শ্রয়ণ সেন

মদনলালজি গাড়িটা থামাতেই নিজের চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এ আমি কী দেখছি! আমার সামনে ধবধবে সাদা বরফ! এই বরফ দেখার জন্যই তো এত কড়া শীতেও হিমাচল ভ্রমণের রিস্ক নিয়েছি। অবশেষে তার দেখা পেলাম!

গাড়ি থেকে নামতেই আরও এক মায়াবী দৃশ্য। দূরে যত দূর চোখ যায় শুধু তুষারাবৃত পাহাড়ের শ্রেণি। না, এ আর ধৌলাধার নয়, এগুলি কাশ্মীরের পিরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণি।

Loading videos...

যে সারপ্রাইজটার কথা কাল মদনলালজি বলছিলেন সেটার দেখা পেলাম। সম্পূর্ণ ‘আউট অফ সিলেবাস’ গন্তব্য।

আরও পড়ুন: শীতের হিমাচলে ১ / যাত্রা শুরু বিলাসপুরে

‘আউট অফ সিলেবাস’ কেন বললাম? আমরা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে বেশ পড়াশোনা করে যাই। তাই কোনো জায়গায় গেলে সেটাকে আর অপরিচিত বলে মনে হয় না। মনে হয়, এই তো বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই পড়ে এসেছি এই জায়গাটা সম্পর্কে। কিন্তু এখন যেখানে আছি, সেই জোত পাস সম্বন্ধে কোথাও এতটুকু কিছু পড়িনি।

সমুদ্রতল থেকে ৭,৫০০ ফুট উচ্চতায় ছোট্ট পাহাড়ি পাস।

আজ সাত সকালেই রওনা হয়েছি নাড্ডি থেকে। পরবর্তী গন্তব্য চম্বার পথে। গুগুল ম্যাপে ধরমশালা থেকে চম্বার রাস্তা জানতে চাইলে ওরা দেখাবে নুরপুর, বানিখেত (ডালহৌসির কাছে) হয়ে চম্বা। সেই রাস্তায় দূরত্ব হয় প্রায় দেড়শো কিমি। কিন্তু মদনলালজি জানিয়ে দিলেন, রাস্তা যদি খোলা থাকে তা হলে জোত পাস দিয়ে যাবেন তিনি। তা হলে অন্তত ৪০ কিমি রাস্তা কমে যেতে পারে। কিন্তু জোত পাসের রাস্তা খোলা নাও থাকতে পারে, কারণ শীতকালে তুষারপাতের ফলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বুঝব কী ভাবে রাস্তা খোলা না বন্ধ?

মদনলালজি বললেন, চাম্বার রাস্তায় লাহরু বলে একটা জায়গা পড়বে, সেখান থেকে দু’ভাবেই চম্বা যাওয়া যায়। সেখানেই জিজ্ঞেস করে নেওয়া হবে জোত খোলা না বন্ধ।

নাড্ডি থেকে নামতে নামতে আবার এক্কেবারে সমুদ্রতলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। ফের সমতল রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। দ্রামনের কাছে প্রাতরাশ করার সময়ে প্রাথমিক ভাবে জানা গেল জোতের রাস্তা খোলা রয়েছে। তবুও লাহরু এলে সেটাকে পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে।

“জোত খুলা হায়?” লাহরুতে একটা চায়ের দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন মদনলালজি।

আরও পড়ুন: শীতের হিমাচলে ২/ ধৌলাধারের পাদদেশে পালমপুরে

“হাঁ খুলা হায়, যাইয়ে।” উত্তর এল।

ব্যাস, গাড়ির চড়াই ভাঙা শুরু হল। প্রচুর চড়াই উঠতে হবে, গাড়িতে তাই শান্ত গানের বদলে রক্ত গরম করা গান চালানো হল। পথ ক্রমশ উঠছে। রাস্তার অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। সরু এবং ভাঙাচোরা। সেই সঙ্গে প্রবল খাড়াই। সমুদ্রতল থেকে হাজার দুয়েক ফুট থেকে ক্রমশ উঠে চলেছি। কিছুটা যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, পাহাড়ের চূড়ায় জঙ্গলের আড়ালে সব বরফ পড়ে রয়েছে এবং সেগুলি আমাদের থেকে বেশি ওপরেও নয়। জোতে বরফ দেখার সম্ভাবনা বাড়ছে।

চলে এলাম জোত পাসে। গাড়ি থেকে নামতেই খেয়াল করলাম, বরফের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছি। দিন কুড়ি আগে এখানে বরফ পড়েছিল, সেই বরফ এখন জমে পাথর হয়ে গিয়েছে। একটু অসাবধান হলে পা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।

পড়ে রয়েছে বরফ!

