শ্যামল বৈরাগী

গাইড ধরে ধরে বিভিন্ন ধরনের অর্কিড বোঝাচ্ছিল, কোনোটায় হলুদ, কোনোটায় সবুজ, কোনোটায় বা কালো ফুল ফুটে আছে। কারও পাপড়ি পাতলা ফিনফিনে, প্রায় ট্রান্সপারেন্ট, কারও বা মোটা পুরু। লম্বা ডাঁটির মাথায় অদ্ভুত এক বেগুনি গোলাপি মেশানো লম্বা লম্বা জড়ামড়ি করা পাপড়িওলা ফুল। নাম হাত্তাজড়ি, মানে অনেকগুলো হাত নাকি জড়িয়ে আছে। একটু কষ্ট করে হলেও মেনে নিলাম উপমাটা। ব্রহ্মকমলের মতো এর থেকেও নাকি শরীর গরম করার ওষুধ তৈরি হয়। এটা আবার চোরেদের খুব প্রিয় (কেন জানি না, গাইড বলল, তাই আমিও বলে দিলাম)।

এর নাম হাত্তাজড়ি।
বেগুনি রঙের বিষ ফুল, অ্যাকোনাইট।

পাশেই শুকিয়ে যাওয়া খয়েরি রঙের একটা ফুল। ব্রহ্মকমলের আর এক জাত। একটু দূরে লম্বা ডাঁটির মাথায় বেগুনি রঙের বিষ ফুল, অ্যাকোনাইট। হোমিওপ্যাথি ওষুধ অ্যাকোনাইট-ন্যাপ এর থেকে তৈরি হয়।

এক রকম ছোট্টো ছোট্টো বলের মতো ফাঁপা ফুল।

সাদা ছাতার অ্যাঞ্জেলিকায় ভরে আছে এক একটা এলাকা। তার নীচে বেগুনি রঙের পাঁচ পাপড়ির ম্যাডাও জেরেনিয়াম, পাপড়িগুলোর গায়ের ঘন গোলাপি শিরা এক অন্য সৌন্দর্য্য এনেছে। এক রকম ছোট্টো ছোট্টো বলের মতো ফাঁপা ফুল। একটু শুকনো যেগুলো, সেগুলো ঠক করে কপালে ঠুকে দিলেই ফট করে শব্দ করে ফেটে যাচ্ছে, নামটা সম্ভবত মাস্ক লার্ক্সপুর।

লম্বা ডাঁটির মাঝে মাঝে ডাঁটিটাকে চারিদিকে ঘিরে ফুল

একটা কাঁটাওলা লম্বা পাতার গাছ হিমালয়ান মাল্টি স্টোরিড ফুল, মোরিনা লঙ্গিফ্লোরিয়া। লম্বা ডাঁটির মাঝে মাঝে ডাঁটিটাকে চারিদিকে ঘিরে ফুল হয়। কিছুটা ছেড়ে আবার এক থোকা। এটাকে হিমালায়ন হর্লফ্লাওয়ারও (Himalayan Whorlflower) বলে। বলতে সাহস পেলাম না, এটা আমি পুরুলিয়ার মাঠেও দেখেছি। তার সঙ্গে এর কোনও …. থাকগে। আবার কী বলতে কী বলে বসবে।

একটা বৈশিষ্ট্য অনেক ফুলের মধ্যেই খেয়াল করছি, একটা লোমশ ভাব। যেন মাকড়সাতে আষ্টেপিষ্টে জাল বুনেছে। শুধু ফুলেই নয়, অনেক গাছের পাতায় বা ডালেও এই ‘হেয়ারি’ ব্যপারটা আছে।

হিমালয়ান ওনিয়ন-এর ওপর প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে।

ইতিমধ্যে আমরা দু’টো নালা পেরিয়ে এসেছি। এক জায়গায় সরু ঘন গোলাপি পাপড়ির হিমালয়ান ওনিয়ন-এর ওপর প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে। অত্যন্ত উপকারী গাছ। এর যে বালব্‌টা হয়, সেটা কাঁচা চিবিয়ে খেলে ঠান্ডা লাগা বা কফ-এর অব্যর্থ ওষুধ। অলটিটুড সিকনেসেও ভালো কাজ দেয়। আর ঘি দিয়ে জাল টাল দিয়ে প্রসেস করলে সেটা আবার কলেরা আর ডাইরিয়া সারায়। এটা নিয়মিত খাবার সঙ্গে খেলে হজমশক্তি বাড়ায়, ব্লাড কোলেস্টরেল সারায় এমনকি শরীরের যে সংবহন তন্ত্র আছে, সেটাও ঠিকঠাক রাখে। আমি ভাবছিলাম ওই প্রজাপতিটার কথা। ও কি জানে এত কিছু? ওর শরীরে কি এত কিছু হয়? এ যা দেখছি, শুধু এর চাষ করেই তো দেশটা বড়লোক হয়ে যেতে পারে।

উও হ্যায় ল্যেগি পয়েন্ট।

উও হ্যায় ল্যেগি পয়েন্ট। আধ কিলোমিটার দূরে নীচের দিকে ল্যেগ-এর পাথর বাঁধানো সমাধিটা দেখা যাচ্ছে। ফুলের মধ্যে শুয়ে আছেন জোয়ান মার্গারেট ল্যেগ। মাথার কাছে সাদা পাথরে খোদাই করা —

I WILL LIFT UP MINE EYES/UNTO THE HILLS,/FROM WHENCE COMETH/ MY HELP ।

কখনও কারও কোনো সমাধি দেখে এত মন খারাপ হয়নি, জনমানবহীন এক উপত্যকায় এক গবেষকের সমাধি দেখে যা হল। আর এর সঙ্গেই শেষ হল আমাদের এগনো।

