শেষ প্রয়াগ বিষ্ণুপ্রয়াগ। সামনে থেকে সোজা আসছে ধৌলীগঙ্গা আর বাম দিক থেকে অলকানন্দা।

শ্যামল বৈরাগী

ট্রেন কখনও বেশি লেট, কখনও বা কম লেট। এই করতে করতে ভোর সাড়ে পাঁচটায় হরিদ্বার। স্যাক ট্যাক নিয়ে সবাই নেমে দেখি মহারাজ দাঁত বের করতে করতে এগিয়ে আসছেন। দেখি দেখি আমি নিচ্ছি, বলে এসে নিজের স্যাকটা পিঠে তুলে ছেলেকে পাশে টেনে নিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে হাঁটা দিল।

আমি যেন ফালতু! তোর জন্য জিনিসপত্র আলাদা করে গুছিয়ে এত দূর সামলে নিয়ে এলাম, তার জন্যও কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ নেই? দশ মাস বাদে দেখা, একটু ভালোবাসার চাউনি তো দিবি! কী আর করা!

স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডান দিকে সোজা হাঁটা। বাঁ দিকে প্রথমেই বাস আড্ডা, মানে বাস স্ট্যান্ড। বাস যাচ্ছে উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। এর পরে বাজার চত্বর ছাড়িয়ে রেল চত্বর ফেলে বেশ কিছুটা এগিয়ে মহারাজা অগ্রসেন চক।

মহারাজা অগ্রসেন চক।

রাস্তার মাঝখানে দু’পাশে দু’টো সিংহকে নিয়ে মাথার ওপর ছাতাওলা সিংহাসনে বসে অগ্রসেন। মাথায় মুকুট, হাতে তলোয়ার। কী ভাগ্যিস, ব্রোঞ্জের মূর্তি, উঠে দাঁড়ায় না! দাঁড়ালেই ছাতার ভেতরে মাথা ঠুকে যেত।

ভারত সেবাশ্রম সংঘ, হরিদ্বার।

অগ্রসেন চক ছাড়িয়ে আরও খানিকটা গেলে ডান দিকে ভারত সেবাশ্রম সংঘ। সামনে বাগান, সোজা গিয়ে মূল ভবনের তোরণ। সেটা পেরিয়ে সামনে বিরাট উঠোন। বাঁ দিকে অফিস। সামনে সোজা মন্দির। আর তার ডান দিক দিয়ে গিয়ে আমাদের ঘর। থাকা হবে না, ওই ফ্রেশ হতে আর ব্রেকফাস্ট করতে যে সময় লাগে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মুণ্ডুটা ঘুরিয়ে বলল, “এখানে শুধু ফ্রেশ হবার জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। তাই দু’টো ঘর নিতে হয়েছে। আটটায় গাড়ি বলা আছে। তার মধ্যে রেডি হতে হবে।” হ্যাঁ, এইটুকু কাজের জন্য উনি ২০০ টাকা দিয়ে ঘর বুক করে রেখে কেতাত্থ করেছেন, অতএব সবাই মিলে ওকে সাধুবাদ জানাও।

ঘরে ঢুকে ছেলেকে ব্রাশ মাজন গামছা দিয়ে বললাম, তুই আগে করে নে। ও বাথরুমে ঢুকতে এ বার এর দিকে তাকিয়ে দেখি, মুখে একটা শয়তানি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দশ মাস বাদে দেখা, ট্রেন থেকে নামার পর থেকে এখনও পর্যন্ত একটা কথা বলেনি, তা-ও কিনা এই ছ’ দিনের ট্যুর শেষ হয়ে গেলে এখান থেকেই আবার ফিরে যাবে আহমেদাবাদে, গামছা বুনতে। গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। মনে হল, ঠাটিয়ে মারি একটা চড়। নিজেকে আটকালাম। মনে হল শয়তানি হাসিতে কোথায় যেন আদর-মাখা।

ও নাকি কাল বোলেরো বুক করেছিল, টাটা সুমো পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই নিয়ে ফোনে এক প্রস্থ ঝামেলা হল। জাতীয় সড়ক ৭ বরাবর হরিদ্বার থেকে গোবিন্দঘাট শ’ তিনেক কিলোমিটার পথ, গাড়িতে লাগে ৯ ঘণ্টা। শহর ছাড়িয়ে প্রথমেই তরাই অঞ্চলের জঙ্গল রাজাজি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে হৃষীকেশ। ঘোলা জলের গঙ্গাকে ডান দিকে রেখে চলতে থাকো। এখন বর্ষাকাল। মেঘলা আকাশে কখনও বৃষ্টি, কখনও রোদ। গরমও বেজায়।

