শ্যামল বৈরাগী

হেমকুণ্ডে গেলে লঙ্গরখানাটা আগে পড়ে। তার পরেই গুরুদ্বারের মূল বাড়ি। মূলত কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি। বরফের থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ ডিজাইনের চাল আর চারি দিক প্রায় ঢাকা। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেলে মূল গ্রন্থগৃহ। আবার সেই অসামান্য হালুয়া। আমার দ্বারা আর ধর্ম করা হল না। সব ভক্তি হালুয়াতেই নিমজ্জিত।

সামনেই হেমকুণ্ডের জলাধার। লেকের এক কোণে লোকপাল লক্ষ্মণের নীল রঙের ছোট্টো মন্দির। সিমেন্ট বাঁধানো লেকের পাড়। চেন ঝুলছে পাড় থেকে জলের মধ্যে। ধরে স্নান করার জন্য। পেছন দিকের পাহাড় থেকে অজস্র ঝর্ণা ঝরে পড়ছে। পাহাড়, লেক সবই ঢেকে আছে মেঘে। এ রকম জায়গায় এলে নিজেকে কত তুচ্ছ লাগে। প্রতি মুহূর্তে জানান দেয়, এই সুবিশাল সীমাহীন জগতে আমার যে কোনো অস্তিত্বই নেই।

খানিকক্ষণ হয়তো হারিয়েই গিয়েছিলাম নিজের মধ্যে। এক পরিচিত ধমকের শব্দে ফিরে দেখি বাবা-মা-মেয়ের পরিবারটা হাজির। এদের গোবিন্দঘাট থেকে ঝগড়া করতে করতে আসতে দেখছি। যতটুকু বুঝেছি ভদ্রলোক পাহাড়ে ঘোরা মানুষ। ভদ্রমহিলা শান্ত টাইপের আদর্শ গৃহবধূ আর বছর ২২/২৩-এর মেয়েটা মড। সারা ক্ষণ ভদ্রলোক মেয়েকে শাসন করে গেলেন আর মেয়ের দাঁতখিঁচুনি শুনলেন। আবার আস্তে চলে, তাড়াতাড়ি নাও, এখানে আবার দাঁড়ানোর কী হল, এখুনি তো চুল ঠিক করলে, আবার কেন, অত ধারের দিকে নয়, যেটা বোঝো না সেটা নিয়ে তর্ক করবে না…..। মেয়ের জবাব, যাচ্ছি তো, আর কত জোরে চলব, আর পারছি না ব্যাস, চুল খুলে গেলে আমি কী করব, আমি কচি খুকি নই, বেশ করেছি, চু-কও-তো তুমি বেশি বোকো না।

লেকের ধার থেকে ফিরে এলাম। দলের আরও দু’জন চলে এসেছে। তবে গুরুদ্বার বেশ কিছুক্ষণ আগে বন্ধ হয়ে গেছে বলে হালুয়া পায়নি। এখনও দলের অনেকে এসে পৌঁছোতে পারেনি। ‘কাপল্‌ অ্যাপেল’ জুটিই আসেনি এখনও। ওর সঙ্গে কথা বলে ঠিক হল, আমি থেকে যাব। ‘লাস্ট পার্সন কভার’ করার জন্য। ওকে তাড়াতাড়ি ফিরে কালকের জন্য গাইডের ব্যবস্থা করতে হবে। গাইড না থাকলে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স যাওয়া বৃথা। ওই ফুল, ওই গাছ  সম্পর্কে যদি জানতেই না পারলাম, তা হলে ভ্যালির সৌন্দর্য শুধু চোখেই দেখব, হৃদয় দিয়ে নয়। আর গাইড টাইড খোঁজার ব্যাপারে ওর জুড়ি মেলা ভার। সাধে বলি, ম্যানেজিং ম্যানেজার!

আমাদের সঙ্গে ট্রেনে এক মোচওলা ভদ্রলোকের আলাপ হয়েছিল। ও রকম পাকানো গোঁফ আর তাগড়াই শরীর বাঙালিদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। নিজের একটা ট্যুর কোম্পানি আছে, মাঝে মধ্যেই লোকজন জুটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।  নিজেরও ঘোরার নেশা। ওঁর দলের বেশ কয়েক জন অলরেড়ি ঘোড়েতে করে এসে ঘুরে গেল। উনি এই একটু আগে এসেছেন। এসেই যে ভাবে জামাকাপড় ছাড়তে শুরু করলেন, একটু কৌতূহল জাগল ওঁর উদ্দেশ্য নিয়ে। ব্যাগ থেকে তেল গামছা সব বেরোল। ভালো করে ঘষে ঘষে তেল মাখলেন। এমন সময় এক শিখ ওঁকে একটা জ্যারিকেন দিয়ে কুণ্ডের জল তুলে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। উনি জ্যারিকেন নিয়ে জলে নামলেন। ওই কনকনে ঠান্ডা জলে নামতে গেলে সত্যিই দম লাগে। একটা ডুব দিয়ে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে জ্যারিকেনটা হ্যান্ডওভার করলেন উনি। এর পর আরও দু’টো ডুব দেবেন। দিলেনও, আর তার পরই নড়াচাড়া বন্ধ। জলের মধ্যে ওই ভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে। নড়ছেনও না, কথাও বলছেন না। শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন খালি। সর্বনাশ! কোলাপস্‌ করে গেছেন নাকি!। সর্ব শক্তি দিয়ে হাঁক পড়লাম, হ্যা-স, কুইক, হে-এ-এ-ল্প (আমি ওকে হ্যাস বলেই ডাকি, হাসব্যান্ড-এর শর্ট ফর্ম)। আর তার পরেই ছুটে গিয়ে চেনটা ধরে টানতে থাকলাম, একটুও যদি ওঁকে টেনে তোলা যায়। আমার চেঁচানোয় ছুটে এল সবাই। এখানকার লোকেরা এ সব ব্যপারে এক্সপার্ট।

সবাই মিলে ওঁকে চাগিয়ে নিয়ে গিয়ে মোটা মোটা কম্বল চাপা দিয়ে ম্যাসাজ করতে লাগল। এক জন কোত্থেকে একটা হ্যালোজেন আলো এনে জ্বেলে দিল ওঁর সামনে, শরীর গরম করতে হবে। একটা জিনিস বলা হয়নি, হেমকুণ্ড পর্যন্ত কিন্তু ইলেকট্রিসিটি  আছে। সেই গোবিন্দঘাট থেকে একটা লাইন পুলনা হয়ে ঘাংঘারিয়া হয়ে হেমকুণ্ড পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছে।

কোনো রকমে ওঁকে খাড়া করা হল। যত কিছু গরম গরম খাবার ছিল সব খাওয়ানো হল। আর একটা ঘোড়ের ব্যবস্থা করে তার পিঠে চাপিয়ে ওঁকে জিনিসপত্র সমেত ফেরত পাঠানো হল। পরের দিনই ওঁকে ঘাংঘারিয়াতে দৌড়োদৌড়ি করতে দেখেছি।

আরও পড়ুন: হেমকুণ্ড ছুঁয়ে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স ৩/ অবশেষে হেমকুণ্ডে

এই সব করতে করতেই চারটে বাজল। বাপ-ছেলেতে ফিরে গেছে অনেক ক্ষণ। বউকে হ্যাস আর ছেলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়ে সেকেন্ড ফচকে থেকে গেছিল আমার সঙ্গে। আমরা এক সঙ্গে ফিরব। এক্ষুনি না ফিরলেই নয়। ফিরতে ঘণ্টা তিনেক তো লাগবেই। এর পর আর দেরি করলে অন্ধকার হয়ে যাবে। কিন্তু ‘কাপল্‌ অ্যাপেল’ তো এখনও এল না। ওদের অবশ্য দোষ দিই না। সবে কয়েক বছর হল বিয়ে হয়েছে, এখন ঝাড়া হাত-পা। দু’জনে মিলে এখনই তো প্রকৃতির স্বাদ নেবে। তার ওপর মেয়েটার আবার শ্বাসের টান আছে। কাল বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইনহেলার নিতে হয়েছে ওকে। তবে অসম্ভব মনের জোর। ও এখানে এসে পৌঁছোলে, আমি ওকে স্যালুট করব।

ভাবতে ভাবতেই ওরা এসে পড়ল। খুব কাঁপছিল ওরা। ওদের শুকনো করিয়ে চা আর খিচুড়ি খাওয়ানো হল। একটু থিতু হয়ে আশপাশটা কোনো রকমে ঘুরে দেখেই ফেরার তাড়া। প্রায় পাঁচটা বাজে। জোরে চলতেই হবে, অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে যতটা এগোনো যায়। তবে পথে ভয় নেই, চওড়া রাস্তা, তায় আবার নড়বড়ে পাথর ফেলা বা কাঁচা মাটির নয়, রীতিমতো সিমেন্ট বাঁধানো, সাইডে অনেক জায়গাতেই রেলিং। শুধু সঙ্গের সকলে নতুন তো, কেউ প্যানিক খেয়ে না যায়।

আকাশটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। যদিও বৃষ্টি থামেনি বা মেঘ কেটে গিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়নি, তবু বুঝতে পারছি যে মেঘের স্তর পাতলা হচ্ছে। উলটো দিকের বরফজমা পাহাড়গুলো একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ এক ঝলক রোদের আভা। এটা খুব ভালো সাইন। কাল সূর্য উঠবে মনে হয়। যদিও পাহাড়ে কখন কী হয়, কেউ বলতে পারে না।

দোকানিরা তাদের পসার বন্ধ করে দিয়েছে। তারা নিশ্চয়ই এখন দোকান-লাগোয়া ছোট্টো ঘরের ভেতর। কিন্তু সেখানেও তো আলো জ্বলতে দেখছি না। সেকেন্ড ফচকে ডেকে দেখাল। তাকিয়ে দেখি, ডান দিকের পাহাড়ের ওপরে পাথরের খাঁজে একটা গুহা, এখান থেকে খুব ছোট্টো লাগছে, আধো অন্ধকারেও সেখানে মানুষের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে, কাপড় শুকোচ্ছে। মানে এখানকার দোকানিদের ওটাই নিরাপদ আশ্রয়? হতে পারে।

যতই অন্ধকার থাক, অন্ধকারেরও একটা আলো থাকে, তাতেই আস্তে আস্তে যেতে হবে। হঠাত্‍ই জানা গেল, আমাদের ‘কাপল্‌ অ্যাপেল’ মোবাইল এনেছে ফোটো তোলার জন্য। যদিও তার চার্জ তলানিতে, তবু সেটাই বাঁচাল শেষ পর্যন্ত। আমি ছাড়া সকলের হাতেই লাঠি। ঢালুতে নামতে নামতে যেখানে সিঁড়ির মতো স্টেপ কাটা, সেখানটা লাঠি দিয়ে বুঝে যাবে। না হলে আছাড় খাওয়ার চান্স।

পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে নামতে হচ্ছে। বৃষ্টিও পড়ছে। কোথাও কোথাও পিচ্ছিল হয়ে আছে। ওঠার সময় দিনের আলোতে যাদের অনায়াসে উপেক্ষা করেছি, নামার সময় অন্ধকারে তারাই তাদের স্বমহিমায় আমাদের ভালোবাসতে আসছে। পাইন গাছের ছোটো একটা ডাল কিংবা পচা ফার্নের পাতাও অনেক বড়ো বিপদ ঘটাতে পারে। তাই যার হাতে টর্চ, তাকে সেকেন্ড পজিশনে থাকতে বললাম।

ভেজা শরীরে ঠান্ডা লাগছে। সেই সঙ্গে ক্লান্তি। শারীরিক ক্লান্তির থেকে বহু গুণে ভয়ংকর মানসিক ক্লান্তি। ‘আর পারছি না’ কথাটা যদি এক বার মনে গেঁথে যায় তা হলেই সর্বনাশ। এখানে ও সবের জায়গা নেই। এখানে তোমাকেই কাজটা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত পৌঁছোতে হবে, তোমাকেই পৌঁছোতে হবে। অতএব এগিয়ে চলো।

একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্তি। এখানে কোনো জানোয়ার বা সাপের ভয় নেই। এমনকি সিকিম হিমালয়ের মতো জোঁকেরও উৎপাত নেই। নীচে, এখনও বহু দূরে, ঘাংঘারিয়ার আলো মাঝে মাঝে গাছের ফাঁক দিয়ে চিক চিক করছে। টানা নামার ফলে পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর চাপ পড়ছে। জুতো আর মোজার কম্বিনেশন ঠিকঠাক না থাকলে আঙুলে ব্যথা হয়, পায়ের তলায় ফোসকা পড়ে অনেক সময়। সেই জন্য ট্রেক শু এক সাইজ বড়ো কিনতে হয়।

হঠাত্‍ই অনেক নীচে ক্ষীণ একটা টর্চের আলো চোখে পড়ল। নড়ছে। নিশ্চয়ই আমাদের কেউ খুঁজতে আসছে। আশা বাড়ল, ঝিমিয়ে পড়া গতি বাড়ল। আলোটা উঠছে। আমরাও নামছি। আলোটা উঠতে উঠতে আমাদের পেরিয়ে চলে গেল। কোনো এক দোকানি তার দোকানের জিনিসপত্র যোশীমঠ থেকে কিনে, গোবিন্দঘাট থেকে পিঠে করে নিয়ে ফিরছে। এখন উঠবে তার বাসস্থান সেই পাহাড়ি গুহায়।

ওকে দেখে আমাদের নামার উত্‍সাহ আবার বাড়ল। ঠিক তিন ঘণ্টায় ঘাংঘারিয়া পৌঁছোলাম, প্রায় আটটা বাজে তখন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here