শ্যামল বৈরাগী:

এখনও অন্ধকার। বাইরে জোর বৃষ্টি। লঙ্গরখানায় চা খেতে গিয়ে দেখলাম, পাশে লক্ষ্মণগঙ্গায় জলের তোড় বেশ। চারিদিক মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অবশেষে বৃষ্টি যখন কমল, দিনের আলো ফুটেছে।

মেঘ আর বৃষ্টির সঙ্গে নীচে ছেড়ে এলাম গোবিন্দঘাট। আর সেই সঙ্গে অলকানন্দাকে।

গোবিন্দঘাট ৬০০০ ফুট, আর আমাদের ১৩ কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছোতে হবে ঘাংঘারিয়া, ১০০০০ ফুটে। এমন কিছু চড়াই নয়, হাতেও আছে সারা দিন। আমার দায়িত্ব পড়ল ‘লাস্ট পার্সন কভার’ করার। অর্থাৎ আমাকে পৌঁছোতে হবে সবার শেষে। সবাই ঠিকঠাক পৌঁছোনোর পর।

গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া অবশ্য ২০ মিনিটেও পৌঁছোনো যায়। হেলিকপ্টারে। আছে ‘ঘোড়ে’ বা খচ্চরও। ব্যাটাদের নামের সঙ্গে কাজের খুব মিল। হেলতে দুলতে কখনও যায় একেবারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে, মনে হবে এই বুঝি ঠোক্কর লাগল, আবার কখনও যাবে খাদের ধার দিয়ে, তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

খচ্চরের পিঠে চাপতে পারো, কিন্তু এ রকম জিব বেরিয়ে গেলে কিছু বোলো না যেন।

আর আছে ডুলি। মানুষের পিঠে চেপে চলো। চা বাগানের কুলিরা যেমন পিঠে ঝোড়া বাঁধে, সেই রকম এক দিক কাটা ঝোড়াতে পুরে আষ্টেপিষ্টে দাড়ি দিয়ে বেঁধে দেবে, যাতে নড়াচাড়ায় তার ব্যাল্যান্স নষ্ট না হয়। বসে বসে শুধু আকাশ দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবে গন্তব্যে।

আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে পাথর ভাঙা…. ব্রিজ তৈরি হবে যে।

পিঠে স্যাক নিয়ে মাথায় একটা বড়ো রুমাল বেঁধে ক্যাপটা পরে নিলাম। সবার ওপরে প্লাস্টিকের টোকা একদম পা পর্যন্ত ঝুলছে। গোবিন্দঘাট ছাড়িয়ে পুলনা এলাম। ৩ কিলোমিটার। গাড়িও আসে। এটাই এই পথের শেষ গ্রাম। উন্নয়নের বান ডেকেছে এই পুলনায়। এখানে কিছু একটা প্রজেক্ট তৈরি হচ্ছে। জানি না পুলনা আর কত দিন তার স্বাভাবিক পাহাড়ি সৌন্দর্য নিয়ে টিকে থাকবে!

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে…

চারিদিক মেঘে ভরে আছে, বৃষ্টি পড়েই চলেছে টিপটিপ করে। দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে না, কাছেরগুলোও ঝাপসা। নদীর ও-পারের পাহাড় থেকে অজস্র ঝর্ণা নেমে আসছে। তবে চলতে অসুবিধে নেই। প্রবল বেগে বয়ে চলা লক্ষ্মণগঙ্গাকে ডান দিকে রেখে হেসে খেলে গান গেয়ে এগিয়ে চলি। পরিষ্কার বাঁধানো পায়ে চলা রাস্তা। সাইডে রেলিং, কিছু দূর অন্তর বসার বেঞ্চিও। কোথাও আবার মাথার ওপর শেড। আর কী চাই? তার ওপরে এ বারে স্লিপিং ব্যাগ, ম্যাট্ট্রেস, আর টেন্ট বইতে হচ্ছে না। তাই স্যাকের ওজনও কম।

