জাহির রায়হান

প্রেমপত্র পেয়েছিলাম এ বারও, নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে, প্রতি বারই পাই যেমন। আর ঠিক এই প্রেমপত্র হাতে পেয়েই আমার চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে মাইরি, এ বারও হয়েছিল। কিন্তু ছাড়ব কী করে, আমি তো এখন আর সিঙ্গল নই, মিঙ্গল করে বসে আছি, সঙ্গে ছানাপোনাও হয়েছে, তাই হা-হুতাশ করতে থাকলাম নাগাড়ে। হতাশ হলাম জেলায় একটা কেষ্ট ঠাকুর না থাকায়, ভোটটা হবে, উন্নয়নের ভোট, আর সে ভোটে মাস্টার থেকে হঠাৎ হয়ে যেতে হবে ‘অফিসার’!

সম্ভব অসম্ভব নানান পরিস্থিতির নিয়ে যখন কল্পনা চালাচ্ছি, দ্বিতীয় চিঠি পেলাম। রিজার্ভ পোলিং অফিসার করে রেখেছে আমায় প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা। যাচ্চলে, সরাসরি বোমা খাওয়ার সম্ভাবনা কমলো কিছুটা। ও দিকে কাগজে পড়লাম, ভোটে মরলেই কুড়ি লাখ! মনে মনে হিসেব করে নিলাম জীবিত অবস্থায় কত দিন লাগবে কুড়ি লাখের দরজায় পৌঁছোতে, হিসেব পারল না আনন্দ দিতে। ভাবলাম, কথাটা যদি এমন হত ভাগ্যবতীর বর মরে…..

Loading videos...

মশারি ও মশা-মারা ধুপ, মোমবাতি আর কিছু টুকিটাকি নিয়ে ‘ডে, পি মাইনাস ওয়ান’। গন্তব্য ডিসি আরসি, অর্থাৎ প্রথম দিন ‘দিবেন’ আর পরের দিন ‘নিবেন’ কেন্দ্র। সাধারণত বেড়াতে বেরোলে সঙ্গে যে ব্যাগটি থাকে সেটাই নিয়েছি, ফলে মনে হচ্ছে পর্যটক বেরিয়েছে পর্যটনে। দাদা বলে দিয়েছিলেন, দেরিতে সই করতে যাতে ব্যাটারা বোমা খেতে কোথাও পাঠাতে না পারে। দাদার যোগ্য ভাই আমি, এত দেরি করেছি যে আমায় সই করতেই দিচ্ছিল না। অনেক ভুজুং ভাজুং দিয়ে কাজ হাসিল করতে হল শেষমেশ।

ও দিকে তখন মারকাটারি পরিস্থিতি, প্রিসাইডিং অফিসার কম পড়িয়াছে। ঘোষণা ঘোষণায় ঘোষকের গলা ভেঙে গিয়েছে, কিন্তু কারওর দেখা নাই রে…কারওর দেখা নাই…। পুলিশের ভয়, টাকার লোভ কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এর মধ্যে এক রিজার্ভ প্রিসাইডিং অফিসার পাকড়াও হলেন। জিজ্ঞেস করা হল, ডাকছি আসছেন না কেন? উত্তর – হাসপাতাল গিয়েছিলাম, অসুস্থ। পরের প্রশ্ন – বলে যাননি কেন? চাবুক উত্তর সে প্রশ্নের, অসুস্থ ছিলাম আমি, কী ভাবে জানিয়ে যাব…?

ডিসিআরসি-তে চেনা-অচেনা নানান মুখের সারির দেখা মেলে, শুধু প্রায় সবার মুখেই কোষ্ঠকাঠিন্যের ছায়া। দলে দলে সব পেয়েছির দল সব পেল কিনা তার হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। কেউ কেউ উদ্বিগ্ন মুখে দায়িত্বপ্রাপ্ত বুথের ঠিকুজিকোষ্ঠী মেলাতে উদগ্রীব। কোন গাড়িতে চারটে পোলিং পার্টি যাবে, তিন দল গিয়ে বসে আছে আর এক দলের পাত্তা নেই। সেক্টর অফিসার বুকে ব্যাজ ঝুলিয়ে খুঁজে হয়রান তাকে।

