শ্যামল বৈরাগী

দু’পাশ থেকে নদী আর পাহাড় এসে চেপে ধরল রাস্তাটাকে। আর রাস্তাটাও নীচের দিকে নামতে নামতে রিভার বেড-এ পৌঁছে গেল। গমগম করে নেমে আসছে পুষ্পাবতী, চারিদিকে জলের রেণুর কুয়াশা তৈরি করে। তার ওপর দিয়ে লোহার ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে। আবার ওপর দিকে উঠতে হবে পাক খেতে খেতে। জঙ্গলে পথ। মোটামুটি চড়াই মন্দ না। সিলভার ফার, ঝাউ, পাইন, ম্যাপলের সঙ্গে মাঝে মাঝে বার্চ বা ভুজ গাছও ছড়িয়ে আছে। গাইড বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে, আমিও তাড়াতাড়ি এগোলাম। সকলে একটু পেছনেই আছে। কিছুদূর গিয়ে দেখি একটা ম্যাপলের ছায়ায় বসে আছে সবাই। ঝিঁঝিঁ ডাকছে চারিদিকে। আমিও ধপাস করে বসে পড়লুম ওর পাশে। আমসত্ব আর শুকনো খেজুর ভাগ করে খেলাম ওর সঙ্গে। ও বোঝাতে থাকল, ম্যাপলের আলাদা আলাদা জাত আর তাদের পাতার পার্থক্য।

ভুজ গাছের খয়েরি-সাদা ডালে একটা ইঞ্চি দু’য়ের পোকা

সামনের ভুজ গাছের খয়েরি-সাদা ডালে একটা ইঞ্চি দু’য়ের পোকা উড়ে এসে বসল কোত্থেকে, ও বলল এটাই ওই ঝিঁঝিঁ, যেগুলো সারা জঙ্গল মাথায় করে রেখেছে। এক জায়গায় বসে শুধু ডানা কাঁপিয়েই ওই রকম আওয়াজ? গায়ে কালচে খয়েরির ওপর সাদার ছিট। ভালো ভাবে ছবি তোলার আগেই ফুড়ুৎ।

অ্যাঞ্জেলিকা।

পাশে একটা ছোটো গাছে লম্বা ডাঁটির মাথায় ছাতার মতো হয়ে অজস্র ছোট্টো ছোট্টো সাদা ফুল ফুটে আছে। আর তাদের ওপর নানা ধরনের মাছি এক সঙ্গে বসে ভোজ লাগিয়েছে। গাইড বলল, অ্যাঞ্জেলিকা। প্রচুর আছে এই পথে। অপূর্ব সুন্দর ফুল।

দূরে দেখা যায় হেমকুণ্ডের পথ।

সবাই এসে গেছে। দমে একটু টান পড়েছে। একটু রেস্ট নিয়ে আবার ওঠা শুরু। দূরে উলটো দিকের খাড়াই পাহাড়ের গায়ে হেমকুণ্ড যাওয়ার রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে, উঠে গেছে ঘুরে ঘুরে। ছোটো ছোটো দোকান বা লোকজনও বুঝতে পারা যাচ্ছে। পাশ দিয়ে লক্ষ্মণগঙ্গা নামছে, পাশাপাশি আরও কয়েকটা ঝরনা আছে। টেলি দিয়ে দেখলে তো সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সরু কিন্তু খুব সুন্দর আর পরিষ্কার রাস্তা। গাছের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। আর সেখান দিয়ে রোদ এসে একটা আলো-ছায়ার সুন্দর মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

ফরগেট মি নট!

নীল তারা দেখেছ আকাশে? রাস্তার ধারে ফুটে আছে। ছোট্টো একটা ফুলের ছোট্টো ছোট্টো আকাশি নীল পাঁচটা পাপড়ি। তাদের মাঝে ছোট্টো একটা সাদা তারা আর সেই তারার মাঝে হলদের ওপর ঘন কালচে খয়েরি।

– ফরগেট মি নট। গাইড বললে।

– ক্যা? আমারও মুখ থেকে আপনা থেকে বেরিয়ে এল।

– ইস ফুল কা ওহি নাম হ্যায়।

– ‘ফরগেট মি নট’, ফুলের নাম! ওরে এর পর আর তোকে ভুলব কী করে।

বুনো গোলাপ।

যত উঠছি, অন্য সমস্ত বড় গাছের সংখ্যা কমছে। সে জায়গায় বাড়ছে ভুজ গাছের সংখ্যা। আমার ছিঁড়ে যাওয়া মন আবার ভালো হতে শুরু করেছে। আর তিনটে বাঁক নিলেই চড়াই শেষ। রাস্তা বেশ সরু, তার ওপর বাঁ দিকের পাহাড় থেকে ভুজ গাছগুলো এমন ভাবে ঝুলে এসেছে যে সাবধানে না চললে মাথায় ঠোক্কর খাওয়া আটকায় কে? একটু বসলাম। সামনেই একটা গাছে গোলাপি বুনো গোলাপ ফুটে আছে।

ইয়েলো-ব্রেস্টেড গ্রিনফিঞ্চ।

তার ওপরের ভুজ গাছের ঝোপে কতগুলো ইয়েলো-ব্রেস্টেড গ্রিনফিঞ্চ ওড়াউড়ি করছে পোকা খাওয়ার জন্য। ছোট্টো গোলগাল চড়াইয়ের মতো দেখতে। পিঠও, লেজ চড়াইয়ের মতো, কিন্তু বাকি শরীরটা বাসন্তী হলুদ। সত্যি বলতে এটাকে একটা আমেরিকান পাখি ইয়েলো-ব্রেস্টেড চ্যাট-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। হুবহু এক দেখতে। গাইড আবার গাইড করল।

সাদা বেলফুলের মতো থোকা থোকা ফুল

পাশের ঝোপে সাদা বেলফুলের মতো থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। পুরো ফুটে যাওয়া ফুলগুলোর ভেতর থেকে হলদে রঙের পুংকেশরগুলো বেরিয়ে এসেছে। পোকা আর মাছিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের ওপর। সাহস করে আর এর নাম জানতে চাইলাম না। সব ঘেঁটে যাচ্ছে। খাতায়কলমে ৫৩১ রকমের গাছগাছড়া আছে এখানে। আমার এমনিতেই মাথার ব্যামো, আর পাগল হওয়ার সাধ নেই।

ভ্যালিটা ইংরিজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো ।

এখান থেকে ভ্যালিটা দেখা যাচ্ছে ওই দূরে…. মাথার ওপর সাদা মেঘ ঢেকে আছে। দু’পাশের পাহাড় ইংরিজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো নেমে এসেছে। নীচে সবুজে মোড়া উপত্যকার মাঝ দিয়ে চিরে বেরিয়ে এসেছে পুষ্পাবতী, তার সাদা জলের ধারা নিয়ে। তার দু’পাড়ে ঘন সবুজে মোড়া ভুজগাছের জঙ্গল।

এর পরের রাস্তা মোটামুটি সমান হলেও সব জায়গা খুব নিরাপদ নয়। রক-ফল জোন আছে একটা। যেখানে ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার চান্স আছে। এ রকম দু’-একটা জায়গা অবশ্য অলরেড়ি পেরিয়ে এসেছি। এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে এক এক জায়গায় এক এক রঙের ফুলের বাহার। যদিও সব জায়গাতেই সব গাছ মিলেমিশে আছে, তবু…. কোথাও নীল, কোথাও সাদা, কোথাও হলুদ, কোথাও লাল …।

আজকের এই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বা ভুন্ডার ঘাটী বা ফুলোঁ কী ঘাটি, যাই বল না কেন, পুরাণে নাকি একে ইন্দ্রের বাগান নন্দনকানন বলা হত। আমি না, গাইড বলল।