এ বার ফেরার পালা। সামনের যে রাস্তাটা দূরে চলে গেছে ভুন্ডার খালের দিকে, যেখানে টিপরা গ্লেসিয়ার থেকে তৈরি হয়েছে এই পুষ্পাবতী, আর কোনো দিন যাব না সে দিকে। কিন্তু আমার অভিযান তো এখান থেকেই শুরু হয়, সবাই যেখানে শেষ করে, সেখান থেকে। এখনও কত কিছু বাকি রইল দেখার। হয়তো একই জিনিসের রিপিটেশন দেখব, তবু তার ভেতরেও অনেক কিছু নতুনও পাব। রতিজড়ি, জটামসি, কেলন্ধি আরও কত কিছু আছে, কিছুই তো দেখা হল না। এসেছিলাম বর্ষার মধ্যে, তার থেকে ক্রমশ ওয়েদার ভালো হতে শুরু করেছে। কাল গোবিন্দঘাট নামার সময়ে আরো ভালো হয়ে যাবে।

পড়ন্ত বিকেলের আলোয় জনমানবহীন পুরো ভ্যালিটা।

ভ্যালি পুরো ফাঁকা। সবাই ফিরে গেছে। লাস্ট পার্সন কভারার নিজেই লাস্ট আজ। একা একা ফিরছি, ইচ্ছে করছে না, তবু ফিরছি। আকাশে কখনও রোদ, কখনও বৃষ্টি। চার পাশের বলসাম, এঞ্জেলিকা আর ছোট্টো ছোট্টো সাদা ফুলে ভর্তি ডালে হিমালয়ান নটউইড আমার মাথা পর্যন্ত ছেয়ে আছে।

লাঞ্চপয়েন্টের কাছাকাছি আসতেই পরিচিত টোব্যাকোর গন্ধ এল নাকে। কীরে, তুই এ রকম জায়গায় বিড়ি ধরিয়েছিস কেন? চোখে না দেখেই গন্ধগোকুলটার উদ্দেশে বললাম। পাথরের ওপর থেকে উত্তর এল, এ দিক দিয়ে ঘুরে চলে আয়। গিয়ে দেখি, যেখানে বসে খাচ্ছিলাম, প্রায় পনেরো ফুট হাইটের সেই পাথরটার মাথার ওপর উঠে বসে আছে। অন্য দু’টো পাথরের ওপর দিয়ে সুন্দর উঠে আসা গেল চত্বরটাতে। পড়ন্ত বিকেলের আলোতে জনমানবহীন পুরো ভ্যালিটা অপূর্ব লাগছে।

পকেট থেকে একটা পাকানো সিগার বের করে একটু চিন্তিত মুখে বলল, বোস এখানে।

বসলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, কী ভাবছিস?

– তুই যা ভাবছিস।

– মানে? তুই জানিস আমি কী ভাবছি?

– জানতাম না, তোর হাঁটা দেখে জেনে গেছি। একটু আগে পর্যন্ত ডিসিশনটা নিতে পারছিলাম না, এখন নিয়ে নিয়েছি।

সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী?

– তোকে ভুন্ডার নালা ডাকছে।

– হ্যাঁ, তো? খুব সন্দেহজনক লাগছে ওর হাবভাব। ওর এই রকম আচরণের সঙ্গে খুব ভালো পরিচিত আমি। হয় কোনো কেলো পাকিয়েছে, না হলে পাকাতে চলেছে, যার দায়ভার আমার ঘাড়ে চাপাবে।

– না ভাবলাম, টাকা যখন দিয়েইছি,…. আর তোরও যখন মনের সায় নেই, তখন….

– এ বার কিন্তু খুব জোর খাবি। পরিষ্কার করে বলবি কি না?

– আর দু’ দিন থেকেই যাই এখানে বুঝলি? তার পর না হয় এক সঙ্গেই বাড়ি ফিরব? মানে এই ফুলের ভ্যালিতে এসে তোর সঙ্গে যদি ফুলশয্যাই না করলাম….। সো, চিয়ার আপ মাই নাইফ।

সত্যি বলছি, ও যদি বলত, চলো, এক্ষুনি ভুন্ডার নালা থেকে দৌড়ে এক চক্কর মেরে আসি, তা হলেও এত আশ্চর্য হতাম না। মালটা এখনও সেই পাগল রয়ে গেছে… আর ওকে ইন্সপিরেশন জুগিয়েছে ‘ডক’! সঙ্গে এতগুলো লোক আছে, ট্রেনের টিকিট কাটা আছে, একটা দায়িত্ব আছে। ওর নিজেরও কর্মক্ষেত্রে ফেরা আছে। সবই নাকি ও ‘ডক’-এর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নিয়েছে। বাকিদের নিয়ে ‘ডক’ ফিরে যাবে। আর আমরা তিন জনে দেড়শো টাকার টিকিট পুরো উসুল করে তার পর ফেরার চিন্তা করব। মানে এখানে আরও দু’দিন থাকছিই।

সে দিনও ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। অন্ধকার সরু রাস্তায় ঝিঁঝিঁ ডাকছে। বার্চের বেরিয়ে আসা ডালগুলো থেকে মাথা বাঁচিয়ে চলতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে নীচে থেকে মেঘ উঠে আসছে, আবার পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে রাস্তাতে। আমাদের এমনিতে চলতে কোনো অসুবিধে নেই। শুধু চুলগুলো বারে বারে ডিসটার্ব করছে, মাথার ক্লিপটা যে কোথায় হারিয়ে গেল আর খুঁজে পেলাম না। (সমাপ্ত)

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here