মাঝে মাঝে রয়েছে খাবারের দোকান, কোনো কোনো দোকানে মিলছে কলা, আপেল, শশা। আপেলগুলো ছোটো ছোটো, গায়ে ছোপ। কিন্তু খেতে অপূর্ব। আর শশা না লাউ! ইয়া বড়ো বড়ো, ভেতরে বীজগুলোও বড়ো বড়ো। কিংবা খাওয়া যায় ছোলা ভিজোনো, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচালঙ্কা, লেবু দিয়ে মাখা। কয়েকটা দোকানে চা, কফি, বিস্কুট, ম্যাগিও পাওয়া যাচ্ছে। তবে দামটা বেশি। জলের বোতল, কোল্ড ড্রিংক্সও মেলে। এমনকি কফিও, যদিও এক কাপ বা গেলাস ৪০ থেকে ৫০ টাকা। ১টা কিনে দু’ জনে ভাগ করে খান না! কেউ কিছু মনে করবে না।

বিন্দু বিন্দু…

রাস্তা ক্রমাগত ওপরে উঠছে। প্রথম দিন সকলেরই একটু বাবারে-মারে অবস্থা হয়। মাঝে মাঝে পথ কোথাও একটু নামে তো আবার ওঠে। ও দিকে খেয়াল করতে নেই। প্রকৃতি দেখো, কত রকমের গাছ, কত পাহাড়ি ফুল, কোথাও রাস্তার ওপর দিয়েই ঝর্ণা বয়ে চলে যাচ্ছে।

ঠিক যেন জুরাসিক পার্ক-এর ভেতর ঢুকে পড়েছি। এক্ষুনি পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে আর্কিঅপটেরিক্স গুলো উড়ে আসবে।

এখন মেঘলা বলে প্রজাপতি আর পাখি দেখা যাচ্ছে না, যেটা ফেরার দিনে ঝকঝকে রোদের আলোয় পেয়েছিলাম প্রচুর। একই পথ, দু’ রকম চেহারা। সে দিন ঝর্ণাগুলোও ঝিমিয়ে পড়েছিল।

আট কিলোমিটার যাওয়ার পর লক্ষ্মণগঙ্গার ওপর ছোটো ব্রিজ।

এই ভাবে আট কিলোমিটার চলে এলাম। ছোট্টো ব্রিজ পেরিয়ে লক্ষ্মণগঙ্গার ডান দিকে চলে গেলাম। দুরন্ত স্রোত ঘোলা জলের। একবার পড়লে একেবারে নিশ্চিহ্ন। বোঝাই যাচ্ছে ওপর দিকে প্রচুর ধস নেমেছে, তাই জল এত ঘোলা। ইতিমধ্যেই কয়েক জন  বেশ কাহিল, আবার কয়েক জন রীতিমতো ফিট। আমার অবস্থা মোটামুটি, চলছে, চলবে। তবে ছোটোদের কোনো ক্লান্তি নেই। সবাইকে গ্লুকোজ আর খাবার খাইয়ে চাঙ্গা করে আবার এগোই। সবার কাছেই ড্রাই খেজুর, আমসত্ব, কাজু, কিসমিস, আমণ্ড, বিস্কুট ইত্যাদি আছে হাঁটতে হাঁটতে খাওয়ার জন্য। ইন্সট্যান্ট ক্যালোরি।

পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে আছে কতই না অজানা জীবনকথা।

বাকি মাত্র ৫ কিলোমিটার, কিন্তু এই পথটুকুই ফাটানো চড়াই। ব্রিজ পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতর একটু যাওয়ার পরেই হঠাৎ ক্রাক-কড়-কড়-কড়-কড়। এক লাফে পাথরের খাঁজে চলে এলাম। ধস নামছে। পর মুহূর্তেই বুঝলাম, আমরা সত্যিই সেফ, ধসটা নামছে উলটো দিকের পাহাড়ে, অর্থাৎ যে দিকে এতক্ষণ ছিলাম।

আর একটু এগোতেই দেখলাম ডান দিকের পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র জলস্রোত রাস্তার ওপর দিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাঁ দিকের খাদে। অনেকে অনেক রকম কসরত করছে, জুতো না ভিজিয়ে পেরিয়ে যাওয়ার জন্য। ধুত্তোর, এমনিতেই ভিজে গেছি পুরো, এ আর নতুন কী ভেজাবে, সবসুদ্দু হেঁটে পেরিয়ে গেলাম।

আরও পড়ুন: হেমকুণ্ড ছুঁয়ে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স ১/ গোবিন্দঘাটের আতিথেয়তায়

কিন্তু রাস্তা যেন আর শেষ হয় না। এদের ১৩ কিলোমিটার যে কততে হয় কে জানে! মনে হচ্ছে বিশ-বাইশ কিলোমিটার পেরিয়ে এসেছি। প্রায় ৭ ঘণ্টা হল হাঁটছি। আর কতদূর? রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস করা বৃথা। সবাই বলে আর একটুখানি, এই তো চলে এসেছেন, পৌঁছে গেছেন প্রায়। আমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করলে আমিও একই কথা বলছি। প্রকৃতি দেখা লাটে উঠেছে, এখন পৌঁছোতে পারলে বাঁচি। অবশেষে এই পথের শেষ দোকানদার বলল আর ২ কিলোমিটার, আপনাদের ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। এ-খ-ন-ও ২-কি-লো-মি-টা-র ?

অবশেষে ঘাংঘারিয়া ০ কিলোমিটার।

এই রাস্তাটুকুও শেষ হল এক সময়। ফলক দেখলাম ঘাংঘারিয়া ০ কিলোমিটার। এক উন্মুক্ত প্রান্তরে হেলিপ্যাড। তার পাশেই টেন্ট অ্যাকোমোডেশন। ইচ্ছে করলে টেন্টে থাকতে পারো। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য আবার সেই গুরুদ্বার, সেই চা, সেই হালুয়া। আহা সব ফ্রী!  

গুরুদ্বারে পৌঁছোলাম। ঘাংঘারিয়ার একদম শেষ প্রান্তে। আমাকে দেখে বাপ-ছেলেতে ছুটে এল, পিঠের স্যাকটা রিলিজ করে দিলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সবাই পৌঁছেছে, তবে কিছু একটা অসুবিধে হচ্ছে।

আমার অত শোনার সময় নেই। আগে চেঞ্জ করব, তার পর সব শুনছি। গুরুদ্বারে ২৪ ঘণ্টা গরম জল মেলে। হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকেই মাথাটা গরম হয়ে গেল, আর অসুবিধেটাও বুঝতে পারলাম। ঘর পায়নি, একটা অন্ধকূপ ডর্মেটরি মিলেছে। পুরো ঘর জুড়ে লোহার বাঙ্ক। এক একটা বাঙ্কে ৪ জন শোবে। এই ভাবে অন্তত ১০০ জনের ব্যবস্থা।

এই ভাবে থাকা যায় নাকি? এতগুলো লোকের সঙ্গে এই ভাবে এত জিনিসপত্র নিয়ে, কোনো প্রাইভেসি নেই। উত্তর পেলাম, একটা উপায় হতে পারে, সেটা এই গুরুদ্বারের লোকেরাই বলেছে, বাইরে কাছাকাছি অনেক হোটেল আছে, মোটামুটি রিজনেবল রেটে পাওয়া যাবে।

অন্তত ঘণ্টা দেড়-দুয়েক আগে এরা এখানে পৌঁছেছে, অথচ ২৫০ মিটার দীর্ঘ ঘাংঘারিয়াতে এই খোঁজটা নিতে পারেনি। আমার মাথা থেকে তখনও টপটপ করে জল পড়ছে। মুখের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে তক্ষুনি ছুটে বেরিয়ে গেল হোটেলের খোঁজে।

