Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: অবসরে অনুভবে

সোশ্যাল মিডিয়া জন্ম দেয় নানা সম্ভাবনার। সম্ভাবনা সৃষ্টি করে উদ্যোগ আর সেই উদ্যোগে উপকৃত হয় অসংখ্য মানুষ। আমাদের সন্টু সে দিন পোস্ট করল তার অভিনব ভাবনার কথা। সাধারণ ভাবে আম খেয়ে, আমের আঁটিটা ফেলে দেওয়াই দস্তুর। সন্টুর বক্তব্য অন্য রকম।

blanket distribution

জাহির রায়হান

সোশ্যাল মিডিয়া জন্ম দেয় নানা সম্ভাবনার। সম্ভাবনা সৃষ্টি করে উদ্যোগ আর সেই উদ্যোগে উপকৃত হয় অসংখ্য মানুষ। আমাদের সন্টু সে দিন পোস্ট করল তার অভিনব ভাবনার কথা। সাধারণ ভাবে আম খেয়ে, আমের আঁটিটা ফেলে দেওয়াই দস্তুর। সন্টুর বক্তব্য অন্য রকম।

সন্টুর কথায়, “এঁটো আঁটি পরিষ্কার করে সামান্য শুকিয়ে জমা করুন। তার পর যে দিন বেড়াতে যাবেন অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে, ব্যাগে একটা প্যান্ট বা দু’টো জামা কম নিয়ে, ভরে নিন সেই জমিয়ে রাখা আমের আঁটিগুলি। ট্রেন-বাসের জানলা দিয়ে ছড়িয়ে দিন মাঠেঘাটে। তাৎক্ষণিক লাভে হালকা হয়ে যাবে আপনার ব্যাগ। আর আগামীর লাভে? মাটি ও জলের সংস্পর্শ পেয়ে একদিন বৃক্ষ হয়ে মাথা তুলবে আমের আঁটিগুলি। পৃথিবী পাবে বৃক্ষরাজি, পরিবেশ পাবে সবুজ এবং মনুষ্য ও পক্ষীকুল ফলমূলের পাশাপাশি পাবে বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অলক্ষ্যে চিত্রগুপ্তের গাবদা খাতায় আপনার নামে জমা পড়বে পুণ্য।”

‘অবসর’।

আর এক ভদ্রলোকের কথা পড়লাম ফেসবুকেই, তিনি সপরিবার বেড়াতে যান আমাদেরই মতো, নানা জায়গায়, নানা স্থানে। তবে তাঁদের বেড়ানোর ভঙ্গিমাটি ভারী মিষ্টি। বেড়াতে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটির সময় হাতে রাখা ব্যাগে তাঁরা জমা করেন পথে পথে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিক, তার পর ডাস্টবিনে জমা করেন সেই বিষ। কেউ তাঁদের করতে বলেনি এ কাজ, তাঁরা নিজেরাই মানুষের সেবা করেন নিজেদের মতো করে। ভ্রমণকালে এ ভাবেই তাঁরা খেয়াল রাখেন পরিবেশ এবং পৃথিবীর। তাঁদের এই অসামান্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ সৃষ্টিশীল মনে দাগ কাটে, বহু মানুষ অনুপ্রাণিত হন, শুরু করেন নিজেদের মতো করে ছোটোখাটো কাজ যাতে ভালো থাকে পারিপার্শ্বিকতা, ভালো থাকে মানুষ।

লেখালেখির সূত্রে আমার সঙ্গে আলাপ হল কলকাতানিবাসী এক ডাক্তারবাবুর। সে আলাপ ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হতে সময় নেয়নি। কর্মসূত্রে কলকাতানিবাসী হলেও তাঁর মন সর্বদা পড়ে থাকে বড়ো সাধের উত্তরবঙ্গে। ডুয়ার্সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন তিনি, ঠিক আমারই মতো। সবুজ বনানী, চিকচিকে পাহাড়ি নদীর রূপালি বালুবক্ষ, তিরতিরে জলপ্রবাহে কুচিকুচি মাছেদের জলকেলি, দূরের উচ্চ-অনুচ্চ পাহাড়-প্রাচীর, বিরামহীন ঝিঁঝিঁর ডাক, অভয়ারণ্যের নৈঃশব্দ্য এবং সর্বোপরি ডুয়ার্সের সরল সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে পাকাপাকি ভাবে কাটাতে চান তাঁর অবসর জীবন। সে অবসরের দিন গোনা শুরু হয়েছে তাঁর, পাশাপাশি চলছে উপযুক্ত প্রস্তুতিও।

অবসরযাপন যেন শুধুই আলসে কালক্ষেপণ না হয় তার জন্য তাঁর চিন্তাভাবনাও সুদূরপ্রসারী। সেই চিন্তাভাবনার মধ্যে আমিও রয়েছি কিয়দংশ, বিন্দুবৎ। ডেরা বাঁধার জায়গা কেনা থেকে আস্তানা গড়ে তোলা, সবটারই আমি সাক্ষী কমবেশি। ডুয়ার্সের প্রান্তিক গ্রামের মানুষদের জন্য বিনা খরচে মেডিক্যাল ক্যাম্প, উৎসব-লগ্নে বস্ত্রবিতরণ, সাধারণ মানুষের পানযোগ্য পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, এবং সংবৎসর চিকিৎসা প্রদানের পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটে তাঁর।

মেডিক্যাল ক্যাম্প।

তিনি বলেন, “প্রাথমিক কিছু বিষয় মেনে চললেই অনেক রোগভোগ থেকে মুক্তি মেলে জাহির, অবসরগ্রহণের পর ডুয়ার্সের গ্রামবাসীকে সেই সচেতনতার পাঠই দেব আমি, তুমি ওদের বাচ্চাদের একটু পড়িও।”

বিনা বাক্যব্যয়ে অযথা কালক্ষেপ না করে জানিয়ে রেখেছি আমার সম্মতি। একদিন বললাম, সবই তো হল দাদা, কিন্তু দীর্ঘদিনের এই কর্মকাণ্ডে খরচ জোগাবেন কোত্থেকে?

তাই তো! বলে শুরু করলেন মস্তিষ্কের খনন। গরুমারা অভয়ারণ্যের পিছনে দক্ষিণ ধুপঝোরা গ্রামে কেনা বিরাট প্রশস্ত জায়গার একপাশে গড়ে উঠল হোম-স্টে, সেই খননকার্যের ফলশ্রুতিতে। রাজ্যের বহু মানুষ ডুয়ার্স বেড়াতে আসছেন রোজদিন। বহু মানুষের এখন অবসরযাপনের পছন্দের গন্তব্য সকলের প্রিয় ডুয়ার্স। বহু লোক নিত্যদিন প্রেমে পড়ছেন আত্মমগ্ন ডুয়ার্সের। তাঁদের কথা ভেবেই নির্মিত হল ‘অবসর’। তবে এই উদ্যোগ শুধুই লাভ-ক্ষতির খতিয়ান বা ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য নয়, ‘অবসর’ আসলে নিরবচ্ছিন্ন রোজগারের একটা নিশ্চিত উৎস, যে আয়ের একটা অংশ ব্যয় করা হবে ডুয়ার্সবাসীর কল্যাণে। মানুষ ডুয়ার্সে বেড়াতে আসবেন, যেমন অন্যত্র থাকেন, এখানেও তেমনি থাকবেন, আয়-ব্যয় হিসেব করে লভ্যাংশের অংশ দিয়ে করা হবে ডুয়ার্সবাসীর সেবা।

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধীরে ধীরে ডানা মেলল আমাদের প্রাথমিক প্রয়াস। পাশাপাশি থেমে থাকল না মানুষের জন্য কাজও। নির্মাণকার্য চলার পাশাপাশি দক্ষিণ ধুপঝোরা গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য আয়োজন করা হল প্রথম ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের। সাড়া পড়ে গেল গ্রাম জুড়ে। কলকাতা ও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের বেশ কয়েক জন চিকিৎসক সাগ্রহে যোগ দিলেন সেই শিবিরে। গ্রামবাসী তাঁদের সমস্যার কথা খোলাখুলি আলোচনা করলেন উপস্থিত চিকিৎসকদের সঙ্গে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বিনামূল্যে ঔষধাদি নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন সরল মানুষগুলি।

