খেতরিতে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিকৃতি। ছবি সৌজন্যে rkmissionkhetri.org

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

১৮৮৮ সালে পরিব্রাজক রূপে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন সারা ভারত পরিভ্রমণের জন্য। মানুষের ঈশ্বরকে দেখার জন্য, চেনার জন্য।

দীর্ঘ দু-আড়াই বছর বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণের পরে মাউন্ট আবুতে মুখোমুখি হয়েছিলেন এক যুগান্তকারী সন্ন্যাসী এবং একজন রাজা। সে দিন সেই রাজা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীর পবিত্র তেজোদৃপ্ত রূপে, সম্যক ত্যাগে, অনন্ত জ্ঞানের গভীরতায় এবং অন্তর্লীন দার্শনিকতার অসীমতায়।

সেই রাজা হলেন রাজস্থানের একটি রাজ্য খেতরির মহারাজা অজিতেন্দ্রিয় সিংহ আর সেই সন্ন্যাসী হলেন সারা বিশ্বের বিস্ময়কর যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ।

পরে খেতরির মহারাজার আমন্ত্রণে ১৮৯১ সালের জুন-জুলাই মাসে স্বামী বিবেকানন্দ  খেতরিতে গিয়েছিলেন।

সসম্মানিত বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি মহারাজ অজিত সিংহের আতিথেয়তার এবং আপ্যায়নের কাহিনি সবাই জানেন। পাশাপাশি এই ঘটনার কথাও অনেকেই জানেন যে স্বামী বিবেকানন্দ মহারাজার দরবারে অতিথি হিসাবে উপস্থিত হয়ে দেখেন যে সেখানে একজন বাঈজি গান শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তা দেখে নিজের আসন থেকে উঠে বেরিয়ে আসছিলেন স্বামীজি। ঠিক সেই সময়ে গান ধরেন সেই বাঈজি। তাঁর সমস্ত সত্তা নিঙড়ে সন্ত সুরদাসের একটি ভজন পরিবেশন করতে শুরু করেন – “প্রভু মেরে অবগুন চিত্ না ধরো।/ সমদর্শী হ্যায় নাম তুহারো, চাহে তো প্যার করো…”।

গানের কথা শুনে স্বামী বিবেকানন্দ থমকে দাঁড়ান। সেই বাঈজির প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে সেই গান শুনতে ফিরে আসেন। নিজের আসনে বসে সে দিন তাঁর গান শুনেছিলেন স্বামীজি। সেই বাঈজীও পর পর সন্ত সুরদাস, সন্ত কবীর, মীরাবাঈ প্রমুখের ভজন শুনিয়েছিলেন সে দিন স্বামী বিবেকানন্দকে।

এই ইতিহাস অনেকেই জানেন।

কিন্তু তার পর? তার পর সেই বাঈজি কোথায় গেলেন? কী হল তাঁর? সে সব খবর আমরা কেউই জানতাম না।

রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির, খেতরি। ছবি সৌজন্যে belurmath.org

কিন্তু ইতিহাস সূর্যের মতোই সত্য, তাই সে প্রকাশিত হবেই, এটাই নিয়ম।

সেই জন্যই বোধহয় অনেক বছর পরে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের এক সন্ন্যাসী সেই ঘটনার পরবর্তী ঘটনার অনুসন্ধান করতে করতে রাজস্থানের খেতরিতে পৌঁছে যান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন সেই বাঈজির নাম ছিল ময়না বাঈ। অসামান্যা সুন্দরী এবং সুগায়িকা ছিলেন তিনি। রাজস্থানের বহু রাজারাজড়া তাঁর গান শোনার জন্য সেই সময়েই উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সেই সে দিনের পর থেকে তাঁকে আর কেউ দেখতে পায়নি।

মিশনের সেই সন্ন্যাসী পরে অনেক খোঁজখবর করেন। তার পর সেখান থেকে বহু দূরে রাজপুতানার এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন সেই মহিলাকে। তিনি তখন বৃদ্ধা রমণী। একটি ছোট্ট কুটিরে থাকেন একা। আর তাঁর সঙ্গে থাকেন তাঁর সারা জীবনের আরাধ্য দেবতারা – গিরিধারী শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর গোপাল স্বামী বিবেকানন্দ –  তাঁদের পটের ছবিকে তিনি গান শোনান, পুজোআচ্চা করেন, নিজের সন্তানের মতো খাওয়ান, ঘুম পাড়ান- সে এক অনির্বচনীয় মনের ভাবের লীলা।

সেই সন্ন্যাসী সেই মহিলার কাছেই শোনেন তাঁর কথা। তাঁর নাম ময়নাবাঈ। তিনি বলেছিলেন, “আমি সে দিন আমার জীবন্ত গোপালকে গান শুনিয়েছিলাম। সেই গান তার পর আর কাউকেই শোনাইনি। আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি এই গাঁওয়ে, …আমার দেবতাদের নিয়েই আমার জীবন কাটিয়ে দেবার জন্যে। আমি সাক্ষাৎ ভগবানকে দেখেছি, তিনি আমার গান শুনেছেন, আমার জীবন ধন্য হয়ে গেছে…”।

অনুসন্ধানের জন্য যাওয়া সেই সন্ন্যাসী অবাক বিস্ময়ে শুধু দেখেছিলেন সেই মহীয়সীকে আর প্রণাম জানিয়ে ছিলেন বারবার।

আর ভেবেছিলেন মনে মনে, ঈশ্বরের কী অপার করুণা… সেই করুণার স্বর্গরূপ ধারা বয়ে চলেছে এই বিশ্বজগৎ জুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মা সারদাময়ী আর স্বামী বিবেকানন্দের আশীর্বাদ হয়ে, যা শুধু অনুভবে অনুপ্রেরণায় খুঁজে  পাওয়া যায়, খুঁজে পাই আমরা।

তথ্যসূত্র: স্বামী বিবেকানন্দ এবং ধর্মের নতুন সংজ্ঞা – স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ, উদ্বোধন আশ্বিন সংখ্যা ১৪২১, ২০১৬।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন