himachal pradesh bilaspur
শ্রয়ণ সেন

এ এক ইচ্ছেপূরণের গল্প। ২০১১-তে মনে জেগেছিল সেই ইচ্ছেটা, আজ পূরণ হল। সেই ইচ্ছেটার কথায় পরে আসছি। আগে শুরুর কথাটা বলি।

কাল রাত সাড়ে ১১টায় চণ্ডীগড় স্টেশনে নামতেই আমাদের এসে জড়িয়ে ধরলেন মদনলালজি। সেই মদনলাল শর্মা। ২০১১ সালে কুড়ি দিন ধরে হিমাচল ঘুরিয়েছিলেন তিনি। সে বার প্রথম সাক্ষাতে আমাদের সূচি দেখে কিঞ্চিৎ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে হয়ে ওঠেন আমাদের খুব কাছের এক মানুষ। তাই কুড়ি দিনের ভ্রমণ শেষে যখন তাঁকে বিদায় জানাচ্ছিলাম তাঁর চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও দেখা গিয়েছিল।

সেই মদনলালজি ব্যবসাকে আরও উন্নত করেছেন। তখন এজেন্সির গাড়ি চালাতেন, এখন নিজের গাড়ি হয়েছে। নিজেই গাড়ির অফিস করেছেন। নিজেই গাড়ির বুকিং দেন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগটা বরাবরই থেকে গিয়েছে। এখন তো হোয়াট্‌সআপের যুগে সেই যোগাযোগ রাখা কোনো সমস্যাই নয়।

তাই শীতে হিমাচল ভ্রমণ করলে কেমন হবে, কোনো সমস্যা হবে কি না, এই প্রশ্ন যখন মদনলালজিকে করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, “নির্দ্বিধায় চলে আসুন। কোনো সমস্যা হবে না।” তাই প্রবল ঠান্ডার হুমকি উপেক্ষা করেই শুরু করলাম হিমাচল ভ্রমণ। কাল ট্রেন থেকে নেমে চণ্ডীগড়ে নিজের পরিচিত একটি হোটেলে আমাদের নিয়ে গেলেন তিনি। আজ সকালে যাত্রা শুরু। সফরের প্রথম গন্তব্য বিলাসপুর।

চণ্ডীগড়ের অনতিদূরে পিঞ্জোর গার্ডেনস। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফের রওনা হলাম। হিমাচল-হরিয়ানা-পঞ্জাব, তিন রাজ্যেরই সীমানা বরাবর গাড়ি এগিয়ে চলল। আনন্দপুর সাহিবকে পাশে রেখে পাহাড়ে চড়া শুরু। রাস্তা ঊর্ধ্বমুখী। দিকে দিকে চোখে পড়ছে উন্নয়নের যজ্ঞ। পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা, কাটা হচ্ছে অগুনতি গাছ। এই দৃশ্য চাক্ষুষ করতে করতেই এগিয়ে চললাম আমরা।

বিলাসপুর যখন পৌঁছোলাম, ঘড়িতে আড়াইটে। পর্যটকদের কাছে বিশেষ পরিচিতি নেই হিমাচলের এই বিলাসপুরের। বিলাসপুর বলতে বেশির ভাগ মানুষই ছত্তীসগঢ়ের শহরটার কথাই জানেন। হিমাচলের এই তুলনায় অপরিচিত শহরটা কী ভাবে আমাদের ভ্রমণসূচিতে ঠাঁই পেল? এখানেই রয়েছে সেই ইচ্ছেপূরণের গল্প।

মানালি-চণ্ডীগড় রুটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর এই বিলাসপুর। ২০১১-তে মদনলালজির গাড়িতে মানালি থেকে চণ্ডীগড় ফেরার সময়েই বিলাসপুরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে হিমাচল পর্যটনের লেক ভিউ হোটেলের। সুবৃহৎ গোবিন্দ সাগর লেকের পাড়ে এই হোটেল, সব ঘরই হ্রদমুখী। ইচ্ছে ছিল কখনও যদি এই হোটেলে থাকা যায়!

হিমাচল পর্যটনের লেক ভিউ হোটেল, বিলাসপুর

এ বার আমাদের ভ্রমণ কাংড়া উপত্যকাকে ঘিরে। চণ্ডীগড় থেকে যাত্রা শুরু করলে কাংড়ার সব থেকে নিকটবর্তী টুরিস্ট স্পট পালমপুর। কিন্তু সেটা চণ্ডীগড় থেকে ২৫৬ কিমি দূরে। একদিনে এতটা জার্নি করা একটু ক্লান্তিকর। মাঝে একদিন কোথাও থাকলে দারুণ হয়! গুগুল ম্যাপ সার্চ করে দেখে নিলাম দু’টি শহরের একেবারে মাঝামাঝি পড়বে বিলাসপুর। চণ্ডীগড় এবং পালমপুর, দু’টি জায়গা থেকেই বিলাসপুরের দূরত্ব ১৩০ কিমি মতো। ব্যাস, হাতে যেন চাঁদ পেলাম। বিশ্রামও পেলাম, সেই সঙ্গে লেক উপভোগ করার সুযোগও পেলাম।

ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম তেমনই ঘর। ঘরের ব্যালকনি থেকে সুবিশাল হ্রদ। দেখা যাচ্ছে হ্রদের মধ্যে থেকে কয়েকটি মন্দিরের চুড়ো। এই মন্দিরের চুড়োর ইতিবৃত্ত জানার জন্য ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়।