polling officers pic 2বুথে পৌঁছে গিয়ে প্রথমেই যেটা আবিষ্কার হয় তা হল, টয়লেটের তালা বন্ধ, যার কাছে চাবি থাকে সে বেপাত্তা, এবং তার মোবাইল নং নেই। সেক্টর অফিসাররা আবার এমন ব্যস্ত থাকে যেন তাদের বাপের বিয়ে। ভেতো বাঙালি ভোটকর্মীরা গিয়েই ভাতের খোঁজ করে, সে কাজও করতে হয় খুব সাবধানে। কেননা কোনো রাজনৈতিক ভাত খাওয়া বারণ। কাজ করতে করতে সবার খাদ্যভাণ্ডার কমবেশি উন্মুক্ত হয়। চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কিট কমন, কখনও সখনও পাকা কলা বা ছোলার ছাতুরও দেখা মেলে।

তবে টেনশন কাটাতে পারলে, অভিজ্ঞতাও হয় হরেক কিসিমের। এ বারই যেমন এক জন বললেন, আমাদের গ্রামে যারা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তাদের এক লাখ করে টাকা দিয়েছে বিজয়ী প্রার্থী। সেখানে তো ভোট হচ্ছে না আর, তাই প্রচারের কোনো খরচ নেই, ফলে বিজয়ী প্রার্থী খুশি হয়ে লাখ টাকা দিয়েছে মিষ্টি খেতে। শুনেই তো আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়….ভোটে আমি নিজে দাঁড়াইনি কেন? এ নিয়েও কিছুটা পস্তানি হল হঠাৎ।

যে তলায় আমাদের গ্যারাজ করল সেখান থেকে শহরের ছাদ দেখা যায় দিব্যি। তবে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে আপনাকে নামতে হবে পাতালে। যারা এই গণ্ডগোলের ব্যবস্থা করেছে, তাদের প্রাণভরে গাল দিলাম। শালাদের যেন সব বন্ধ হয়ে যায়, তার কামনা করলাম মিনিট তিনেক। বাবুরা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে নিজেদের, আমরা তো রিজার্ভ পোলিং অফিসার, ছাগলের তৃতীয় সন্তান, তাই আমাদের পেট থাকতে নেই।

সারা রাত মশকবাহিনীর সাথে লড়াই। যখনই অসহ্য মনে হয়, ভেবে নিই বুথে পাঠালেই কিন্তু উন্নয়নের সাথে একতরফা লড়াই বেঁধে যাবে। মশককুলকে তো তা-ও চাপড়া মারা যাচ্ছে, হোথায় সে সবের বালাই নেই। কাপড়া খুলে লিয়ে সিধা মায়ের ভোগে…, মা মাগো মা, দেখা দে মা। হঠাৎ হঠাৎ ভোটবাবুরা আসছেন আর এক একজনকে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন যমদূতের মতো, আর বেচারা ভোটকর্মীরা চোখ কচলাতে কচলাতে চলে যাচ্ছে যমপুরীর পানে গণতন্ত্র রক্ষা করতে। আমি মটকা মেরে পড়েই রয়েছি, ভাবছি এ বার, এ বার বোধহয় আমার পালা।

ভোটের দিন সকাল থেকেও টেনশনের চোরাস্রোত বয়ে চলেছে ভিতর ভিতর এই বুঝি এই বুঝি…ঘড়ির কাঁটা থেমে গিয়েছে, নড়তেই চাইছে না যেন। ও দিক থেকে সহধর্মিনী ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে খবর নিয়ে চলেছে, কুড়ি লাখ থেকে আমি কত দূরে! এ দিকে ফেসবুকে কিছু আপডেট দিতেও পারছি না, কর্তাব্যক্তিদের রোষানলে পড়ার ভয়ে। অসহনীয় জ্বালা। সারা দিন লুকোচুরি খেলে অবশেষে পাঁচটা বাজল, স্বস্ত্বি ফিরল শরীরে, বাবুদেরও দয়া হল, ছেড়ে দিল একে একে।

কিন্তু ট্রেনে ফেরার পথে টেনশেনটাও ফিরে এল পুনর্বার। পরের ভোটেও তো যেতে হবে, না গেলে চাকরি যাবে, আর গেলে যাবে প্রাণ। কাকে ছেড়ে কাকে বাঁচাই? ‘গণতন্ত্র’, আপনার কাছে জবাব আছে?

ছবি: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.