মেডিক্যাল ক্যাম্পে মহিলা।

তবে সেটাই শেষ নয়। শারদ উৎসবের প্রাক্কালে ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে আবার বসল শিবির। তবে মেডিক্যাল ক্যাম্প নয়, এ বারে নেওয়া হল বস্ত্রবিতরণ কর্মসূচি। আগত শারদীয়া উৎসবের কথা মাথায় রেখে গ্রামের কচিকাঁচাদের হাতে তুলে দেওয়া হল নতুন জামাকাপড়। তারা তো নতুন বস্ত্র পেয়ে মহা খুশি আর তাদের হাসিমুখ দেখে আনন্দিত আমরাও। আমরা অনুপ্রাণিত হলাম পুনর্বার, গৃহীত হল আরও সুচারু ও বৃহত্তর ভাবে মানুষের জন্য কাজ করার নানাবিধ কর্মসূচি।

মানুষের জন্য যে কাজ করার ভাবনা শুরু হয়েছে তাতে দোসর হিসেবে পাশে পাওয়া গেল ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’কে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বছরভর ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’ আয়োজন করে থাকে মানবদরদী এই অলাভজনক সংগঠনটি। তারাও শামিল হল ‘অবসর’-এর সঙ্গে। গত অক্টোবরে দ্বিতীয় বার আয়োজিত হল চিকিৎসাশিবির। গ্রামের মহিলাদের কথা মাথায় রেখে ব্যবস্থা রাখা হল মহিলা চিকিৎসকেরও। দ্বিতীয় শিবিরে সহযোগিতার হাত বাড়াল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দফতর।

প্রথম ক্যাম্পটি ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলেও, দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হল মূর্তি নদীর ধারে বন দফতরের অফিসচত্বরে। অফিস-সংলগ্ন কাঠের বাংলোবাড়িতে শুরু হল এ বারের আয়োজন। দু’টি শিবিরেই রোগিণীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামবাসী একে একে এসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে নিয়ে গেলেন নানাবিধ রোগের নিদান। এ বারেও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করা হল ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ ও ‘অবসর’-এর পক্ষ হতে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সুগার পরীক্ষার ব্যবস্থাপনাও রাখা হয়েছিল এ বারে।

ভালোয় ভালোয় মিটে গেল সে দিনের আয়োজন। শিবির শেষ হলে উপস্থিত চিকিৎসকদের মধ্যে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী করা হল সামগ্রিক পর্যালোচনা। এ ধরনের শিবিরের নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি জোর দেওয়া হল শারীরিক সচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রচারকার্যের ওপর। ‘অবসর’-এর উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা’য় জানালেন, অধিকাংশই পেটের রোগী। পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে, পেটের রোগের সুরাহা হয়ে যাবে অনেকখানি। অতএব সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল গ্রামবাসীদের সুবিধার্থে একটি বৃহৎ পরিশুদ্ধ পানীয় জলের প্ল্যান্ট বসানো হবে এবং সেখান থেকে নামমাত্র মূল্যে গ্রামবাসীদের সরবরাহ করা হবে প্রয়োজনমাফিক পানীয় জল।

বস্ত্র বিতরণের প্রস্তুতি।

তার পর পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাপজোক করে ‘অবসর’-প্রাঙ্গণে জমির একটা অংশ তুলে দেওয়া হল কর্মোদ্যোগের সাথি ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’-এর হাতে। তারা সেখানে স্থায়ী মেডিক্যাল ইউনিট, টিউটোরিয়াল হোম, কর্মসংস্থানমুখী নানাবিধ হাতের কাজ ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, উপকৃত হবেন গরুমারা-মূর্তি সংলগ্ন গ্রামের আপামর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। পানীয় জলের বৃহৎ ইউনিট গড়ে উঠবে নিকট ভবিষ্যতে। কিশোরী-তরুণীদের জন্য ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনের সংস্থান করা হবে আগামী দিনে। সেখান থেকে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রী থেকে বয়স্ক মহিলা, সকলেই সংগ্রহ করতে পারবে তাদের প্রয়োজনীয় ন্যাপকিন। প্রয়োজনে স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় মেয়েদের মধ্যে এ ব্যাপারে চালানো হবে রুচিসম্মত প্রচারকার্য। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষাসাপেক্ষে অন্যান্য ক্ষেত্রেও নজর দেওয়া হবে ভবিষ্যতে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিকল্প চাষবিষয়ক ক্ষেত্রগুলিতে দেওয়া হবে প্রাধান্য যাতে করে গ্রামবাসীর অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি মানোন্নয়ন ঘটে তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রারও। শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনাও রয়েছে আগামী দিনগুলিতে ।

