Connect with us

দূরে কোথাও

পুজোয় চলুন / খবর অনলাইনের বাছাই : গন্তব্য উত্তর-পূর্ব / ১

১৫ অক্টোবর ষষ্ঠী, দুর্গাপুজো শুরু। আর দিন পনেরো পরেই শুরু হয়ে যাবে পুজোর ছুটিতে ট্রেনের আসনের আগাম সংরক্ষণ। সুতরাং আর দেরি নেই। এখনই করে ফেলতে হবে পুজোর ভ্রমণ পরিকল্পনা। পর্যটন সম্পদে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ। ঘোরার জন্য রয়েছে নামী-অনামী বহু জায়গা। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খবর অনলাইন এ বারও সাজিয়ে দিচ্ছে এক গুচ্ছ ভ্রমণ পরিকল্পনা। শুরু করছে উত্তর-পূর্ব […]

Published

on

১৫ অক্টোবর ষষ্ঠী, দুর্গাপুজো শুরু। আর দিন পনেরো পরেই শুরু হয়ে যাবে পুজোর ছুটিতে ট্রেনের আসনের আগাম সংরক্ষণ। সুতরাং আর দেরি নেই। এখনই করে ফেলতে হবে পুজোর ভ্রমণ পরিকল্পনা। পর্যটন সম্পদে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ। ঘোরার জন্য রয়েছে নামী-অনামী বহু জায়গা। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খবর অনলাইন এ বারও সাজিয়ে দিচ্ছে এক গুচ্ছ ভ্রমণ পরিকল্পনা। শুরু করছে উত্তর-পূর্ব ভারত দিয়ে।

ভ্রমণ-ছক ১ : অসম

প্রথম দিন – গুয়াহাটির উদ্দেশে ট্রেন। গুয়াহাটি যাওয়ার সব থেকে ভালো ট্রেন সরাইঘাট এক্সপ্রেস। প্রতি দিন বিকেল ৩:৫০-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে গুয়াহাটি পৌঁছোয় পরের দিন সকালে ৯:৫০-এ। কামরূপ এক্সপ্রেস প্রতি দিন বিকেল ৫:৩৫-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে গুয়াহাটি পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৩:৩৫-এ। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস প্রতি দিন সকাল ৬:৩৫-এ শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে গুয়াহাটি পৌঁছোয় পরের দিন ভোর ৪টেয়। এ ছাড়াও আরও ট্রেন আছে।

peacock island on brahmaputra

ব্রহ্মপুত্রে পিকক আইল্যান্ড, যেখানে রয়েছে উমানন্দ মন্দির।

Loading videos...

দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন – গুয়াহাটিতে ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস। এখানে অবশ্য দ্রষ্টব্য —

(১) কামাখ্যা মন্দির — শহর থেকে ৯ কিমি দূরে নীলাচল পাহাড়ে কামাখ্যা মন্দির।

(২) ভুবনেশ্বরী মন্দির — কামাখ্যাদেবীকে পুজো দিয়ে চলুন নীলাচল পাহাড়ের মাথায় ভুবনেশ্বরী মন্দিরে। কামাখ্যা থেকে ১ কিমি। ভুবনেশ্বরী মন্দির চত্বর থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য ভোলার নয়।

(৩) নবগ্রহ মন্দির – শহরের প্রাণকেন্দ্রে, নবগ্রহ পাহাড়ের শিরে। এখানে কোনো মূর্তিপুজো হয় না। গ্রহের আকারে পাথরের স্থাপত্য। সেখানেই পুজোর ব্যবস্থা। পাহাড়ের উপর থেকে গুয়াহাটি শহর ও ব্রহ্মপুত্রের অসাধারণ ভিউ।

(৪) উমানন্দ মন্দির — ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝে পিকক আইল্যান্ড। সেখানে উমানন্দ মন্দির। দেবী কামাখ্যার ভৈরব। এখানেই রয়েছে চন্দ্রশেখর মন্দির। কাছারি ঘাট বা ফ্যান্সিবাজার ফেরি ঘাট থেকে বোটে চেপে ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে উমানন্দ যাওয়া এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

(৫) বশিষ্ঠ আশ্রম – শহর থেকে ১২ কিমি দূরে, পাহাড় থেকে নেমে আসা তিনটি ঝরনাধারায় সৃষ্টি হয়েছে বশিষ্ঠ গঙ্গা। কাছেই বশিষ্ঠ মন্দির, শিব মন্দির।

(৬) বালাজি মন্দির – তিরুপতি মন্দিরের আদলে গড়া, শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে ১০ কিমি দূরে লোখরা এলাকায়।

(৭) চিড়িয়াখানা – মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে বন্যজন্তুর সংগ্রহ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। লাগোয়া বটানিক্যাল গার্ডেন।

hajo, assam

হাজো।

চতুর্থ দিন – চলুন তীর্থস্থান হাজো। গুয়াহাটি থেকে দূরত্ব ৩৫ কিমি। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে খুব পবিত্র তীর্থস্থান। দেখুন ‘মণিকূট’ পাহাড়ের মাথায় হয়গ্রীব মাধবমন্দির, মাধব দেউল, পোয়া মক্কা, ‘মদনাচল’ পাহাড়ের মাথায় কেদারেশ্বর মন্দির। হাজো ফেরার পথে ১৬ কিমি দূরে চলুন  শুয়ালকুচি, মুগা শিল্পীদের গ্রাম। শুয়ালকুচি থেকে গুয়াহাটি ৩৫ কিমি। রাত্রিবাস গুয়াহাটি।

train journey to haflong

হাফলং-এর পথে।

পঞ্চম দিন – চলুন কামরূপের খাজুরাহো, মদন কামদেব গুয়াহাটি থেকে ৪০ কিমি। ১০ থেকে ১২ শতকে পাল রাজাদের আমলে তৈরি ২৪টিরও বেশি মন্দিরের কমপ্লেক্স। রাত্রিবাস গুয়াহাটি।

