ব্রেমেন-এর শ্নুর

দেবোপম ঘোষ

ব্রেমেনের দ্বিতীয় সকালটা ছিল তুলনামূলক ভাবে বেশি ঠান্ডা, ৬-৭ ডিগ্রির কাছাকাছি। তার সঙ্গে এক নাগাড়ে ঠান্ডা হাওয়া। দুয়ে মিলে ঘরের বাইরে বেরোনো কঠিন। কিন্তু প্রথম দিন এত ঘোরার পর দ্বিতীয় দিনটা ঘরে বসে কাটিয়ে দেব, এটা ঠিক মানতে পারলাম না। তাই শান্ত জনমানবহীন রবিবারের সকালে বেরিয়ে পড়লাম।

সিটি সেন্টারের একটি অংশ।

শহর ঘুরে দেখার ভালো উপায় হল হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম শহরের মাঝখানে ‘ডোমস্‌হাউস’ বা সিটি সেন্টারে। মোবাইলে মানচিত্র দেখে এখানে পৌঁছোতে লাগল প্রায় আধ ঘণ্টা। তবে সিটি সেন্টার সম্পর্কে বলার আগে এখানকার ফুটবল স্টেডিয়াম সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলাম ভেসার নদীর ধারে। নদীর ওপর সাঁকোতে দাঁড়িয়ে আশেপাশের কয়েকটা ছবি তুলতে তুলতে দেখলাম স্টেডিয়ামটা খুব দূরে নয়। নাম, ‘ভেসার স্টাডিয়োন’। নদীর নামে স্টেডিয়ামের নাম। ভেতরে ঢুকেই সঙ্গী করে নিলাম এক জন গাইডকে।

স্টেডিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ।

একটা ফুটবল মাঠের মেরামতি, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে কত রকমের সরঞ্জাম লাগে, তা বুঝলাম এই প্রথম। মাঠের ঘাস সঠিক তাপমাত্রায় রাখার জন্য বড়ো বড়ো আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। গাইডসাহেব আমাকে ঘাসে পা দিতে বারণ করলেন। কারণ আমার জুতো থেকে জীবাণু ছড়িয়ে যেতে পারে। আমি তো তাজ্জব!

খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতার ঘর দেখিয়ে গাইডসাহেব আমাকে নিয়ে এলেন স্টেডিয়ামের রেস্তোরাঁয়। স্টেডিয়ামের নীচে জাদুঘর। জাদুঘর ঘুরে গাইডসাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে অবশেষে পৌঁছোলাম সিটি সেন্টারে।

সিটি সেন্টার মূলত একটি বিশাল জায়গা যেখানে রয়েছে শপিং মল, দোকানপাট। রয়েছে একটি বিশাল সরকারি ভবন, যার পরিচিতি ‘রাটহাউস’ হিসাবে। ‘রাটহাউস’-এর সবুজ ছাদ এবং দুর্গের গড়ন আমার নজর কেড়েছিল। সাধারণত, রূপকথায় এ ধরনের দুর্গের ছবি দেখা যায়। এই প্রথম চাক্ষুষ করলাম।

‘রাটহাউস’-এর ঠিক পাশে রয়েছে আরও একটি বিশালাকৃতির দুর্গ, যাকে ‘ডোম’ বলা হয়। এই ‘ডোম’ আসলে একটি গির্জা। ‘ডোম’ থেকে সামান্য দূরে ‘রোলান্ড’-এর বিখ্যাত মূর্তি। মূর্তির দৃষ্টি গির্জার দিকে। এই ঠান্ডাতেও কিন্তু বেশ কিছু মানুষ এখানে জড়ো হয়েছেন, মোবাইলে ছবি তুলছেন।

পাশাপাশি আরও একটি দৃশ্য লক্ষ করলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছেন এক জন। সামনে গিটারের খাপটি খোলা। পথচারীদের মধ্যে কেউ কেউ তার মধ্যে পয়সা ফেলছেন, কেউ সেটিকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলেছেন। এ সব ছবি এত দিন বই বা খবরের কাগজের পাতায় দেখেছি, আজ স্বচক্ষে দেখলাম। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়ে একটু অন্য রকম অনুভূতি হল।

