শ্যামল বৈরাগী:

সবাইকে বললাম, ভিজে যা কিছু আছে, ভালো করে নিংড়ে বাইরের দড়িতে মেলে দাও, শুকোবে না বটে তবে হাওয়াটা অন্তত খাক। আর যেগুলো কাল সকালে পরবে, সেগুলো কম্বলের তলায় নিয়ে শুয়ে পড়ো, গায়ের গরমে শুকিয়ে যাবে।

প্ল্যানিং অনুযায়ী কাল হেমকুণ্ড ঘুরে আসার কথা। দূরত্ব বেশি নয়, মাত্র ৬ কিলোমিটার। কিন্তু এই ৬ কিলোমিটারে উঠতে হবে ঘাংঘারিয়ার ১০ হাজার থেকে ১৪২০০ ফুট। তার পর নামা। ওই উচ্চতায় বড়ো কোনো গাছ জন্মায় না। অক্সিজেনও বেশ কম।

সব থেকে করুণ অবস্থা আমার সাইকিয়াট্রিস্টের। আমি ওকে ‘ডক’ বলে ডাকি। বেচারা বউ-মেয়েকে রেখে একা এসেছে, তারা নাকি পাহাড়ে হাঁটতে পারবে না। ‘ডক’ বলল, ওর মোটা মোজা আর জুতো যে ভাবে ভিজেছে কাল কিছুতেই বেরোতে পারবে না। ওকে বাদ রেখেই যেন আমরা হেমকুণ্ড যাই। ও পরশু ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স-এ যাবে। বললাম, জুতো মোজা নিয়ে চিন্তা নেই। যত ভিজেই হোক, সকালে পরে বেরিয়ে পড়লেই হবে, চলতে চলতে সব শুকিয়ে যাবে।

কিন্তু ‘ডক’ কনফিডেন্স পাচ্ছে না, সে পারবে না (পরের দিন অবশ্য সে-ই হেমকুণ্ডে পৌঁছেছিল সবার আগে)। এই ‘পারব না’-টাও একটা ছোঁয়াচে রোগ। আস্তে আস্তে প্রায় সকলেই বলে উঠল, কাল হেমকুণ্ড যাওয়া সম্ভব নয়। শুধু টিমের সেকেন্ড ফচকে, যার নাকি কুঁচকি থেকে পুরো পায়ে প্রচণ্ড টান ধরেছিল, যার বউও না-যাওয়ার দলে, সে বলল, “আমি যাব।”

বৃষ্টি পড়েই চলেছে, মনে হচ্ছে না সকালেও থামবে। আমাদের তিন জনের প্রব্লেম নেই। বাকি সবারই প্রথম ট্রেক। কাজেই সকলের সুস্থ থাকা খুব জরুরি। রাতে শুয়ে শুয়ে ঠিক করলাম, আমি কাল থেকে যাব, যারা যাবে তাদের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে বাপ এগিয়ে যাবে। আমি এখানকার পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেব।
সকালবেলায় বাইরের আবহাওয়া না পালটালেও ঘরের আবহাওয়া পালটে গেল হঠাৎই। ‘ডক’ই প্রথম বলল
, “যাই, ঘুরেই আসি।” একে একে সবাই। আর্নিকা তা হলে ভালোই কাজ করেছে।

বেরোতে বেরোতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। কিছুটা দেরি হল ব্রেকফাস্টে। কেউই গুরুদ্বারের পুরি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে রাজি ছিল না। সবাই চায় বাইরের দোকানে খেতে। দোকানে যা-ই খাই, সেটা ওরা বানিয়ে দেবে, কিছুটা সময় তো লাগবেই।

তার ওপর দেরি হল পঞ্চু (কথাটা পঞ্চো থেকে এসেছে) ভাড়া করতে গিয়ে। একটা বড় আয়তাকার চাদর বা প্লাস্টিক শিটের মাঝখানে গোল গর্ত করে সেখান দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলেই পঞ্চু হয়ে যায়, মাথায় একটা টুপিও আছে। গোবিন্দঘাটে কেনা ওয়াটার প্রুফগুলোর করুণ অবস্থা। অতএব এখান থেকে পঞ্চু ভাড়া করো। ১০০ টাকা করে ভাড়া।

আজকের হাঁটার একটা সুবিধে, কোনো ওজন ক্যারি করতে হচ্ছে না। হেমকুণ্ড গিয়েই তো ফিরে আসব। শুধু রাস্তায় খাওয়ার জন্য ড্রাই ফুড, জল আর একটা খালি ছোটো ব্যাগ বা ন্যাপস্যাক নিয়ে নাও পিঠে। গায়ে যা আছে, একটু হাঁটলেই গরমে আর তা গায়ে রাখা যাবে। তখন সেগুলো খুলে ওই ব্যাগে নিতে হবে।

অল্প অল্প চড়াই, সুন্দর পরিষ্কার রাস্তা। পাস দিয়ে অনেকে ঘোড়ের পিঠে চেপে যাচ্ছে। ঘোড়ের মর্জি বুঝে নিয়ে সাবধানে তাদের পাস দিতে হচ্ছে। প্রথম দিকে সকলেরই দমে চাপ লাগে কিন্তু একটু হাঁটলেই পায়ের স্টেপিং-এর সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস মিলিয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যায়।