ষষ্ঠ দিন – চলুন শৈলশহর হাফলং দিনের বেলার ট্রেনে, উপভোগ করুন লামডিং-বদরপুর হিল সেকশনের অপার সৌন্দর্য। সপ্তাহে পাঁচ দিন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস, গুয়াহাটি ছাড়ে ভোর ৪.৩৫ মিনিটে, হাফলং পৌঁছোয় সকাল ১১.৫০ মিনিটে। সাপ্তাহিক তিরুঅনন্তপুরম-শিলচর এক্সপ্রেস। প্রতি বুধবার সকাল ৬টায় গুয়াহাটি ছেড়ে দুপুর ১.২০ মিনিটে নিউ হাফলং পৌঁছোয়। নয়াদিল্লি-শিলচর এক্সপ্রেস প্রতি শনিবার সকাল ৯:১০-এ গুয়াহাটি থেকে ছেড়ে, নিউ হাফলং পৌঁছোয় বিকেল ৩:৩৫-এ। রয়েছে নয়াদিল্লি-আগরতলা ত্রিপুরাসুন্দরী এক্সপ্রেস। ট্রেনটি বুধবার চলে। সময় একই। রাত্রিবাস হাফলং।

সপ্তম দিন – হাফলং ঘোরাঘুরি। রাত্রিবাস।

বরাইল পর্বতমালায় ৩০০০ ফুট উচ্চতায় শৈলশহর হাফলং। অসমের একমাত্র হিলস্টেশন। এখানে দেখবেন —

হাফলং লেক, গরম জলের প্রস্রবণ, ঝুলন্ত ব্রিজ, প্রাচীন সার্কিট হাউস, প্রাচীন কালীবাড়ি এবং হাফলং চার্চ। ঘুরে আসতে পারেন ৯ কিমি দূরের জাটিঙ্গা, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কৃষ্ণপক্ষের রাতে পাখিদের আত্মহননের জন্য খ্যাত।

haflong lake

হাফলং লেক।

অষ্টম দিন – আসুন বাঙালির শহর শিলচরে। দূরত্ব ৯৬ কিমি। হাফলং থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসুন শিলচর। ঘোরাঘুরি, রাত্রিবাস শিলচর। হাফলং থেকে ট্রেনেও আসতে পারেন শিলং, তবে চার-পাঁচ ঘন্টা সময় লাগে।

নবম দিন – সারা দিন শিলচর ঘোরাঘুরি। রাত্রিবাস শিলচর।

শিলচরে দেখবেন বরাক নদীর পাড় থেকে সূর্যোদয়, গান্ধী বাগে ভাষা আন্দোলনের শহিদ স্তম্ভ, কাছাড় ক্লাব, কাছাড়ি রাজবাড়ি, দোলু লেক, ইসকন মন্দির, ২০ কিমি দূরে খাসপুরে ডিমাসা রাজাদের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, কাঁচাকান্তি কালীমন্দির (শহর থেকে ১৭ কিমি)।

দশম দিন – ঘরপানে রওনা। সোম, বুধ ও শুক্রবার কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। সকাল সাড়ে ১০টায় শিলচর ছেড়ে শিয়ালদহ পৌঁছোয় পরের দিন সন্ধে ৭.২৫ মিনিটে। তিরুঅনন্তপুরম আসার ট্রেন সপ্তাহে দু’ দিন, মঙ্গল ও বৃহস্পতি। ছাড়ে রাত ৭.৫৫ মিনিটে, হাওড়া পরের দিন রাত ১২.৪৫ মিনিটে পৌঁছোয়। তিরুঅনন্তপুরম পৌঁছোয় পরের পরের দিন রাত ১০.৪০ মিনিটে। এই ট্রেনটি ৩৯৩০ কিমি দৌড়োয়। শিলচর থেকে দিল্লি আসার সাপ্তাহিক ট্রেন ছাড়ে সোমবার। এ ছাড়া গুয়াহাটি এসে দেশের সব জায়গার ট্রেন ধরা যায়। বিমানেও ফিরতে পারেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে গুয়াহাটি শহরে ঘুরে নিন। গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে আসুন হাফলং। হাফলং শহরে ঘোরাঘুরির জন্য অটো, জিপ বা অন্য গাড়ি মেলে। একটা গাড়ি ভাড়া করে শিলচর চলে আসুন। শিলচরে ঘুরুন স্থানীয় যানে।

কোথায় থাকবেন

গুয়াহাটি স্টেশনের কাছেই রয়েছে অসম পর্যটক উন্নয়ন নিগমের প্রশান্তি টুরিস্ট লজ। হাফলং-এ রয়েছে অসম পর্যটন উন্নয়ন নিগমের টুরিস্ট লজ। শিলচরে আছে প্রশান্তি টুরিস্ট লজ। কিন্তু অনলাইনে বুকিং-এর কোনো ব্যবস্থা নেই। বুকিংয়ের জন্য অসম পর্যটনে যোগাযোগ ০৩৬১-২৫৪৭১০২/২৫৪২৭৪৮/২৫৪৪৪৭৫ কলকাতা অফিসে যোগাযোগ ০৩৩-২২২৯৫০৯৪

এ ছাড়া তিনটি শহরেই বিভিন্ন মানের বিভিন্ন দামের বেসরকারি হোটেল রয়েছে। খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

silchar rly station

শিলছর স্টেশন।

মনে রাখবেন

(১) ষষ্ঠ দিন দুপুরের মধ্যে হাফলং পৌঁছতে পারলে সপ্তম দিন দুপুরের খাওয়া সেরে শিলচর রওনা হন। সে ক্ষেত্রে বিকেলে শিলচরে পৌঁছে যাবেন। সপ্তম ও অষ্টম দিন শিলচরে কাটিয়ে নবম দিন ঘরে ফেরার ট্রেন ধরতে পারেন।

(২) যদি শিলচর থেকে বিমানে ফেরেন তা হলে নবম দিন বিকেলেই ঘরপানে রওনা হতে পারেন।

(৩) হাতে কয়েকটা দিন থাকলে শিলচর থেকে চলে যাওয়া যায় শিলং, ২১৫ কিমি। মেঘালয় পরিবহণের নানা ধরনের বাস এই রুটে চলে নিয়মিত। শিলং পৌঁছে ভ্রমণ ছক ২-এর মতো করে ঘোরা যায়। অথবা শুধু শিলং-চেরাপুঞ্জি ঘুরে গুয়াহাটি চলে আসা যায়।

(৪) গুয়াহাটিতে কামাখ্যা মন্দিরের খোলা-বন্ধের সময় আগাম জেনে নিলে বেড়ানোর প্ল্যান করতে সুবিধা হবে।

(৫) উমানন্দ মন্দির সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা।

(৬) হাতে কম সময় থাকলে একই দিনে হাজো ও মদন কামদেব ঘুরে আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শুয়ালকুচি বাদ দিতে পারেন। একটা গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে ৩৫ কিমি দূরে হাজো চলুন। হাজো ঘুরে চলুন ৩৩ কিমি দূরে মদন কামদেব। সেখান থেকে গুয়াহাটি ফিরুন, ৪০ কিমি।

(৬) ট্রেনের সময়সূচির জন্য দেখে নিন erail.in । 

double decker root bridge

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ।

ভ্রমণ- ছক ২ : অসম-মেঘালয়

প্রথম থেকে তৃতীয় দিনভ্রমণ-ছক ১-এর মতো।

চতুর্থ দিন – একটা গাড়ি নিয়ে যাত্রা করুন শিলং-এর উদ্দেশে। দূরত্ব ৯৯ কিমি। গুয়াহাটি থেকে নিয়মিত বাসও আছে। পথে পড়বে উমিয়াম লেক তথা বড়াপানি। রাত্রিবাস শিলং।

পঞ্চম দিন — আজও থাকুন শিলং-এ। দেখে নিন —

(১) ওয়ার্ডস লেক ও বোটানিল্যাল গার্ডেন। (২) ক্যাথলিক ক্যাথিড্রাল। (৩) ১০ কিমি দূরে শিলং পিক (৬৪৪৫ ফুট)। (৪) শিলং পিক যাওয়ার পথেই এলিফ্যান্ট ফলস্‌। (৫) শিলং গলফ্‌ কোর্স। (৬) ৫ কিমি দূরে বিশপ ও বিডন ফলস। (৭) রিবং-এ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি-বিজড়িত ‘মালঞ্চ’ বাড়ি। (৮) ওয়াংখার বাটারফ্লাই মিউজিয়াম ইত্যাদি।

wards lake

ওয়ার্ডস লেক।

ষষ্ঠ দিন – খাসি পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে শিলং থেকে চলুন চেরাপুঞ্জি। দূরত্ব ৫৪ কিমি। চেরাপুঞ্জিতে দেখুন রামকৃষ্ণ মিশন (চেরাপুঞ্জির একটু আগে), নোহকালিকাই ফলস্‌, ইকো পার্ক, সেভেন সিস্টার ফলস্‌, খাংখারাং পার্ক, নংগিথিয়াং ফলস্‌, মওসমাই কেভ, ধাপে ধাপে তিন ধাপে নামা কেইনরাম ফলস্‌ (সেলার পথে ১০ কিমি, মেঘালয়ের সর্বোচ্চ) এবং ডবল ডেকার রুট ব্রিজ। রাত্রিবাস চেরাপুঞ্জি।

সপ্তম দিন – চলুন মওলিননং। এশিয়ার সব থেকে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। চেরাপুঞ্জি থেকে দূরত্ব ৮০ কিমি। গ্রামের মাঝে সুন্দর চার্চ, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে থাইলাং নদী। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ থাইলাং-এর ওপর লিভিং রুট ব্রিজ। আরও দু’টি দ্রষ্টব্য ব্যালান্সিং রক এবং স্কাই ভিউ পয়েন্ট। রাত্রিবাস মওলিননং।

mawlynnong

মওলিননং।

অষ্টম দিন – মওলিননং থেকে চলুন বাংলাদেশ সীমান্তে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য ডাওকি। দুরত্ব ৩০ কিমি। ডাওকি দেখে ১০ কিমি দূরে সিনডাই গুহা দেখে নিতে পারেন। এ বার ফিরে চলুন শিলং হয়ে গুয়াহাটি। দূরত্ব ১৮০ কিমি। রাত্রিবাস গুয়াহাটি।

নবম দিন – বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরুন। প্রতিদিন দুপুর সাড়ে বারোটায় গুয়াহাটি থেকে ছেড়ে পরের দিন ভোর ৫:১০-এ হাওড়া পৌঁছোয় সরাইঘাট এক্সপ্রেস। কামরূপ এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকাল ৭.৪৫-এ গুয়াহাটি থেকে ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় পরের দিন ভোর ৫:৪৫-এ। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত ১০:৫৫-এ গুয়াহাটি  থেকে ছেড়ে শিয়ালদহ পৌঁছোয় পরের দিন সন্ধ্যা ৭:২৫-এ। দেশের অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার জন্যও ট্রেন পাবেন গুয়াহাটি থেকে। এ ছাড়া দেশের সব বড়ো শহরের সঙ্গে গুয়াহাটির বিমান যোগাযোগ তো আছেই।

কী ভাবে ঘুরবেন

(১) গুয়াহাটিতে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে ঘুরে নেওয়াই সব থেকে ভালো। গুয়াহাটি থেকে শিলং বাসে আসতে পারেন। তার পর লোকাল ট্যাক্সিতে শিলং ঘুরে নিয়ে ওই গাড়ি নিয়েই চেরাপুঞ্জি-মাওলিননং ঘুরে এসে শিলং ছেড়ে দিন। শিলং থেকে বাসে ফিরুন গুয়াহাটি।

(২) শিলং-এ পুলিশবাজার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গাড়ি ভাড়ার তালিকা দেওয়া আছে।

india-bangladesh at dawki

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ডাওকি।

কোথায় থাকবেন

গুয়াহাটিতে থাকা নিয়ে ভ্রমণ-ছক ১ দেখুন।

শিলং শহর জুড়ে হোটেলের ছড়াছড়ি। মেঘালয় পর্যটনের হোটেল পাইনউড (০৩৬৪-২২২৩১১৬), হোটেল অর্কিড (০৩৬৪-২২২৪৯৩৩)। অনলাইনে বুক করতে পারেন mtdc.nic.in

চেরাপুঞ্জিতে থাকার ভালো জায়গা চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসর্ট (০৯৪৩৬১১৫৯২৫) আর মাওলিননং-এ থাকুন মাওলিনং গেস্টহাউজ (০৯৮৩০২০৩৯৭৩), ইলা জঙ্গ গেস্টহাউজ (০৯৬১৫০৪৩০২৭) বা স্কাই ভিউ গেস্টহাউজে (০৮৭৩১০৯৫৮০৭, ০৮৫৭৫৬১৫৮৭৭)।

আরও হোটেলের সন্ধান পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

malancha house

রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত ‘মালঞ্চ’।

মনে রাখবেন

(১) ডবল ডেকার রুট ব্রিজ যেতে হলে সিঁড়ি দিয়ে ২৫০০ ফুট নামতে হবে আবার উঠে আসতে হবে। মোটামুটি একটা দিনের ধাক্কা। সুতরাং ডবল ডেকার রুট ব্রিজ দেখতে হলে চেরাপুঞ্জিতে আরও একটা দিন থাকা বাঞ্ছনীয়। আর হাঁটুর জোর থাকলেই এ পথে যাবেন, নচেৎ নয়।

(২) শিলং-এ জেল রোডে অবস্থিত ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার (০৩৬৪-২২২৬২২০) মেঘালয় ঘোরার তথ্য পেতে পারেন।

(৩) ওয়াংখার বাটারফ্লাই মিউজিয়াম শনি ও রবিবার বন্ধ থাকে।

(৪) গুয়াহাটি ফিরে হাফলং-শিলচর চলা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভ্রমণসূচি আরও দিন তিনেক বাড়বে।

(৫) হাতে আরও সময় থাকলে গুয়াহাটিতে থেকে ভ্রমণ- ছক ১-এ বর্ণিত হাজো ও মদন কামদেব বেড়িয়ে নিতে পারেন।

(৬) ট্রেনের সময়সূচির জন্য দেখে নিন erail.in

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: শেষ পর্ব/ দুর্যোগ কাটিয়ে ঘরে ফেরা

Published

on

manas sarovar

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম নাজাং-এর উদ্দেশে। সবার মুখ থমথমে। লিয়াজঁ অফিসারদের খুব চিন্তাগ্রস্ত লাগছে। কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে কনকনে হাওয়া। চারিদিক থেকে ধসের খবর আসছে। দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না। বৃষ্টির মধ্যেই কালী নদীকে বাঁ হাতে রেখে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঘষে কোনো রকমে যাওয়া যায়। ঝুরঝুরে আলগা মাটি। একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদ। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরাগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে।

Loading videos...

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

টানা দু’ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের চিত্র পুরো বদলে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। কখনও নদীর পাড়, তো কখনও পাহাড়ের চুড়ো – এ ভাবেই চড়াই-উতরাই ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি। বৃষ্টির জল পেয়ে কালী নদী ফুঁসছে। মনে হচ্ছে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। ঝরনার জলে আমরা সবাই ভিজে গিয়েছি। আমাদের যাওয়ার রাস্তা অবিরাম পরিষ্কার করে চলেছে বুলডোজার, কিন্তু ধসের বিরাম নেই। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। কোনো কোনো রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। বৃষ্টির জন্য পা প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছি। মুখে ঈশ্বরের নাম।

১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে সব কৈলাসযাত্রী মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতে মালপায় স্মারক।

এ ভাবেই ১০টা নাগাদ মালপায় এলাম। প্রাতরাশের জন্য পথ চলার সাময়িক বিরতি এখানে। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট শেষ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মালপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাসযাত্রী। তাঁরা ছিলেন ১৩ নম্বর ব্যাচের যাত্রী। কী অদ্ভুত সমাপতন! আজও ১৭ আগস্ট এবং আমরাও ১৩ নম্বর ব্যাচ। জানি না, পরমেশ্বর আমাদের কপালে কী রেখেছেন? পুরো যাত্রা এত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেললেন আমাদের তিনি?

প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা, পাশে গণেশ। কোনো কোনো ঘাসের ঝাড় ধরে ঝুলে নামা। নীচে কোথায় পা দেব, বুঝে উঠতে পাচ্ছি না, এত খাড়া পাহাড়ের গা। নীচে থেকে গণেশ হাতে ধরে পা বসিয়ে দিচ্ছে। ঘাসের গোড়া বা গাছের শিকড় মুঠিতে চেপে ধরে, বুক-পেট পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বর্ষার পর এ পথে আমরাই প্রথম। এ ভাবেই সেই ৪৪৪৪ সিঁড়িওয়ালা পাহাড় অতিক্রম করলাম। সামনে আরও একটা বড়ো পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামলেই নাজাং, যেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

লেখকের পথের সাথি গণেশ।

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই পা পিছলে যাচ্ছে। যেখানেই থমকে যাচ্ছি, গণেশ এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরা না থাকলে এতক্ষণে আমাদের চলে যেতে হত কালী নদীতে। কালী নদীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না, এখন তার রূপ এতটাই ভয়াল। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছোলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। এ দিকের রাস্তা আরও খারাপ। কোনো কোনো জায়গায় সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে নামতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় হামাগুড়ি। সারা গা কাদায় মাখামাখি। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টির দিনে এ ভাবেই কাদা মেখে ফুটবল খেলতাম। আর আজ? প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াই। অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরার লড়াই। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে গণেশও হাত ধরতে পারছে না। হাত ধরতে গেলেই দু’ জনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, পা আর চলছে না। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা সময় দেখলাম নাজাং-এ এসে গিয়েছি। নীচে নেমে শুয়ে পড়ে পাহাড়কে প্রণাম করলাম।

মনে একরাশ আনন্দ। হ্যাঁ, পেরেছি – হেঁটে কৈলাস-মানস দর্শন করতে। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। চোখে আমার জল। তখনও কি জানতাম, সামনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

নাজাং থেকে গাড়িতে ধারচুলা যাওয়ার কথা। কিন্তু ছ’ কিমি দূরে রাস্তা পুরো ধসে গিয়েছে। সব গাড়ি ওখানে আটকে। এখানে অপেক্ষা না করে লিয়াজঁ অফিসারদের নির্দেশে সামনে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রবল বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ। এই সব পাথর টপকে টপকে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। এক সময় সেই ছ’ কিমি পথ শেষ হল। আর রাস্তা নেই। দু’টি বুলডোজার ব্যস্ত রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। কিন্তু যে জায়গাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ধস নেমে সেই জায়গা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

লেখকের দুই যাত্রাসঙ্গী জহরভাই ও সুরজভাই।

আর উপায় নেই। এ বার এক এক করে এই জায়গাটা পার হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা বাঁশি বাজালে এক জন করে যাত্রী ধসের জায়গাটা পার হবেন। বাঁশি বাজতেই প্রথম যাত্রী দৌড় দিলেন। কিন্তু যেই মাঝপথে পৌঁছেছেন ওপর থেকে পাথর পড়া শুরু হয়ে গেল। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। যাত্রীভাই মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন। আবার বাঁশি বাজল, কিন্তু প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ এগিয়ে গেল না। সবাই ভয়ে পিছিয়ে আসছেন।

আমি দেখলাম এই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। কতক্ষণ এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে থাকতে হবে তার কোনো হিসেব নেই। সামনে এগোতেই হবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমিই দৌড় লাগালাম। সামনেই একটা ঝরনা। ঝরনার জল প্রবল বেগে নেমে এসে খাদ দিয়ে গড়িয়ে নীচের কালী নদীতে গিয়ে মিশছে। কোনো ভাবে পা হড়কে গেলে সোজা নদীতে। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি। চিরকালই আমি ডানপিটে, মৃত্যুভয় আমার নেই। যে দিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সে দিন নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আর যে দিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিনও নিজের ইচ্ছায় হবে না। তা হলে কেন এই মৃত্যুভয়?

ঝরনা অতিক্রম করে দেখি, সামনে এক বিশাল পাথর। টিকটিকির মতো বুকে ভর দিয়ে সেই পাথরও পেরিয়ে এলাম। এ বারে একটা পাথর থেকে আরেকটা পাথর লাফিয়ে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো পেরিয়ে এসে অন্য বিপদ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা দু’টো আটকে গেল। কোনো দৈবশক্তি জেন আমার উপর ভর করল। কে যেন আমাকে এক হাত ধরে তুলে নিল। তবে কি আমার প্রভু আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেন? সারা গায়ে কাদা মেখে এ পারে আসতেই ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে এ প্রান্তের মানুষজন আমায় জড়িয়ে ধরল। পরে জহরভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার দৌড় শুরু করার কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই পাহাড় থেকে পাথর পড়া শুরু হয়্। দু’-একটা মুহূর্ত এ-দিক ও-দিক হলেই…।

সেই বিপজ্জনক জায়গা।

এ পারে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কখন দলের বাকি সদস্যরা আসবে? পাথর পড়া যখন দু’-তিন মিনিটের জন্য বন্ধ হচ্ছে, এক জন করে যাত্রী এ পারে আসছেন। তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটতে লাগল। এ পারে আসতে গিয়ে গণেশ কাদার মধ্যে পড়ে গেল দেখলাম। হাঁটু থেকে রক্ত বার হচ্ছে। এক মহিলা যাত্রী কাদার মধ্যে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিলেন। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করলেন। অনেকক্ষণ পর জহরভাই আর সুরজভাইও পেরিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই অক্ষত অবস্থায় এ পারে এলেন।

এ বার গাড়িতে করে রওনা ধারচুলা। আমাদের লাগেজ পড়ে রইল গুনজিতে। এক কাপড়ে ধারচুলা থেকে দিল্লি, তার পর কলকাতা। কলকাতায় আসার দশ দিন পর এল আমার লাগেজ। এসে পৌঁছোল কৈলাস-মানসের পবিত্র জলও। এটাই সব চেয়ে দামি আমার কাছে। (শেষ)

ছবি: লেখক    

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

Published

on

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

কাল প্রায় সারা রাত জেগে কেটেছে। চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি, তাতে মনে অপার শান্তি। অতিথিশালায় ফিরে এসে বাকি সময়টা বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ মানসকে বিদায় জানানোর পালা।

Loading videos...

