রবিবারের পড়া: ওজোন চাই? চলুন গাছ লাগাই

দীপঙ্কর ঘোষ

সে দিন কলেজে গাছের ছাওয়ায় বসে পাঁচু অর্থাৎ পাঞ্চজন্য রায়‌ এবং চাঁদু অর্থাৎ চন্দ্রাণী মাহাতো, বলা যায়,‌ ওরা ইয়ে মানে, পরস্পরের‌ আকর্ষণে ক্লাস বাঙ্ক করে নিজেদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছিল। পাঁচু কিঞ্চিৎ আকাশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল – “ফুটো হয়ে গেল।”

চাঁদু চশমা তুলে খানিক‌ আকাশ দেখে বলল – “কী? তোর হিয়া নাকি?”

পাঁচু যারপরনাই বিরক্ত – “তোর মাথা।”

চাঁদু নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল – “না হয়নি।”

পাঁচু মর্মান্তিক ব্যথা পেয়ে বলল – “আহা ওই যে ওজোনে ফুটো হচ্ছে… সিগারেটের বেঞ্জিন, টার, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, কার্বন মনো‌অক্সাইড, ফেনল – সব কিছু মিলে ওজোনে ফুটো করছে।”

দু’ জনেই রসায়নের সহপাঠী। চাঁদু খানিকক্ষণ মন দিয়ে নখ খেয়ে জিজ্ঞেস করল – “ওজোন‌ আবার কবে তৈরি হল?”

পাঁচু সন্দিগ্ধ চোখে চাঁদুকে দেখতে দেখতে বলল – “তার মানে? ওজোন তো প্রথম থেকেই ছিল।”

“বলিস কীরে? পৃথিবী তৈরি হল ৫৪০ কোটি বছর‌ আগে। তখন‌ও পৃথিবী আগুনের গোলক – জল নেই – অক্সিজেন নেই – তখনই ওজোন?”

“ছিল না?”

“এজ্ঞে না, সেই জন্যে প্রাণ‌ও ছিল না – আবার ওজোন ছিল না বলেই প্রাণ তৈরি হয়েছে।”

“চাঁদু তুই কিন্তু রহস্য তৈরি করছিস।”

“তা হলে শোন, কান খোলকে শোন লো – একটা নেবুলা থেকে নক্ষত্র তৈরি‌ হ‌ওয়ার সময় সূর্য আর নক্ষত্রটার টানে পৃথিবী ছিটকে গিয়ে তৈরি হয়ে যায়; অনেক পরে অ্যাংলো স্যাক্সন জাতি পৃথিবীর নাম দেয়‌ আর্ডা যার মানে হল মাটি, সেখান থেকেই আর্থ কথাটা এসেছে – বুঝলি গবেট? সূর্যের থেকে কিছুটা অংশ ছিটকে আসে বাকিটা আসে সেই নেবুলা থেকে। তার পর সূর্যের নিজের অক্ষে বনবনিয়ে ঘোরার চোটে পৃথিবী‌ও ঘুরতে থাকে।”

পৃথিবীর সৃষ্টি।

পাঁচু চমকে যায়।

“ডাঁড়া ডাঁড়া। কিমাশ্চর্যম! সূর্য‌ আবার ঘোরে নাকি?”

“সিকিরে? জানিস না? ১৬১২ সালেই গ্যালিলেই গ্যালিলিওই তো প্রথম লক্ষ করেন সৌরকলঙ্কগুলো স্থান পরিবর্তন করে। এখন তো সবাই জানে পৃথিবীর সাতাশ দিনে সূর্য‌ একবার নিজের অক্ষের‌ ওপর পাক দেয়।”

পাঁচু চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকে চাঁদুর দিকে। চাঁদু বলে চলে – “প্রথম যুগে, তার মানে ৫৪০ কোটি বছর‌ আগে পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপমাত্রা ছিল ৪০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে ছিল কেবলমাত্র হাইড্রোজেন, মিথেন, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া। ব্যাস‌ আর কিচ্ছু না।”

“তা হলে জল কোথা থেকে এল?” পাঁচুর তাৎক্ষণিক প্রশ্ন।

“ধ্যাত্তেরি জল জল করে গলা শুকিয়ে দিলি। ভেস্টা নামের‌ একটা বিরাট‌ জল-ভরা উল্কা মানে অ্যাস্টেরয়েড‌ এসে দুম করে পৃথিবীকে ধাক্কা দেয় – ব্যাস, বেচারা ভেস্টার সব জল পৃথিবীতে ঝরে পড়ল। তখন‌ অবশ্য‌ অক্সিজেন আলাদা করে ছিল না। তাই ওজোনও ছিল না। সমঝে বেটা?”

“কিন্তু অক্সিজেন?”