তবে শুধু মানুষ কেন? পশু-পাখি কি ডুয়ার্সবাসী নয়? তাঁদের কথাও ভাবা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে, রাস্তার কুকুরদের জন্য ‘ডগ শেল্টার’ এবং তাদের জন্য দু’বেলা অন্নের জোগান, পাখিদের জন্য রোপিত হয়েছে অজস্র ফলের গাছ। পাখি-প্রজাপতি ও গাছগাছালিতে ভরে উঠবে একদিন তামাম ‘অবসর’চত্বর।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: নারী স্বাধীনতা ও এক বৃদ্ধা…

ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতই বলবে, কিন্তু মানুষের জন্য কাজ থেমে থাকবে না কোনো ভাবেই। গত ২৩ জানুয়ারি ২০২০, নেতাজি স্মরণোৎসবের দিন নেওয়া হয়েছিল কম্বলবিতরণের কর্মসূচি। দক্ষিণ ধুপঝোরা ও সংলগ্ন এলাকার মানুষদের হাতে সে দিন তুলে দেওয়া হয় শীত-নিবারণী কম্বল। তবে এই কাজে শুধুই ‘অবসর’ ও ‘এইম ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নয়, জড়িয়ে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ভ্রমণ-পর্বে এই সামান্য সামাজিক কাজের কথা সোশ্যাল মিডিয়া মারফত জানতে পেরে বহু মানুষ বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের সহযোগিতার হাত। তাঁরা সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন এ ব্যাপারে। ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন আমাদের সঙ্গে শামিল হওয়ার, তাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আশা রাখি, সকলের এই অসামান্য যোগদানে সর্বতো ভাবে সফল হবে আমাদের আগামী দিনের পথচলা।

ছবি: লেখক

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: ভারতীয় ক্রিকেট-বিপ্লবের দুই কারিগর

শ্রয়ণ সেন

১০ নভেম্বর, ২০০০। ঢাকায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলছে নামছে ভারত। প্রথম বার সাদা জার্সিতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিতে চলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতীয় ড্রেসিং রুমে থেকে দেখা যাচ্ছে এক বিদেশি মুখকে। জন রাইট (John Wright)।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওই টেস্টটা সৌরভের যেমন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্ট তেমনই ভারতের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে জন রাইটেরও।

পরবর্তী সাড়ে চার বছর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সুবর্ণ অধ্যায় ছিল। সেই অধ্যায়ে অর্জুন যদি হন সৌরভ, তা হলে নিঃসন্দেহে তাঁর দ্রোণাচার্য হলেন জন রাইট।

কী অদ্ভুত সমাপতন না! আজই গুরু পূর্ণিমা। আবার ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম বিদেশি কোচের জন্মদিন। তিন দিনের মাথায় অর্জুনেরও জন্মদিন।

২০০০ সালটা ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে মহাপরিবর্তনের যুগ ছিল। মার্চেই ভারতীয় দলের ব্যাটনটা সচিনের হাত থেকে সৌরভের হাতে চলে আসে।

কিন্তু তার পরের কয়েক মাস, সৌরভদের কাছে অত্যন্ত কঠিন একটা সময় ছিল। গড়াপেটার কলঙ্ক লেগে গিয়েছে ভারতীয় দলে। সাসপেন্ড হয়েছেন একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে ভারতীয় দলকে টেনে বের করে আনার দায়িত্ব নেন সৌরভ, সচিন, দ্রাবিড়রা। সেই সঙ্গে জুটে যান যুবরাজ, জাহির খানদের মতো জুনিয়র। ২০০০-এর অক্টোবরেই বাজিমাত। সবাইকে চমকে দিয়ে আইসিসি মিনি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের রানার্স আপ। অল্পের জন্য ট্রফি হাতছাড়া। গ্রুপ স্টেজে অস্ট্রেলিয়া আর সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা বধ করে আসা। ভারতীয় ক্রিকেটের চরিত্রটা কিন্তু বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে।