আরেক বার গেলাম মানসের পাড়ে। দূরে উজ্জ্বল কৈলাস পর্বত। ভোররাতের ঘটনার কথা ভেবে এখনও লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ভেসে আসছে ‘ওম মণি পদ্মে হুম’-এর সুর। ভেসে আসছে ড্রামের আওয়াজ। মন কিছুতেই চাইছে না এই জায়গা ছেড়ে যেতে। বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে। শেষ বারের মতো মানসের জল মুখে নিয়ে, পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ছুটলাম বাসের দিকে। বাসের যাত্রীরা সবাই শিবের ভজন গাইছে। বাস এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আমার স্বপ্নের মানস-কৈলাস। আমার দু’ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কে যেন কানে কানে বলছে – আবার আসিস।

আরেক বার মানস দর্শন।

কখন যে তাকলাকোট পৌঁছে গিয়েছি, খেয়াল করিনি। হোটেলে ফিরেও হোয়াটস অ্যাপে বাড়ির সঙ্গে কথা বললাম। কত দিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা হল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে এলাম।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ১৫ আগস্ট। এই পুণ্য দিনে ফিরে চলেছি ভারতে। তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৯টা নাগাদ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল চিনা অভিবাসন দফতরে। তার পর কাস্টমস অফিসে। আমাদের মালপত্র পরীক্ষার পর তিব্বত তথা চিন ত্যাগের অনুমতি পেলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাসে করে চলে এলাম লিপুলেখ পাস সংলগ্ন ভারত-চিন সীমান্তে। চিনা অফিসারেরা আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন। মিলল পাহাড়ে চড়ার অনুমতি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণেশ যথারীতি চলে এসেছে। ওর কাছে আমার রুকস্যাক দিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা আমাদের দেখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আজ স্বাধীনতা দিবস। তাই মহাদেবের পাশাপাশি ভারতমাতার নামেও জয়ধ্বনি হল।

মানস থেকে ফেরার পথে মন্যাস্টেরি।

লিপুলেখ পাসের নীচেই আইটিবিপি-র ক্যাম্প। গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। আইটিবিপি-র জওয়ানদের সঙ্গে ছবি তোলা হল।

আজ আমাদের গন্তব্য গুনজি, ২৬ কিমি। আসার সময় যে পথ তিন দিনে এসেছিলাম, সেই পথ এক দিনে পেরোব। একটু যে টেনশন হচ্ছে না, তা নয়। তবু হাঁটতে তো হবেই।

খুব জোরে হাঁটতে পারছি না। পথের সৌন্দর্যও সে ভাবে আকর্ষণ করছে না। কেবল কৈলাস-মানসের কথা মনে পড়ছে। মানস সরোবরে ভোররাতের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ যেন চোখের সামনে ভাসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা বিশাল ঝরনার কাছে চলে এলাম। গোটা পথকে প্লাবিত করে ঝরনা প্রবল বেগে নীচে নেমে যাচ্ছে। লাঠির সাহায্যে অতি সন্তর্পণে পথটুকু অতিক্রম করলাম। চলে এলাম নাভিডাং। এখানে সেনাশিবিরে স্বল্পক্ষণের যাত্রাবিরতি। দেখলাম জওয়ানরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে ব্যাস্ত। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। এখানে প্রাতরাশ সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম কালাপানির উদ্দেশে।

কিছুটা হাঁটার পর বুঝতে পারছি, বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পাথরের উপর বসে রইলাম। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকটা মসৃণ হল, বেশ আরাম লাগছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু চলার ক্ষমতা যে বেশ কমছে, বুঝতে পারছি। বাঁ পায়ের হাঁটুতে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। জহরভাইয়েরও একই সমস্যা হয়েছিল। আমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে কিছুটা সামলেছে। সমতলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু চড়াই-উতরাই এলেই সমস্যা।

পথের দু’ পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা। তার মধ্যের উপত্যকা দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেছে। সেই নদীকে ডান হাতে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। মখমলের মতো সবুজ ঘাস আর গুল্ম দিয়ে মোড়া পুরো উপত্যকা। অসংখ্য রঙিন ফুল ফুটে রয়েছে। এ যেন এক স্বপ্নলোক। এ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কালাপানির অতিথিশালায়। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা এখানেই। আমি দুপুরের খাবার না খেয়ে এগিয়ে চললাম। কালাপানিতে পাসপোর্টে সিল মারিয়ে আবার এগিয়ে চলা। পথেই আলাপ হল আইটিবিপি-র এক জওয়ানভাইয়ের সঙ্গে। উনি আমাদের হাতে চকোলেট তুলে দিলেন। বাড়িতে ওঁর ছোটো একটা ছেলে আছে। তার বিদেশি মুদ্রা জমানোর খুব শখ। আমি ওঁর হাতে ১০০ চিনা ইউয়ানের একটি নোট তুলে দিলাম। সারা পথ ওঁদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেল নাগাদ পৌঁছে গেলাম গুনজি ক্যাম্পে। এসেই দেখি মনীশভাই আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। গুনজি ক্যাম্পে আজ খুব ভিড়। ক্যাম্পের পাশেই পাহাড়ে মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসী আসছেন। গুনজি আইটিবিপি ক্যাম্প রাতে আমাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করেছে। অনেক দিন পর দেশের খাবার খেলাম। জওয়ানভাইদের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়।

গুনজি ক্যাম্প।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই চার দিক থেকে ধসের খবর আসতে লাগল। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরা বিশাল আকার ধারণ করে। এখানেও তাই। আজ গণেশ ছাড়াই পথ চলা শুরু হয়েছে। মেলার জন্য গণেশ একদিন গুনজিতে থেকে গেল। কাল সকালে বুধিতে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

গুনজি থেকে ছায়লেক পর্যন্ত রাস্তা সমতল। তার পর পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। সেই পথটা খুব বিপজ্জনক। দু’-তিন ঘণ্টা একটানা হেঁটে চলেছি। ফুসফুস ক্রমশ হাপর হয়ে উঠছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। লজেন্স মুখে দিলাম। লজেন্সের মোড়ক বুকপকেটে রেখে দিলাম প্রকৃতির বুকে দূষণ এড়ানোর জন্য। কৈলাস পরিক্রমার সময় দেখেছিলাম জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রাখা। আমাদের উত্তরাখণ্ডে সে সবের বালাই নেই।