শীতের দিন। চারটে বাজতে না বাজতেই সূর্যাস্তের বেলা চলে এল। ঠান্ডাও বাড়ছে। আজকের মতো ফিরে চললাম।

ব্রেমেন শহরটা যেন আমাকে টানছে। গতকাল সিটি সেন্টার আর স্টেডিয়াম ঘুরে দেখার পর শহর ঘোরার বাসনা বেশ বেড়ে গেছে। এই শহরে বেশ কয়েকটা ঐতিহাসিক জায়গা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শ্নুর’। এই ‘শ্নুর’ দেখার জন্য উঠে পড়লাম বাসে।

এখানকার বাসের কথা বলি আগে। দু’ কামরার বাস, মেট্রোর মতো। সাধারণত এ ধরনের বড়ো বড়ো বাস ট্রামরেলের ওপর দিয়ে চলে। ফলে রাস্তা সরু হলেও গাড়ি চলাচলে কোনো অসুবিধা হয় না। বাসে টিকিট কাটতে হলে সামনের গেট চিয়ে চড়তে হয়। কিন্তু আমার কাছে পাস থাকায় যে কোনো গেট দিয়েই ওঠার অধিকার আমার আছে।

মিনিট দশেক পর পৌঁছে গেলাম ‘শ্নুর’-এ। অসংখ্য সরু গলি এই ‘শ্নুর’-এ। এটাই এই অঞ্চলের বিশেষত্ব। মনে হল যেন উত্তর কলকাতা দিয়ে হেঁটে চলেছি। আশেপাশে কয়েকটি ছোটো ছোটো দোকান, চা-কফির। এ সবের গায়েই ‘ব্রেমেন ষ্টাটমুসিকান্টেন’ অর্থাৎ ব্রেমেন শহরের সুরকার-এর প্রতীক। আদতে একটি মূর্তি, ‘রাটহাউস’-এর পাশেই। কিছুটা এগোতেই রাস্তার মাঝখানে আরেকটি ব্রোঞ্জের মূর্তি। এই মূর্তিটি হাইনি হোল্টেনবিন-এর। ব্রেমেনের এই মানুষটি নিয়মিত ‘শ্নুর’-এ আসতেন। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে ক্লাউস হোমফেল্ড এই মূর্তি নির্মাণ করেন।

বিউর্গার পার্ক’।

‘শ্নুর’ ঘুরে চলে এলাম ‘বিউর্গার পার্ক’-এ। এটি একটি প্রকৃতি পার্ক, আকারে এতটাই বড়ো যে এর থৈ পাচ্ছিলাম না। পার্কের এক প্রান্তে একটি বড়ো জলাশয়, এবং তার পিছনে সাদা রঙের একটি ভবন। দু’য়ে মিলে এক অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। এই বাড়িটিতে যাঁরা থাকতে আসেন, তাঁরা তো খুবই ভাগ্যবান। জানলা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়বে সবুজ গাছপালা আর জলাশয়ে খেলে বেড়াচ্ছে হাঁসের দল।

এখান থেকে চলে এলাম ব্রেমেনের আরেকটি প্রকৃতি উদ্যান ‘রোডোডেনড্রন পার্ক’-এ। রংবেরঙের রোডোডেনড্রন ফুলের সমারোহ এখানে। ছবি তোলার আদর্শ জায়গা। কয়েকটি ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম। ভাবলাম ঘরে ফেরার আগে একটু দূরের ‘বাতচক্র’ তথা উইন্ডমিলটি দেখে ফিরব।

 আরও পড়ুন :  জার্মান দেশে ১/ ভেসার-এর ধারে ব্রেমেন

উইন্ডমিলটির নাম ‘মুলে আম ভাল’, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘ওয়াল’ নামে জায়গাটিতে অবস্থিত ‘বাতচক্র’। এখন অবশ্য এটি একটি রেস্তোরাঁ। সামনে বিরাট বাগান, তার মাঝে বসার কয়েকটি জায়গা। এক জায়গায় বসে সারা দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে বসলাম। ঘুরলাম তো ভালোই, কিন্তু কিছু জায়গা দেখা এখনও বাকি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘বুনক্যার ফালেনটিন’। এটা কালকের জন্য তোলা রইল।

ঘুরে ঘুরে যতই ব্রেমেন দেখি, ‘বুনকার ফালেনটিন’ না দেখলে ব্রেমেন দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই পরের দিনই বেরিয়ে পড়লাম।

প্রথমেই ‘বুনকার ফালেনটিন’ ব্যাপারটি কী বলে রাখি। এটা বিশাল একটা কারখানা, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু মানুষকে বন্দি করে রাখা হত। হ্যাঁ, এটাও ছিল একটা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’। এই ধরনের ক্যাম্পগুলোতে বন্দিদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হত। দেওয়া হত নামমাত্র খাবার। বেশির ভাগ বন্দি কিছু দিনের মধ্যেই মারা যেতেন।

এই ‘বুনকার ফালেনটিন’ আমার আবাস থেকে বেশ কিছুটা দূরে। তাই  ঠিক করলাম, ট্রেনে যাব। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের আবহাওয়া আর পরিবেশ বেশ উপভোগ করছিলাম। গতকাল নাকি রাতের তাপমাত্রা শূন্যের কম ছিল। ভালো করে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম। রাস্তা আর দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ওপর জলের বিন্দু পড়ে জমে আছে। আর দিনের বেলায় তারার মতো চমকাচ্ছে। সত্যি বলতে কী, এ রকম অপরূপ দৃশ্যের সাক্ষী কখনও হইনি। দেখলাম, রাস্তার ধারে অল্প অল্প বরফও পড়ে আছে।

স্টেশন থেকে খুব দূরে নয় ‘বুনকার ফালেনটিন’। কারখানাটি বিশাল বললেও কম বলা হয়। গায়ে শ্যাওলা লেগে রয়েছে, জায়গায় জায়গায় ভেঙে গিয়েছে, যেন এর ওপর ভারী বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। গাইড কিন্তু সে কথাই বললেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ হয়।

ভেতরে ঢুকলাম। কয়েকটি ছবি আর কিছু লেখা। সময় নিয়ে প্রতিটি লেখা পড়লাম। বুঝলাম এই কারখানার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কখন কোথায় যুদ্ধ হয়েছে তার বিস্তৃত বিবরণ। প্রথম ঘরে রাখা কয়েকটি মানচিত্র থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হল। গাইডকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এটি আসলে একটি সাবমেরিন, জার্মান ভাষায় যাকে বলে ‘উ-বুট’। এই সাবমেরিন তৈরি করার কাজে লাগানো হত প্রচুর বন্দি। এবং এই বন্দিরা যাতে পালাতে না পারেন তার জন্য বাইরে মোতায়েন থাকত ক্ষুধার্ত ‘জার্মান শেফার্ড’ কুকুর।

দ্বিতীয় ঘরটা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছিল সব রকম অস্ত্রের গুদাম। এই ঘরটিতেই সব থেকে বেশি বোমা ফেলা হয়। তার চিহ্ন এখনও বর্তমান। ছাদের দিকে তাকালেই একটা বড়ো খোলা অংশ দেখতে পাওয়া যায় আর তার ঠিক নীচে লোহার একটা বড়ো টুকরো। লোহার টুকরোটা বোমার অংশ, আর ওই বোমার আঘাতেই ছাদের ওই গর্ত তৈরি হয়েছে। ‘বুনকার ফালেনটিন’-এর সামনে একটা বড়ো জলাশয় ছিল। কিন্তু একটা সাবমেরিনও এই কারখানা থেকে বেরোতে পারেনি। কারণ সাবমেরিন কর্মক্ষম হয়েছে কিনা তা দেখার মতো জলের যথেষ্ট গভীরতা জলাশয়ে ছিল না। অর্থাৎ এই সব বন্দির প্রাণ অকারণেই শেষ হয় এখানে।

‘বুনকার ফালেনটিন’-এর দিকে আরেকবার তাকিয়ে ফিরে চললাম আমার বাসস্থানের দিকে। সঙ্গে নেই চললাম ব্রেমেন ভ্রমণের এক রাশ স্মৃতি। (শেষ)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here