এই চারিত্রিক বদলের ব্যাপারটি পূর্ণ মর্যাদা পেল জন রাইটের আগমনে। বিদেশি কোচের সুবিধা হল, তাঁর মধ্যে প্রাদেশিকতার কোনো ব্যাপার থাকে না, যেটা দেশি কোচদের নিয়ে সব থেকে বড়ো সমস্যার।

জন রাইটকে ভারতীয় দলের কোচ করে আনার পেছনে রাহুল দ্রাবিড়ের (Rahul Dravid) একটা ছোট্ট কিন্তু মহৎ ভূমিকা রয়েছে।

রাইটের কথা প্রথমে সৌরভকে বলেন দ্রাবিড়ই। ২০০০-এর গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি খেলেন দ্রাবিড়। সেই দলেরই কোচ ছিলেন রাইট। তখন সৌরভ আবার খেলছেন ল্যাঙ্কাশায়ারে। সেখান থেকে সৌরভের সঙ্গেও রাইটের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

এর পরেই বিশ্ব দেখল সৌরভ আর রাইটের সেই বিখ্যাত জুটি। সৌরভ-রাইট জুটির প্রথম পরীক্ষা ছিল ২০০১-এর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজটা।

স্টিভ ওয়ের অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়া। টানা ১৫টা টেস্ট জিতে ভারতে পা রেখেছে। বিপক্ষে ভারত তখন একঝাঁক তরুণ, অভিজ্ঞতাও সে ভাবে কম। তা এ হেন অস্ট্রেলিয়া যখন প্রথম টেস্টেই ভারতের ওপরে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গেল, কেউ হয়তো কল্পনাই করতে পারেননি যে পরের দু’টো টেস্ট জিতে ভারত ইতিহাস গড়বে।

কিন্তু সেটাই করে দেখাল বদলে যাওয়া ভারত। সিরিজ শুরু হওয়ার আগে পঞ্জাবের তরুণ অফ স্পিনার হরভজন সিংহের হয়ে প্রবল জোরে গলা ফাটিয়েছিলেন সৌরভ। অবশ্যই রাইটের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল এই ব্যাপারে।

এই হরভজনই ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তফাতটা গড়ে দিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে উঠে এলেন ভিভিএস লক্ষ্মণও। ইডেনে দ্বিতীয় টেস্টে ফলোঅন করে ভারত কার্যত পরাজিত হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। রাহুল দ্রাবিড়কে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন লক্ষ্মণ। পঞ্চম দিনের শেষ লগ্নে এসে ঐতিহাসিক জয় পেল ভারত। এর পর চেন্নাইয়ের শেষ টেস্টও জিতে নিয়ে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি দখল করে নিল ভারত।

স্টিভ ওয়ের ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ দখল করার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।

ভারতের মাটিতে ট্রফি জয় এক জিনিস আর সেই ট্রফিটাই যখন বিদেশের মাটি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, তার মাহাত্ম্য আরও অনেকটাই বেশি।

আড়াই বছর পর, ২০০৩-০৪-এর শীতটা ভারতীয় ক্রিকেটে আরও এক সোনালি মুহূর্ত নিয়ে এল। এ বার সিডনি থেকে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফিটি ভারতে নিয়ে চলে এলেন সৌরভ। স্টিভ ওয়, রিকি পন্টিংরা হাঁ করে দেখতে থাকলেন।

না, ওই সিরিজটা ভারতের জেতা হয়নি। চার টেস্টের সিরিজ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়েছিল ১-১। কিন্তু শেষ টেস্টের শেষ বিকেলে স্টিভ ওয় ও রকম প্রতিরোধ না গড়ে তুললে ২-১ ব্যবধানে সিরিজটা যে ভারতই জিতত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তার বছর দুয়েক তিনেক আগে থেকেই বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা রপ্ত করতে শিখেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০১-এ জিম্বাবোয়ে আর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ জিতলেও ২০০২-টা ছিল মোড়ঘোরানো বছর।

ওই বছর এপ্রিল-মে’তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পোর্ট অব স্পেনে ঐতিহাসিক টেস্ট জিতল ভারত। দুর্ভাগ্যবশত, পরের দু’টি টেস্ট হেরে যাওয়ার ফলে সিরিজটা জেতা হয়নি, কিন্তু তার মাস তিনেকের মধ্যেই ইংল্যান্ডে আরও বড়ো সাফল্য এলে ভারতীয় দলের জন্য।

