Port of Livorno
লিভোর্নো পোর্ট অপেক্ষা ঘর

mousumiমৌসুমি বিলকিস

অবশেষে পায়েস্তুম ছাড়তে হল। সে এক ইমোশনাল দৃশ্য, মাদ্রের চোখ ছলছল, আমারও। ভোরবেলা মাদ্রে আমার জন্যই ঘুম থেকে উঠেছেন। আলবের্তো তাঁর ভাইপোর আধুনিক গাড়ি নিয়ে তৈরি। আমাকে ট্রেনে তুলতে যাবেন। সালের্নো থেকে আমার ট্রেন। যাব লিভোর্নোপোর্ট। ঘন্টা পাঁচেক লাগবে। তাই মাদ্রে ও আলবের্তো বড়োসড় খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছেন। আলবের্তোর গাড়ি চলছে দ্রুত। বাঁ দিকে তাইরেনিয়ান সমুদ্রের নীল জল। সূর্য উঠছে ডান দিকে। এই সব অসাধারণ দৃশ্যাবলি আমার মন ভালো করতে পারছে না। ট্রেনের কেবিনে যখন আমার নির্দিষ্ট আসনে বসে গেছি, কাচ আঁটা জানলার ও-পার থেকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আলবের্তো অঙ্গভঙ্গি করে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করছেন। হাসলাম। ট্রেনটা ছেড়ে দিল।

সহযাত্রীরা কেউ ইংরেজি জানেন না। তবু এক অদ্ভুত উপায়ে তাদের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল। এক মহিলা রোমা তারমিনিতে নেমে গেলেন। উঠলেন এক পুরুষ। ইনি ইংরেজি জানেন। কিন্তু এত গম্ভীর আর কম কথা বলেন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকই হবেন বুঝি।

যখন লিভোর্নো স্টেশনে নামলাম মুহূর্তের মধ্যে স্টেশন ফাঁকা। এক জন কালো যুবককে দেখতে পেয়ে রাস্তা জিজ্ঞেস করলাম। সেলিভোর্নো পোর্ট শব্দদু’টো বুঝতে পেরে রাস্তা দেখিয়ে দিল। নিজে থেকেই আমার লাগেজ বয়ে দিল। ভরসা করে সম্পূর্ণ তার হাতে ছেড়ে দিতে পারলাম না বলে আমিও সঙ্গে সঙ্গে বয়ে নিয়ে গেলাম। স্টেশনের বাইরে এসে সে নিজের মুখের কাছে ডান হাত নিয়ে গিয়ে খাবার ভঙ্গি করল আর দেখাল একটা এক ইউরোর কয়েন। বুঝলাম ব্যাগ বয়ে দেওয়ার মূল্য চাইছে এক ইউরো। অন্যএক আফ্রিকান যুবককে দেখেছি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকের কাছে টাকা চাইছে। আমি বিব্রত। আমার কাছে খুব বেশি টাকাপয়সা নেই। এক ইউরোও মূল্যবান। আমার ইতালি যাওয়া, ওখানে থাকা ও দেশে ফেরার খরচ ফিল্‌ম কনভেনশন কর্তৃপক্ষের। বাকি দেশগুলো ঘোরার খরচ আমার বান্ধবী ইরমট্রডের। দোনামনা করছি আর এক ইংরেজি জানা মানুষের থেকে বুঝে নিচ্ছি কোন বাসে পোর্ট যাব। কালো যুবক কী একটা ভেবে ইউরো না নিয়েই চলে গেল।