ভালো করে শুকনো হয়ে সকলের দিকে মন দিলাম। সকলেই বেশ কাহিল, কেউ বিছানায় কুঁজো হয়ে কম্বল জড়িয়ে বসে আছে (সোজা হয়ে বসলে ওপরের বাঙ্ক-এ মাথা ঠেকে যাবে)। কারও পায়ের শিরায় টান, তো কারওর মাথার শিরায়।

সবাইকে বললাম, আগে ২ ফোঁটা করে আর্নিকা খেয়ে নিতে। তার অন্তত ১০ মিনিট পর ২ ফোঁটা কোকা। আর অন্তত আধ ঘণ্টা যেন কেউ বিড়ি-সিগারেট না ধরায়। আর সবাই যেন যে যার জিনিস গুছিয়ে নিয়ে রেডি থাকে, এক্ষুনি অন্য বেটার কোথাও শিফট করব। আর একটা কথা, কেউ যেন ক্লান্তির দোহাই দিয়ে বিছানার আশ্রয় না নেয়।

১৫ মিনিটের মধ্যে মহারাজ আর রাজপুত্র এসে হাজির। গুরুদ্বারের গেটের ঠিক উলটো দিকের বাড়িতেই দু’টো ফোর বেডেড ঘর পাওয়া গেছে, এক একটা ৭০০ টাকা করে। জিনিসপত্র ঘাড়ে করে নিয়ে গিয়ে দেখি একটা লম্বা চওড়া বারান্দার ওপর বড়ো বড়ো দু’টো পাশাপাশি ঘর, ততোধিক বড়ো টাইলস্‌ বসানো অ্যাটাচড্‌  বাথরুম। ঘরের পাশেই এক টুকরো খোলা জমি আর তার পরেই উঠে গেছে খাড়া পাহাড়। সুন্দর বিছানায় নরম গদি আর ইয়া মোটা নরম কম্বল। এক কথায়, ‘ভাবা যায় না’। (চলবে)

কী ভাবে যাবেন

হরিদ্বার থেকে বাসে বা গাড়িতে গোবিন্দঘাট এসে সেখান থেকে ঘাংঘারিয়া যাওয়ার নানা উপায়। হাঁটা তো আছেই। ৩ কিলোমিটার দূরে পুলমা পর্যন্ত গাড়ি যায়। হাঁটা শুরু করতে পারেন সেখান থেকেও। গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া হেলিকপ্টার সার্ভিস আছে। ভাড়া ৩ হাজারের মতো। কম-বেশি হতে পারে। আছে ‘ঘোড়ে’ বা খচ্চর। ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, যার কাছে যেমন পায়। আছে ডুলি, মানুষের পিঠে চেপে চলা।

কোথায় থাকবেন

ঘাংঘারিয়ায় গুরুদ্বার তো আছেই। আছে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল। আছে জিএমভিএন টুরিস্ট বাংলোও। অনলাইন বুকিং www.gmvnl.in । জিএমভিএন-এর অফিস আছে বিভিন্ন জায়গায়। সেখানে যোগাযোগ করেও বুকিং করা যায়। কলকাতা অফিসে যোগাযোগ ০৩৩-২২৩১ ৫৫৫৪।       

প্রয়োজনীয় তথ্য

বৃষ্টিতে ভেজা, গায়ে ব্যথা ইত্যাদির জন্য আর্নিকা অব্যর্থ। আর উচ্চতাজনিত অসুস্থতার জন্য যদি কারও মাথা ধরা, শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জিক সিনড্রোম হয় তার জন্য কোকা ৩০ বা কোকা ২০০ অব্যর্থ।

ছবি: লেখক ও দীপ্যমান অধিকারী 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here