হেডিংলি টেস্টে জয় আজও বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের সেরা টেস্ট জয়ের মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। ওই টেস্টে ইনিংসে জয়ের হাত ধরে, ইংল্যান্ডে মাটিতে টেস্ট সিরিজ অমীমাংসিত রাখার বিরাট কৃতিত্ব অর্জন করল ভারত।

তখন থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করেছে। ভারত আর ‘বিদেশের মাঠে শক্ত পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র’ নয়। সৌরভের ‘চোখে চোখ রেখে কথা বলা’ মনোভাবের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় দল তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

হরভজনের পাশাপাশি আরও কয়েক জন তরুণের আগমন ঘটল ভারতীয় দলে, যারা নিজেরাই এক একজন ম্যাচ উইনার। একদিনের ব্যাটিং তো বটেই, ভারতীয় ফিল্ডিং নতুন রূপ পেল যুবরাজ সিংহ আর মহম্মদ কাইফের আগমনে। অন্য দিকে বীরেন্দ্র সহবাগকে মিডিল অর্ডার থেকে ওপেনার হিসেবে তুলে আনা একটি বিশাল বড়ো মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা তো পরের কয়েকটি বছরেই জানা যায়।

আর প্রতিপক্ষ শিবিরে থরহরিকম্প ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আগমন ঘটল জাহির খান আর আশিস নেহরার।

সৌরভ-রাইট জুটি আরও একটি মাস্টারস্ট্রোকীয় চাল চাললেন। রাহুল দ্রাবিড়কে এক দিনের দলে উইকেটকিপার করে আনা। দ্রাবিড়ের এক দিনের ব্যাটিং ফর্ম কিছুটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে এক দিনের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন।

কিন্তু সৌরভ-রাইট বুঝতে পারে, দ্রাবিড়ের মতো ব্যাটসম্যানকে এক দিনের দলের বাইরে রাখা উচিত নয়। এর ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মরল। ভারতীয় দলে বাড়তি ব্যাটসম্যানও এল, আর উইকেটে পেছনে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য একজনকে পাওয়াও গেল।

উইকেটকিপার হিসেবে দ্রাবিড় কতটা দক্ষ ছিলেন, সেটা তো ২০০৩ বিশ্বকাপেই দেখেছি আমরা। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ব্যাট হাতেও বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

এই বিশ্বকাপটি সৌরভ-রাইট জুটির আরও একটা সাফল্যগাথা বলা যায়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে টানা ৮টা ম্যাচ জিতে ভারত চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। পরাজিত হল এমন একটা অস্ট্রেলিয়ার দলের কাছে, যারা ওই সময়ে অন্য গ্রহের কোনো দলের মতো খেলছিল। এই হারে কোনো লজ্জা ছিল না, বরং রানার্স হওয়ার জন্য দেশবাসীর চূড়ান্ত বাহবা কুড়িয়েছিল সৌরভের ভারত।

সাফল্য তো আরও বাকি। ১৫ বছর পর পাকিস্তান সফর করে টেস্ট আর এক দিনের সিরিজ দু’টোই বাগিয়ে আনা।

কিন্তু সৌরভ-রাইট জুটির এই সাফল্যগাথাটা আচমকাই ফিকে হতে শুরু করে। ২০০৪-এ অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার ভারত আগমন দিয়ে শুরু। দেশের মাঠে সিরিজ হেরে যায় ভারত, যা এক সময়ে অকল্পনীয় ছিল কার্যত। এর কয়েক মাস পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয় ভারত।

সৌরভ আর রাইটের জুটিও ভেঙে যায়। ২০০৫-এর এপ্রিলের ভারতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে যান তিনি। এর পর আগমন হয় গ্রেগ চ্যাপেলের। তার পরের দু’ বছর ভারতীয় দল কী রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তা তো আমরা জানিই।

কী কাকতালীয়, রাইটের চলে যাওয়া আর ক্রিকেট-রাজনীতির শিকার হয়ে সৌরভের অধিনায়কত্ব আর দলে জায়গা হারানো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে।

