রবিবারের পড়া: অবসরে অনুভবে

0
blanket distribution
কম্বল বিতরণের পর।

জাহির রায়হান

সোশ্যাল মিডিয়া জন্ম দেয় নানা সম্ভাবনার। সম্ভাবনা সৃষ্টি করে উদ্যোগ আর সেই উদ্যোগে উপকৃত হয় অসংখ্য মানুষ। আমাদের সন্টু সে দিন পোস্ট করল তার অভিনব ভাবনার কথা। সাধারণ ভাবে আম খেয়ে, আমের আঁটিটা ফেলে দেওয়াই দস্তুর। সন্টুর বক্তব্য অন্য রকম।

সন্টুর কথায়, “এঁটো আঁটি পরিষ্কার করে সামান্য শুকিয়ে জমা করুন। তার পর যে দিন বেড়াতে যাবেন অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে, ব্যাগে একটা প্যান্ট বা দু’টো জামা কম নিয়ে, ভরে নিন সেই জমিয়ে রাখা আমের আঁটিগুলি। ট্রেন-বাসের জানলা দিয়ে ছড়িয়ে দিন মাঠেঘাটে। তাৎক্ষণিক লাভে হালকা হয়ে যাবে আপনার ব্যাগ। আর আগামীর লাভে? মাটি ও জলের সংস্পর্শ পেয়ে একদিন বৃক্ষ হয়ে মাথা তুলবে আমের আঁটিগুলি। পৃথিবী পাবে বৃক্ষরাজি, পরিবেশ পাবে সবুজ এবং মনুষ্য ও পক্ষীকুল ফলমূলের পাশাপাশি পাবে বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অলক্ষ্যে চিত্রগুপ্তের গাবদা খাতায় আপনার নামে জমা পড়বে পুণ্য।”

‘অবসর’।

আর এক ভদ্রলোকের কথা পড়লাম ফেসবুকেই, তিনি সপরিবার বেড়াতে যান আমাদেরই মতো, নানা জায়গায়, নানা স্থানে। তবে তাঁদের বেড়ানোর ভঙ্গিমাটি ভারী মিষ্টি। বেড়াতে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটির সময় হাতে রাখা ব্যাগে তাঁরা জমা করেন পথে পথে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিক, তার পর ডাস্টবিনে জমা করেন সেই বিষ। কেউ তাঁদের করতে বলেনি এ কাজ, তাঁরা নিজেরাই মানুষের সেবা করেন নিজেদের মতো করে। ভ্রমণকালে এ ভাবেই তাঁরা খেয়াল রাখেন পরিবেশ এবং পৃথিবীর। তাঁদের এই অসামান্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ সৃষ্টিশীল মনে দাগ কাটে, বহু মানুষ অনুপ্রাণিত হন, শুরু করেন নিজেদের মতো করে ছোটোখাটো কাজ যাতে ভালো থাকে পারিপার্শ্বিকতা, ভালো থাকে মানুষ।

লেখালেখির সূত্রে আমার সঙ্গে আলাপ হল কলকাতানিবাসী এক ডাক্তারবাবুর। সে আলাপ ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হতে সময় নেয়নি। কর্মসূত্রে কলকাতানিবাসী হলেও তাঁর মন সর্বদা পড়ে থাকে বড়ো সাধের উত্তরবঙ্গে। ডুয়ার্সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন তিনি, ঠিক আমারই মতো। সবুজ বনানী, চিকচিকে পাহাড়ি নদীর রূপালি বালুবক্ষ, তিরতিরে জলপ্রবাহে কুচিকুচি মাছেদের জলকেলি, দূরের উচ্চ-অনুচ্চ পাহাড়-প্রাচীর, বিরামহীন ঝিঁঝিঁর ডাক, অভয়ারণ্যের নৈঃশব্দ্য এবং সর্বোপরি ডুয়ার্সের সরল সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে পাকাপাকি ভাবে কাটাতে চান তাঁর অবসর জীবন। সে অবসরের দিন গোনা শুরু হয়েছে তাঁর, পাশাপাশি চলছে উপযুক্ত প্রস্তুতিও।

অবসরযাপন যেন শুধুই আলসে কালক্ষেপণ না হয় তার জন্য তাঁর চিন্তাভাবনাও সুদূরপ্রসারী। সেই চিন্তাভাবনার মধ্যে আমিও রয়েছি কিয়দংশ, বিন্দুবৎ। ডেরা বাঁধার জায়গা কেনা থেকে আস্তানা গড়ে তোলা, সবটারই আমি সাক্ষী কমবেশি। ডুয়ার্সের প্রান্তিক গ্রামের মানুষদের জন্য বিনা খরচে মেডিক্যাল ক্যাম্প, উৎসব-লগ্নে বস্ত্রবিতরণ, সাধারণ মানুষের পানযোগ্য পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, এবং সংবৎসর চিকিৎসা প্রদানের পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটে তাঁর।

