মেঘভাঙা বৃষ্টিতে কাটল মুনথুমের রাত

0
মুনথুম।
মুনথুম ভিলেজ হোমস্টে।

পাপিয়া মিত্র

বিজনবাড়ির ব‍্যাম্বু রিসর্টের ৫ নম্বর কটেজের বিছানায় শুয়েই যেন রঙ্গিতকে ছোঁয়া যায়। বরং বলা ভালো এখানে নদী এসে মিশেছে ঘরের দাওয়ায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মুছে চমকে যেতে হয়েছিল বর্ষার জলে ফুলে ফেঁপে ওঠা রঙ্গিতকে দেখে। আর নদীর ধারে সময় কাটানো নয়। ডাকছে মুনথুম। ট্র‍্যাভেলিজিমের দেওয়া পরবর্তী গন্তব্যে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম।

আজকের পথ দার্জিলিং হয়ে। বিজনবাড়ি ছাড়াতেই ২ কিমি দূরে পুলবাজার। তার পর নেমে এলাম রঙ্গিতের ধারে জামুনি ব্রিজে। জামুনি সেতুতে নেমে বেশ কিছুক্ষণ ফোটোসেশন চলল। দূরে গড়ে উঠছে একটি পার্ক। পার্কের মধ‍্যে দীর্ঘকায় পদ্মাসনে মহাদেবের মূর্তি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটা রঙ্গিত নদী। সুন্দর নয়নাভিরাম এই জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলছে।

পদ্মাসনে মহাদেব, জামুনি ব্রিজ।

এর পর পাতলেবাস ফরেস্ট, সিংটাম চা বাগান হয়ে দার্জিলিং-এ হিলকার্ট রোডে পড়লাম। একটু পরেই বাঁ দিকে পড়ল হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ও পদ্মজা নায়ডু জুলজিক্যাল পার্ক। চলে এলাম চকবাজার হয়ে দার্জিলিং স্টেশনে। আবার দেখা টয়ট্রেনের লাইনের। এই রেললাইনের যে একবার প্রেমে পড়েছে সে কোনো দিন ভুলবে না প্রকৃতির সঙ্গে এর রসায়ন। হিলকার্ট বরাবর চলে এলাম ঘুম। ফেলে এলাম বাতাসিয়া লুপ।

ঘুম থেকে বাঁ দিকে ঘুরে ধরলাম পেশক রোড। তার পর তিন মাইল (এখান থেকে বাঁ দিকে বেরিয়েছে মংপুর রাস্তা), ছয় মাইল, লামাহাট্টা (ডান দিকে লামাহাট্টা ইকো পার্ক, সুন্দর লেক, অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান), লাভার্স মিট (রঙ্গিত আর তিস্তার সংগম), তিস্তাবাজার। এখানে তিস্তা পেরোলাম। ২-১ কিমি যেতেই দু’ রাস্তার মোড়। বাঁ দিকের রাস্তা নীচে নেমে গেল। ওই রাস্তা তিস্তার পাড় ধরে চলে গেছে গ্যাংকট অভিমুখে। আমরা ধরলাম ডান দিকের পথ। যা ক্রমশ উপরে উঠেছে। পৌঁছে গেলাম কালিম্পং। তার পর রেলিখোলা, পালাখোলা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম মুনথুম।

কথা হয়েছিল মুনথুম যাওয়ার পথে লাভার্স মিট দেখে যাব। লাভার্স মিট আসতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়া। কলকাতা থেকে একটি পরিবারকে দেখে ভালো লাগল। করোনার ভীতি কাটিয়ে মুখে মাস্ক দিয়ে পাইনের আবছায়ায় হাঁটছে। হয়তো পায়ের জট ছাড়াতে। এখানে সূর্যের মুখ দেখা গেছে। ঘন পাইনে গাছের ফাঁক দিয়ে রবিকিরণ এক মায়াজাল ছড়িয়েছে পাহাড়ি রাস্তায়। কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম লাভার্স মিটে। নীচে চোখ পড়তেই দুই নদীর সঙ্গম সহজেই চেনা গেল। চত্বরে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে মুখ করলে সোজাসুজি ধেয়ে আসছে সিকিম থেকে তিস্তা। আর বাঁ হাতি রঙ্গিত।

এই রঙ্গিত কিন্তু বিজনবাড়িতে দেখা রঙ্গিত নয়। ইনিই আসল রঙ্গিত, আসছেন সিকিম থেকে। বিজনবাড়ির রঙ্গিত ছোটা, তিনি আসছেন নেপাল থেকে। লাভার্স মিটে রঙ্গিতের জল তিস্তা অপেক্ষা অধিক গাঢ়। তিস্তার ধার বরাবর চলে গেছে গ্যাংটকের রাস্তা। গাড়ির চলাচল ওপর থেকে বোঝা যাচ্ছিল।

তিস্তা ও রঙ্গিতের সংগম, লাভার্স মিট থেকে।

মুনথুম হোমস্টের ঠিক আগে চারশো মিটার রাস্তা পাথরনুড়ি বিছানো। তবে গাড়ি পৌঁছে যাবে হোমস্টের দোরগোড়ায়। সবুজ ঘাসে মোড়া, পাহাড়ি ফুলে সাজানো, বাঁশের রেলিং। জমির ধাপ কেটে কেটে সিঁড়ি। বর্ষা, তাই একটু সাবধানে পা ফেলে নামাটুকু ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই। ওপরে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি ফটকে দাঁড়িয়েছিলেন বিশাল গুরুং। একেবারে ওপরের ডাবল রুমের ঘরটি বরাদ্দ হল আমাদের জন্য। বাঁশ দরমা চটের সংমিশ্রণে ঘরগুলি বড়োই মনোরম। ওপরে টিনের চাল।
কিছুক্ষণের মধ‍্যেই বিশাল-ঘরনি নীতা গোলমরিচ ও দারুচিনি সহযোগে চা নিয়ে এলেন। ঝিনঝিনে বৃষ্টির পিছু ছাড়া নেই। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমাদের আপ‍্যায়নের ত্রুটি রাখলেন না গুরুং দম্পতি।

নীতার সংসার একেবারে রাস্তার ধারে। সেখান থেকে কিছুটা নীচে আমাদের ঘর। এরই মাঝে নানা গাছের মধ‍্যে একটি বিশাল আমগাছ। আম পড়ে আছে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দুপুরের ভাতের পাতে ঘরোয়া সেই আচারের স্বাদ নিলাম। সুস্বাদু ডালের সঙ্গে আলুভাজা, ডিমের কারি, ধুমায়িত ভাতের মিষ্টি গন্ধ ভরিয়ে দিল ঘর। পেটের খিদে আর রিমঝিম বৃষ্টি, আহা বাবু হয়ে মাটিতে বসে পড়লাম। কত দিন পরে এমন স্কুলবেলার বসা। গোল হয়ে এক সঙ্গে।

কন্যা-সহ নীতা।

নীতার হোমস্টে সংসারে চারটি ছেলে আছে যারা প্রতিনিয়ত সকলের দেখভালে ব‍্যস্ত। মেঠো জমি কেটে ধাপে ধাপে যে সিঁড়ি নেমে গেছে একবারে পালাখোলা নদী কিনারে, তারা তরতর করে নামছে উঠছে। ভাত খাওয়ার পরে যে যার জায়গায় বিশ্রামে চলে গেল। ঘনঘোর আকাশের মেঘফাঁকা এক জায়গায় একফালি আলো যেন মনে হল মুখে পড়ল। কাত হয়ে দেখি আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিদায়ী সূর্য জানান দিচ্ছে। বাইরে এসে দেখি দূরের আকাশে বৃষ্টি, জমাট মেঘ। একটু যেন মেঘও ডাকল মনে হল‌।

বেশ খানিক নীচে খাবার জায়গার ব‍্যবস্থা। বিশাল বলেছিলেন সন্ধেতে গানের আসর বসবে। নীতার সংসারের ছেলেরা গিটার বাজিয়ে গান শোনাবে। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন জায়গায় আলো জ্বলে উঠল। যেমন খাবারের জায়গা, আড্ডা, কোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠান থাকলে সেই সব জায়গায়। আর সিঁড়ির ধাপগুলো খুব জোরালো নয়, এক মায়াময় আলোয় চারদিক সেজে উঠল।

রাতে সেজে উঠল হোমস্টে।

নীতা কালিম্পঙের মেয়ে। বিশাল শিলিগুড়ির ছেলে। কলকাতায় দু’জনে হোটেল ম‍্যানেজমেন্ট পাশ করে একটি পাঁচতারা হোটেলে চাকরি করতে গিয়ে একে অন‍্যের সঙ্গে আলাপ। তাদের বিবাহিত সংসার কলকাতায় গড়ে উঠেছিল। কোল আলো করা কন‍্যাসন্তানকে নিয়ে দুবাই পাড়ি দিয়েছিলেন বিশালেরা। বেশ কয়েক বছর ওখানে দু’জনেই চাকরি করার পরে ফিরে আসা উত্তরবঙ্গে। নীতার দাদুর ৯ একর জমিতে গড়ে উঠেছে মুনথুম হোমস্টে। গুরুংদম্পতি জীবনের সব অভিজ্ঞতাটুকু ঢেলে দিয়েছেন এই হোমস্টেতে। সিঙ্গল কটেজ নেমে গেছে আরও নীচের দিকে। নীতা কথা প্রসঙ্গে জানিয়ে দিলেন আগস্টে ৬টি ছেলে একমাসের জন্য বুকিং করেছেন ‘ওয়ার্ক ফ্রম মাউন্টেন’-এর জন্য।

সন্ধের মুখে সামান্য সোনালি আকাশ দেখা দিলেও দূরতল্লাটে মেঘ গর্জে উঠেছিল। ভুল শোনা যায়নি। ঝিল্লির উল্লাস বেড়েই চলেছে। রাতের খাওয়ার জন্য আর নীচে যাওয়া হল না। দুড়দাড় বেগে বৃষ্টি নামল। পাহাড়ে এমন মেঘভাঙা বৃষ্টি আগে কখনও দেখিনি। 

মুনথুমে থাকা

মুনথুম ভিলেজ হোমস্টে, যোগাযোগ: ট্রাভেলিজম, ফোন: 8276008189, 9903763296

আরও পড়ুন: দ্বাদশীর জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় বিজনবাড়ি

আরও পড়ুন: চা বাগিচায় শ্রাবণের ডাক, চিয়াবাড়ি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন