ফার… ফল সমেত।

শ্যামল বৈরাগী

এর পর পথের বর্ণনা আর কী দেব? পুরোটাই তো ছবি। শুধু মনটা বড়োই খচখচ করছে, ওরে আজকের মতো দিনেও এত দেরি করে কেউ? পাহাড়ের ওপর দিকে মেঘ জমে থাকলেও মোটামুটি ওয়েদার পরিষ্কার। সামনে দিয়ে এসে পুষ্পাবতী আমাদের বাঁ দিক দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। কখনও খুব কাছে, কখনও বা একটু দূরে। নদীর ডান দিক আর বাঁ দিক হিসেব হয়, তার গতিমুখের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে তোমার যে দিকে যে দিক পড়ছে তার ওপর। আর এখানে আমি আমাদের হিসেবে বলছি, নদীর হিসেবে নয়। আমরা উঠছি নদীর স্রোতের উলটো মুখে।

আমাদের ডান দিকের পাহাড়টাও সব সময় রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষে ওঠেনি। কোথাও সূর্যমুখীর আর এক জাতভাই শৌয় ইনুলা তার সরু সরু পাপড়ি নিয়ে হলদে হয়ে ফুটে আছে, কোথাও ফুল ছাড়া রডোডেনড্রন সবুজ পাতা মেলে রেখেছে। গাইডের সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রথমেই চেতনা জাগল যে, আমরা ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স যাচ্ছি, অতএব শুধু ফুল দেখব, এটা মাথায় নেওয়াটাই ভুল। আমরা যাচ্ছি প্রকৃতিকে জানতে, হিমালয়কে চিনতে আর নিজেদের আবিষ্কার করতে। সেখানে গাঢ় বেগুনি আর মেরুন হাত্তাজড়ি-র মতো যেমন দেড়ফুটিয়া বড়ো অর্কিড পাবে তেমনই ছোট্টো নীল তারার মতো ‘ফরগেট মি নট’ পাথরের খাঁজ থেকে উঁকি মারছে। আর সকলের ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে সবুজের নানা ভ্যারিয়েশন, ভাবা যায় না। সবুজ, গাঢ় সবুজ, হালকা সবুজ, হলদেটে সবুজ, নীল মেশানো সবুজ, অন্ধকারের ঘন সবুজ, রোদ লাগা চকচকে সবুজ কিংবা জলে ভেজা চিকচিকে সবুজ…. এক কথায় সেই প্যালার ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, না দেখলে তবু বিশ্বাস করা যেত, কিন্তু দেখলে একদমই বিশ্বাস করা যায় না।

বেরি গাছে লাল লাল ফল হয়ে আছে, কোনওটা খাওয়া যায়, কোনওটা যায় না। গাইড বলল, ওপরের শাঁসটা খেয়ে বীজ ফেলে দিতে। টক-মিষ্টি-কষা মেশানো স্বাদ। খুব ভালো ওষধি গুণ আছে এর, বিশেষ করে ইউরিক অ্যাসিড আছে যাদের, তাদের জন্য খুব উপকারী।

হিমালয়ান স্নোবেরি।

পাথরের খাঁজ থেকে বেরিয়ে আছে ছোট্টো গাছ, নীল রঙের ছোটো ক্যাপসিকাম-এর মতো ফলের হিমালয়ান স্নোবেরি বা গল্থেরিয়া ট্রাইকোফিল্লা, হালকা গোলাপি আর সাদা মেশানো ফুল হয়, এর পাতায় ইউক্যালিপটাসের গন্ধ, কাশি আর ঘায়ের ওষুধ তৈরি হয় এর থেকে। এ ছাড়া আছে ছত্রাক, মস, ফার্ন।

মাছের আঁশের মতো মস।

পাথরের গায়ে এক ধরনের মাছের আঁশের মতো মস হয়, এর আগে প্রচুর দেখেছি অনেক জায়গায়, কিন্তু জানতাম না যে এর থেকে মেহেন্দি তৈরি করে এখানকার মেয়েরা হাতে লাগায়। আবার লাল ছড়ানো পাতা নিয়ে ম্যাপল বা সরু পাতাওয়ালা পাইনের মতো বড়ো গাছও আছে। আর আছে তাদের গায়ে জড়িয়ে থাকা সবুজ লতা, তাদের গায়েই জন্মানো ভেলভেট মস আর ফার্ন। শুধু তা-ই? বলসামেরই কত রকম প্রকার ভেদ, সাদা বলসাম, হলদে বলসাম, সাদা-গোলাপি বলসাম। গাইড একের পর এক বলতে বলতে যায়, আর আমার সব ঘেঁটে যেতে থাকে। এত কিছু মনে রাখব কী করে? সঙ্গে একটা ভিডিও ক্যামেরা থাকলেও না হয় ছবি-সমেত ওর কথা রেকর্ড করে রাখা যেত। ইচ্ছে করেই কাগজ কলম আনিনি। কোনও লাভ হত না। দেখব, না শুনব, না শিখব, না লিখব? আর তার সঙ্গে ক্যামেরা, আর এক ঝামেলা। এক বার মনে হচ্ছে ১৮-৫৫ লেন্স লাগাই, আবার মনে হচ্ছে এক্ষুনি ৫৫-২৫০-টা লাগানো দরকার। সত্যিই ঘেঁটে যাবার মতো অবস্থা। এখনও এক কিলোমিটারই আসিনি। এখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। বুঝতে পারছি, কেন একেবারে ৩ দিনের জন্য ১৫০ টাকা নিল, মানে অন্তত ৩ দিন না এলে লাভ নেই কোনও।

ডান দিক থেকে নেমে এসেছে সরু একটা নালা। রাস্তার ধারে যে লোহার রেলিং দেওয়া আছে, সেই এক খানাকে উপড়ে এনে তার ওপর শুইয়ে দিয়েছে। এটাই এখানকার ইন্সট্যান্ট ব্রিজ।

একেবারে যেন মোষের মাথা।

নালা পেরিয়ে আবার একই রাস্তা একটু একটু করে ওপর দিকে উঠছে। ডাইনে বাঁয়ে দু’দিকেই জঙ্গল। হঠাৎই একটা পড়ে থাকা মড়া গাছের গুঁড়িকে দেখিয়ে গাইড বলল, ঠিক সে দেখিয়ে…. । ভুল করে দেখার কোনও প্রশ্নই নেই, একেবারে যেন মোষের মাথা। চোখ, মুখ, সিং কান সব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

মড়া গাছের গায়ে মাশরুম হয়ে আছে। গাইড বলছে, যেগুলোর মাথা গোল বলের মতো সেগুলো বিষাক্ত হয়।

কিন্তু যাদের মাথা ছাতার মতো সেগুলো খাওয়া যায়।

আমিও খুঁজে পেতে একটা মাশরুম বের করলাম, যার মাথা ঝড়ে উলটে যাওয়া ছাতার মতো। বলল, ওটা খেলে নাকি নেশা হয়। আর যায় কোথা? দলের সবক’টা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, কোথায়? কোথায়? কোনটা দেখি?…যেন এক্ষুনি উপড়ে খেয়ে নেবে।

এটা জানকাস। জানকাস থমাসি।

সরু সরু ঘাসের ডাঁটির মাথায় সাদা ফুল, এটা জিনসেং। আমি তো লাফিয়ে উঠলাম… এটা? সেই যার শেকড় থেকে এনার্জি স্টিমুলেটর তৈরি হয়? ওই যেটা চায়না, সাইবেরিয়া আর ইন্ডিয়াতে পাওয়া যায়? চায়নারটা ব্যান করা হয়েছে নাকি… ওটা সেক্স-স্টিমুলেটর হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছিল বলে? সাইবেরিয়ানটা বাজারে চলে… আর আনফরচুনেটলি ইন্ডিয়ারটার খবর জানি না। পাশ থেকে ‘হ্যাস’ কানে কানে বলল, চেপে যা, এটা জিনসেং নয়। এটা জানকাস। জানকাস থমাসি। ও ঠিকই বলেছে, তোর শুধু মাথাই যায়নি, সঙ্গে কানটাও গেছে। এটা থেকে হার্ট, লাং, ব্লাডার আর স্মল ইন্টেনস্টাইনের অনেক রকম ওষুধ তৈরি হয়। ডায়াবেটিস, শরীরে বিভিন্ন জায়গায় জল জমা, বিশেষ ধরনের জন্ডিস, ইনসমনিয়া, রাতে ভয় পাওয়া, মুখে ঘা, ট্রমা … কী সারে না এতে? তোর ওই জিনসেং-এর থেকে অনেক বেশি কাজের। চায়নাতে আগে এর প্রচুর ব্যবহার হত। জিনসেং একটা গাছের রুট, আদা আর গাজরের মাঝামাঝি দেখতে। তোর মনে হয়, এই চিমড়ে ঘাস বাচ্চার ওই রকম রুট হবে?

খুব প্রেস্টিজে লাগল আমার। জানি তুই সব ব্যপারে মাস্টারপিস, আমার কম্পিউটার জ্ঞান তোর কাছ থেকে পাওয়া, নেচার স্টাডি তোর কাছ থেকে শেখা, হতে পারে আমি একটু হাউড়ে হয়ে ভুল বকে ফেলেছি… তা বলে… সকলের সামনে…। চুপচাপ কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আস্তে আস্তে সরে গেলাম।

পাশে একটা পাইনের গুঁড়িতে বেশ বড়োসড়ো মানুষপ্রমাণ কোটর। তার ভেতরে জনগণ মস ছিঁড়ে গদি পেতে রেখেছে। সোজা গিয়ে সেই কোটরে ঢুকে বসে রইলুম।

বার-টেলড ট্রিক্রিপার ।

সামনেই ঝোপের ভেতর থেকে দু’বার উঁকি মেরে আমাকে ভালো করে দেখে একটা সাহসী বার-টেলড ট্রিক্রিপার জাতীয় পাখি উড়ে এসে বসল উলটো দিকের মরা পাইনের মস জমে যাওয়া সবুজ গুঁড়ির ওপর। ৫৫-২৫০ লেন্সটা লাগিয়ে খুব মন দিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম সেটার। (চলবে)

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here