২৬ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী, দুর্গাপুজো শুরু। শুরু বাঙালির বেড়ানোর মরশুমেরও। চার মাস আগে ট্রেনের আসন সংরক্ষণ। সুতরাং ২৬ সেপ্টেম্বরের ট্রেনের বুকিং শুরু হবে মে-র ২৯ তারিখে। কেউ যদি আগে বেড়িয়ে পড়তে চান, তা হলে সে ভাবে দিন গুণে নেবেন। অর্থাৎ ২৪ বা ২৫ সেপ্টেম্বর বেড়িয়ে পড়তে চাইলে টিকিট কাটুন ২৭ বা ২৮ মে। যা-ই হোক, প্ল্যান যা করার এখনই করে নিতে হবে। খবর অনলাইন বাড়িয়ে দিল সাহায্যের হাত। সাজিয়ে দিচ্ছে কতগুলি ভ্রমণ-ছক। শুরু হয়েছে হিমাচল প্রদেশ দিয়ে।

গোটা চারেক ভ্রমণ-ছক বেছে নেওয়া হয়েছে হিমাচলের জন্য। এর মধ্যে দু’টি বৃহস্পতিবার দেওয়া হয়েছে, আজ শনিবার দেওয়া হল বাকি দু’টি।

ভ্রমণ-ছক ৩ : অমৃতসর হয়ে কাংড়া উপত্যকা

প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন – ট্রেনে অমৃতসর রওনা। হাওড়া থেকে অমৃতসর মেল রোজ সন্ধে ৭.১০ মিনিটে ছেড়ে অমৃতসর পৌঁছয় তৃতীয় দিন সকাল ৮.৫৫ মিনিটে। কলকাতা স্টেশন থেকে অকাল তখ্‌ত এক্সপ্রেস বুধ ও রবি সকাল ৭.৪০ মিনিটে ছেড়ে পৌঁছয় দ্বিতীয় দিন বিকেল ৫.২০ মিনিটে, দুর্গিয়ানা এক্সপ্রেস মঙ্গল ও শনি দুপুর ১২.১০ মিনিটে ছেড়ে পৌঁছয় একই সময়ে আর শিয়ালদা থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগ এক্সপ্রেস শুক্রবার দুপুর ১.১০ মিনিটে ছেড়ে পৌঁছয় দ্বিতীয় দিন সন্ধে ৭.৪৫ মিনিটে। সুতরাং অমৃতসরে ঘুরবেন তৃতীয় দিন। সকালে দেখুন স্বর্ণ মন্দির, জালিয়ানওয়ালাবাগ ও দুর্গিয়ানা মন্দির। বিকেলে চলুন ৩১ কিমি দূরের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ওয়াঘায়। দেখুন ‘বিটিং রিট্রিট’।

ডালহৌসি। এক টুকরো।

চতুর্থ দিন – ১১০ কিমি দূরের পাঠানকোট হয়ে চলুন ডালহৌসি। সকালের দিকে ট্রেন/বাস/ট্যাক্সি ধরে পাঠানকোট চলুন। ঘণ্টা তিনেকের জার্নি। পাঠানকোট থেকে ডালহৌসি আসার জন্য বাস/গাড়ি পাবেন। ৮০ কিমির কিছু বেশি, ঘণ্টা তিনেকের জার্নি। চেষ্টা করুন অমৃতসর থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে দুপুর ১টা/দেড়টার মধ্যে ডালহৌসি পৌঁছতে।

পঞ্চম দিন – থাকুন ডালহৌসিতে (২০০০ মিটার)। দেখে নিন সাতধারা, পঞ্চপুল্লা জলপ্রপাত, বাকরোটা পাহাড়, সেখান থেকে দেড় কিমি হেঁটে খুঁজে নিন রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত স্নো-ডন বাড়ি, সুভাষ বাওলি ইত্যাদি।