আরও কিছুটা এগোনোর পর জলপতনের গর্জন শোনা গেল। যতই এগোচ্ছি, গর্জন ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হুড়হুড় করে পড়ছে ঝরনার জল। যেন বিরাট তুলোর বস্তা। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা সেই জল রাস্তা ভাসিয়ে কালী নদীতে পড়ছে। ঝরনার জল সারা গা ভিজিয়ে দিল। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা নয়, চিন্তা ক্যামেরাটা নিয়ে। ক্যামেরার ছবি আমার কাছে মহা মূল্যবান, আমার সারা জীবনের সম্পদ, আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ক্যামেরা বাঁচিয়ে কোনো রকমে পেরিয়ে এলাম সেই জায়গা।

১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ছায়লেকে। খাওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি। আবার পথ চলা শুরু। এ বার নীচে নামার পালা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, পথ ভয়ংকর পিছল। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ের বুকে আমি একা। ট্রেকিং-এ এ রকম হয়, কেউ যায় এগিয়ে, কেউ থাকে পিছিয়ে – যার যেমন চলার সামর্থ্য বা গতি।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথা প্রচণ্ড বেড়েছে। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাধ্য হয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ খেলাম। অনেক নীচে বুধির ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বৃষ্টির তেজ প্রচণ্ড বাড়ল। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে লাঠি নিয়ে, পা টিপে টিপে পরমেশ্বরের নাম করতে করতে এগিয়ে চললাম ক্যাম্পের দিকে।

ঈশ্বরকে মনেপ্রাণে ডাকছি – আর একটা দিন তুমি শক্তি দাও, এতটা রাস্তা যদি হেঁটে আসতে পারি, তা হলে শেষ বেলায় কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছ? তোমার কৃপা না থাকলে এতটা পথ আসতে পারতাম না। হাঁটুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা কমানোর মলম স্প্রে করলাম। একটু যেন স্বস্তি এল। ধীরে ধীরে নেমে চললাম। পৌঁছে গেলাম বুধি। কেএমভিএন-এর এক কর্মীভাই যথারীতি শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। (চলবে)

ছবি: লেখক                 

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

Published

on

view of Kailas from Kailas

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কিউগুতে। মানসের তীরে এই জনপদ। সরোবরের নীল জলরাশি সূর্যের আলোয় হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শত সহস্র জলকণা সূর্যের আলোয় তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। সরোবর সংলগ্ন এক অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মানসের জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকেই সবাই বেরিয়ে গেলাম। ছুটলাম মানসের জলে অবগাহন করতে। হিমশীতল জল। বাইরের তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির কাছাকাছি, সঙ্গে প্রবল হাওয়া। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বাধাই আর বাধা নয়। মানস সরোবর যেন দু’ হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। এই সেই মানস সরোবর। স্বয়ং দেবাদিদেব যেখানে অবগাহন করেন।

Loading videos...
কিউগুতে মানস সরোবর।

মানস সরোবরের জলে নেমে স্নান করার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বালতি করে জল তুলে এনে স্নান করতে হয়। কিন্তু কে মানে সেই বিধিনিষেধ! মানসের জলে নেমে সবাই আনন্দে আত্মহারা। ‘হর হর মহাদেব’ আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। মানসের জল আর চোখের অশ্রু মিলেমিশে তখন সব একাকার। মানসের জল তো শুধু জল নয়, এর মধ্যে আছে ঈশ্বরের ছোঁয়া। এ আমার কাছে চরণামৃত। সরোবরের জলে অবগাহন করতে করতে বললাম –

করচরণকৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাহপরাধম। / বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত ক্ষমস্ব জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো।।

(হে প্রভু, আমার এই জন্মে হস্তপদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবণজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ, সব ক্ষমা কোরো।)

সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। হে প্রভু, তুমি না থাকলে এই পুণ্যধামে আমার আসার সুযোগ হত না। কত বাধা, কত বিঘ্ন উপস্থিত হয়েছে। তুমি সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে আমাকে এই পুণ্যধামে নিয়ে এসেছ। এ তোমার অপার মহিমা। আমাকে তোমার চরণে স্থান দাও।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে হয় না। পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হব, এ আশাও আমি করি না। যত দিন বাঁচব, পিতৃঋণ আমি সানন্দে বহন করতে চাই। এই বলে মানস সরোবরের জল নিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ শুরু করলাম। তর্পণ করার কোনো সামগ্রীই আমার কাছে ছিল না, সামান্য একটু তিল ছাড়া। সেই তিল হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতৃদেবকে স্মরণ করে বললাম –

ওঁ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ/পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।

কতক্ষণ জলের মধ্যে ছিলাম জানি না, জহরভাইয়ের ডাকে হুঁশ এল – তাড়াতাড়ি চলুন স্যর, হোমযজ্ঞ যে শুরু হয়ে যাবে। মানসের জলে ডুব দিয়ে কিছু পাথর সংগ্রহ করে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালাম।

সরোবরের পাশেই যজ্ঞের স্থান। মুম্বইনিবাসী মুকেশভাই যজ্ঞ করার দায়িত্ব নিলেন। তাঁকে সাহায্য করলেন জহরভাই। যজ্ঞের সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ যেন এক আলাদা অনুভূতি। সবাই মিলে হোম-যজ্ঞে পরমেশ্বরের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। মুকেশভাই বেদির উপর মাথা ঠুকতে ঠুকতে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্তব পাঠ করতে লাগলেন।

সব তীর্থযাত্রীর চোখে জল। আসলে এই চোখের জল তো শুধুমাত্র জল নয়, এ আনন্দাশ্রু – ঈশ্বরকে দেখার, ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার যে আনন্দ, তারই প্রকাশ। এই বিরল মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করলাম অতি দ্রুত।

যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর অতিথিশালায় ফিরে জানলার ধারে বসে রইলাম। মানস সরোবরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নীল জলের অপর প্রান্তে কৈলাস পর্বত এখনও ঝকঝক করছে। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছে, টের পাইনি। জহরভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোররাতে উঠতে হবে। শুনেছি, ভোররাতেই শিব-পার্বতী মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন। চিত্রকল্পটা মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে কখন যে ঘুম এসে গেল!