বুঝতে পারলাম আমরা এখন আশপাশের সব কিছুর থেকেই ওপরে রয়েছি। অথচ পাস হিসেবে জোতের উচ্চতা আহামরি কিছু নয়। সাড়ে সাত হাজার ফুট মতো হবে। সাধারণত ডিসেম্বরের শেষে এই পাস খোলা থাকে না। বরফের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এ বার ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর আর সে ভাবে বরফ পড়েনি, তাই রাস্তা খোলা।

বেশ কিছু ভিউ পয়েন্ট রয়েছে এখানে। আমাদের লক্ষ্য যতটা সম্ভব ভিউ পয়েন্টগুলিতে যাওয়া। প্রবল হাওয়ায় আমাদের উড়ে যাওয়ার জোগাড়। সেই হাওয়া উপেক্ষা করেই হাঁটা লাগালাম, জোতকে ভালো করে চিনব বলে।

জোতকে নতুন পর্যটন স্থল হিসেবে তুলে ধরছে হিমাচল সরকার। পাহাড়ের ঢালে বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়েছে ভিউ পয়েন্ট। একটি পয়েন্ট থেকে যেমন পিরপাঞ্জালকে অসাধারণ দেখায়, তেমনই অন্য একটি পয়েন্ট থেকে দেখতে পাওয়া যায় মণিমহেশের কৈলাস পিককে। ইতিউতি বরফ মাড়িয়েই এগিয়ে গেলাম সব থেকে ওপরের পয়েন্টের দিকে। ভূতের সিনেমায় যেমন হাওয়ার শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায়, এখানে ঠিক সে রকম আওয়াজ করছে হাওয়া। হাওয়ার ধাক্কায় সামনে ওঠা দায়। তবুও কাউকেই তোয়াক্কা না করে উঠে চলেছি, যতটা ওঠা যায়।

দেখা যায় পিরপাঞ্জাল।

এখানে একটা ছোট্টো বুগিয়াল মতো রয়েছে। ফাঁকা ঢালু মাঠ। তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে হিমাচলের বন দফতর। অচিরেই হয়তো এখানে গড়ে উঠবে হিমাচল পর্যটনের কোনো বিশ্রামাবাস। সেটা তৈরি হলে এখানে যে পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে তা বলাই বাহুল্য।

ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সামনের পিরপাঞ্জাল, পাশের দেবদারুর জঙ্গল দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে খেয়াল করিনি ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে। মদনলালজির ফোনে হুঁশ ফিরল। এ বার চম্বার দিকে নামতে হবে যে।

আরও পড়ুন: শীতের হিমাচলে ৩/ কাংড়া ফোর্ট দেখে দলাই-ভূমে

গাড়ির দিকে যাওয়ার সময়ে মনে পড়ল কিছুক্ষণ আগেই মদনলালজি বলেছিলেন, “জোত মে আপ কো পুরা জন্নত দিখ যায়গা।” সত্যিই এই জোতেই তো স্বর্গের হাতছানি পেলাম।

জোত ছাড়িয়ে চম্বার পথে।

কী ভাবে যাবেন

ধরমশালা থেকে চম্বা গেলে জোত দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। কথা দিচ্ছি ঠকবেন না। তবে বাস নয়, গাড়িতেই ভরসা রাখতে হবে। কারণ এ রাস্তায় বাস চলে খুবই কম। চম্বা থেকেও আলাদা ভাবে ঘুরে নিতে পারেন জোত। দূরত্ব ২৬ কিমি।

কোথায় থাকবেন

জোতে থাকার ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত হয়নি। আশেপাশের গ্রামগুলিতে কিছু রিসোর্ট-হোম স্টে রয়েছে যদিও। সে ক্ষেত্রে রাত কাটাতে পারেন চম্বায়। এখানে রয়েছে হিমাচল পর্যটনের দু’টি হোটেল, ইরাবতী এবং চম্পক। অনলাইনে বুক করার জন্য লগ ইন করুন www.hptdc.in। এ ছাড়াও প্রচুর বেসরকারি হোটেল রয়েছে শহর জুড়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.