রবিবারের পড়া: একটি বিপর্যয় ও দেব-রথের সারথি

১৬ জুন, ২০১৩। আজকের দিন থেকে ঠিক ছ’ বছর আগে এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গাড়োয়ালের বিস্তীর্ণ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই দিনই উত্তরকাশী থেকে হরিদ্বার এসেছিলেন লেখক। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা।

0
kedarnath disaster 2013
কেদারনাথ ধ্বংস।
শৌনক, গুপ্ত

গঙ্গোত্রীকে যেমন আমরা উত্তরাখণ্ডের এক জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্র বলি, তেমনই গঙ্গোত্রীর পথে উত্তরকাশীকে পর্বতারোহীদের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র বলা যেতেই পারে। এখানেই রয়েছে পর্বতারোহণ-প্রশিক্ষণের পীঠস্থান ‘নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং’ বা সংক্ষেপে ‘নিম’। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব পর্বতারোহী, আরোহণ-প্রশিক্ষক, এমনকি খ্যাতির আড়ালে থাকা বহু আরোহণকুশলীরও চরণধূলি পড়েছে এখানে। সেই ‘তীর্থক্ষেত্র’ উত্তরকাশীতে অবস্থান করছি তখন। সাল ২০১৩।

গোমুখ থেকে ফেরার পথে উত্তরকাশীর যে হোটেলে আমরা ছিলাম সেটা একেবারেই ব্যস্ত রাস্তার ধারে আর একই রকম ব্যস্ত একটা পেট্রলপাম্পের একেবারে বিপরীতে। জুন মাসের ১৫ তারিখ। চারধাম যাত্রা চলছে পুরোদমে। তাই রাস্তায় নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ির সারি, হর্নে হর্নে কানে তালা লাগার জোগাড়। বর্ষা তার আগমণ জানান দিতে শুরু করেছে। তাই মাঝে মাঝে বেশ জোরে বৃষ্টি নামছে। পরের দিন আমাদের হরিদ্বার নেমে যাওয়া। পেট্রলপাম্প লাগোয়া স্ট্যান্ডে গিয়ে ফেরার গাড়ির ব্যবস্থাও বিকেল বিকেলই সারা হয়ে গেছে।

পরদিন ভোরে যে প্রবল বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল, আমরা তাকে গত ক’দিনের পরিচিত বৃষ্টি বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু যে ঘটনা একেবারেই অপরিচিত, তা হল ভোরের উত্তরকাশীতে একটা হর্নের আওয়াজও না-পাওয়া। কপালে যে ভাঁজ নিয়ে বারান্দায় এলাম, ঘরে ফিরে গেলাম তাকে আরও কয়েক গুণ গভীর করে। বৃষ্টি এতই দুর্ভেদ্য যে উলটো দিকের দশ হাত দূরের পেট্রলপাম্পটাও আর দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির লোকটিকে ফোন করতে জানা গেল, ধরাসুতে বড়ো রকম ধস পড়ে রাস্তা বন্ধ। সব গাড়ি আটকে রয়েছে। রাস্তা খুললে গাড়ি আসবে, তখন যাওয়া যাবে। “রাস্তা কব ঠিক হোগা?”, বোকার মতো প্রশ্নটা করেছিলাম প্রতিবর্ত ক্রিয়ায়। একগাল হেসে লোকটি অবশ্য আরও অদ্ভুত একটা উত্তর দিয়েছিল – “বারিশ রুকনে পর”।

আমরা গোছগাছ সেরে নিলাম। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরে মনে হল বৃষ্টির বেগ তো একটুও কমেনি, বরং যেন অনেকটাই বেড়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, চার দিক আরও অন্ধকার হয়ে আসছে। এ দিকে চেক-আউটের সময় হয়ে গেছে। সঙ্গীদের লবিতে লাগেজের সঙ্গে বসিয়ে আমরা দুই বন্ধু ছাতা নিয়ে গাড়ির স্ট্যান্ডে চলে গেলাম। উত্তরকাশীতে যেন অঘোষিত বন্ধ চলছে। ট্যাক্সি ইউনিয়নের অফিসে তিন জন অলস মুডে গল্প করছে। সেই একই ধরাসুর গল্প নতুন করে শুনলাম। ধস সারাই হলে গাড়ি আসবে। আমরা অসহায় ভাবে বসে রইলাম। যেন ওঁরাই ধস সরাতে যাবেন, এই আশায়। প্রায় আধ ঘণ্টা নিজেদের মধ্যে গল্প করার পর ওঁরা মনে হয় বুঝলেন আমরা কতটা নিরুপায়। এ-দিক ও-দিক ফোন-টোন করলেন। শেষে একটা ফোনে ‘তো ফির জায়েগা?’ বলতে শুনে আমরা আশার আলো দেখতে পেলাম। ফোন রেখে ওঁরা জানালেন, একটা গাড়ি আছে, শ্রীনগর গাড়োয়ালের গাড়ি। ড্রাইভার কাল রাতে যাত্রী নিয়ে এসে আর ফিরতে পারেনি। ছ’ হাজার টাকা দিলে হরিদ্বার নামিয়ে দিতে পারে। আমরা স্বাভাবিক ভাবেই দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোঁজার সাহসটুকুও করলাম না।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: আর মাত্র পনেরোটা বছর, তার পর হয়তো…

ড্রাইভার ছেলেটি বেশ হাসিখুশি, নাম পারভেজ। বাড়িতে স্ত্রী আর ছোটো বাচ্চা আছে। আমাদের হরিদ্বার নামিয়ে বাড়ি ফিরবে। হোটেল থেকে লাগেজ তুলে সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা স্টার্ট দিলাম। প্রথমে উলটো পথ ধরলাম, গঙ্গোত্রীর দিকে। তার পর ডান দিকে একটা নতুন রাস্তা। এই রাস্তাই পিপলডালি হয়ে রুদ্রপ্রয়াগ–হরিদ্বার হাইওয়েতে উঠবে শ্রীনগরের কাছে। গাড়ির সব কাচ তোলা। কাচের ওপর যেন বালতি বালতি জল ঢালা হচ্ছে। শুধু উইন্ডস্ক্রিনে জোড়া ওয়াইপারের চলন মাঝে মাঝে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে গাড়ি রাস্তা ধরেই চলেছে। কিছুটা চলার পর ছাদে একটা জোরে শব্দ হতে পারভেজ গাড়ি দাঁড় করাল। ছাতা মাথায় দিয়ে ছাদে উঠে যেটা নামিয়ে আনল সেটা মাঝারি সাইজের একটা পাথর। পাথরের সাইজ আরেকটু বড়ো হলে কী হত সেটা বলতে দেখলাম পারভেজের বেশ হাসি পাচ্ছে। আরও কিছুটা যেতে দেখলাম বেশ কিছু গাড়ি লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। রাস্তা বন্ধ। এখানেও ধস, তবে বড়োসড়ো কিছু নয়। একটা পাহাড়ি নালা ছোটো ছোটো পাথর রাস্তায় এনে ফেলেছে। গাড়ির ড্রাইভারেরাই হাতে হাত লাগিয়ে সেগুলো সরিয়ে আবার রওনা দিল। পিপলডালি পৌঁছোতে এগারোটা বেজে গেল। বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু থামেনি। এখানে খবর পাওয়া গেল, সামনের রাস্তায় ধস নেমে গাড়ি আটকে পড়েছে। পারভেজ আরও দু’জন ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করল, তিনটে গাড়ি এক সঙ্গে একটা খুব উঁচু আর নির্জন কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাবে। ভয় হল। পারভেজকে বললাম, কাছাকাছি থাকার জায়গা পেলে দেখতে। ওর বাড়ি ফেরার আরও তাড়া। তাই ও মোটে থাকার পক্ষপাতী নয়। শুধুই হেসে বলে, “যব নিকল পড়ে হ্যাঁয়, তব পহুঁছনা তো পড়েগাহি না।”

আমাদের আশঙ্কা যে মিথ্যে ছিল না, তার প্রমাণ মিলল মাত্র আধ ঘণ্টা চলেই। সরু নির্জন রাস্তায় পর পর তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে বিশাল এক পাথর। গাড়ি ঘুরিয়ে পিছনে যাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। বৃষ্টি আবার বেগ বাড়িয়েছে। গাড়ি থেকে নামার আগে এ বার মিষ্টি করে ধমকটা দিয়েই দিল পারভেজ, “ঘর জানা হ্যায় তো উতারকে পত্থর হটানে মে মদত করনা পড়েগা”। তা নামা তো হল, কিন্তু পাথর হঠানোর কোনো উপায় বেরোল না। ছোটো ছোটো পাথর তুলে রাস্তার ধারে ফেলছি। তার ওজনেই হাঁপ ধরে গেছে। এ দিকে সবাই জলকাদায় মাখামাখি। পারভেজরা কিছুক্ষণ ভাবল। তার পর ওই ছোটো পাথরগুলো ছুড়ে ছুড়ে বড়ো পাথরটার রাস্তার দিকের অংশে আঘাত করতে লাগল। ম্যাজিকের মতো কাজ হল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বড়ো পাথরের সেই দিকটা খুলে পড়ে গেল। খোলা অংশটা সরিয়ে প্রায় খাদ ছুঁয়ে তিনটে গাড়িই বেরিয়ে এল। পরে বুঝেছি, এই নির্জন রাস্তায় আটকে পড়লে কত বড়ো বিপদ হত। অলকানন্দার তীরে শ্রীনগরে এসে যখন হাইওয়েতে পড়লাম তখন দুপুর দুটো। পথে বেশ কয়েক বার নেমে পাথর সরাতে হয়েছে। কাদামাখা জামাকাপড়েই গাড়ির সিটে লেপ্টে আছি। রাস্তাটা অনেক দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। তার পুরোটাই দুই লেনে গাড়ির লাইন। গর্জনশীলা অলকানন্দার এমন পাগল রূপ, দেখলে ভয় লাগে। গাড়ি খুব ধীরে ধীরে নামতে লাগল। প্রচুর গাড়ি উঠছেও। বদরীনাথ ও হেমকুণ্ড সাহিবের পথে কাতারে কাতারে তীর্থযাত্রী। তিন মাসের দুধের শিশু থেকে নবতিপর অসুস্থ বৃদ্ধা, কে নেই পুণ্য অর্জনের সেই দীর্ঘ লাইনে। জায়গায় জায়গায় ধস পড়ে রাস্তা এক লেনের হয়ে গেছে। গাড়ির গতি তখন শামুককেও হার মানায়। সেই গতিতেই দেবপ্রয়াগ পৌঁছোলাম সন্ধে সাতটায়। তখন অন্ধকার নামছে। মোবাইলের চার্জও শেষ।

