পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

0
Gaurikund
গৌরীকুণ্ড।

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

মাঝে মাঝে বরফে পা হড়কে যাচ্ছে। জুতো তো প্রায়ই বরফে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে জুতো-মোজা ভিজে একাকার। খুব সাবধানে লাঠি গেঁথে গেঁথে দোলমা পাসের উপর উঠতে থাকি। চলার গতি স্বভাবতই অনেক কম। ছোটো ছোটো গর্ত, ওপরে কাচের মতো স্বচ্ছ বরফের আস্তরণ। লাঠি দিয়ে চাপ দিতেই বরফ ভেঙে জল বেরিয়ে পড়ছে। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। পাহাড়ের চূড়াগুলোয় পেঁজা তুলোর মতো বরফ জমে আছে।

গলা শুকিয়ে কাঠ। গরম জল শেষ। অনন্যোপায় হয়ে কয়েক টুকরো বরফ মুখে পুরলাম। পুরো পাহাড় জুড়ে বৌদ্ধদের লাল-হলুদ পতাকা উড়ছে। শ্বেতশুভ্র বরফে লাল-হলুদ পতাকার সার এক বিপুল বৈচিত্র্যময় রঙের জগৎ সৃষ্টি করেছে। ধীরে ধীরে উঠে এলাম পাসের মাথায়।

দোলমা পাস।

দোলমা পাস, ১৮৬০০ ফুট উচ্চতায় এক রুক্ষ প্রান্তর। নারীশক্তির আধার, ভদ্রকালী, চামুণ্ডে, মুণ্ডমালিনী। এ যেন তাঁরই রণনৃত্যভূমি। অসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা মহাদেবের কাছে এলেন। মহাদেব সব শুনলেন, ধ্যানস্থ হলেন। মহাদেবের তৃতীয় নয়ন থেকে সৃষ্টি হল দেবী কালিকার। জগতের মঙ্গলকামনায় অসুর নিধনের জন্য এই উপত্যকা থেকেই যাত্রা করলেন।

এই দোলমা পাসে রয়েছে বিশাল এক শিলাখণ্ড। সেই পাথরের সর্বাঙ্গে মানুষের মাথার চুলের গোছা আর মালার মতো গেঁথে টাঙানো রাশি রাশি ভাঙা দাঁত। পাথরের সারা গায়ে থকথকে সাদা মাখন। শিলাখণ্ডটি বীভৎস রূপ পেয়েছে। যেন ভয়ংকরী মহাকালী। ইনি হলেন গিরিবর্ত্মের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দোলমা। তিব্বতিদের প্রথা, মস্তক মুণ্ডন করে এখানে চুল রেখে যাওয়া, পড়ে যাওয়া দাঁত ঝুলিয়ে রাখা। হাতজোড় করে কালীরূপী দোলমার চরণে প্রণাম নিবেদন করলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। আরও সতর্ক হয়ে চলতে হচ্ছে। গৌরীকুণ্ড দেখা যাচ্ছে। দোলমা পাস থেকে ৪০০ ফুট নীচে। জলের রঙ সেখানে পান্নার মতো সবুজ। মা পার্বতী এই গৌরীকুণ্ডে স্নান করেন। প্রকৃতির কী অপরূপ সৃষ্টি! ১৮২০০ ফুট উচ্চতায় বরফের জলে তৈরি এই কুণ্ড। আমাদের সঙ্গী এক সাধুবাবা গৌরীকুণ্ডে নেমে পবিত্র জল এনে দিলেন।

নামার পথে হিমবাহ।

দোলমা পাস থেকে নামার পথে পড়ল এক হিমবাহ। চারিদিকে শুধুই বরফ। তার মধ্য দিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে চললাম। হাতের লাঠি আর ঈশ্বরই ভরসা। চার ধারে বিশাল বিশাল নাম-না-জানা পাহাড়। শ্বেতশুভ্র বরফের পুরু চাদরে ঢাকা। সূর্যের আলোয় ওই শুভ্রতার ঔজ্জ্বল্য বহু গুণ বেড়ে গিয়েছে। নীল আকাশের বুকে ছোটো ছোটো তুলোর মতো মেঘ ভেসে চলেছে।

এই হিমবাহের উপর দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর শুরু হল তুষারপাত। সঙ্গে প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়া। চলতে চলতে তাকিয়ে দেখি ক্রিভাস বা বরফের ফাটল। কোথাও কোথাও পায়ের তলায় জলের কুলকুল শব্দ কানে পরিষ্কার ভেসে আসছে। খুব সতর্ক হয়ে ভয়ংকর এই পথ পেরিয়ে এলাম। পিছনে ফিরে দেখলাম তুষারাবৃত পর্বতমালা গৌরীকুণ্ডকে তাদের সন্তানের মতো পরম স্নেহে আঁকড়ে রেখেছে।

আজ হাঁটার ধকল একটু বেশি। তাই কিছুটা উঠেই হাঁফ ধরে আসছে। মাঝে মাঝেই বিশ্রাম করছি, চকোলেট বা খেজুর মুখে দিয়ে আবার চলা শুরু করছি।

