শিখ পুণ্যার্থী ঘাংঘারিয়ায়

শ্যামল বৈরাগী:

যথারীতি দেখতে পেয়েই দৌড়ে এলো, আগে খাবি না ফ্রেশ হবি?

– দু’টোই। আমি চট করে ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি, তুই একটা ম্যাগী আর চা-এর কথা বলে দে। এসেই যেন গরম গরম হাতে পাই। খুব খিদে পেয়েছে।

খেতে খেতে রিপোর্ট দিল, সবাই ঠিকঠাক আছে। খাওয়া দাওয়া করছে। যথারীতি আর্নিকা আর কোকা মেরে দিতে বলেছে সবাইকে।

– কালকের গাইডের কী ব্যবস্থা হল?

– গাইড রেডি, এখানেরই ছেলে, ফুল, পাখি ঠিকঠাকই চেনে দেখলাম। তবে দু’ হাজার চাইছে। কম-টম হবে না।

– কনফার্ম করেছিস?

– ওই যে, তোকে জানানো হয়নি বলে ওকেও কনফার্ম করিনি।

– তুই এ রকম রাম-ভক্ত হনুমানের মতো বউ-ভক্ত হলি কবে থেকে বলত?

– যবে থেকে বাড়ি ছেড়েছি।

– চ, কনফার্ম করে আসি। ছানা কোথায়?

– সে ওদের সঙ্গে জমে গেছে এখন।

সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ঘাংঘারিয়ার রাস্তায় মানুষজন প্রায় নেই। দোকানগুলো খোলা থাকলেও দোকানি তার হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ওর বাঁ হাতটা দু’হাতে চেপে ধরে বললাম, পারবি নারে ক’দিন আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে যেতে? বাবা-মার ও ভালো লাগত। এ বার গেলে তো আবার কবে দেখা হবে জানি না। দেখ না, একটু চেষ্টা করে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এ বার আমার প্রেম-প্রেম ভাবটা গেল চটকে, তাকিয়ে দেখি একদম ভাবলেশহীন মুখে হাঁটছে। সেখানে না আছে চিন্তা, না আছে ভালোবাসা, না আছে আবেগ, না আছে কাঠিন্য, না আছে প্রশান্তি। শুধু একটা স্থির মুখ। জীবন্ত পাথরের তৈরি। সিদ্ধান্তে স্থির। পৃথিবী  উলটে গেলেও যেটা পালটাবে না।

সাদা হলুদ বলসাম

গাইডের নিজের একটা অফিস আছে। ঢুকলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। ওর নিজের তোলা প্রচুর ছবি দিয়ে সাজানো। অসাধারণ নেচারের ছবি, অনেক রকমের ফুল, পাখি তো আছেই, তা ছাড়া এ তো দেখি যাকে বলে রীতিমতো ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার। মানে অনেক জানোয়ার, হরিণ, বাঘ, এমনকি স্নো লেপার্ড-এর ছবিও আছে, নীচে ওর নাম লেখা। ওর তোলা? সন্দেহ হয়। কিন্তু পরে দেখেছিলাম, ছেলেটা সত্যিই যাকে বলে নেচার লাভার। শুধু ভারতেই নয়, ভারতের বাইরেও ঘুরেছে। নেচার, গাছপালা, পশুপাখির ওপর বেশ কিছু কোর্সও করেছে। নানা ধরনের পাখির ডাক, ঝিঁঝির ডাক আলাদা আলাদা রেকর্ড করা আছে ওর।

মোটা লাল গালচে-পাতা মেঝে, দেওয়ালে ছবির সঙ্গে ফাঁকে ফাঁকে আইস অ্যাক্স, রোপ, ক্যারাবিনার, স্যাক ঝুলছে। ঘরটাতে বেশ একটা বন্য বন্য ভাব আছে। টেবিলে ল্যাপটপ, পেছনের দেয়ালে ৩২ ইঞ্চি এলইডি টিভি। খুব বেশি বয়স নয় ছেলেটার, আমাদের মতো হবে। ও খালি বলল, কাল সকালে বেরোনোর আগে প্যাকড লাঞ্চ নিয়ে নিতে। আর যত তাড়াতাড়ি হয় বেরোতে। অত সকালে প্যাকড লাঞ্চ কী ভাবে পাব জিজ্ঞেস করতে বলল, পাশের হোটেলে বলে দিতে, ওরা বানিয়ে দেবে সকালে সময়ের মধ্যে।

সে সব ব্যবস্থা করে ঘরে ফিরে এলাম। এ বার আমাদের তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে হবে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে আবার। যদিও তাড়াতাড়ি শোয়া আমাদের হয় না। রাতে খাবার পর সবাই মিলে হ্যাহ্যাহিহি না করলে যে বাঙালির রাতের ঘুম আসে না। সেই করতে করতেই রাত বারোটা বেজে যায় রোজই।