রাস্তাটা এ বার এক নালার ওপর রেলিং ওপড়ানো সাঁকো পেরিয়ে সোজা পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত।

রাস্তাটা এতক্ষণ উত্তরমুখী ছিল, এ বার একটা ডান দিকে টার্ন নিয়ে দুদ্দাড় করে নেমে আসা এক নালার ওপর রেলিং ওপড়ানো সাঁকো পেরিয়ে সোজা পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ভ্যালির ভেতর। দু’পাশে বলসামের জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে পাথর বসানো সরু রাস্তা। রাস্তাতে আর একটু এগোলেই বাঁ দিকে একটা পাথরের চত্বর, তারই একটা ওভারহ্যাং-এর নীচে লাঞ্চ করব ঠিক করলাম। একটা বেজে গেছে। খিদেও পেয়েছে। শুধু নিজের নয়, টিমের সকলের জন্যই একটু রেস্ট আর খাবার দরকার। ‘হ্যাস’ আর ‘ডক’ আসেনি এখনও। চিন্তা নেই, পৌঁছে যাবে একটু পরেই।

কাউকে কিছু বলতে হল না, সবাই যে যার নিজের মতো করে পরোটা আর আচার নিয়ে বসে গেল। সকলেই বুঝে গেছে যে এখানে বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না। অন্য যে সমস্ত গ্রুপ এসেছিল, তাদের অনেকেই ফেরার রাস্তা ধরেছে অথচ আমরা এখনও সবে ভ্যালির দোরগোড়ায়। এখনও ওয়েদার ঠিকঠাক আছে, কিন্তু যে কোনো সময় মেঘ ঢুকতে পারে।

সবাই খেয়েদেয়ে রেডি। কিন্তু এখনও এ দুটো এল না কেন? সত্যিই চিন্তা হচ্ছে। সবাইকে এগোতে বলে আমি উলটো রাস্তা ধরলাম। দেখি দু’জনে রেলিং-ভাঙা সাঁকো পেরোচ্ছে। ‘ডক’ ডান পা-টা একটু টেনে চলছে। বলল, একটু টান ধরেছে। ব্যথার মলম লাগাতে বললাম। না হলে ডুলি আছে, পিঠে করে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডুলির নাম শুনেই ‘ডক’ খাড়া হয়ে গেল।

রাস্তার দু’ ধারে মানুষ সমান উঁচু গাছ হয়ে আছে। বাকিরা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। তাড়াতাড়িই ধরে ফেললাম। গাইড ওদের কী একটা দেখাচ্ছে। আমার ছানা আমাকে একটা বলসামের পাকা শুঁটি দেখিয়ে বললে, মা, ধরো ধরো এটাকে দু’পাশ থেকে দু’ আঙুলে। ছোট্টো ইঞ্চি তিনেকের সরু বিনকড়াইয়ের মতো শুঁটিটা ধরলাম।

– এ বার দু’পাশ থেকে চাপ দাও আস্তে আস্তে। দাও দাও আর একটু দাও।

ছোট্টো ইঞ্চি তিনেকের সরু বিনকড়াইয়ের মতো শুঁটি।

চাপ দিলাম একটু। তার পরই হঠাৎ চিড়িং করে কারেন্ট খাওয়ার মতো ঝটকা খেলাম আর শুঁটিটা ফেটে গিয়ে ভেতরের সাদা সাদা বীজগুলো ছড়িয়ে পড়ল। আচমকা এই ঝটকাতেই চমকে উঠেছিলাম। কানের কাছে হ্যাহ্যাহ্যাহ্যা শুনে বুঝলাম মুরগি হয়েছি। একেবারে কান এঁটো করা হাসি, দাঁত-মাড়ি সব বেরিয়ে পড়েছে, টাকরা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে একদম। তারপর হাসি চাপতে গিয়ে গিঁক গিঁক করে গলা থেকে আওয়াজ, যেন ঘরের পাশে ধেড়ে ইঁদুর ডাকছে। ওর অবস্থা দেখে আমিও হেসে ফেললাম। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here