শরীরে এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট নেই। পারভেজকে দেখে অবাক লাগছে। একটানা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। দেবপ্রয়াগের পর একটু গতি বাড়ল। হৃষীকেশ পৌঁছোলাম রাত সাড়ে দশটায়। জানা গেল, আর যাওয়া যাবে না। লক গেট খুলে দেওয়ায় গঙ্গার জল রাস্তার ওপর দিয়ে বইছে। এ দিকে হৃষীকেশ আর ও দিকে রুড়কি পর্যন্ত গাড়ির লম্বা লাইন লেগে গেছে। সকালে জল কমলে আবার যাওয়ার কথা ভাবা যাবে। অত রাতে আর খাওয়া জুটল না। বহু খুঁজে গঙ্গার ধারে একটা ধর্মশালায় আশ্রয় পেলাম। নদীর জল সবেগে আছড়ে পড়ছে তার একতলার উঠোনে। আমরা সন্তর্পণে দোতলায় উঠে গেলাম। মেঝেতে পাতা বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম। পারভেজ কিছুতেই গাড়ি ছেড়ে আসতে রাজি হল না। আমাদের লাগেজও গাড়িতেই ওর জিম্মায় থেকে গেল।

রাস্তা খুলেছে শুনতেই সকাল সকালই বেরিয়ে পড়লাম। জামাকাপড় কিছুই বদলানোর সুযোগ হয়নি। গাড়ি আর কোথাও আটকাল না। হরিদ্বারে হোটেলে এসে ঢুকলাম সকাল সাতটায়। কথা হওয়া ছয় হাজারের এক পয়সাও বেশি নিল না পারভেজ। টানা পনেরো ঘণ্টা ড্রাইভ করে রাতে গাড়িতে ঘুমোনো ছেলেটা একই রকম হেসে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে চলে গেল। স্নান সেরে বেরিয়ে টিভি চালাতেই চমকে উঠলাম। কেদারনাথ ধ্বংস। বদরী-হেমকুণ্ডের রাস্তার জায়গায় জায়গায় প্রবল ধস। উত্তরকাশীতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে ঘরবাড়ি। সমস্ত ইন্টারনেট, মোবাইল ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন। হাজারে হাজারে মানুষ বিপন্ন, নিখোঁজ, মৃত। বুঝতে বাকি রইল না, ধ্বংস গতকাল আমাদের পিছু পিছু আসছিল। একেই বলে ‘মার্জিনাল এস্কেপ’। মনে পড়ে গেল সেই দুধের শিশু আর বৃদ্ধদের কথা। তারা এখন কোথায়, কেউ জানে না। পারভেজের কথা মনে পড়ল। সে-ও তো শ্রীনগর ফিরবে। ওকে ফোন করলাম, ফোন লাগল না। বেলা বাড়তে খবরের ভয়াবহতাও বাড়তে লাগল। প্রশাসনের পাশাপাশি নিমের পর্বতারোহীরাও নেমে পড়েছে উদ্ধারকাজে। বিমর্ষ মনে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। হরিদ্বারের রাস্তায় ভিড় বাড়ছে। কত বছর কেটে গেছে। নিম-এর ক্যাম্পাসে কিছু পজিটিভ কোটের হোর্ডিং দেখেছিলাম। তার একটা ছিল, “A man is not properly dressed if he is not wearing a smile on his face”। আরেকটা ছিল উইলমা রুডলফের কথা, “I’m in my prime, there’s no goal too far, no mountain too high”। পারভেজ প্রথমটার নিখুঁত প্রতীক ছিল। আর দ্বিতীয় কথাটা গাড়ি চালিয়ে দিন গুজরানো এই ছেলেটা আরও কত সহজ ভাষায় বলেছিল, “যব নিকল পড়ে হ্যাঁ, তব পহুঁছনা তো পড়েগাহি না”। পারভেজের নম্বরে আর কখনও যোগাযোগ করতে পারিনি। কিন্তু ওর সেই আত্মবিশ্বাস আজও আমায় বিশ্বাস করায়, ও বাড়ি ফিরতে পেরেছিল। এই শহুরে বিলাসী জীবনে সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ে দেবদূতের মতো আসা রথের সারথি আজও আমায় যে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নিরসনের প্রেরণা জোগায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here