অনন্ত প্রশ্ন নিয়ে পাঁচু সদা প্রস্তুত।  চাঁদু একটু মাথা চুলকে নেয়, তার পর বলে, “হুম! সেটা কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ জটিল বটে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে কিছু জল ভেঙে অক্সিজেন তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু তৈরি হয়েই হালকা বলে মহাকাশে উড়ে যাচ্ছিল। অক্সিজেন বহুত হালকা জানিস তো? ভেবে দ্যাখ তখন‌ সিচুয়েশনটা – সব  আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর পেটের ভেতর থেকে লাভা উগরে দিচ্ছে। উত্তপ্ত পৃথিবীতে জল টগবগ করে ফুটছে, বাষ্প হয়ে মেঘ তৈরি করছে, মেঘে মেঘে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ও দিকে চলছে মহাজাগতিক প্রলয় – বিগ ব্যাং –  তার ঠ্যালায় থেইয়া বলে একটা অ্যাস্টেরয়েড পৃথিবীর‌ এক দম কাছে চলে আসে আর তার টানে চাঁদ পৃথিবীর কাছ থেকে স্বাধীনতা নিয়ে ‘তা থেইয়া তা থেইয়া তাআআআ তুম তানা নানা নানা নানা’ বলে আকাশে ডানা মেলে পৃথিবীর চার পাশে চরকি পাক খেতে লেগেছে। একেবারে মাদাগাসকার টাইপের ব্যাপারস্যাপার। গোদের‌ ওপর বিষফোঁড়া –  আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি। এ আবার পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় রশ্মির মতো কোষের গঠন বদল দেয়। মানে একটা টোটাল হুলুস্থুলু চলছে। এই সময় চুপিচুপি আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি অজৈব কোষ থেকে নাইট্রোজেন বেস তৈরি করে ফেলল। ইউরাসিল‌ আর সিস্টোসাইন। এগুলো আর‌এন‌এ তৈরিতে কাজে লাগে। অর্থাৎ প্রাণের সূচনা হল। সেখান থেকে এককোষী প্রাণী এসে হাজির। এরা আবার মিথেনোজেন। মিথেন ছাড়ে, মিথেনেই বাঁচে। মনে আছে ক’ দিন‌ আগেই সাবটেরেনিয়ান বায়োস্ফিয়ারে অর্থাৎ মাটির অনেক তলায় প্রচুর এই রকম ‘এখনও’ জীবন্ত প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী পাওয়া গেছে? যারা সেই ডাইনোসরের‌ আগে থেকেই বেঁচে আছে? কী হল রে পাঁচু? মুখটা ওর’ম ঝুলে পড়ল কেন? সত্যিই ওরা আজও বেঁচে আছে। মাটির গভীরে। তাই তখন প্রচুর মিথেন তৈরি হল। ফলে মিথেন‌ একটা বলয়ের মতো পৃথিবীকে ঘিরে রাখল। পৃথিবীর তাপমাত্রা কমল কিন্তু আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি হুশহুশিয়ে ঢুকতে লাগল। এ বার‌ আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ওই সব প্রাণী থেকে এককোষী উদ্ভিদ তৈরি করে ফেলল।”

পাঁচু ফুট কাটে – “বাহবা বেশ করিতকর্মা তো?”

ওজোন স্তর।

চাঁদু অদম্য, পাত্তা না দিয়ে বলে যায় – “এরা অক্সিজেন ছাড়তে লাগল। প্রচুর‌…অনেক। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন প্রচুর বেড়ে গেল, তার পর‌ এল ওজোন (O3) লেয়ার।”

পাঁচু অবাক হয়ে যায় – “এইটুকু সময়ের মধ্যেই?”

চাঁদু অগ্নিবর্ষী দৃষ্টিতে তাকাল – “হাঁ জ্জি।, এইটুকু সময়েই” – তার পর পাঁচুর চুলের ঝুঁটি মুঠিতে চেপে হেঁইও বলে টান দিয়ে বলেন, “মাত্তর ২০০ কোটি বছরের মধ্যেই। বুঝলেন প্যাংলা কাত্তিক?”

