রাজার খোঁজে কানহায় / ১

0

moitryমৈত্রী মজুমদার

হঠাৎ ময়ূরের আর্ত চিৎকার শুনে জিপসির স্টার্ট বন্ধ করে দিল আমাদের ড্রাইভার কমলেশ। বান্দরি ছুপাও তালাও-এর দিকে চোখ ফেরাতেই অন্য পারে গাড়ির ঠিক কোনাকুনি দূরে দেখা গেল শব্দের উৎস। গভীর নীলরঙা ভারতের জাতীয় পাখিটি তখন তার বহুবর্ণ পেখমের কথা ভুলে উল্টো দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে বসে আছে। এপ্রিলের ৪৬-৪৯ ডিগ্রি গরমে, থমমারা জঙ্গলের পরিবেশ, ময়ূরের আর্ত চিৎকার থেমে যাওয়ার সাথে সাথে আরও যেন থমথমে হয়ে গেল।

এই ফাঁকে বলে ফেলা যাক এই আকস্মিক পরিচ্ছেদের পটভূমি।

আমার এক বান্ধবী কথা প্রসঙ্গে এক দিন তার পৈতৃক সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজে রায়পুর যাওয়ার কথা বলে। শহরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় হাঁপিয়ে ওঠা আমি আর আমার আরও এক বান্ধবী লাফিয়ে উঠি তার সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য। সময়ের অভাবে শহরবন্দি হয়ে থাকা আমাদের কাছে তখন ‘কুছ নেহি তো রায়পুর হি সহি’। যাত্রার দিন যত এগোতে থাকে, মনের আশা ততই ঊর্ধ্বমুখী। অনেক জল্পনাকল্পনা, আলাপ-আলোচনার শেষে আমাদের প্রধান গন্তব্য স্থানান্তরিত হল কানহা ন্যাশনাল পার্কে।

কানহায় প্রথম দিন দুপুরে পৌঁছনোয় বিকেলের সফারি নেওয়া হল। কিসলি রেঞ্জ। আর কোর এরিয়ায় ঢুকতে না ঢুকতেই এই কেকা রবে অভ্যর্থনা।

দুপুরে রিসর্টে ঢুকেই খবর পাওয়া গিয়েছিল এক বাঘিনীকে নাকি বাচ্চাসমেত গত দু’দিন সকালের দিকে দেখা গিয়েছে এই দিকে। তাই জঙ্গলে ঢোকা ইস্তক আমাদের চোখ কান খোলা। এই দমবন্ধ পরিবেশে স্থির হয়ে বসে থাকতে থাকতেই ফিস ফিস শব্দে আলোচনা চলছিল ময়ূরটির গতিবিধি নিয়ে। আমাদের আশঙ্কা, কিছু একটা দেখেই এ ভাবে স্থির হয়ে বসে আছে সে। আমাদের ড্রাইভার কমলেশ আর গাইড সঞ্জয় দু’জনেই এখন জিপের লোহার রডের ওপর দাঁড়িয়ে যত দূর চোখ যায় দেখার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই বার্কিং ডিয়ারের টাঁউ টাঁউ আওয়াজ শোনা গেল দূর থেকে। জঙ্গলে যাতায়াত-থাকা পর্যটক মাত্রই জানেন বার্কিং ডিয়ারের ডাক মানেই ‘কিং ইজ নিয়ার’।

ইতিমধ্যে আরও দু’-একটি জিপ আমাদের থেকে খবর নিয়ে এ-দিক ও-দিক গিয়েছে। জঙ্গলে এরা নিজেদের মধ্যে খুবই কোঅর্ডিনেশনে কাজ করে। যাতে এক সময়ে একই রেঞ্জে কোনও পর্যটক কিছু মিস না করে। বিশেষত বাঘ, যা দেখতে এখানে আসা।

বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা একটু দূর থেকে আসায় আমাদের জিপও অনেকক্ষণ পর সচল হল। কমলেশ বলল, হয়তো আশাপাশের কোনও পাকদণ্ডী দিয়ে ঘোরাফেরা করছেন তিনি, তাই এ বারে গাড়ি স্থির হল জামুন তালাও-এর পাশে। দূরে একটা নালাও দেখা যাচ্ছে। গরমের দিনে বিকেলে জন্তুরা জল খেতে আসে, তাই সবগুলো তালাও আর নালার আশেপাশে আমাদের ঘোরাফেরা। আবার বাচ্চা-সহ বাঘিনী বেশি নড়াচড়া পছন্দ করে না। তাই আশায় বুক বেঁধে জিপবন্দি হয়ে অনভ্যস্ত চোখে জঙ্গলে নজরদারি চালাতে থাকি।

নাহ্‌। দেখা নেই কোনও কিছুর। একটা বনমুরগি থেকে থেকে ডাকছে। কিন্তু পাখি, বাঁদর এমনকী হনুমানেরও দেখা নেই। মনে মনে এই জীবনে পড়ে থাকা যাবতীয় জঙ্গলের কাহিনি, ভ্রমণকাহিনির পাতা ওল্টাতে থাকি। হ্যাঁ! সত্যিই তো, বনের রাজা আশেপাশে থাকলে অন্য কেউ টুঁ-টা করে না। তার মানে ১০০ শতাংশ আশা আছে। যেই ভাবা, ওমনি টাঁউ! টাঁউ! শব্দ। এক বার ! দুবার! আবার, আবার।

আছে আছ, আমাদেরও টেলিপ্যাথির জোর আছে।kanha 1b

ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আওয়াজটা আসায় জিপওয়ালারা অন্য অন্য দিকে পজিশন নিয়েছিল। আবার ঘুরে ঘুরে আসছিল তালাওয়ের দিকে। নাহ্, এখনও কিছু নেই। খবর পাওয়া গেল বড় রাস্তার কাছে এই বাঘিনীর সঙ্গীকে নাকি এ দিকেই আসতে দেখা গিয়েছে। আমাদের ড্রাইভার কিন্তু অত্যন্ত কনফিডেন্ট। সে এ বার জিপ ঘোরালো বান্দরি ছুপাও তালাও-এর দিকে।

পথের বাঁক ঘুরতেই সেই কোনও দিন না-দেখা, অভূতপূর্ব, অবর্ণনীয়, রোমহর্ষক, অতুলনীয় দৃশ্য!

বান্দরি ছুপাও তালাও-এর উল্টো পাড়ে, জলে গা ডুবিয়ে দিনের ক্লান্তি দূর করছেন স্বয়ং গৃহকর্ত্রী (বাঘিনী) আর পাড়ের উঁচু জায়গায় বাচ্চাদু’টো খুনসুটিতে মত্ত। না, যতটা বাচ্চা ভেবেছিলাম, ততটা বাচ্চা তারা নয়। পূর্ণাঙ্গ হওয়ার জন্য বেশি দিন বাকি নেই তাদের। আর মা-ও মাঝবয়সি। ভারী-সারি মানুষ (পড়ুন বাঘ)। তাই বাচ্চারা মায়ের ধাতই পেয়েছে।

 

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন