রবিবারের পড়া: আর মাত্র পনেরোটা বছর, তার পর হয়তো…

0
kids' demonstration in new delhi
১৫ মার্চের বিক্ষোভে শামিল দিল্লির খুদেরা। ছবি সৌজন্যে এবিসি নিউজ।
সন্তোষ সেন

পরিবেশ সমস্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের পিছনে বহুজাতিক লুঠেরা কর্পোরেট সংস্থার পাহাড়প্রমাণ মুনাফাবৃদ্ধির স্বার্থ এবং এদের দালাল রাষ্ট্রনায়কদের ভূমিকা ধরতে না পারলে পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যার বাস্তবত কোনো সমাধান করা যাবে না। তাই বিশ্ব জুড়েই এই প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা গ্রেটা থুনবার্গের নেতৃত্বে ও অনুপ্রেরণায় পথে নেমেছে।

এ বছর ১৫ মার্চ বিশ্বের ১৩০টি দেশের পনেরো লক্ষেরও বেশি দামাল কিশোরকিশোরী রাজপথ কাঁপিয়ে দীপ্ত কণ্ঠে আওয়াজ তুলল – “বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার জন্য এখনই পদক্ষেপ করুন, অনেক কথাবার্তা, চুক্তি হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।”

এই কাজটি শুরু হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে সুইডেনের নবম শ্রেণির ছাত্রী ১৬ বছরের গ্রেটা থুনবার্গের (Greta Thunberg) হাত ধরে। তবে শুরুরও তো একটা শুরু থাকে। ২০১৮ সালের অগস্টে সুইডেনের ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ও দাবানল অটিস্টিক গ্রেটার জীবন আমূল বদলে দিল। সে বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ছিল সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনের দিন। ২০ আগস্ট গ্রেটা ঠিক করল যত দিন না নির্বাচন হচ্ছে তত দিন সে স্কুলে যাবে না। স্কুলে না গিয়ে রোজ ‘রিক্সডাক’-এর (সুইডেনের জাতীয় আইনপরিষদ) সামনে পোস্টার নিয়ে বসে থাকত গ্রেটা – পোস্টারে লেখা ‘স্কোলস্ট্রেইক ফিওর ক্লিমাটেট’ (আবহাওয়ার জন্য স্কুল ধর্মঘট)।

দেশের সাধারণ নির্বাচনের পর গ্রেটার বিক্ষোভের ছবিটা একটু বদলাল। তখন সে এই প্রতিবাদ-কর্মসূচি চালিয়ে গেল প্রতি শুক্রবার। প্রতি শুক্রবার স্কুলে না গিয়ে সেই সময়ে সুইডেনের আইনপরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ-অবস্থান করত সে – পরবর্তী প্রজন্ম যদি আঙুল তুলে প্রশ্ন করে, প্রকৃতি-পরিবেশ ঠিক করার জন্য তোমাদের সময়ে কিছু করার সুযোগ থাকলেও কী ভবিষ্যত উপহার দিয়ে গেলে আমাদের, তখন সে কী বলবে – এই ভাবনাই গ্রেটাকে বিচলিত করল। ‘আবহাওয়ার জন্য স্কুল ধর্মঘট’ শীর্ষক পোস্টার নিয়ে একা মহীরুহ হয়ে গ্রেটা প্রতি শুক্রবার প্রতিবাদ-কর্মসূচি চালিয়ে গেল টানা চার মাস ধরে। তার দাবি, প্যারিস চুক্তি মেনে সুইডিশ সরকারকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। গ্রেটার আন্দোলনের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। ডিসেম্বরের হিসাব, বিভিন্ন দেশের ২৭০টির মতো শহরের স্কুলপড়ুয়ারা প্রতি শুক্রবার (‘শুক্রবারের স্কুল ধর্মঘট’) স্কুল পালিয়ে (?) রাজপথ কাঁপিয়ে দীপ্ত কণ্ঠে দাবি তুলেছে – “দেশের জল-জঙ্গল-জমিন লুঠেরা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। প্যারিস চুক্তি মেনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

আর এই সব পরিবেশ-সচেতন শিশু (Climate kids)  অর্থাৎ খুদে সংগঠকদের হাত ধরে পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের খবর আলোর গতিবেগে পৃথিবীর কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ল সোশাল মিডিয়ার দৌলতে, যে কাজে বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি পারদর্শী। আর এ সবের ফল – ১৫ মার্চ সাংহাই থেকে মুম্বই, সুইডেন থেকে লন্ডন, বেইরুট থেকে জেরুজালেম, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে দিল্লি – অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ থেকে আর্কটিক অঞ্চলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা গ্রেটার দেখানো পথে বিক্ষোভ আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ল। তারা ৪০টিরও বেশি ভাষায় গান গাইল, কবিতা পড়ল, আর মানবসভ্যতার সম্ভাব্য অবলুপ্তি সম্পর্কে তাদের রাগ, ক্ষোভ উচ্চকিত কণ্ঠে উগরে দিলে। এই দামাল কিশোরকিশোরী, যুবকযুবতিরা শুধুই আবেগসর্বস্ব নয়। তাদের বিচারবুদ্ধি, যুক্তি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। তাই তারা প্রাঞ্জল ভাবে উচ্চারণ করতে পারে – “সমাজের চালু নিয়মনীতি দিয়ে যদি বিপর্যস্ত পরিবেশসমস্যার সুরাহা না করা যায়, তা হলে চালু নিয়মগুলোকেই পালটে দিন।”

