wrivuশ্রয়ণ সেন

সাত বছর আগের সঙ্গে কিছুতেই ছবিটা মেলাতে পারছিলাম না। জায়গাটা যে এত বিশাল সেটা ধারণাই হয়নি তখন। অবশ্য তখন জায়গাটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়ার থেকে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রকৃতি। প্রবল বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া আর কুয়াশা আমাদের গাড়ি থেকে নামতেই দেয়নি।

এ বার অবশ্য সে রকম কোনো বাধা নেই। হেঁটে চলেছি। যতদূর চোখ যায় দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেল। সমুদ্রতল থেকে সাড়ে ৪ হাজার ফুট ওপরে এত বিশাল মাঠ ভাবা যায় না, পঞ্চগণির টেবলল্যান্ডে।

সহ্যাদ্রী পাহাড়ে মহারাষ্ট্রের দুই যমজ শৈল শহর পঞ্চগণি আর মহাবালেশ্বর। সাত বছর আগে এখানে পা পড়েছিল আমাদের। তিন দিন থাকলেও বৃষ্টির প্রভাবে প্রায় পুরো ভ্রমণটাই মাটি হয়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি কিছুটা রোমন্থন করতে সক্কালে রওনা হয়েছি পুনে থেকে।

শহর থেকে বেঙ্গালুরু সড়ক ধরে সাতারার দিকে এগিয়ে চললাম। পথ কখনও পাহাড়ি কখনও বা সমতল। পুনে থেকে ৭৫ কিমি দূরে সুরুর। এখান থেকে জাতীয় সড়ক ছেড়ে ডান দিকে মহাবালেশ্বরের রাস্তা ধরলাম। বারো কিলোমিটার চলার পর এল ওয়াই। দার্জিলিঙের যেমন শিলিগুড়ি, পঞ্চগনি-মহাবালেশ্বরের তেমন ওয়াই। অর্থাৎ, এখান থেকেই ঘাট রাস্তা শুরু। কিন্তু ওয়াই শহরেরও নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে।

কৃষ্ণা নদীর দু-পাড়ে প্রায় শ’খানেক মন্দির রয়েছে এই শহরে, যার মধ্যে অন্যতম ধোল্য গণপতি বা মহাগণপতি মন্দির। স্থানীয়দের কাছে ওয়াই পরিচিত ‘দক্ষিণের কাশী’ হিসেবে। কিছুক্ষণ এই ওয়াইয়ে কাটিয়ে ফের পথ চলা শুরু। রাস্তা এ বার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। উঠে পড়েছি পাহাড়ের কোলে। পথ চলেছে এঁকে বেকে। মনে পড়ল সাত বছর আগের কথা। তখন অবশ্য কুয়াশার জন্য রাস্তাটা উপভোগই করতে পারিনি।

panch-1
পঞ্চগনির টেবলল্যান্ডে।

পৌঁছোলাম পঞ্চগনি। ওয়াই থেকে ১৪ কিমি। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা ৪,৩০০ ফুট। আমাদের এ বার গন্তব্য অবশ্য টেবলল্যান্ড। পঞ্চগনি শহরের কেন্দ্রস্থল শিবাজি চক। এখান থেকে বাঁ দিকের রাস্তা উঠে গিয়েছে টেবিল ল্যান্ডের দিকে। প্রায় দেড় কিমি খাড়াই পথ অতিক্রম করে এসে পৌঁছোলাম টেবলল্যান্ডে। একেই বছরের শেষ দিন, অন্য দিকে সমুদ্রতল থেকে এত উচ্চতা, তবুও বোঝার কোনো উপায়ই নেই। গাড়ি থেকে নামতেই গনগনে রোদ ছেঁকে ধরল।   

‘পঞ্চগনি’ নামের অর্থ পাঁচ পাহাড়। পাঁচ পাহাড়ে ঘেরা এই শহর। তাদের চূড়াগুলো সব এক হয়ে সমতল জমিতে পরিণত হয়েছে। তৈরি হয়েছে এই টেবলল্যান্ড। টিবেটান মালভূমির পরে এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম সমতলভূমি এই টেবিল ল্যান্ড। প্রায় ছ’কিমি দীর্ঘ। এখান থেকে পঞ্চগনি শহর এমনকি ওয়াই শহরও সুন্দর দেখায়। একটু এগোলে দেখা যায় মহাবালেশ্বর থেকে নেমে আসে কৃষ্ণা নদীকেও। হাতে সময় কম, তাই টেবলল্যান্ডের মায়া ত্যাগ করে পরবর্তী পয়েন্টের পথে পাড়ি দিলাম।