দেবপ্রয়াগ। 

এই রাস্তায় পাঁচটা প্রয়াগ। প্রথমে দেবপ্রয়াগ। গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে গঙ্গা এসে এখানে ভাগীরথী খড়গ আর শতপন্থ হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে। গঙ্গাকে ছেড়ে আমরা এগোচ্ছি অলকানন্দাকে সঙ্গী করে।

এ রকম ক্যান্টিলিভার ব্রিজ শুধু হৃষীকেশেই নয়, সারা হিমালয় জুড়ে ছড়িয়ে আছে।

এলাম শ্রীনগর। কাশ্মীরের শ্রীনগর নয়, এটা উত্তরাখণ্ডের শ্রীনগর। বেশ বড়ো জায়গা। এর আগেই কীর্তিনগরে অলকানন্দাকে পেরিয়ে ডান দিকে চলে এসেছি। এখন থেকে বাকি  রাস্তাটাই সে থাকবে আমাদের বাঁ দিকে।

এ বার রুদ্রপ্রয়াগ। কেদার থেকে অপরূপা মন্দাকিনী নেমে এসে এখানে মিশেছে অলকানন্দায়। মন্দাকিনীকে কেন অপরূপা বললাম? তার পান্না রঙের জলস্রোত আর তার সাদা ফেনার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা যে আমার নেই। ২০১৩-তে এই মন্দাকিনীই ফেটে পড়েছিল। সব ভাসিয়ে দেওয়ার চিহ্ন এখনও অনেক জায়গায় রয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারে বারে মনে ঘুরছে, কোনো নদীরই সেই মোহিনী রূপ দেখছি না কেন। সবাই কেমন যেন ঘোলাটে। ড্রাইভার বলল, এটা চারিদিকে ধস নামার ফল। বর্ষা কেটে গেলেই আবার সবাই স্বমহিমায় ফিরে যাবে।

এর পর কর্ণপ্রয়াগ। পিন্ডারি গ্লেসিয়ার থেকে পিন্ডার গঙ্গা এসে অলকানন্দায় মিশেছে।

পরেরটা নন্দপ্রয়াগ। নন্দাদেবী থেকে বয়ে আসছে নন্দাকিনী। আর সব শেষে বিষ্ণুপ্রয়াগে ধৌলীগঙ্গা। সকলেরই অবগাহন অলকানন্দায়। 

লেডিস পর্বত, জোশীমঠ । কেন এই নাম জানি না, ওখানের লোকজন এই নামই বললো।

ইতিমধ্যে শেষ শহর জোশীমঠ পেরিয়ে এসেছি। শীতকালে বদ্রীনাথের মন্দির বন্ধ থাকে। তখন বদ্রীনাথকে এই জোসীমঠে নামিয়ে এনে পুজো করা হয়। সারা দিন ধরে পাহাড়ে উঠছি।

রাস্তার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঝরনার জল। আর তাতে স্নান করা।

প্রায় ৬০০০ ফুটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, অথচ ঠান্ডার ঠ-ও নেই। জনমানসে অসন্তোষ জমছে। এর থেকে নাকি জয়সলমীর (আসলে জৈসলমের) গেলে ভালো ছিল। যত বলছি, সন্ধেটা হতে দে আগে, সুজ্জি পাটে গেলেই ঠান্ডা পড়বে। কে শোনে কার কথা! ‘ডক’ (আমার সাইকিয়াট্রিস্ট, ওকে আমি ডক বলে ডাকি ) তো বলেই ফেলল, রাতেও ঠান্ডা না পড়লে ও গরমের যা কিছু এনেছে সব আমাকে পরিয়ে দেবে।

গোবিন্দঘাটের পথে…. হঠাৎ দেখা…।

অবশেষে গোবিন্দঘাট। গা গতর ব্যথা হয়ে গেছে। টাটা সুমো সাড়ে ছ’ হাজার বুঝে নিল। আমরা যে যার স্যাক পিঠে নিয়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে প্রায়ান্ধকারে নেমে চললাম গুরুদ্বারের দিকে।

গোবিন্দঘাট …পসার নিয়ে দোকানি।

মোটামুটি ৫০০ ফুট দূরে গুরুদ্বারের কাছে আবার আলোর রোশনাই, দোকানপাট রয়েছে, সবই মেলে এখানে – মেয়েদের যাবতীয় গয়নাগাটি থেকে শুরু করে শিখদের বালা, কুকরি, তলোয়ার, পাহাড়ে চড়ার সব রকম সামগ্রী, ঘর গেরস্থালির সব কিছু। গুরুদ্বারে ঢুকতে হলে মাথায় ঢাকা দিতে হয়, পাগড়ি, টুপি, ওড়না, রুমাল, নিদেন  পক্ষে গামছা দিয়ে। প্রধান ফটকের দু’ দিকে বিশালদেহী দুই বল্লমধারী দাঁড়িয়ে। দুরুদুরু বুকে তাঁদেরই জিজ্ঞেস করলাম থাকার জায়গা পাওয়া যাবে কি না। বড়ো মোলায়েম ভাবে তাঁরা বল্লমের ডগা দিয়ে রিসেপশনের জানলাটা দেখিয়ে দিলেন। পাগড়ি-পরা এক রিসেপশনিস্ট আইডি কার্ড চেক করে কোত্থেকে এসেছি, কত জন আছি, কত দিন থাকব, কোথায় যাব, এই সব জেনে নিয়ে প্রশ্ন করলেন, কত জন এসেছেন কলকাতা থেকে?