ওটাই হল আদি বিলাসপুর। আমরা এখন যেখানে রয়েছি, সেটার বয়স মেরেকেটে ৭০ বছর। কিন্তু আদি বিলাসপুরের বয়স সাড়ে তিনশোরও বেশি। ১৬৬৫ সালে বিলাসপুর শহরের পত্তন হওয়ার পরে এই সব মন্দির তৈরি হয়েছিল। মূলত নাগরশৈলীর মন্দির। কিন্তু ১৯৫৪ সালে শতদ্রুর ওপরে তৈরি হয় ভাকরা নাঙ্গল জলাধার। তৈরি হয় এই কৃত্রিম হ্রদ গোবিন্দ সাগর। সেই হ্রদের জলেই ডুবে যায় আদি বিলাসপুর শহর।

এই সেই ডুবে থাকা মন্দির

শহরের বাসিন্দাদের জন্য নতুন বিলাসপুর তৈরি হলেও, মন্দিরগুলোকে তো আর স্থানান্তরিত করা যায়নি। সেগুলি জলের তলাতেই থেকে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ডুবে যাওয়ার আগে তিরিশটা মন্দির ছিল। এখন পাঁচ-ছ’টা মন্দিরের চুড়ো দেখা যায়।

গরম কালে যখন হ্রদের জল বেশ কমে যায়, তখন মন্দিরগুলি জল থেকে উঠে আসে। তখন হেঁটে হেঁটে ওই মন্দির দর্শন করা যায়। এখন অবশ্য বোটিং-এর মাধ্যমে মন্দির দর্শন করানো হচ্ছে। তবে আমাদের লক্ষ্য এখন বোটিং নয়, শহরের অনতিদূরের বান্ডলা হিলটপ।

মধ্যাহ্নভোজনের পরে খানিক বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। মানালির দিকে কয়েক কিলোমিটার গিয়ে ডান দিকে ঘুরে গেল আমাদের গাড়ি।

সরু রাস্তা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এমন খাড়া রাস্তা দেখে আমাদের মধ্যেই কয়েকজন ঘাবড়ে গেলেন, কিন্তু মদনলালজি অবিচল। বারবার আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন ঘাবড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। সত্যি কথা বলছি, তাঁর মতো আত্মবিশ্বাসী চালক খুব কম দেখেছি। চালক যদি ভালো হয়, গোটা সফরের ক্লান্তি এমনিই দূর হয়ে যাবে।

বান্ডলার রাস্তা

যাই হোক, এসে পৌঁছোলাম বান্ডলা টপে। সমুদ্রতল থেকে আমরা এখন সাড়ে চার হাজার ফুটের কিছু বেশি উচ্চতায়। অর্থাৎ বিলাসপুর থেকে উঠেছি প্রায় আড়াই হাজার ফুট মতো। বিলাসপুর শহর থেকে দূরত্ব ১২ কিমি।

এখানে বন দফতরের একটি অতিথি নিবাস রয়েছে। সেটাকে পাশে রেখে আরও চড়াই ভাঙতে শুরু করলাম। এ বার অবশ্য নিজেদের পা-ই ভরসা।

বেশ কিছুটা চড়াই ভাঙার পর, এল এক অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট। বুঝতে পারলাম আশপাশের পাহাড়ের থেকে আমরা বেশ উঁচুতে রয়েছি। এখান থেকে গোটা বিলাসপুর শহর এবং গোবিন্দ সাগর হ্রদকে অসাধারণ দেখাচ্ছে। তবে কিছুটা কুয়াশার প্রভাব রয়েছে। তাই যতটা পরিষ্কার দেখার ইচ্ছে ছিল, ততটা নয়। কিন্তু এই দৃশ্যও যথেষ্ট উপভোগ্য। দূরে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারার চেষ্টা করছে ধৌলাধারের বরফমাখা চুড়োগুলো। তবে সেগুলিকে ক্যামেরায় ধরা গেল না।

বান্ডলার ভিউ পয়েন্ট থেকে

সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় কাটালাম ওই ভিউ পয়েন্টে। ধীরে ধীরে গোবিন্দ সাগরের জলকে রাঙিয়ে পশ্চিমে ঢলে পড়ল সূর্য। আমরা নামার তোড়জোড় শুরু করলাম। (চলবে)

কী ভাবে যাবেন

চণ্ডীগড়-মানালি সড়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিলাসপুর শহর। মানালি থেকে চণ্ডীগড় বা চণ্ডীগড় থেকে মানালি যাওয়ার পথে এক রাত কাটিয়ে দিন এই শহরে। হাওড়া থেকে কালকা মেলে চণ্ডীগড় পৌঁছোন। অথবা ব্রেক জার্নি করুন হাওড়া থেকে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে চণ্ডীগড়। চণ্ডীগড় থেকে বিলাসপুরের দূরত্ব ১২৫ কিমি। বাস যাচ্ছে নিয়মিত। তবে নিজস্ব গাড়িতে গেলে একটু ঘুরে ভাকরা জলাধার এবং নয়নাদেবী মন্দির দেখে নিতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

জায়গার অবস্থান অনুযায়ী বিলাসপুরে সব থেকে ভালো থাকার জায়গাটি হল হিমাচল পর্যটনের লেক ভিউ হোটেল। হোটেলটির সব ঘরই হ্রদমুখী। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন www.hptdc.in। এ ছাড়াও শহর জুড়ে রয়েছে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here