পাঁচু ভয়াবহ‌ একটা চিৎকার ছাড়ল। ফলে মনোযোগ দিয়ে ঘাস-চিবুনো দু’ একটা প্রেমরত যুগল‌ ওর চিক্কুর শুনে ওদের দিকে তাকাল। কিন্তু চাঁদুর মারকুটে স্বভাব ওরা জানে, তাই পাত্তা দিল না।

পাঁচু বলল – “মারধর বন্ধ করে বাকিটা বল।”

চাঁদু আরম্ভ করল – “ওজোন থাকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে…” 

পাঁচু মাথার ক’টা চুল‌ উৎপাটিত হল গুনছিল, বাধা দিল, বলল, “দুম করে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ঢুকে গেলি কেন? আগে বল পৃথিবীর ঠিক‌ ওপরে যে বায়ুমণ্ডলে আমরা থাকি সেটার নাম ট্রোপোস্ফিয়ার – এটা আমাদের প্রয়োজনীয় সব জরুরি উপাদান সাপ্লাই দিয়ে থাকে। এটা প্রায় দশ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। তার‌ ওপরে আছে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। এখানে ওজোন স্তর থাকে। যে হেতু সূর্যের‌ আলো বিনা বাধায়‌ এই স্তর পর্যন্ত চলে আসে তাই এর মধ্যেই প্রচুর ইউভি বিকিরণ থাকে। হ্যাঁ – এটা প্রচণ্ড শক্তি থেকে উৎপন্ন‌ একটা তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ। তাই এখানে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি, প্রায় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এর‌ ওপরে থাকে মেসোস্ফিয়ার, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে। এর তাপমাত্রা কখনও কখন‌ও ১০০০ থেকে ৪০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পর্যন্ত হতে পারে।”

চাঁদু নির্বিকার ভাবে বলল – “এখানে বাঁচানোর জন্যে ওজোন নেই – তাই সূর্যের সমস্ত তাপ‌ই এখানে উপস্থিত। কিন্তু ওখানে বাতাস এত পাতলা যে প্রাথমিক ভাবে খুব ঠান্ডা লাগবে। তার পর হুঁহুঁ… কাবাব হয়ে যেতে হবে। এর‌ ওপরে আরেকটা জায়গা আছে – এক্সোস্ফিয়ার‌, এটাকে প্রায় মহাকাশ বলা যায়। এটা কোথায় গিয়ে মহাকাশে মিলিয়ে গেছে, কেউই জানে না। এখানে তাপমাত্রা ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। “

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: ব্ল্যাক হোল-এর কত কথা

পাঁচু চিন্তান্বিত হয়ে পড়ল – “একটু আগে বললি সূর্য ক্রমশ বড়ো‌ আর গরম হয়ে উঠছে, এর পর লাল দানব হয়ে উঠবে। এ দিকে এয়ার কন্ডিশনারের থেকে বেরোনো অতি হালকা ক্লোরিনেটেড ফ্লুরোকার্বন‌ উড়ে যাচ্ছে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে। সেখানে ওজোনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ওজোনকে ভেঙে ফেলছে। ওজোন না থাকলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে কিছু না হলেও ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যাবে। তাই যত ওজোন ভাঙছে পৃথিবীতে তত গরম বাড়ছে আর ততই এসি-র ব্যবহার বাড়ছে। ততই আরও বেশি করে ওজোন নষ্ট হচ্ছে। কিছু দিন পরে আমাদের সাধের সবুজ পৃথিবী তো ঝলসানো রুটির মতো কালোপানা হয়ে যাবে।”

চাঁদু ইতিমধ্যে একটা চা-ওয়ালাকে ডেকে দু’কাপ চা দিতে বলে দিয়েছে।  চায়ে চুমুক দিয়ে বলল – “জানিস কি?এ ছাড়া ইউভি রশ্মি আমাদের চামড়ার সব রকম ক্যানসারের জন্যেই দায়ী। স্কিন ক্যানসার, রডেন্ট আলসার, – মনে রাখিস সব থেকে ভয়ংকর ক্যানসারের নাম ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা। সেটার জন্যেও ওই ইউভিবি রশ্মি দায়ী – এটা হলে চোখ, লিভার কাউকে ছাড়ে না। যেটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ২৯০-৩২০ ন্যানোমিটার (এক মিটারের‌ ১০০ কোটি ভাগের‌ একভাগ)। সেই তরঙ্গ শরীরের পক্ষে সব থেকে ক্ষতিকর।”

পাঁচু স্বগতোক্তি করে – “এর পরে ডিএনএ-র বদল ঘটিয়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। ছানি পড়া, অকাল বার্ধক্য, চামড়া কুঁচকে যাওয়া…।”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: মাটির পাঁচ কিলোমিটারেরও নীচে এক অমর জীবজগৎ

চাঁদু বলে – “হ্যাঁরে, ঠিক বলেছিস – আমার কাকা মাঠে চাষ করেন। ওনার গোটা মুখ বলিরেখায় ভর্তি হয়ে গেছে।”

পাঁচু বলল, “অথচ‌ ইউভিএ, যেটা ৩৩০-৪০০ ন্যানোমিটার, সেটা শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করে।”

দু’ জনে চা শেষ করে বলল – ” চল রে, আমরা আজ থেকেই গাছ লাগাই। ওজোনে ভরে উঠুক স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। আমাদের ছানাপোনারা যাতে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকে তার চেষ্টা তো আমাদের‌ই করতে হবে।”

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.