রবিবারের পড়া: রাজার বিশ্বাস

0
Raja Biswas

চিরঞ্জীব পাল

উপরের ছবিটা রাজা বিশ্বাসের। আপনি ওকে হয়তো নাও চিনতে পারেন। রাজা বিশ্বাস আমার বন্ধু। ৪৫ বছর বয়সে সদ্য প্রয়াত হয়েছে। কোভিড নয়, সেলিব্রাল অ্যাটাকে।

Loading videos...

রাজা বামপন্থী। তবে জীবনের এক একটি ধাপে এক এক রকম ভাবে সক্রিয় থেকেছে সে। ছাত্রজীবনে নকশাল রাজনীতি, পরবর্তী কালে রোজগারের প্রয়োজনে সাংবাদিকতা এবং মিডিয়াকর্মী, মিডিয়াকেন্দ্রিক ব্যবসা, একেবারে শেষের দিকে সংস্কৃতিকর্মী।

সংস্কৃতিকর্মী হিসাবে নাটকটাকে আঁকড়ে ধরেছিল। নাট্যকার হিসাবে নিজেকে ক্রমশ বিকশিত করছিল। কিন্তু ছড়িয়ে পড়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।

রাজার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় একটি নিউজ চ্যানেলে। আমি রাজার সমবয়সি হলেও কর্মক্ষেত্রে রাজা ছিল আমার সিনিয়ার। ওই চ্যানেলের একটি জনপ্রিয় প্রোগামের দায়িত্বে সে। আমাকে চ্যানেলের আউটপুট এডিটর বললেন, রাজাকে ওই প্রোগ্রামটায় অ্যাসিস্ট করতে।

পেশায় আমি নতুন, রাজা সিনিয়র, তাই দুরুদুরু বক্ষ এবং কুণ্ঠা নিয়ে হাজির হলাম। তার পর মাত্র পাঁচ মিনিটি, কোথায় গেল সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ও বুঝিয়ে দিল আসলে এ সবের কোনো অর্থ হয় না। মোদ্দা কথা হল কাজটাকে চ্যাম্পিয়ন করা।

তার পর সম্পর্ক গড়িয়েছে বন্ধুত্বে। সব সময় এক সঙ্গে কাজ না করলেও সম্পর্ক আরও দৃঢ হয়েছে।

সম্মান ও শ্রদ্ধার মধ্যে একটি বড়ো পার্থক্য রয়েছে। শ্রদ্ধার মধ্যে কোথাও একটি নিজেকে নত করার ব্যাপার থাকে। তা সে মত বা মাথা, উভয়ই। কিন্তু সম্মান জানানোর মধ্যে তা নেই। পারস্পরিক মতের আদানপ্রদানের রাস্তা খোলা থাকে।

রাজার সঙ্গে প্রথম কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি যে, সে সম্মান জানানোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এ ক্ষেত্রে ছোটো-বড়োর কোনো পার্থক্য ছিল না। সবার মতকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, মতের মধ্যে যুক্তি থাকলে তা কাজে লাগানো, অযুক্তির মনে হলে পালটা যুক্তি দিয়ে বলা। কিন্তু কোথাও নিজের মতটাকে ঠিক এবং একমাত্র সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল না।

রাজার সঙ্গে যত মিশেছি, বুঝেছি এটা সে খুব সচেতন ভাবেই চর্চা করে।

যাঁরা ফ্যাসিবাদকে বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে মনে করেন, তাঁদের দেখেছি ‘অচেতন’ ভাবে প্রতি মুহূর্তে ফ্যাসিস্ট-ভাবনার চর্চা করতে। নিজের মতকে একমাত্র সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অন্য মত না শোনা। আমি তোমার থেকে বেশি সমাজ সচেতন, তাই তুমি কিছু বোঝো না —  নিজের মনে এই বিশ্বাসকে গেঁড়ে বসিয়ে রেখে অন্যের মতকে অসম্মান করা। তাই অন্যকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের কথা অনগর্ল গড়গড় করে বলে চলা – এ সব চলে প্রতিনিয়ত।

আসলে খুব ছোটো থেকে আমাদের মধ্যে এই অভ্যেসগুলোকে গেঁথে বসিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ি, স্কুল কলেজ – সর্বত্র চলে এই চর্চা। ছোটো শিশুটি তার অভ্যাসবশত কিছু প্রশ্ন করলেই বলা হয় ‘চুপ করো, অত প্রশ্ন কেন।’ শিশুর মনের মধ্যে গেঁথে বসে যায়, বেশি প্রশ্ন করতে নেই বা কেউ প্রশ্ন করলে তাকে এই ভাবে চুপ করিয়ে দিতে হয়। সেখান থেকেই শুরু হয়ে যায় ফ্যাসিবাদের চর্চা।

শিশু নানা বিষয়ে নিজের মত প্রকাশের চেষ্টা করে। কিন্তু বড়োরা তাকে থামিয়ে দেয়। শিশুরা বোঝে এটাই পদ্ধতি।

তাই হিটলার (মানে ফ্যাসিবাদী বলতে তো প্রথমেই আমাদের হিটলারের কথা মনে আসে) মরে ভূত হয়ে গেলেও তার ভাবনার অবাধ চলাচল আমাদের চিন্তায়, কাজে। সমাজ-রাজনীতিতে আবার তাই খুব সহজেই নতুন মোড়কে জায়গা করে নেয় ফ্যাসিবাদ।

আমরা শঙ্কিত হই, প্রধান শত্রু চিহ্নিত করি, বদল চাই, কিন্তু নিজেদের বদলাই না।

রাজা বদলে ফেলেছিল। নিজেকে। সচেতন ভাবে।

রাজা কোনো দিন আমাকে বলেনি, নিজেকে বদলে ফেলো, আমার মতো। কিন্তু স্বল্প সময় হলেও, সঙ্গে থেকে বুঝতে পেরেছি, নিজেকে বদলে ফেলতে হবে। না হলে মেনে নিতে হবে ‘ফ্যাসিবাদ সত্য কারণ ইহা সনাতন’।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: চলে গেলেন অলোকরঞ্জন, খুলে গেল বাংলা কবিতার বাহুডোর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.