রাইট আর সৌরভের মধ্যে ছোটোখাটো কিছু মিলও রয়েছে। প্রথমত, দু’জনেই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। রাইট দু’ ধরনের ক্রিকেটেই ওপেনার ছিলেন, সৌরভ একদিনের ক্রিকেটে ওপেনিংয়ে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আবার দু’ জনেই টেস্টে দু’বার করে ৯৯-এ আউট হয়েছেন।

খেলার দুনিয়ায় কিছু কিছু কোচ-অধিনায়ক জুটি হয়, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। এমনই একটি জুটিই ছিলে সৌরভ আর রাইটের মধ্যে। ঠিক যেমন ২০১১ বিশ্বকাপের সময়ে গ্যারি কার্স্টেন আর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মধ্যে জুটি ছিল।

গত বছর বিশ্বকাপের সময়ে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে দেখা সৌরভ আর রাইটের। রাইটকে উদ্দেশ করে সৌরভ সরাসরিই বলে দেন, “আমার প্রিয় কোচ।”

রাইট বলেন, “ভারতকে কোচিং করানোর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব সম্মানের ছিল। শুরুটা দু’ জনের কাছেই খুব শক্ত ছিল। কিন্তু আমাদের দু’ জনের কাছেই প্রমাণ করার তাগিদ ছিল কোচ আর অধিনায়ক হিসেবে আমরা দু’ জনই ভারতীয় ক্রিকেটে সাফল্য এনে দিতে পারি।”

দু’ দশক হয়ে গেল একটা দলের স্বার্থে এই দু’ জন লোক হাত মিলিয়েছিল। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতীয় ক্রিকেটের যুগান্তকারী পরিবর্তনের কান্ডারি এই দু’ জন।

শুভ জন্মদিন জন রাইট। জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিম দত্ত

সম্প্রতি প্রয়াত হলেন (২২-০৬-২০২০) ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই বছর বয়স পার করেও এই বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সক্রিয়। এর রহস্য কী জানতে চাইলে, উত্তরে বলতেন, আনন্দের সঙ্গে কাজ, স্বল্পাহার, সরল ও নিয়মানুগ জীবনযাপন। দু’ দশকের বেশি ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গলোভী বর্তমান লেখক বুঝেছেন এগুলো কেবল কথার কথা না। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবেন বলেই বর্ধমানের মুগকল্যাণ গ্রামের স্কুল থেকে সোজা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও গবেষণার কাজ। জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহের বীজ অন্তরে লালিত হয়েছিল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পরোক্ষ প্রভাবে। এমএসসি ক্লাসে তাঁর শিক্ষক গণিতবিদ ভি ভি নারলিকার (প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের বাবা) এ বিষয়ে তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৫০-এর বেশি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চাইতেন সমাজে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হোক এবং সেই প্রয়োজনে সহজ ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লিখে তিনি প্রচার করতেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ পত্রিকা যাতে সামাজিক অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানকে প্রয়োগের নানা আলোচনা থাকত। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহ ও এই বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সর্বসাধারণের উপযোগী বই লিখেছেন, রেডিও-দূরদর্শনে বক্তৃতা করেছেন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় প্রচুর প্রবন্ধ (আড়াই হাজারের বেশি) লিখেছেন এবং স্থিরচিত্রের সাহায্যে হাজার হাজার বার (প্রায় ন’ হাজার) আলোচনা করতে ছুটে বেড়িয়েছেন দূরদূরান্তের গ্রাম-শহরে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাধ সাধতে পারত না বেশির ভাগ সময়েই। জিজ্ঞেস করলে আয়োজকদের অসহায়তার কথা বলতেন। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন, প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভিড়ে উপচে পড়ছে। তিনি অবিচল, কারণ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন হলের শীতাতপ ব্যবস্থাটি মহার্ঘ। অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গের অ্যাট্যাচি খুলে ভিজে গেঞ্জি পালটে নিলেন যখন, তখনও সমান নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, অনুষ্ঠান সবার কেমন লাগল! 