হলুদ বলসাম

সকালবেলা যথারীতি আবার সবাই ফিট। কিন্তু নড়তে চড়তে সেই আটটা বাজিয়ে ছাড়লে। এই সব কাজে অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড হওয়া দরকার। একেবারে মিলিটারি ডিসিপ্লিন — সব সময় সজাগ, সব কাজ সময়ের মধ্যে শেষ। ইচ্ছে করেই আমরা অতটা কঠিন হইনি, সকলেই নতুন, তায় এমন কিছু কঠিন কাজও করছি না, আর দশ মাস বাদে ওর সঙ্গে দেখা হওয়াতে আমিও একটু প্রেম-প্রেম আবেশের মধ্যে আছি। একটু হালকা আমেজেই ঘোরা হচ্ছে। তবে যে যা-ই মনে করুক, কন্টিনিউ তাড়া মেরে যেতেই হচ্ছে। না হলে নিজেরাই মিস করবে। তুমি দিনের আলোয় যত তাড়াতাড়ি যাবে, তত বেশি দেখবে। বেলা বাড়লে মেঘ ঢুকতে শুরু করবে, হয়ে গেল।

বিস্তর্তা অফ্ফিনিস বড্ড কঠিন নাম। বরং দেশি চুক্রু বা মাসলুন বা হিমালয়ান ফ্লিস ফ্লাওয়ার-ও চলতে পারে।

সকাল থেকেই রোদ উঠেছে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘও আছে বটে কিন্তু সুন্দর সকাল। দূরের পাহাড়গুলোয় বরফ জমেছে। গাইড এসে গেছে, দুটো করে আলু-পরাঠা দিয়ে লাঞ্চ প্যাক রেডি। কিন্তু এরা আর তৈরি হয়ে উঠতে পারছে না। এর পর খাবে, পঞ্চু নেবে, নড়বে চড়বে… ন’টা যে বেজে গেল রে…।

রেড বেরি

এই পথে গাইডের সঙ্গে সঙ্গে চলতে হয়। নিজের মতো চলতে গেলেই কিছু না কিছু মিস করবে। ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুটা কালকেরই রাস্তা। লক্ষ্মণগঙ্গা পেরিয়ে একটু এগোতে হবে। তা হলেই চেকপোস্ট বলে একটা জায়গা পড়বে, যেখান থেকে সোজা উঠে গেছে হেমকুণ্ড আর বাঁ দিকে চলে গেছে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। দারুণ সুন্দর রাস্তা। দু’পাশে বিভিন্ন গাছের জঙ্গল। কী নেই সেখানে… বলসম, বনতুলসি, নাইফ-লাইক মেডো রু (knife-like meadow rue), এনিমো, অ্যাঞ্জেলিকা, রডোডেনড্রন, বেরি। আরও কত কী!

ছোটো পাতার ট্রেলিং বেল ফ্লাওয়ার

একটু এগোলেই রেজিস্ট্রেশন পয়েন্ট। নাম, ধাম ইত্যাদি লেখানোর সঙ্গে মাথাপিছু ১৫০ টাকা করে টিকিট কাটতে হবে। এই টিকিটে পরপর তিন দিন যাওয়া যাবে, এর পর প্রতি দিন ৫০ টাকা করে। স্টিল ক্যামেরা বা সাধারণ মুভি ক্যামেরার জন্য কিছু লাগে না। ভ্যালিতে টেন্ট করা বা রাতে থাকা যায় না। যাবে, দেখবে, ফিরে আসবে। দরকার হলে আবার যাবে পরদিন। প্রকৃতিকে তার মতো করে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুব সুন্দর ব্যবস্থা। আমরাও শপথ করেছি, কোনো ভাবেই পাহাড় নোংরা করব না। সকলের কাছেই আলাদা আলাদা প্যাকেট আছে, সব নোংরা তাতে জমা করা হচ্ছে।

২০১৩-এর ধ্বংসলীলার পর ভ্যালিতে যাওয়ার রাস্তাটাই পালটে গেছে। আগে একটা গ্লেসিয়ার পার হতে হত, সেটা নেই। নতুন রাস্তা, নতুন ব্রিজ হয়েছে। গত বছর নাকি ভালো বরফ পড়েনি, তাই এ বার ফুলের সংখ্যাও কম। টিপরা হিমবাহ থেকে বেরিয়ে ভ্যালি চিরে বেরিয়ে এসেছে পুষ্পাবতী নদী। ঘাংঘারিয়াতে লক্ষ্মণগঙ্গার সঙ্গে মিশে লক্ষ্মণগঙ্গা নামেই বয়ে গেছে। এই পুষ্পাবতীর ডান দিক দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে সামনের পাহাড়টায় উঠতে হবে মোটামুটি হাজার ফুট।

