রবিবারের পড়া: বাঁচতে হলে ভাবতে হবে

0
forest destruction
অবিরাম বৃক্ষছেদন। সৌজন্যে টুডেঅনলাইন।
jahir raihan
জাহির রায়হান

অদ্ভুত এবং নিশ্চিত এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছি আমরা বর্তমানে। উষ্ণায়ন এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের অনীহার কারণে, আমাদের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। পরিশ্রম ও অপরিসীম অধ্যাবসায়ে তিলে তিলে গড়ে ওঠা মানবসভ্যতা এবং সে সভ্যতায় বসবাসকারী তামাম মনুষ্যকুলের প্রাণরক্ষা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। আগামী দিনে মনুষ্যজাতি আর থাকবে কিনা, প্রাণের অস্তিস্ত্ব থাকবে কিনা বসুন্ধরায়, তা নিয়ে চলতে পারে তর্ক আলোচনা। কেননা প্রকৃতি ও পরিবেশের যে ভারসাম্যের কারণে স্বাভাবিক গতিতে চালিত হয় আমাদের জীবনচক্র, সে ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটার লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিদিন একটু একটু করে। অনাবৃষ্টি, খরা, উষ্ণায়ন, হিমবাহের গলন এবং সামুদ্রিক জলস্তরের উচ্চতাবৃদ্ধি কপালে ভাঁজ ফেলেছে তামাম বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের। এই পৃথিবী ও তাতে বসবাসকারী সকল জীব কি ক্রমশ এগিয়ে চলেছে নিশ্চিত ধ্ব্ংসের পথে? না এখনও নিজেদের রক্ষা করার কিছু সময় আছে মানবজাতির হাতে? চলুন দেখা যাক।

যে পৃথিবীর তিন ভাগ জল, সেই পৃথিবীতেই শুরু হয়েছে পানীয় জলের আকাল, কোনো দিন আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি এমন দিনও আসতে পারে। এর জন্য দায়ী মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা। মাত্র মাস দুয়েক আগেই তামিলনাড়ুর চেন্নাই শহরে শুরু হয় পানীয় জলের জন্য হাহাকার। পাশের রাজ্য কেরল হতে গ্যালন গ্যালন জল পাঠিয়েও সমাধান হচ্ছে না সেই দুর্যোগের। রাজস্থানে মাত্র কয়েক লিটার জলের জন্য বাড়ির মেয়ে-বউ-কিশোরকিশোরীদের পাড়ি দিতে হচ্ছে বেশ কয়েক মাইল লম্বা পথ। তবে শুধু তামিলনাড়ু বা রাজস্থান নয়, সমগ্র ভারত জুড়েই দেখা দিয়েছে এমন আশঙ্কা।

আগামী দিনে তীব্র ভয়ঙ্কর পানীয় জলের সংকটে পড়তে চলেছে জন্মভূমি। আগত সামনের বছর দুইয়ের মধ্যেই শেষ হতে চলেছে দেশের ২১টি নগরীর পানীয় জলের প্রাকৃতিক জোগান। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রায় দশ কোটি নাগরিকের জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে। আবার পানীয় জলের সংকটই বিঘ্নিত করবে দেশবাসীর খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষে কৃষিকাজেই ব্যবহৃত হয় প্রায় আশি শতাংশ জল। শুরু হওয়া জল সংকট স্বাভাবিক ভাবেই প্রভাব ফেলবে চাষাবাদে, ফলস্বরূপ বিঘ্নিত হবে খাদ্যের জোগান। নীতি আয়োগের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ‘এই মুহূর্তে শুধু পানীয় জলের সংকটের কারণেই দেশ জুড়ে প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষ মানুষ মারা যান’।

এখন প্রশ্ন, এই উদ্ভূত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? উত্তরটা খুবই সংক্ষিপ্ত -‘মানুষ’। পৃথিবীর একভাগ মাটি, তিনভাগ জল। কিন্তু এই বিপুল জলসম্পদের খুব সামান্য অংশই সুপেয় অর্থাৎ পান করার যোগ্য, আমরা সেটা জানি এবং এটাও জানি যে, নব রূপে আবির্ভূত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের বাস্তবতায় বিংশ শতাব্দীতে জল আজ সর্বজনীন সম্পদ নয়, জল এখন বাণিজ্যিক পণ্য। জল নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যবসায়িক কারবার। অর্থের সীমাহীন লোভ মানুষকে করে তুলেছে অবিবেচক। সব কিছুকেই আমরা এখন বিচার করি অর্থের মানদণ্ড দিয়ে। ফলে মূর্খ মানবজাতির ছোটো বড়ো ভুল এবং বদভ্যাসের কারণে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে গোটা মানবজাতিটাই। আমাদের লোভ, লালসা, যথেচ্ছাচার এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাই একদিন ধ্বংস করে দেবে মানবসভ্যতা এবং এই সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা পৃথিবীকে, সে আর মিথ্যে ভাষণ বা অসম্ভব পরাবাস্তব নয়; সে সম্ভাব্য, ধ্রুব এবং অলঙ্ঘনীয় কর্কশ সত্য। 

