রাজার খোঁজে কানহায় / ২

0

moitryমৈত্রী মজুমদার

এই মুহূর্তে চোখের সামনে ঘটতে থাকা ঘটনাবলির বর্ণনা হয় না। কে জানে জিম করবেট বা বুদ্ধদেব গুহ হলে হয়তো তা লেখনী হয়ে মনের দোরে কড়া নাড়ত। কিন্তু নিতান্ত আমার মতো কলমের কাছে সেই প্রত্যাশা নিরর্থক। তা-ও যা চোখ দেখল, তা আঙুল দিয়ে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা যাক।

বাঘিনী তার নরম দেহ নিয়ে সেই যে আধডোবা হয়ে বসেছে, তার নট্‌-নড়ন, নট্‌-চড়ন। কিন্তু বাচ্চাদের রক্ত গরম, তারা এক বার শুচ্ছে, এক বার বসছে, প্রকাণ্ড লেজ নাড়ছে। এ-ওকে থাবাচ্ছে। আর ১০-১২টা জিপসির ৩০-৪০ জন মানুষ তা নিজেদের চোখ আর ক্যামেরার লেন্স দিয়ে চেটেপুটে উপভোগ করছে।

kanha2sমুহূর্তে মনে হল, পৃথিবীর সব ধরনের ক্যামেরার এক্সিবিশন চোখের সামনে দেখছি। দেশিদের সোনি, ক্যানন থেকে বিদেশিদের হাতের বিশাল লেন্স থাকা নাইকম, মিনল্‌টা এমনকি উত্তেজনার তুঙ্গে স্যামসাং, এলজি, নোকিয়া থেকে মাইক্রোম্যাক্সের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা বের করে ১০০ মিটারেরও দূরে থাকা বাঘিনীর পরিবারের গ্রুপ ফটো এমনকি বাঘের পরিবারের পটভূমিতে নিজেদের সেলফি পর্যন্ত তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

শুনেছি বহু বছর ধরে (১৯৩০ সাল থেকে) বংশানুক্রমে পর্যটক দেখতে দেখতে এখানকার বাঘেরা বেশ মানুষ-ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠেছে। কিন্তু ক্যামেরা-ফ্রেন্ডলিও যে হয়েছে, তা বুঝলাম যখন একটা বাচ্চা হঠাৎ করে উঠে হাঁটতে শুরু করল। এই দৃশ্য যে কোনও সিক্স-প্যাক মডেলের র‍্যাম্প-ওয়াককেও হার মানায়। হবেই না বা কেন ? বাওয়া ! এ যে বিগ ক্যাট ওয়াক।

শুধু কি চলেই ক্ষান্ত দিল সে ? উঁহু, তার সামনে তখন হাজার ক্যামেরার ঝলকানি, সে ডাইনে গেল, বাঁয়ে গেল, তার পর অল্প দূরে গিয়ে পাড় বেয়ে জলের দিকে নেমে এল। খানিক ক্ষণ চুপচাপ। তার পর শুয়ে বসে উলটে-পালটে নানা রকম কসরৎ করতে লাগল। বাড়িতে আহ্লাদি বেড়াল থাকলে এ দৃশ্য কিছুটা কল্পনা করা যেতে পারে।

এক ফাঁকে নজর করলাম প্রথমে দেখা সেই ময়ূরটা আশেপাশে কোথাও নেই। সত্যি বনের রাজার আশেপাশে কোনও প্রজার থাকা চলে না। (অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ।)

এ দৃশ্যের বর্ণনা শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু আমাদের সময় শেষ হওয়ার পথে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জঙ্গল থেকে বেরোতে না পারলে জরিমানা ভরতে হবে।

মনে মনে ভাবছি, হে মা বাঘিনী, অল্প উঠে দাঁড়া, চলে ফিরে দেখা। ডেরায় ফিরতে হবে যে। ঠিক সেই মুহূর্তেই জল থেকে কাদা মেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দু’ মিনিটের নীরবতা, তার পর পাড় বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগলেন, যেখানে তাঁর বাচ্চারা আছে।

বাব্বা ! আজ কার মুখ দেখে যে উঠেছি! মনে ভাবছি, আর চোখের সামনে তা ঘটতে দেখছি। কিন্তু এ কী, এ যে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। আচ্ছা এত ক্ষণে বোঝা গেল। একে বাচ্চা-সহ বাঘিনী, তার ওপর অল্প-জখমি, আর সময়টা গ্রীষ্মের গোধূলি। একে একে দুই আর দুয়ে দুয়ে ….।

স্থান, কাল, পাত্রের এক অমোঘ ত্র্যহস্পর্শে আমাদের ললাটলিখনে সৌভাগ্যদেবীর স্বয়ং উদয়। আহ্‌! আজ একটা লটারির টিকিট কাটাই যেত।

এই সব খুশির কথা মনের মধ্যে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো কলকল করছিল, আর সেই মুহূর্তেই আজকের ক্লাইম্যাক্স। দুলকি চালে, অতি নিঃশব্দে গহন-গম্ভীর পদক্ষেপে, বাঁ দিকের গভীরতম জঙ্গলের বুক চিরে বেরিয়ে এলেন পরিবারের কর্তা।

সেই যাকে কিছুক্ষণ আগে বড় রাস্তার নালার ধারে দেখা গিয়েছিল। তিনি অতি কনফিডেন্ট পদক্ষেপে এসে আরাম করে বসলেন তাঁর গৃহিনীর পাশটিতে। তার পর এক মুহূর্তে মুখ দিয়ে আলতো আদর। মনে হল গিন্নির পায়ের ব্যথার খোঁজ নিলেন। তার পর স্থির হয়ে বসলেন দু’ জনে, ক্যামেরার দিকে মুখ করে।

আবার ঝলসে উঠল অজস্র ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, এক সঙ্গে।

এই অবর্ণনীয় দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে দেখতে আমরাও রওনা দিলাম রিসর্টে ফেরার পথে। মনে মনে বললাম-

“বাজা তোরা, রাজা যায়…..”

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন