দেবোপম ঘোষ

“হার্জলিষ ভিলকমেন ইন ডয়েচলান্ড” – ব্রেমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিসা অফিসার আমাকে জার্মানিতে স্বাগত জানিয়ে আমার হাতে পাসপোর্টটা ফেরত দিলেন। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই ব্রেমেন শহরের সৌন্দর্য আমার চোখে ধরা দিল।

মাসটা ছিল অক্টোবর, কলকাতার নিরিখে বেশ ঠান্ডা। থার্মোমিটারের পারদ বলছে ৮ ডিগ্রি। থাকার জায়গাটা ঠিক করে এসেছি। তাই একটু নিশ্চিন্ত। কারণ বহু আশ্রয়প্রার্থী অর্থাৎ ‘রিফিউজি’ জার্মানিতে আসার ফলে এখানে ঘর পাওয়া একটা সমস্যা।

ব্রেমেনের ট্রাম।

আশ্রয়স্থলে যাওয়ার উপায় খুঁজতে খুঁজতে ট্রামের দেখা পেলাম। জার্মানির প্রতিটি শহরে কলকাতার মতো ট্রাম চলে। ট্রামগুলো সাধারণত চার কামরার এবং প্রত্যেকটার গায়ে বিজ্ঞাপন। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে একটা ট্রামে উঠে পড়লাম।

ট্রামে করে যাওয়ার পথে  কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস নজরে এল।

ফুটপাতে লাল পথ সাইকেলের জন্য।

প্রথমত দেখলাম ফুটপাতে দু’টি রাস্তা নির্দিষ্ট করা। একটি সাদা পাথরের, অন্যটি লাল। কিছুক্ষণ ভালো করে দেখার পর বুঝলাম, লালটি হচ্ছে সাইকেল চালকদের জন্য, অন্যটি পথচারীদের। পরে দেখেছি, জার্মানির প্রায় প্রতিটি শহরে এই ব্যবস্থা রয়েছে। লক্ষ্য একটাই – পরিবেশ দূষণ কমানো।

পথচারীদের জন্য ট্রাফিকসংকেত।

ট্রাম আমায় নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছিয়ে দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর দ্বিতীয় চমকটি লক্ষ করলাম। দেখতে পেলাম, পথচারীদের জন্যও রয়েছে ট্রাফিকসংকেত। এই ট্রাফিকসংকেত যে পোস্টগুলোয় লাগানো, সেগুলোয় এক বিশেষ ধরনের যন্ত্রও লাগানো রয়েছে, যাতে হাত দিয়ে চাপ দিলে ‘সিগনাল কম্‌ট’ অর্থাৎ ‘সংকেত আসছে’ কথা ক’টি ভেসে ওঠে। ট্রাফিকসংকেতের মতোই সবুজ আলোয় রাস্তা পার হওয়ার অনুমতি।

যে বিষয়টা আমায় সব থেকে বেশি অবাক করল, তা হল যে কোনো পথচারী রাতের বেলায় ফাঁকা রাস্তাতেও এই সংকেত লঙ্ঘন করে না। সাধারণত দিনের বেলায় জরিমানার ভয়ে স্বাভাবিক ভাবেই কেউ নিয়ম ভাঙে না। তা বলে রাতেও? সত্যিই, এখানকার মানুষদের শৃঙ্খলা দেখে বিস্মিত আমি।

ব্রেমেন শহর।

প্রথম দিনের এই সব বিস্ময়কর ব্যাপার হজম হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়লাম পরের দিন দুপুরে ব্রেমেন শহরটা ঘুরে দেখার জন্য। প্রথমেই বলে রাখি, সকাল ৮টায় সূর্যোদয় দেখে একটু অবাকই হয়েছিলাম। যাই হোক, ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম এখানকার ‘ভেসার’ নদীর ধারে। এই নদীটি মূলত ‘শ্লাখটা’র জন্য বিখ্যাত। ‘শ্লাখটা’ মানে নদীর পাড়। এই পাড়ে রয়েছে নানাবিধ রেস্তোরাঁ, ছোটো ছোটো দোকানপাট। কিছু দিন পরেই তো এখানে বসবে ‘ভাইনাখট্‌সমার্ক্‌ট’ অর্থাৎ বড়োদিনের বাজার।

নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নজরে এল অসংখ্য নৌকা পাড়ে ভেড়ানো। ভালো করে দেখে বুঝলাম, এগুলো এক একটা রেস্তোরাঁ। এই ‘শ্লাখটা’ প্রাতর্ভ্রমনের জন্যও বিখ্যাত। কিছুক্ষণ ঘোরার পর কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ হল। জানতে পারলাম, মাত্র এক দিনের জন্য বাজি পোড়ানোর অনুমতি মেলে এখানে। দিনটি হল বছরের শেষ দিন, নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর দিন। এখানে সে দিন খুব ভিড় হয়। নতুন বছর আসার মুহূর্তটা উপভোগ করার জন্য শহরের মানুষজন এখানে সমবেত হন। তা হলে ৩১ ডিসেম্বর রাতে এখানে আসাটা ভোলা চলবে না। ‘শ্লাখটা’য় হাঁটাহাঁটি করে ফিরে এলাম। মনে মনে ভাবলাম, ‘এই তো সবে শুরু। এখনও তো গোটা ব্রেমেন শহরটা পড়ে’। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here