’।

তাঁরই কবিতায় অঞ্জলি দিয়ে শতবর্ষে স্মরণ করলাম কবিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.