এলাম পার্সি পয়েন্ট। টেবলল্যান্ড যদি পঞ্চগনির শ্রেষ্ঠতম স্থান হয়, তা হলে এই পার্সি পয়েন্ট দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম জায়গা। শিবাজি চক থেকে মহাবালেশ্বরের দিকে ২ কিমি গেলে ডান দিকে পড়বে এই পয়েন্ট। এই জায়গাটির মাহাত্ম্য কৃষ্ণা-দর্শনের জন্য। মহাবালেশ্বর থেকে উৎপত্তি হওয়ার পর এখানেই প্রথম দর্শন দেয় কৃষ্ণা। তবে প্রথম দেখা দেখলে নদী নয়, মূলত লেক মনে হবে। আসলে নীচে রয়েছে একটি জলাধার যার ফলে কৃষ্ণাকে ওরকম লাগে।

panch-3
পার্সি পয়েন্ট থেকে কৃষ্ণা নদী।

পঞ্চগনির আরও কিছু দর্শনীয় স্থান আগের বার দেখেছিলাম, যার মধ্যে অন্যতম ছিল রাজাপুরী গুহা। তবে এ বার হাতে সময় খুব অল্প থাকায় সে দিকে না গিয়ে মহাবালেশ্বরের এগোন গেল।

মহাবালেশ্বর। মহারাষ্ট্রের উচ্চতম শৈল শহর। উচ্চতা ৪,৭০০ ফুট। শহরের প্রাণকেন্দ্রের কিছুটা আগেই বিনা লেক। বলা যায় নৈনিতাল, উটি, কোদাইকানালের মতোই এই শহরকেও আলো করে রেখেছে এই হ্রদ। টলটলে জলের ধারে কিছুক্ষণ সময় কাটানো গেল। বছরের শেষ দিন, পর্যটকদের ভিড়ে উপচে পড়ছে হ্রদের আশপাশে। বোটিং-এর জন্য হুড়োহুড়ি যুবক-যুবতীদের মধ্যে। নৌকাবিহারের আশা ছিল, কিন্তু ভিড়ের পাল্লায় সে আশায় জল ঢেলেই উঠে পড়লাম গাড়িতে।

মহাবালেশ্বরের দর্শনীয় স্থান অনেক। ক্ষণিকের আগমনে সে সব জায়গা দর্শন করা সম্ভব নয়, তবে যেটা না দেখলেই নয় সেটা পঞ্চগঙ্গা মন্দির। মহাবালেশ্বরের প্রাণকেন্দ্র থেকে সাত কিমি দূরে অবস্থিত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পুরনো এই মন্দির। দক্ষিণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নদী কৃষ্ণার উৎপত্তি এই মন্দির থেকেই। কৃষ্ণার সঙ্গে আরও চারটি নদী বেরোচ্ছে এই মন্দিরের মধ্যে থেকে–কয়না, গায়ত্রী, সাবিত্রী আর ভেনা।

বিকেল হয়ে আসছে, এ বার রওনা না হলে পুনে পৌঁছোতে অনেক রাত হয়ে যাবে। সত্যি কথা বলতে এ বারও মহাবালেশ্বর-পঞ্চগনি ভ্রমণে অপূর্ণতা থেকে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিল, পাহাড়ের কোলে অস্ত গেল বছরের শেষ সূর্য।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে দ্বিসাপ্তাহিক দুরন্ত এক্সপ্রেস বা দৈনিক আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে পৌছোন পুনে। এ ছাড়া দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, মুম্বই থেকে নিয়মিত ট্রেন রয়েছে পুনের উদ্দেশে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকেই বিমানযোগ রয়েছে পুনের। পুনে থেকে পঞ্চগনি ৯৮ আর মহাবালেশ্বর ১২০ কিমি। পুনে থেকে বাস বা গাড়িতে যেতে পারেন পঞ্চগনি আর মহাবালেশ্বর। মুম্বই, বেঙ্গালুরু বা দিল্লি থেকে ট্রেনে সাতারা পৌঁছে সেখান থেকে মহাবালেশ্বর আসতে পারেন। সাতারা থেকে মহাবালেশ্বর ৫২ কিমি, পঞ্চগনি ৭২ কিমি।

কোথায় থাকবেন

রাত্রিবাসের জন্য মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হলিডে রিসোর্ট রয়েছে মহাবালেশ্বরে। অনলাইনে বুক করতে পারেন  mtdcrrs.maharashtratourism.gov.in। এ ছাড়াও পঞ্চগনি আর মহাবালেশ্বরে রয়েছে বিভিন্ন দামের অসংখ্য বেসরকারি হোটেল।   

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here