দেবারুণ রায়

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পলিটব্যুরোয় ভোটাভুটিতে বাংলার দুই নেতা জ‍্যোতি বসু ও প্রমোদ দাশগুপ্ত মোরারজির পক্ষে থেকে সরকার বাঁচাতে চেয়ে সংখ্যালঘু হয়ে গেলেন। অন্য দিকে ইএমএস, সুরজিৎ, সুন্দরাইয়া, বিটিআর, বাসবপুন্নায়া প্রমুখ মোরারজির নেতৃত্বে সরকার ফেলার পাশাপাশি চরণে শরণ নেওয়ার পক্ষে রায় দিলেন।

পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক যখন চলছিল, উদ্বিগ্ন ফার্নান্ডেজ সারাক্ষণ বসেছিলেন সিপিএম সদর দফতরে। শেষ মুহূর্তে মোরারজির অত্যন্ত স্নেহভাজন জর্জ সরে গিয়েছিলেন তাঁর পাশ থেকে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: জীবনের আয়নায় জর্জ – বিজেপি সম্পর্কে আগাগোড়াই ছিলেন নরম

জানা গিয়েছিল, সে কালে সিপিএমের ঘনিষ্ঠ জর্জ সমর্থন তুলে নেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন। শ্রমিক আন্দোলন পর্বে জ‍্যোতিবাবুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল যথেষ্টই। কিন্তু জুলাই সংকটের ওই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মোরারজি সরকার ফেলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল খারিজ করেছিলেন জ‍্যোতিবাবু।

যদিও ‘৭৪-এর দেশ-জাগানো রেল ধর্মঘটের নেতৃত্বে ছিল যে সমন্বয় কমিটি তাতে সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্টরা ছিলেন এক সঙ্গে। বড়ো ভূমিকা ছিল জর্জ ফার্নান্ডেজের। তিনি কখনও নিজে বা কখনও প্রতিনিধি পাঠিয়ে কলকাতায় বসুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। জয়প্রকাশের আন্দোলনেও সিপিএমকে শামিল করতে জর্জ লাগাতার বসুর সঙ্গে কথা বলতে আসতেন। পারস্পরিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল তাঁদের। সমতা পার্টি গঠনের পর থেকে সে সম্পর্ক অটুট ছিল।

with mamata bandyopadhyay
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ছবি সৌজন্যে হাফপোস্ট ইন্ডিয়া।

তার পর ধীরে ধীরে পট পরিবর্তন হয়। সিপিএমের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরে এবং তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। অবশ্য তহেলকা ঘুষ কাণ্ডে অভিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফার্নান্ডেজ-সহ অন্যদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজপেয়ী মন্ত্রিসভা ছাড়েন। সে সময় কফিন কেলেঙ্কারির অভিযোগও ওঠে তাঁর নামে।

ফার্নান্ডেজের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো অভিযোগ ওঠে কারগিল যুদ্ধের প্রাক্কালে। প্রশ্ন ওঠে, পাক ফৌজ ভারতের ভূখণ্ডের ভেতর ঢুকে ঘাঁটি গেড়ে অত দিন বসে থাকল কী করে? কী ভাবে এত বড়ো অনুপ্রবেশ বা এক কথায় আগ্রাসনের আয়োজন ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব‍্যবস্থার চোখ এড়িয়ে গেল? যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘন ঘন সিয়াচেনে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন, কারগিলে তাঁর চোখ পড়ল না কেন?

গোড়ার দিকে বামপন্থীদের বন্ধু হিসেবে অনেক দিন কাজ করলেও মতাদর্শে জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো বামমার্গী ছিলেন না। বরং তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধিতা ছিল তাঁর রাজনীতির ধারাবাহিকতায়। এই মৌল উপাদানটিই ওঁকে কালক্রমে আডবাণী, বাজপেয়ী এবং আরও পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছাকাছি এনেছিল।

জর্জকে সঙ্গে না পেলে আডবাণী অ্যান্ড কোং বাবরি মসজিদ মামলার চার্জশিটের দাগ নিয়ে এনডিএ গড়তে পারতেন না। ক্ষমতায় আসার জন্য বিজেপি ও সংঘকে মোদীর মতো কারও পথ চেয়ে থাকতে হত, ২০০২-এর গুজরাত যাঁকে হিন্দু গৌরবের পাগড়ি পরিয়েছে।