শিক্ষকমহল বা সমাজের হর্তাকর্তাদের পক্ষ থেকে কিছু বিরোধিতা এলেও এই সব ‘ক্লাইমেট কিড’ তাঁদের মুখে সপাটে চড় মেরে জবাব দিয়েছে – “যদি পনেরো বছর পর বেঁচেই না থাকি তা হলে এই রুক্ষ সূক্ষ্ম মরুভূমিতে স্কূলে গিয়েই বা কী লাভ? রাষ্ট্রনায়কদের দৌড় আমাদের বোঝা হয়ে গেছে, তাই আমাদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের থামানো যাবে না।”

প্রসঙ্গত বলি, কল্যাণী স্টাডি সার্কেলের উদ্যোগে এই বিষয় নিয়ে রবিবার ১২ মে একটি আলোচনাসভার  আয়োজন করা হয়। ‘পরিপ্রশ্ন’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বিজ্ঞানকর্মী অরূপ ঘোষ একটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হাজির করেন – এত দিন জানা ছিল, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নই যত নষ্টের গোড়া। ভূ-উষ্ণায়নের পাশপাশি আর একটি ভয়ংকর বিপর্যয় হল, পৃথিবীর জীবনরেখা (Lifeline) যাকে বলা হয়, সেই সামুদ্রিক শ্যাওলা (algae) বীভৎস বিকৃত ভাবে বেড়ে চলেছে এবং বিষ উৎপাদন করে চলেছে। চাষে যে রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয় তার প্রায় ৬৪ শতাংশ সমুদ্রে চলে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রাসায়নিক সার সামুদ্রিক শ্যাওলার বিকৃত বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তা ছাড়া সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ও দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সমুদ্রের পেটে প্রায় ৪০০টির মতো ‘ডেড জোন’ তৈরি হয়েছে। এই এলাকাগুলোয় মাছ-সহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী মৃত্যুর ফাঁদে বন্দি। এই সামুদ্রিক জীবগুলো মৃত বা জ্যান্ত, যে কোনো অবস্থায় আমাদের খাওয়ার টেবিলে স্থান পেলে মানবদেহে ক্যানসার-সহ নানান রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবে। এই অবস্থা অর্থাৎ অ্যালগি বুম-এর (algae boom) বাড়বাড়ন্তের প্রভাবে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাবে। কাজেই শুধুমাত্র কার্বন ডাইঅক্সাইড-এর বৃদ্ধি বন্ধ করাই নয় বা শুধুমাত্র গাছ লাগানোই নয়, রাসায়নিক সারের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে অবিলম্বে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কৃষ্ণগহ্বরের ছায়াছবি

নবীন ও সবুজের বার্তাবাহক, পরিবেশসচেতন ‘কিড’দের সুরে সুর মিলিয়ে আমাদেরও বলতে হবে – কর্পোরেটের মুনাফার স্বার্থে দেশের জল-জঙ্গল-জমিন ওদের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না। বিজ্ঞানীরা জোর দিয়েই বলছেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির দ্বন্দ্বের বিজ্ঞানসম্মত সঠিক সমাধানের দিকে এগোনো বাস্তবত সম্ভব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, “আমাদের হাতে যে অস্ত্র আছে তা-ই দিয়েই ‘ক্লাইমেট এমার্জেন্সি’ জারি করে এই যুদ্ধ কার্যত জেতা সম্ভব। এই লক্ষ্যে কাজ শুরু হোক এক্ষুনি, আর দেরি করার সময় নেই।”

গ্রেটা থুনবার্গ-সহ কচিকাঁচাদের আওয়াজ আর বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা আমরা বড়োরা, বিজ্ঞরা কি শুনতে পাচ্ছি? ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিপর্যস্ত পরিবেশকে সংশোধন করার কাজে আমরা কি এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়ব নাকি মানবসভ্যতা চিরকালের জন্য কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়েই থাকব? প্রশ্নটা সোজা, আর উত্তরও আমাদের জানা। তাই আমাদেরই দায়িত্ব – আগামী প্রজন্ম তথা আমাদের নাতিপুতির জন্য একটা সুস্থ, সুন্দর পরিবেশ রেখে যাওয়া, যে পরিবেশে ওরা শুদ্ধ বাতাস প্রাণভরে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে গেয়ে উঠবে আগামীর জয়গান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here