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: চলছে নির্বিচার বৃক্ষনিধন, মানুষ হচ্ছে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন

ভারতবর্ষের জলাভূমি, পুকুর, হ্রদ, খাল, বিল-সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাশয়ই জলের চাহিদা মেটানো, জল সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানীয় জল সরবরাহে দিনের পর দিন পালন করে এসেছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর ভূমিকা। কিন্তু নগর-সভ্যতার বিকাশ, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করে জলাভূমি, পুকুর ও নদী-নালা যথেচ্ছ ভরাটের ফলে আমাদের জীবন থেকে ক্রমেই বিলীন হচ্ছে প্রকৃতি প্রদত্ত ব্যবস্থাপনা। উন্নয়নের নামে অবাধে করে চলেছি বৃক্ষছেদন। নদীবক্ষে নির্মিত হচ্ছে অগুনতি নির্মাণ, বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতি, পলি জমে নদী হারাচ্ছে তার জলবহন ও জলধারণ ক্ষমতা। যেখানে প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত বিস্তৃত নদী অববাহিকা ও জলাভূমিগুলিই সৃষ্টিলগ্ন থেকে পালন করে আসছিল জল সংরক্ষণ ও ভূ-গর্ভীয় পানীয় জল ও তার পুনঃসঞ্চালনের গুরুদায়িত্ব, সেগুলোও আজ মানুষের অবিবেচনার শিকার, সেগুলোও একটু একটু করে আজ পৌঁছে গিয়েছে সমাপ্তিপথের প্রায় চূড়ান্ত সীমানায়।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? প্রশ্নটা নিজেকেই করা উচিত আমাদের। ব্যক্তিগত, ব্যবহারিক ও প্রাত্যহিক জীবনে জলের অপচয় রোধ, অসংখ্য গাছ লাগানো ও তার নিয়মিত পরিচর্যা, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং তার পুনর্ব্যবহারে যত্নশীল হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু সেটুকুই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি প্রয়োজন জীবন ও পৃথিবীকে ভালোবাসা। প্রয়োজন জল ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ এবং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবাসীর ভালো থাকার ও তাদের ভালো রাখার সদিচ্ছা। ব্যবসায়ী মুনাফা এবং সর্বগ্রাসী মনোভাবের কবল থেকে জল এবং অক্সিজেনের মতো মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে প্রাকৃতিক সম্পদের জাতীয়করণের কথাও আমাদের ভেবে দেখার সময় উপস্থিত। কেননা ভূ-গর্ভস্থিত জলসম্ভার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের স্থানিক এবং একমাত্রিক জলের উৎস নয়, বরং তা সামগ্রিক ভাবে মাটির নীচে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সঞ্চিত প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিপুল ভাণ্ডার যা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে, হচ্ছে মানবসভ্যতায়, মানবকল্যাণে। আবার আবহমান কাল ধরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পুনর্সঞ্চিত হয়ে এসেছে সেই অ্যাকুইফার। তাই জলস্তর সংরক্ষণে উন্নত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জলের ভূ-তাত্ত্বিক ম্যাপিং এবং কমিউনিটি পার্টিসিপেশন বা পার্টিসিপেটরী গ্রাউণ্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট একই ভাবে জরুরি বিষয়।

সুতরাং, আসুন আমরা নিজের স্বার্থে, নিজেদের পরিবার-পরিজন ও আগামী প্রজন্মের  জন্য একটু দায়িত্বশীল হই। নিজে বাঁচি, পৃথিবীকেও বাঁচাই। কী ভাবে? ‘ভারতের ওয়াটারম্যান’ রূপে সমধিক পরিচিত রাজেন্দ্র সিং-এর ঐকান্তিক উদ্যোগে আমাদেরই দেশের রাজস্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অভিনব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলসঞ্চয় কাঠামো যার দ্বারা একই সঙ্গে হাজারেরও বেশি খরা-আক্রান্ত গ্রামে নিশ্চিত হয়েছে জলের পর্যাপ্ত জোগান। শুধু তা-ই নয়, জলাভাবে শুকিয়ে যাওয়া পাঁচ পাঁচটি নদীকে ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের পূর্বের প্রবাহ, ফলে নদী সন্নিহিত অঞ্চলগুলিতে কৃষি উৎপাদন বেড়ে গিয়েছে বেশ কয়েক গুণ, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে সবুজায়ন এবং এ সবের সম্মিলিত প্রভাবে সংরক্ষিত হয়েছে পরিবেশ ও তার জীববৈচিত্র্য। আসুন নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে, নিজেদের ঘরে ঘরে রাজেন্দ্র সিং হয়ে উঠি আমরা, মিথ্যা এবং অমূলক করে দিই দূরদর্শী কবির অমোঘ নিদান, ‘একদিন নদীতে থাকবে না জল, গাছে রইবে না ফুল, মানুষকে সেদিন টাকা খেয়েই বেঁচে থাকতে হবে’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here