অ্যাঞ্জেলিকা

চিন্তা নেই, প্রকৃতি দু’ হাতে ভরিয়ে রেখেছে কোনো কষ্টই হবে না। কিছু বোঝার আগেই দু’পাশ দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবে ওপরে। তার পর রাস্তা সোজা চলে গেছে উত্তর দিকে। তার পর ডানদিকে ঘুরে একটা নালা পেরিয়ে পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত ১০ বর্গ কিলোমিটার ভ্যালির ভেতরে। ১১ থেকে ১২ হাজার ফুট উঁচু এই ভ্যালিতে বড়ো গাছ বলতে শুধু ভূজ। তাও বেশি না। পুরো সবুজে ঢাকা। প্রকৃতির হাতে তৈরি বন্য সৌন্দর্য্য প্রতি বছর নতুন করে সৃষ্টি হয়, আবার শীতকালে চলে যায় বরফের নীচে।

সরু পাপড়িওলা মব রঙের এস্টার্স

এ বার একটু অন্য কিছু দেখি অন্য ভাবে। পিছিয়ে যাই প্রায় ৮৬ বছর — সেই ১৯৩১-এ। এক ইতিহাসের গল্পে, ভুল আর বিপর্যয়ের গল্প। সেটা ছিল ৯ জুলাই,  ঘনঘোর বর্ষাকাল। কামেট অভিযানে গেছিল ৬ জনের ব্রিটিশ টিম, ফ্রাঙ্ক স্মাইথ এবং আর এল হোল্ডসওয়ার্থ-এর নেতৃত্বে। অভিযান সফল, এবার ফেরার পালা। লক্ষ্য বদ্রীনাথের উত্তরে মানা। কিন্তু প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ধ্বসে রাস্তা প্রায় উধাও। অবশেষে অনেক ঘুরে পথ ভুল করে তাঁরা এসে পৌঁছোন ভুন্ডার খাল পেরিয়ে একটা উপত্যকায়। তখন না ছিল স্যাটেলাইট, না ছিল মোবাইল বা স্যাটফোন, না জিপিএস।  অস্ত্র বলতে সেক্সট্যান্ট, কম্প্যাস আর ছাপানো মানচিত্র, তার সঙ্গে অনুমান আর অভিজ্ঞতা। শেষ পর্যন্ত জায়গাটা আইডেন্টিফাই করা হল। এটা ভুন্ডার উপত্যকা বা ভুন্ডার ঘাটি। এখান থেকে কুণ্ডখাল হয়ে বদরি যাওয়া যেতে পারে, কয়েক দিনের মাত্র রাস্তা। তাই ঠিক হল। কিন্তু ওই, সেই সুপ্রাচীন প্রবাদ, মানুষ ভাবে এক….।

নাইফ লাইক মেডো রু, ফুলবাহার

স্মাইথকে ওখানেই থেকে যেতে হয়েছিল আরও বেশ কয়েক মাস। কারণ ওরা যখন ওই বুগিয়াল ছাড়ার তোড়জোড় করছেন, ঠিক তখনই মেঘ কেটে গেল। জ্বলজ্বল করছে মাইলের পর মাইল ফুলের ঢল। আগুন রঙের প্রাইমুলা, সরু পাপড়িওয়ালা মব রঙের এস্টার্স, হলদে মার্স মেরিগোল্ড, গোলাপি বলসম, বেগুনি রঙের ক্যাম্পানোলা ল্যাটিফ্লোরা, সাদা এনিমো, লাল ওয়াইল্ড রোজ….। পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ভ্যালিটার প্রেমে পড়ে গেলেন স্মাইথ।

রেড বেরি। শুধু শাঁসটা খেয়ে বীজটা ফেলে দাও

দেশে ফিরে গিয়েও স্মাইথ ভুলতে পারেননি এই উপত্যকাকে। ৬ বছর পর আবার ফিরে আসা এই ভুন্ডার ভ্যালিতে। নতুন করে নমুনা জোগাড়। শেষ পর্যন্ত বই লেখা, ‘দ্য ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স’। কিন্তু অভিযাত্রী স্মাইথের পক্ষে সব কিছুর বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই আরও দু’বছর বাদে ১৯৩৯-এ ব্রিটেনের রয়্যাল বটানিক্যাল গার্ডেন ৫৪ বছরের এক মহিলা বটানিস্ট জোয়ান মার্গারেট ল্যেগ এলেন আরও ভালো ভাবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ল্যেগ-এর আবার ছিল না অভিযাত্রী-জীবনের অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা। কাজপাগল বৈজ্ঞানিক ওই বছরেই নমুনা সংগ্রহের সময় পাহাড়ের ওপর থেকে পড়ে মারা যান। তাঁকে ওই ভ্যালিতেই ফুলেদের মাঝে সমাধি দেওয়া হয়। আরো দু’বছর বাদে লেগ্যের দিদি ব্রিটেন থেকে এসে বোনের সমাধিতে একটা ফলক লাগিয়ে দিয়ে যান। তাতে লেখা — I WILL LIFT UP MINE EYES/UNTO THE HILLS,/FROM WHENCE COMETH/MY HELP।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here