বাজপেয়ী কিন্তু এ পথের পথিক নন। তিনি পাগড়ি পরতেন ঈদের ইফতারে, ফাইভ স্টার কেতায়। পরাতেন অজমের শরিফের গরিব নওয়াজের ইবাদতগার মৌলভি সায়েব। সে জন্য একক গরিষ্ঠতায় হিন্দুহৃদয়সম্রাট হওয়া তাঁর হত না। হওয়ার বাসনা যে ছিল, তা-ও নয়। তিনি প‍্যান ইন্ডিয়ান পারসোনালিটি, স্টেটসম‍্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এবং সে কাজে তাঁর প্রথম সহায়ক জর্জ ফার্নান্ডেজ‌। জর্জের প্রদর্শিত পথেই একে একে এলেন নীতীশ, মমতা, ফারুক, করুণানিধি এবং অবশেষে তৎকালীন সেকুলার মোর্চার কফিনের শেষ পেরেক চন্দ্রবাবু।

with vajpayee
বাজপেয়ীর বন্ধু। ছবি সৌজন্যে টুডেইন্ডিয়া।

সোশ্যাল ডেমোক্র‍্যাসির আত্মা বললে অত‍্যুক্তি হবে না জর্জকে। যদিও এখন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্র‍্যাগম‍্যাটিক কমিউনিস্টদের সঙ্গে সোশ্যাল ডেমোক্র‍্যাটদের আর কোনো ফারাক কার্যত নেই। শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুবিন‍্যাসে অমিল। সোশ্যালিস্ট ইন্টারন‍্যাশনালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বলতে ভারতে ছিল শুধু জর্জেরই। জার্মান সোশ্যালিস্ট পার্টির ভিলি ব্রান্টের সঙ্গেও যোগসূত্র ছিল তাঁর। লোহিয়াবাদী হিসেবে কট্টর চিনবিরোধী জর্জ ভারতে আশ্রিত তিব্বতিদের আন্দোলন সমর্থন করেছেন আজীবন। কেন্দ্রে মন্ত্রী থাকতেও।

বিজেপির বন্ধু হিসেবে জর্জের ভূমিকা দেশের সমকালীন ইতিহাসে একটা বৃহৎ ও বিতর্কিত অধ‍্যায়। বহু রাজনৈতিক সংকটে তিনি বিজেপির সরকার ও দলকে বাঁচিয়েছেন প্রশাসনিক দক্ষতা বা ধর্মনিরপেক্ষতার সার্টিফিকেট দিয়ে। ২০০২-এ গুজরাত গণহত্যার সময় নৃশংস ভাবে সন্তানসম্ভবার পেট ‌চিরে অপরিণত শিশুকে বের করে ত্রিশূলে গেঁথে আগুনে পোড়ানোর মতো পৈশাচিক ঘটনা কোনো এক সাংসদ সংসদে বিবৃত করলে মন্ত্রী জর্জ বলেছিলেন, “দাঙ্গার উন্মাদনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেই থাকে।” মনে পড়ে, বানতলা নিয়ে বসুর বক্তব্য কিছুটা ফাঁক পূরণ করে লেখা হলেও তার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল। কিন্তু ‘এনডিএ দাদা’ নামে খ‍্যাত জর্জের এ হেন বিস্ফোরক মন্তব্য সংসদের বাইরে তেমন ঝড় তোলেনি।‍

george arrested in emergency
বিদ্রোহী জর্জ। জরুরি অবস্থার সময়ে। ছবি সৌজন্যে অপইন্ডিয়া।

অথচ ব‍্যক্তিজীবনে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বা মতাদর্শগত নিষ্ঠায় জীবনের একটা বড়ো অংশ পর্যন্ত অনমনীয় ছিলেন। তাঁকে চেনা যেত কাজে ও কথায়। লোকসভার বাঁকা কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে জেল থেকে লড়ে বিপুল ভোটে জিতেছিলেন জর্জ। ওঁর নির্বাচন এজেন্ট সমাজবাদী কর্মী বিজয় বাঁকা-মুম্বই-দিল্লি-কলকাতা সমন্বয় করতেন, প্রচারের রেস্তো সংগ্রহ করতেন তিনি। ‍বরোদা ডিনামাইট মামলার আসামি জর্জ বিপুল ভোটে জিতেছিলেন জেলে বসেই। জনপ্রিয়তা তখন আকাশচুম্বী।

george
প্রেমিক জর্জ। ছবি সৌজন্যে লাইভমিন্ট।

আরেকটি বিষয় ছুঁয়ে না গেলে ভারতীয় রাজনীতির এক কালের এই অ্যাংরি ইয়ংম‍্যানের জীবনের একটি বড়ো অধ‍্যায় উহ‍্য থেকে যাবে। সেটা হল জর্জ ফার্নান্ডেজের প্রেমের ভুবন। একটা খাদির পাজামা-কুর্তা, শীতকালে কুর্তার নীচে সোয়েটার আর পায়ে গান্ধীচটি। এই প্রোফাইল এবং চেহারায় চে গেভারার ধারেকাছে না হয়েও মহিলাদের আকৃষ্ট করেছেন জর্জ সারা জীবন।

তাঁর কিছুটা জঙ্গি গোছের শ্রমিক আন্দোলন, প্রচণ্ড প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভাবমূর্তি এবং ইন্দিরা গান্ধীর মতো শাসকের রক্তচক্ষু জর্জকে যুবসমাজের প্রতি আকর্ষণীয় করে তুলেছিল সত্তর দশকের শেষার্ধে। তারই রেশ থেকে প্রেমিক জর্জের জন্ম। সতর্ক পদক্ষেপে সাধারণ ভাবে একটা আড়াল রেখে যেতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আড়াল থাকেনি। অনেক নারী এসেছেন তাঁর দীর্ঘ বর্ণময় জীবনে।

with jaya jaitely
জয়া জেটলির সঙ্গে। ছবি সৌজন্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

স্থায়ী বন্ধু হিসেবে জীবনের একেবারে অন্তিম পর্বের আগে পর্যন্ত ছিলেন জয়া জেটলি। হয়েছিলেন তাঁর দলের সর্বাধিনায়িকা। শেষ পর্বে দলে বিদ্রোহ হয় জয়ার বিরুদ্ধে। জয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্ভবত তাঁর রেলমন্ত্রিত্বের সময়। একদা জম্মু-কাশ্মীরের স্বনামধন্য মুখ‍্যসচিব অশোক জেটলিকে রেলমন্ত্রকে নিয়ে আসেন জর্জ। জয়া ছিলেন তাঁরই স্ত্রী। অ্যালঝাইমার শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা কেউ পারেনি। এবং তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় কৈশোর ও যৌবনে। যে স্মৃতি সতত তাঁকে নিয়ে যেত তাঁর ভাই, বাবা-মা আর প্রথম প্রেমের কাছে। জীবনের অর্ধেক শতক একেবারে মুছে গিয়েছিল স্মৃতির ক‍্যানভাস থেকে।

অতীতের একটা কথা। যাকে ওঁর এই ব‍্যাপ্ত জীবনের আধার হিসেবে কল্পনা করা যায় কিনা তার বিচারের ভার নিক ইতিহাস। ‘৯১-‘৯২ সাল। সংসদভবনে অবিভক্ত জনতা দলের দফতরের একটি ঘরে জর্জের সঙ্গে বসে আছি। সঙ্গী আরও দু-এক জন। জর্জ বলছেন বিতর্কিত প্রসঙ্গ, ব‍্যক্তিজীবনে সেকুলারিজম নিয়ে। বলছেন, “আমার ছেলে সুশান্তকে আমি বলি, দেখ বাবা, আমি তোর জন্মদাতা জন্মসূত্রে ক্রিশ্চান। তোর মা লায়লা জন্মসূত্রে মুসলিম। তাঁর বাবা মুসলিম (হুমায়ুন কবীর) এবং মা হিন্দু। সুতরাং মনে রাখবি, তুই মুক্ত মানুষ। তোর কোনো পিছু টান নেই। তোর কোনো ধর্ম নেই।” (শেষ)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here