– মানে? কী জানতে চান, সারা দিনে কলকাতা থেকে কত জন এসেছেন? বোঝো ঠ্যালা, আমি কি সারা কলকাতার ঠিকে নিয়ে বসে আছি! তবে এটুকু বুঝলাম, আপাতত এখানে শিখ পুণ্যার্থীদের থেকে কষ্টলোভী বাঙালির সংখ্যা বেশি। 

এ বার এগিয়ে এলেন আর এক বিশালদেহী ততোধিক ক্ষুদ্র এক চাবি নিয়ে। উলটো দিকের বাড়িতে থাকার ঘর দেখিয়ে দিলেন। বেশ বড়ো ঘর, অ্যাটাচড্‌ বাথ। বিছানাটা শুধু মেঝেতে। মোটা গদি, ফরসা চাদর, বালিশ, মোটা নরম কম্বল। আহা, আর কী চাই? বিশালদেহীর কাছে আমার হিন্দিতে এখানকার নিয়মাবলি জানতে চাইলাম। মানে কখন খাবার পাওয়া যায়, কখন গেট বন্ধ হয় ইত্যাদি। উত্তর পেলাম, খাবার, চা এবং খোলা গেট ২৪ ঘন্টাই অ্যাভেলেবল্‌ এবং সবটাই ফ্রি। হ্যাঁ, সারা দিনে যখন খুশি যত বার খুশি লঙ্গরখানায় চলে গেলেই হল। সারা দিনের ধকলের পর গোবিন্দঘাটের আতিথেয়তা মনটা ভরিয়ে দিল।

ঠান্ডা তেমন নেই। তবে জলটা একটু ঠান্ডা। তা হোক, স্নান সেরে ফিটফাট হয়ে বেরোলাম, গ্রন্থসাহিব দেখে আসি। ঢাল বেয়ে গুরুদ্বারের দোতলায় উঠে সামনেই পায়ের পাতা ভেজানোর জন্য জলের বাচ্চা চৌবাচ্চা, নেমে পড়ো তাতে। পা ধুয়ে চৌবাচ্চার অপর পাড় দিয়ে উঠলেই গ্রন্থসাহিব-এর ঘর। আমার কপাল, বদ্ধ ঘরের ঈশ্বরেরা চিরকাল আমাকে ত্যাজ্য করে রেখেছেন। আজও করলেন। দরজা বন্ধ। ফিরে আসছিলাম। আর এক বিশালদেহী পথ আটকালেন, দরজা বন্ধ তো কী হয়েছে, ঈশ্বরের প্রসাদ তো নিয়ে যাও। হাতভর্তি হালুয়া মিলল। অপূর্ব স্বাদ। ভোরবেলা এসো, দরজা খোলা পাবে। আর যাওয়া হয়নি ভোরবেলায়। হালুয়ার লোভেও না।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে পাহাড়ে।

ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কখনও জোরে, কখনও আস্তে। খেয়েদেয়ে ঘরে ফিরে কালকের জন্য জুতো, পোশাক, বর্ষাতি রেডি করে সোজা কম্বলের তলায়। সকালে যত তাড়াতাড়ি বেরোতে পারব, ততই ভালো। (চলবে)

কী ভাবে যাবেন

ভারতের সব বড়ো শহর থেকেই ট্রেনে হরিদ্বার আসা যায়। হাওড়া থেকে দুন এক্সপ্রেস (রোজ), কুম্ভ এক্সপ্রেস (মঙ্গল ও শুক্র বাদে) এবং উপাসনা এক্সপ্রেস (মঙ্গল ও শুক্র)। ট্রেনে দিল্লি এসে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতেও হরিদ্বার আসা যায়। দিল্লি থেকে হরিদ্বারের দূরত্ব ২২২ কিমি। হরিদ্বার থেকে বাসে বা গাড়িতে গোবিন্দঘাট, দূরত্ব ২৯১ কিমি।

কোথায় থাকবেন

গোবিন্দঘাটে থাকার সব চেয়ে ভালো জায়গা গুরুদ্বার। এ ছাড়া গুরুদ্বারের আশেপাশে রয়েছে কয়েকটি বেসরকারি হোটেল।

ছবি : লেখক      

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here