Port of Livorno
লিভোর্নো পোর্টে ইরমট্রডকে দেখে স্বস্তি

এক চটপটে মহিলা ড্রাইভারের বাসে করে যখন পোর্টের দিকে যাচ্ছি বাসের পিছনে এক আফ্রিকান কিশোরের জিম্মায় লাগেজ আর ব্যাকপ্যাক রেখে ড্রাইভারের কাছে টিকিট কাটতে গেলাম। আর তখন কী ভয়টাই না হচ্ছে, এই বুঝি লাগেজ নিয়ে ছেলেটি পালিয়ে যায়। অনেক সিনেমায় এবং লেখায় দেখি ব্ল্যাকরাই যত দুষ্কর্ম করে থাকে। কিছু দিন আগেই রিলিজ করা ‘কুইন’ ফিল্মে দেখেছি কঙ্গনার ব্যাগ চুরি করতে যাচ্ছিল এক ব্ল্যাক যুবক। নবনীতা দেবসেনের লেখায় পড়েছিলাম বিদেশের কোথাও একটা তাঁর ব্যাগ চুরি করে পালাচ্ছিল এক ব্ল্যাক। তাঁর বান্ধবীর তৎপরতায় ছেলেটি ব্যাগ ফেলে পালায়। বিদেশ পাড়ি দেওয়ার আগে এত জন আমাকে লাগেজ আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চুরি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। আর লন্ডনে গবেষণারত প্রিয়ঙ্কা বসু মাস খানেক আগেই বিপদে পড়েছিল ওর লাগেজ আর পাসপোর্ট চুরি যাওয়াতে। অনেক কাণ্ডের পর সে নতুন পাসপোর্ট পায়। বাসটা বেশ বড়ো আর ভিতরে ভিড় থাকায় আমার লাগেজ বা কিশোরটিকে দেখাই যাচ্ছে না। নিজের নির্বুদ্ধিতায় হাত কামড়াচ্ছি। অনেক কথাবার্তার পর যখন কোথায় যাব ঠিকঠাক বোঝাতে সক্ষম হয়ে টিকিট কেটে, টিকিট পাঞ্চ করে ভিড় ঠেলে বাসের পিছন দিকে ফিরলাম দেখি কালো কিশোর খুব যত্ন করে আমার লাগেজ আর ব্যাকপ্যাক ধরে বড়ো বড়ো চোখ মেলে জানলার বাইরে তাকিয়ে। তাড়াতাড়ি আমার বসার জায়গা করে দিল ব্যাগগুলোকে সরিয়ে। খুব লজ্জা পেলাম। একটা সাধারণ বিশ্বাস যে সবার প্রতি প্রযুক্ত হতে পারে না আবার প্রমাণিত হল।

লিভোর্নো পোর্টে যখন পৌঁছলাম আমার হাতে অনেক সময়। ফ্রান্সের করশিকা থেকে আসবেন ইরমট্রড। তাঁর ফেরি বিকেল সাড়ে ছটায়। তার পর আমাকে নিয়ে পাড়ি দেবেন অস্ট্রিয়া। ভারী লাগেজ নিয়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয় বলে বন্দরটা যতটা সম্ভব ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। টুসকানি প্রদেশের তাইরেনিয়ান সমুদ্রতীরের লিভোর্নো পোর্ট ইতালির এবং ভূমধ্যসাগরের সব থেকে বড় সমুদ্র বন্দর। অবশেষে ইরমট্রড তাঁর লাল গাড়ি বোঝাই জিনিসপত্র, চেলো ইত্যাদি নিয়ে বিশাল একটা জাহাজ থেকে নামলেন। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার পরের অবকাশে আমার বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিলেন তিনি যে আমাদের দেখা হয়েছে। এই প্রথম একা একা ঘুরছি বিদেশের রাস্তায়। খবর না পেয়ে বাড়ির লোকজন চিন্তায় মারা পড়ছিল আর কী। কলকাতা থেকে যে কোম্পানির সিম কার্ড কিনেছি তাতে ইউরোপের কেউই ফোন করেপাচ্ছে না। তাতে সমস্যায় পড়ছি মাঝে মাঝে। কেবলমাত্র কলকাতা থেকে কেউ কল করলে তবেই পাওয়া যাচ্ছে। আমাকে নিয়ে ইরমট্রড গাড়ি চালিয়ে দিলেন অস্ট্রিয়ার উদ্দেশে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here