মেডিক্যাল ক্যাম্প।

তিনি বলেন, “প্রাথমিক কিছু বিষয় মেনে চললেই অনেক রোগভোগ থেকে মুক্তি মেলে জাহির, অবসরগ্রহণের পর ডুয়ার্সের গ্রামবাসীকে সেই সচেতনতার পাঠই দেব আমি, তুমি ওদের বাচ্চাদের একটু পড়িও।”

বিনা বাক্যব্যয়ে অযথা কালক্ষেপ না করে জানিয়ে রেখেছি আমার সম্মতি। একদিন বললাম, সবই তো হল দাদা, কিন্তু দীর্ঘদিনের এই কর্মকাণ্ডে খরচ জোগাবেন কোত্থেকে?

তাই তো! বলে শুরু করলেন মস্তিষ্কের খনন। গরুমারা অভয়ারণ্যের পিছনে দক্ষিণ ধুপঝোরা গ্রামে কেনা বিরাট প্রশস্ত জায়গার একপাশে গড়ে উঠল হোম-স্টে, সেই খননকার্যের ফলশ্রুতিতে। রাজ্যের বহু মানুষ ডুয়ার্স বেড়াতে আসছেন রোজদিন। বহু মানুষের এখন অবসরযাপনের পছন্দের গন্তব্য সকলের প্রিয় ডুয়ার্স। বহু লোক নিত্যদিন প্রেমে পড়ছেন আত্মমগ্ন ডুয়ার্সের। তাঁদের কথা ভেবেই নির্মিত হল ‘অবসর’। তবে এই উদ্যোগ শুধুই লাভ-ক্ষতির খতিয়ান বা ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য নয়, ‘অবসর’ আসলে নিরবচ্ছিন্ন রোজগারের একটা নিশ্চিত উৎস, যে আয়ের একটা অংশ ব্যয় করা হবে ডুয়ার্সবাসীর কল্যাণে। মানুষ ডুয়ার্সে বেড়াতে আসবেন, যেমন অন্যত্র থাকেন, এখানেও তেমনি থাকবেন, আয়-ব্যয় হিসেব করে লভ্যাংশের অংশ দিয়ে করা হবে ডুয়ার্সবাসীর সেবা।

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধীরে ধীরে ডানা মেলল আমাদের প্রাথমিক প্রয়াস। পাশাপাশি থেমে থাকল না মানুষের জন্য কাজও। নির্মাণকার্য চলার পাশাপাশি দক্ষিণ ধুপঝোরা গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য আয়োজন করা হল প্রথম ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের। সাড়া পড়ে গেল গ্রাম জুড়ে। কলকাতা ও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের বেশ কয়েক জন চিকিৎসক সাগ্রহে যোগ দিলেন সেই শিবিরে। গ্রামবাসী তাঁদের সমস্যার কথা খোলাখুলি আলোচনা করলেন উপস্থিত চিকিৎসকদের সঙ্গে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বিনামূল্যে ঔষধাদি নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন সরল মানুষগুলি।

মেডিক্যাল ক্যাম্পে মহিলা।

তবে সেটাই শেষ নয়। শারদ উৎসবের প্রাক্কালে ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে আবার বসল শিবির। তবে মেডিক্যাল ক্যাম্প নয়, এ বারে নেওয়া হল বস্ত্রবিতরণ কর্মসূচি। আগত শারদীয়া উৎসবের কথা মাথায় রেখে গ্রামের কচিকাঁচাদের হাতে তুলে দেওয়া হল নতুন জামাকাপড়। তারা তো নতুন বস্ত্র পেয়ে মহা খুশি আর তাদের হাসিমুখ দেখে আনন্দিত আমরাও। আমরা অনুপ্রাণিত হলাম পুনর্বার, গৃহীত হল আরও সুচারু ও বৃহত্তর ভাবে মানুষের জন্য কাজ করার নানাবিধ কর্মসূচি।

মানুষের জন্য যে কাজ করার ভাবনা শুরু হয়েছে তাতে দোসর হিসেবে পাশে পাওয়া গেল ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’কে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বছরভর ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’ আয়োজন করে থাকে মানবদরদী এই অলাভজনক সংগঠনটি। তারাও শামিল হল ‘অবসর’-এর সঙ্গে। গত অক্টোবরে দ্বিতীয় বার আয়োজিত হল চিকিৎসাশিবির। গ্রামের মহিলাদের কথা মাথায় রেখে ব্যবস্থা রাখা হল মহিলা চিকিৎসকেরও। দ্বিতীয় শিবিরে সহযোগিতার হাত বাড়াল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দফতর।

প্রথম ক্যাম্পটি ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলেও, দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হল মূর্তি নদীর ধারে বন দফতরের অফিসচত্বরে। অফিস-সংলগ্ন কাঠের বাংলোবাড়িতে শুরু হল এ বারের আয়োজন। দু’টি শিবিরেই রোগিণীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামবাসী একে একে এসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে নিয়ে গেলেন নানাবিধ রোগের নিদান। এ বারেও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করা হল ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ ও ‘অবসর’-এর পক্ষ হতে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সুগার পরীক্ষার ব্যবস্থাপনাও রাখা হয়েছিল এ বারে।

ভালোয় ভালোয় মিটে গেল সে দিনের আয়োজন। শিবির শেষ হলে উপস্থিত চিকিৎসকদের মধ্যে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী করা হল সামগ্রিক পর্যালোচনা। এ ধরনের শিবিরের নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি জোর দেওয়া হল শারীরিক সচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রচারকার্যের ওপর। ‘অবসর’-এর উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা’য় জানালেন, অধিকাংশই পেটের রোগী। পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে, পেটের রোগের সুরাহা হয়ে যাবে অনেকখানি। অতএব সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল গ্রামবাসীদের সুবিধার্থে একটি বৃহৎ পরিশুদ্ধ পানীয় জলের প্ল্যান্ট বসানো হবে এবং সেখান থেকে নামমাত্র মূল্যে গ্রামবাসীদের সরবরাহ করা হবে প্রয়োজনমাফিক পানীয় জল।

বস্ত্র বিতরণের প্রস্তুতি।

তার পর পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাপজোক করে ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে জমির একটা অংশ তুলে দেওয়া হল কর্মোদ্যোগের সাথি ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’-এর হাতে। তারা সেখানে স্থায়ী মেডিক্যাল ইউনিট, টিউটোরিয়াল হোম, কর্মসংস্থানমুখী নানাবিধ হাতের কাজ ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, উপকৃত হবেন গরুমারা-মূর্তি সংলগ্ন গ্রামের আপামর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। পানীয় জলের বৃহৎ ইউনিট গড়ে উঠবে নিকট ভবিষ্যতে। কিশোরী-তরুণীদের জন্য ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনের সংস্থান করা হবে আগামী দিনে। সেখান থেকে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রী থেকে বয়স্ক মহিলা, সকলেই সংগ্রহ করতে পারবে তাদের প্রয়োজনীয় ন্যাপকিন। প্রয়োজনে স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মেয়েদের মধ্যে এ ব্যাপারে চালানো হবে রুচিসম্মত প্রচারকার্য। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষাসাপেক্ষে অন্যান্য ক্ষেত্রেও নজর দেওয়া হবে ভবিষ্যতে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিকল্প চাষবিষয়ক ক্ষেত্রগুলিতে দেওয়া হবে প্রাধান্য যাতে করে গ্রামবাসীর অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মানোন্নয়ন ঘটে তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রারও। শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনাও রয়েছে আগামী দিনগুলিতে ।

তবে শুধু মানুষ কেন? পশু-পাখি কি ডুয়ার্সবাসী নয়? তাঁদের কথাও ভাবা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে, রাস্তার কুকুরদের জন্য ‘ডগ শেল্টার’ এবং তাদের জন্য দু’বেলা অন্নের জোগান, পাখিদের জন্য রোপিত হয়েছে অজস্র ফলের গাছ। পাখি-প্রজাপতি ও গাছগাছালিতে ভরে উঠবে একদিন তামাম ‘অবসর’চত্বর।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: নারী স্বাধীনতা ও এক বৃদ্ধা…

ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতই বলবে, কিন্তু মানুষের জন্য কাজ থেমে থাকবে না কোনো ভাবেই। গত ২৩ জানুয়ারি ২০২০, নেতাজি স্মরণোৎসবের দিন নেওয়া হয়েছিল কম্বলবিতরণের কর্মসূচি। দক্ষিণ ধুপঝোরা ও সংলগ্ন এলাকার মানুষদের হাতে সে দিন তুলে দেওয়া হয় শীত-নিবারণী কম্বল। তবে এই কাজে শুধুই ‘অবসর’ ও ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নয়, জড়িয়ে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ভ্রমণ-পর্বে এই সামান্য সামাজিক কাজের কথা সোশ্যাল মিডিয়া মারফত জানতে পেরে বহু মানুষ বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের সহযোগিতার হাত। তাঁরা সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন এ ব্যাপারে। ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন আমাদের সঙ্গে শামিল হওয়ার, তাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আশা রাখি, সকলের এই অসামান্য যোগদানে সর্বতো ভাবে সফল হবে আমাদের আগামী দিনের পথচলা।

ছবি: লেখক

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.