মানসের ধারে যজ্ঞের আয়োজন।

১৩ আগস্ট। রাত ৩টের সময় সুরজভাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, কয়েক জন যাত্রী মানসের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে এখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। বাইরে এসে দেখি আমাদের বন্ধুরা সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। সবার মুখে তখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। ওই মন্ত্র ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যের উদয় হল। চারি দিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু স্বপ্নপূরণ হল না। তাঁরা এলেন না। অতিথিশালায় ফিরে এলাম।

আজ আমাদের অখণ্ড অবসর। আজ শুধু মানসের চার পাশে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। অতিথিশালার সংলগ্ন গুম্ফায় গেলাম। চার দেওয়ালে বৌদ্ধের বাণী আর তৈলচিত্র। বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে এক উপাসক ড্রাম বাজাচ্ছেন। ড্রামের ডুম ডুম আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ চারি দিকে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমিও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। লাউডস্পিকারে অতি মৃদু স্বরে ভেসে আসছে – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)/ধম্মং শরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ নিলাম)/ সংঘং শরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ নিলাম)। জানতে পারলাম এই গুম্ফা ৩০০ বছরের পুরোনো। ভিতরের তৈলচিত্রগুলোও সেই সময়কার। অথচ এখনও কত উজ্জ্বল।

মানসের ধারে গুম্ফা।

দুপুর হতেই দল বেঁধে চললাম স্নান করতে। কেউ নিয়ম মানছেন না। আশেপাশে কোনো পাহারাদার নেই দেখে সবাই ডুব দিতে জলে নেমে পড়ল। আমিও নেমে পড়লাম মানসের জলে। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। সরোবরের অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার পর মানসের জল আনতে ছুটলাম। বোতলে ভরলাম। কলকাতার অনেকেই মানসের জল আনতে বলেছেন। জানি না, এই জল শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছোবে কি না। ঘোড়ার পিঠে করে আমাদের মালপত্র যাবে নাজাং পর্যন্ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে দিল্লি, তার পর ট্রেনে কলকাতা। তখনও জানতাম না ফেরার সময় আমাদের জন্য কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।

রাতের খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল ঘড়ির অ্যালার্ম। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আকাশ মেঘলা থাকলে দৃশ্যমানতা কমে যায়। তবে কি আজও তাঁর দেখা পাব না? এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মানস সরোবরে আজই আমাদের শেষ রাত। কাল সকালেই আমরা রওনা দেব তাকলাকোটের উদ্দেশে। হাতে ছাতা নিয়ে মানসের জেটিতে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছু যাত্রী অনেক আগে থেকেই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কৈলাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রভুকে ডেকে চলেছি।

ঠিক ৩.২৫ মিনিট। হঠাৎ দেখি মানসের জল স্থির হয়ে গেল। কৈলাস পর্বতের মাথায় একটা হলুদ আলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। অনেকটা হ্যালোজেন আলোর মতো। সেই আলোর জ্যোতিতে মানস আলোকিত। আলোটা কৈলাস পর্বত থেকে নেমে এসে মানসের জলে ঘুরপাক খেতে লাগল। ৩০-৪০ সেকেন্ডের পর আলোটা জল থেকে উঠে কৈলাস পর্বতে মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় আমাদের শরীর কাঁপছে, আমরা মূক। কতক্ষণ যে এই ভাবে ছিলাম, জানি না। পাশের যাত্রীর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমি কী দেখলাম! পরমেশ্বর অবশেষে আমাদের দেখা দিলেন। তা হলে কি সেই কাহিনি সত্যি? সত্যিই কি শিব-পার্বতী ভোররাতে মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন?

এই অলৌকিক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। কী ভাবে এই আলোর উৎপত্তি? কেনই বা সেই আলো এসে পড়ে মানসের জলে? আমার সারা শরীর শিহরিত। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। সহযাত্রী জহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম জহরভাই আর সুরজভাই উত্তেজনায় কাঁপছে, মুখে শুধু ‘হর হর মহাদেব’। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। পবিত্র মানসের জল মুখে-মাথায় দিলাম। পরমেশ্বরের এই রূপ দেখতেই তো এত কষ্ট করে, বাড়ি-ঘর-সংসার ফেলে এখানে ছুটে আসা। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যদেব দেখা দিলেন। আমরা এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ়। (চলবে)

ছবি: লেখক

Continue Reading
Advertisement
মালদা42 mins ago

মালদহের মানিকচকে ভেসেল উলটে ৮টি ট্রাক পড়ল গঙ্গায়, বেশ কিছু মানুষ নিখোঁজ

ফুটবল2 hours ago

পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ঘরে তুলল হায়দরাবাদ

রাজ্য6 hours ago

রাজ্যের নতুন সংক্রমণ নেমে এল সাড়ে তিন হাজারের ঘরে, কমল দৈনিক মৃত্যুও

বন্ধন ব্যাঙ্ক
শিল্প-বাণিজ্য6 hours ago

এবার কলকাতা মেট্রোর স্মার্ট কার্ডে থাকবে বন্ধন ব্যাঙ্কের লোগো

বিদেশ9 hours ago

যুদ্ধ বাধাতে পারেন ‘দুর্বল’ জো বাইডেন, আশঙ্কা করছে চিন

দেশ9 hours ago

অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রয়াত

বিনোদন10 hours ago

মাদক মামলায় জামিন পেলেন ভারতী সিংহ ও হর্ষ লিম্বাচিয়া

বাঁকুড়া10 hours ago

ডিসেম্বর থেকে ‘দুয়ারে দুয়ারে সরকার’, নয়া প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা5 days ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

কেনাকাটা2 months ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

কেনাকাটা2 months ago

নতুন কালেকশনের ১০টি জুতো, ১৯৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো এসে গিয়েছে। কেনাকাটি করে ফেলার এটিই সঠিক সময়। সে জামা হোক বা জুতো। তাই দেরি...

নজরে