পাহাড়ের গা বেয়ে বোল্ডার ছড়ানো রাস্তা ধরে নীচে নেমে চলেছি। পাহাড় থেকে যখন সমতলে নামলাম, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ১১টা। নীচে নেমে জহরভাই আর সুরজভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার এগিয়ে চলা। আরও ১২ কিমি যেতে হবে। আজ আমাদের রাতের আস্তানা জুনজু ফু-এ।

দুপুরের মিঠে রোদে আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি। জনমানহীন প্রান্তর। কৈলাস পর্বতকে ডান দিকে রেখে এগিয়ে চলা। কৈলাসের বরফজল থেকে তৈরি হওয়া এক ছোট্ট নদী আমাদের পথ দেখিয়ে চলেছে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে অসংখ্য ঝরনা, মিলছে ওই নদীর সঙ্গে। প্রায় দু’ কিমি দীর্ঘ এক চড়াই অতিক্রম করতেই চোখাচোখি হল কৈলাস পর্বতের সঙ্গে। কৈলাস তার মোহিনী রূপ নিয়ে নীল আকাশের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ কিছু প্রাণের সাক্ষাৎ পেলাম। পাহাড়ের ঢালে ভেড়ার দল মনের আনন্দে ছোটাছুটি করছে। একটু বিশ্রাম নিতে সাধ জাগল। তন্ময় হয়ে বেশ কিছুটা সময় ধরে ওদের খেলা উপভোগ করলাম। শরীর আর মন কিছুটা চাঙ্গা হল। আবার নতুন উদ্যমে হাঁটা শুরু করলাম।

দোলমা থেকে ক্রমশ নেমে চলা।

খানিকটা বৃষ্টি হল। আর বৃষ্টির পরেই ডান দিকের তুষারশৃঙ্গগুলো গলানো রুপোর মতো ঝলমল করতে লাগল। রুক্ষ প্রান্তরে একটু একটু করে সবুজ প্রাণেরও দেখা পাচ্ছি। সবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ পাহাড় জুড়ে বাড়তেই থাকল। এই উদ্ভিদের জন্যই পাহাড়ের এই ঢাল পাহাড়ি পশুর চারণভূমি। নদীর জল কখনও কখনও পা ভিজিয়ে দিচ্ছে।

এই ভাবে পথ চলতে চলতে জুনজু ফু-র অতিথিশালায় পৌঁছে গেলাম। অতিথিশালাটি সুন্দর, কিন্তু সেই এক সমস্যা। ওয়াশরুম অতিথিশালার বাইরে। এখন বেলা ৩টে। ভোররাত থেকে হাঁটা শুরু করেছি। শরীর আর দিচ্ছে না, গরম গরম স্যুপ আর নুডলস্‌ এখন অমৃত। সাথে কফি। আর কী চাই এই দুর্গম প্রান্তরে?

১২ আগস্ট। ভোর ৫টায় যাত্রা শুরু হল। মাথায় যথারীতি টর্চ বাঁধা। কারণ এই অঞ্চলে সূর্যের আলো ফোটে সকাল ৮টায়। আজ আমাদের গন্তব্য ১০০ কিমি দূরের কিউগু – না, হাঁটাপথে নয়, বাসবাহনে। আসলে ৫ কিমি দূরের হোর-এ আমাদের হাঁটা শেষ হবে, শেষ হবে কৈলাস পরিক্রমা। এত কাছ থেকে আর দেখতে পাব না কৈলাস পর্বতকে। ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৮/ কৈলাস-দর্শনের সিংহদুয়ারে

পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। অন্ধকার একটু একটু করে কাটছে। সূর্যদেব ধীরে ধীরে দেখা দিচ্ছেন। অবশেষে চতুর্দিক আলোকিত হয়ে উঠল। আমরা হোর-এ এসে পৌঁছোলাম। নৈঃশব্দ্যের স্বপ্নপুরী যেন এক লহমায় কোলাহলমুখর জনপদে পরিণত হল। নির্বিঘ্ন যাত্রাশেষের আনন্দে সহযাত্রীরা একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। এত দিনের স্বপ্ন সফল হল। পরমেশ্বরের করুণায় পায়ে হেঁটেই ঈশ্বরদর্শন করতে পারলাম। মনে মনে প্রভুর চরণে প্রণাম নিবেদন করলাম।

পোর্টার প্রেমাকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানালাম। সামান্য কিছু বকশিশ ওর হাতে গুঁজে দিলাম। ওর চোখে জল। এই দুর্গম প্রান্তরে ওই ছিল একমাত্র ভরসা, প্রতি মুহূর্তের সাথি। এরাই আমার পথপ্রদর্শক, এরাই আমার পরমেশ্বর। এরা না থাকলে এই দুর্গম পথ অতিক্রম করতে পারতাম না।

আমাদের নিতে এসেছে নীল রঙের দু’টি বাস। ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে আমরা চললাম কিউগুর পথে। (চলবে)   

ছবি: লেখক       

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.