ঘাংঘারিয়া ছাড়ালেই সামনে এক বিশাল ঝরনা। লক্ষ্মণগঙ্গা ঝরে পড়ছে। শীতকালে জমে যায়। আর সেই জমে যাওয়া বরফের প্রপাত বেয়ে ওঠার জন্য বিদেশিরা আসে। পুরো ঘাংঘারিয়া তখন ১০ ফুট বরফের নীচে। আমারও ইচ্ছে রইল সেই বরফের দেয়াল ক্লাইম্ব করার।

দিব্যি উঠতে থাকলাম। আশপাশে ছোটো ছোটো ঝোপ আর গুল্মজাতীয় গাছে ভর্তি। প্রচুর ফুল ফুটে আছে রাস্তার ধারে। তার মধ্যে ইমপেটিয়েন্স প্রজাতির গোলাপি বলসম বা গুলমেহেন্দির সংখ্যাই প্রচুর, আর আছে সাদা রঙের ছোট্টো পার্নাশিয়া। এ ছাড়া হলুদ রঙের ইনুলা, যেন সূর্যমুখীর ছানা।

কয়েক ধরনের কোবরা লিলি। এরা আবার পতঙ্গভুক। মানে পোকামাকড় পেলেই খেয়ে ফেলে।

কিংবা ছোটো ৫-৬টা পাপড়ির হলদে রঙের মার্স মেরিগোল্ড (না গাঁদা নয়)। তার সঙ্গে আছে বিষাক্ত কাঁটাওলা ক্যাকটাস ঝোপ ‘ফ্যালকনার্স থিসল্‌’ (হিন্দিতে বলে গৃদ্ধ পাঙ্খে মানে শকুনের ডানা), নামেতেই কাম মালুম হচ্ছে, একবার ফুটলে আর রক্ষে নেই।

আর রঙবেরঙের বেশ কিছু ছোটো পাখি বৃষ্টি উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছে খাবারের খোঁজে। দেখলাম হিমালয়ের ঘুঘু ‘ওরিয়েন্টাল টার্টল ডাভ’।

সাদা কানের বুলবুলি

আশেপাশেই রয়েছে ‘হিমালয়ান হোয়াইট ইয়ার্ড বুলবুল’ মানে সাদা কানের বুলবুলি (আহা যেন রেড ইন্ডিয়ান নাম), গাঢ় নীল শরীরে হলদে ঠোঁটের ‘ব্লু হুইস্লিং থ্রাশ’, উজ্জ্বল লালচে খয়েরি শরীরে কালো ডানা আর সাদা মাথার ‘হোয়াইট ক্যাপড্‌ ওয়াটার রেডস্টার্ট’, গোলাপি শরীরে চড়াইয়ের ডানাওলা ‘পিঙ্ক ব্রাওড রোজফিঞ্চ’, এদের মেয়ে পাখিগুলো অবিকল আমাদের চড়াইয়ের মতো দেখতে। এক সঙ্গে না থাকলে পুরুষ আর স্ত্রী-পাখিদের আলাদা জাতের পাখি বলে মনে হয়, এতটাই তফাত।

সাদা বুক-পেট আর নীল পিঠ আর ডানার ঠিক পাশে হলদে রঙের বৃষ্টিভেজা ‘হিমালয়ান ব্লুটেল’। উফ… পথের কোনো কষ্টই তোমার গায়ে লাগতেই দেবে না।

আস্তে আস্তে দলের অনেককেই ছাড়িয়ে এসেছি। সবাইকেই বলা আছে দুপুর দু’টোতে হেমকুণ্ডের গুরুদ্বার বন্ধ হয়ে যাবে। অতএব হালুয়া খেতে চাইলে তার মধ্যে পৌঁছিও। হেমকুণ্ড হল পাহাড়ের ওপর একটা লেক। শিখদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। দশম শিখ গুরু, গুরু গোবিন্দ সিং এখানে তপস্যা করেছিলেন। অনেকেই এই কুণ্ডের জল জ্যারিকেনে করে বাড়ি নিয়ে যায়। অনেকটাই গোমুখের জল নিয়ে যাওয়ার মতো। হেমকুণ্ডে নাকি লক্ষ্মণ তপস্যা করেছিলেন। তাঁর একটা মন্দিরও আছে ওখানে। জায়গাটাকে লোকপাল আর লক্ষ্মণের মন্দিরকে লোকপাল মন্দির বলে।

২ কিলোমিটারের পর থেকেই মাঝে মাঝেই রয়েছে চা-বিস্কুট-ম্যাগির দোকান। তবে দাম বেশ বেশি, হবেই তো। ওই উচ্চতায় এ সব মিলছে, সেটাই তো যথেষ্ট। ৩ কিলোমিটার এলাম, উচ্চতায় প্রায় ১২ হাজার ফুট। এর পর আর বড়ো গাছের দেখা মিলবে না। বেশ খিদে পাচ্ছে, ড্রাই ফুডে হবে না। একটা দোকানে দাঁড়িয়ে গেলাম। গা-হাত-মাথা ভালো করে মুছে গায়ে উইন্ডচিটারটা চাপিয়ে মাফলারটা মাথায় ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে আগে খানিকটা গুঁড়ো গ্লুকোজ মুখে ফেলে জল খেলাম, তার পর ম্যাগি আর চা। এই সময়ে একটু আগুনের তাপ হলে ভালো হত, কিন্তু এলপিজি-তে তো সেটা সম্ভব নয়। তাই শরীরের তাপ যেন বেরিয়ে না যায়, সেই চেষ্টাই করলাম। ছেলেটার জন্য চিন্তা হচ্ছে। খেল কিনা, ঠিকঠাক প্রোটেকশন নিচ্ছে কিনা, যদিও বাপের সঙ্গে আছে, তবু…। হয়তো একেই বলে ‘মায়ের মন’।

এ বার চড়াই থেকে আস্তে আস্তে খাড়াইটা শালিখ হয়ে দাঁড়কাক হচ্ছে। আসলে ঘাংঘারিয়া ছাড়ালেই যে পাহাড়টা তার মাথায় হেমকুণ্ড। কাজেই সোজা উঠে যাও ৪ হাজার ফুট। কয়েকটা বাঁক নেওয়ার পরেই চোখের সামনে একটা পাহাড়ি ঢালে ব্রহ্মকমলের ঢল। ছোট্টো কাঁটাওয়ালা গাছে পাহাড়ের রানি ব্লু পপিও আছে, তবে খুব অল্প। বুকে টান লাগছে। হাঁফ ধরছে। আর কতদূর? ওপর থেকে নেমে আসা এক বয়স্ক সর্দারজি বললেন, “অউর থোড়াসা, লেকিন শর্টকার্ট মত লেনা। এয়সে হি রাস্তে রাস্তে মে চল জানা বিটি।” আর কিছুটা গেলে হেমকুণ্ডে যাওয়ার সিঁড়ি, সেই রাস্তাটাই নিতে বারণ করেছেন।

দাঁড়ালাম দু’মিনিট। আবার এগোই। ওই তো ওই…। ওপরে বাপ-বেটাকে দেখা যাচ্ছে, ওপর থেকে হাঁক পাড়ছে, হাত নাড়ছে। আমার চেঁচানোর ক্ষমতা নেই। হাত নাড়লাম কোনো রকমে। যাচ্ছে না ফিরছে ওরা? যদি ফেরে তা হলে আমিও ফিরে যাব ওদের সঙ্গে। হার্ট আর ফুসফুস ঠিক যেন ম্যাচ করছে না। আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকি। কোনো রকমে টেনে টেনে চলতে থাকি। গায়ে এক্সট্রা যা কিছু ছিল, সব খুলে ন্যাপস্যাকে ভরে নিয়েছি। তাতেও ঘেমে যাচ্ছি ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায়। পরে জেনেছিলাম ওখানে সকলেরই একই সমস্যা হয়েছিল। কোনো কারণে হঠাৎই ওখানে অক্সিজেন খুব কমে গিয়েছিল। তা ছাড়া খাড়াইও ছিল সাংঘাতিক।

হঠাৎই এক চেনা ডাকে মুখ তুলে দেখি ‘ডক’ তিড়িং তিড়িং করে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। ও অলরেড়ি সব কিছু দেখে ফিরে যাচ্ছে। আরে এসেই তো গেছ, ওই ওপরটাতেই। আর দু’টো ভাঁজ মারলেই পৌঁছে যাবে।


অতএব সেই সুপ্রাচীন প্রবাদের পুনরাবৃত্তি হল, সব দু:স্বপ্নেরই শেষ হয়। হেমকুণ্ড পৌঁছলাম অবশেষে। ঘড়িতে একটা। মানে ৬ কিলোমিটার আসতে লাগল প্রায় ৬ ঘণ্টা। আবার নিজেকে কভার করে ফেললাম পুরো। তার পরেই লঙ্গরখানার সেই কল-লাগানো ড্রাম থেকে এক গ্লাস চা। শরীরে জল দাও, ক্যালোরি দাও, গরম দাও, যত পারো। শরীরে শক্তি যেন আর নেই, কাঁপছি রীতিমতো। ভালো হত যদি সব চেঞ্জ করে শুকনো কিছু পরে ফেলা যেত। কিন্তু কিছু করার নেই। আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মানে অ্যাক্লিমেটাইজেশন হয়ে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানে খিচুড়ি পাওয়া যাচ্ছে, ২ প্লেট খিচুড়িই খেয়ে নিলাম। শরীরে ইনপুট দিতে থাকো। ভালো না লাগলেও দাও। ইচ্ছে না করলেও দাও। অসুস্থ হয়ে পড়লেও দাও। ভেতর থেকে এক বার শক্তি পেতে শুরু করলে আর কোনো চিন্তা নেই। (চলবে)

ছবি : লেখক ও দীপ্যমান অধিকারী

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here