আসলে এই কাজ তিনি ভালোবাসতেন আর একে তিনি সামাজিক দায় হিসাবেই দেখতেন। এমন তো হয়েছেই, যখন দেখেছি অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখা গেল মাত্র কয়েক জন বসে আছেন দর্শক আসনে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই ফিরে গেছেন ঘরে। অনুষ্ঠানে স্লাইড নিয়ে মহাকাশের বিষয়ে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য রাখলেন অন্য দিনগুলোর মতোই, সমান উৎসাহের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

একবার বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করার জন্য আয়োজকরা স্যারকে (এ ভাবেই আমরা সম্বোধন করতাম) নিয়ে গেছেন। উদ্বোধনের পর স্লাইড চিত্র-সহযোগে বলবেন ‘জ্যোতিষ কেন বিজ্ঞান নয়’ এই প্রসঙ্গে। উদ্বোধনের কাজ শুরু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। বিশেষ অতিথি এসে পৌঁছোতে দেরি করছেন। আমরা কয়েক জন রয়েছি সঙ্গে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছি। স্যার কিন্তু আমাদের নিরস্ত করছেন। কত কষ্ট করে অর্থ আর শ্রম দিয়ে এ সব মেলা আয়োজন করতে হয়, তাই একদিন আমাদের কষ্ট হলই বা! এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাতেন আন্তরিক ভাবেই। 

জ্যোতিষ-বিরোধিতা প্রসঙ্গে স্যারের ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে স্লাইড প্রদর্শনগুলোতে তিনি কোনো বাগাড়ম্বর নয়, ব্যবহার করতেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘদিন (১৯৬৮-১৯৮৮) প্রথমে নটিক্যাল অ্যালামনাক ও পরে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন হয়ে তৈরি পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার-এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, বিভিন্ন তিথিগণনা, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তের সময় মাপা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তারিখ, সময় ধরে পূর্বাভাস দেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভারতে এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানেই হয়।

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান যা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফল। যদিও এটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর আগেই মেঘনাদ সাহা মারা যান (১৯৫৬)৷ যাদের ধারাবাহিক পরিশ্রমে চিন ও জাপান ছাড়া এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রূপ পায় ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান। জ্যোতিষশাস্ত্রের কারবারিরা এই সংস্থার তথ্যগুলো ব্যবহার করেন কিন্তু দুর্বোধ্য আঁকিবুকি কেটে গ্রহের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন যা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। স্যার এ সবের সরব প্রতিবাদ করতেন সব সময়।

তাঁর লেখা ‘জ্যোতিষশাস্ত্র কি বিজ্ঞান?’ বইটি বহূল প্রচারিত৷ বইটির ইংরাজি অনুবাদও যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে জ্যোতিষীদের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার ও মানুষকে প্রতারণা তিনি মেনে নেননি কখনোই। প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যায় যে এর ফলে প্রমাদ গুনলেন একদল জ্যোতিষী। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা প্রাণনাশের হুমকি দিলেন – অবিলম্বে এ সব প্রচার বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সে যাত্রায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন রক্ষা পায় পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ অফিসারের সক্রিয় ভূমিকায়। উল্লেখযোগ্য যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্যোতিষ-বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অবিচল যা মেঘনাদ সাহার  ভূমিকার উজ্জ্বল অনুসরণকেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

Continue Reading
Advertisement
দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৭১১৪, সুস্থ ১৯৮৭৩

কলকাতা3 days ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

ক্রিকেট3 days ago

১১৬ দিন পর শুরু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, হাঁটু গেড়ে বসে জর্জ ফ্লয়েডকে স্মরণ ক্রিকেটারদের

রাজ্য2 days ago

ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন মহীনের অন্যতম ‘ঘোড়া’ রঞ্জন ঘোষাল

LPG
দেশ3 days ago

উজ্জ্বলা যোজনায় বিনামূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ার মেয়াদ বাড়ল আরও তিন মাস

দেশ2 days ago

সক্রিয় করোনা রোগীর ৯০ শতাংশই আটটি রাজ্যে!

কলকাতা2 days ago

করোনার পাশাপাশি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে শুরু হচ্ছে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা

শিক্ষা ও কেরিয়ার2 days ago

শুক্রবার আইসিএসই, আইএসসি-র ফল

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

ঘরের একঘেয়েমি আর ভালো লাগছে না? ঘরে বসেই ঘরের দেওয়ালকে বানান অন্য রকম

খবরঅনলাইন ডেস্ক : একে লকডাউন তার ওপর ঘরে থাকার একঘেয়েমি। মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের রদবদল করুন। জিনিসপত্র এ-দিক থেকে...

কেনাকাটা4 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা5 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা6 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

নজরে