ষষ্ঠ দিন– চলুন খাজিয়ার, দূরত্ব ২২ কিমি। উৎসাহ ও ক্ষমতা থাকলে খাজিয়ারের পথে ১০ কিমি দূরে লক্কর মন্ডি থেকে ৩ কিমি হাঁটা পথে চলুন কালাটপ (২৪৪০ মিটার), তুষারমৌলী হিমালয়ের শোভা দেখুন। ১৯৬০ মিটার উঁচুতে ২ কিমি লম্বা ও ১ কিমি চওড়া সবুজ রূপসী উপত্যকা খাজিয়ার।

চাম্বার চৌগান তথা মহারাজদের প্রমোদ উদ্যান।

সপ্তম দিন – চলুন ২৪ কিমি দূরের ইরাবতীর তীরে চাম্বায় (৯৯৬ মিটার)। এ দিন প্রাসাদ, একাধিক মন্দির, মিউজিয়াম সহ চাম্বার স্থানীয় দ্রষ্টব্যগুলো দেখুন।

অষ্টম দিন – আজও থাকুন চাম্বায়। ঘুরে আসুন ৬৬ কিমি দূরের ভারমোর (২১৯৫ মিটার, ৭ শতক থেকে ১১ শতকের মধ্যে নির্মিত ৮৪টি শিবমন্দিরের জন্য বিখ্যাত), সেখান থেকে মণিমহেশের প্রবেশদ্বার হাডসার (আরও ১৮ কিমি)।

নবম দিন – চাম্বা থেকে চলুন ধরমশালা (১৪৫৭ মিটার), ১৩০ কিমি মতো। চেষ্টা করুন আপার ধরমশালা (ম্যাকলিয়ডগঞ্জ, ২০৮২ মিটার) বা নড্ডিতে (২০০০ মিটার) থাকতে। ধরমশালা (লোয়ার) থেকে আরও ১০-১২ কিমি।

দশম দিন – আজ ধরমশালা থেকে ঘুরে আসুন জ্বালামুখী (৫৫ কিমি), সেখান থেকে চিন্তপূর্ণী (৩৫ কিমি)। ফিরুন ধরমশালা (৭৭ কিমি থেকে ৯০ কিমি, ধরমশালায় কোথায় থাকবেন তার ওপরে)।

একাদশ দিন– আজ সারা দিন দলাই লামার রাজধানী ধরমশালায় ঘোরাঘুরি।

কাংড়া ফোর্ট।

দ্বাদশ দিন – সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন। ১৮ কিমি দূরের কাংড়ায় দুর্গ, মন্দিররাজি দেখে কাংড়া মন্দির স্টেশন থেকে ন্যারো গেজ ট্রেনে চলুন পালামপুর। ট্রেন বিকেল ৩টেয়, পালামপুর পৌঁছে দেবে বিকেল সাড়ে ৪টেয়। তুষারমণ্ডিত ধৌলাধার দেখার জন্য এই ট্রেনে চড়া। ট্রেনের বাঁ দিকে বসবেন। রাত্রিবাস পালামপুর (১৪৭২ মিটার)।

ত্রয়োদশ দিন – থাকুন পালামপুরে। দেখে আসুন চামুণ্ডাদেবী মন্দির (১৯ কিমি), বৈজনাথ (১৬ কিমি, নবম শতকের শিব মন্দির, অনেকে বলেন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম)। মনে রাখবেন পালামপুরের দু’ দিকে চামুণ্ডাদেবী ও বৈজনাথ। বাকি সময় ঘোরাঘুরি চা বাগানের শহর পালামপুরে।

বৈজনাথের কাছে কাংড়া ভ্যালি ন্যারোগেজ ট্রেন।

চতুর্দশ দিন – ঘরে ফেরার ট্রেন ধরতে চলুন ১১৪ কিমি দূরের পাঠানকোটে। কলকাতা আসার হিমগিরি ও জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেস রাতে। দিল্লি আসার ট্রেনও রাতে। সেই সময় আন্দাজ করে পালামপুর থেকে বেরিয়ে পড়ুন।

কী ভাবে ঘুরবেন – এই ভ্রমণ ছকে টানা গাড়ি ভাড়া না করলেও চলবে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়ি করুন। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে সেখানে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরুন। অনেক জায়গায় বাসও পাবেন। কিছু জার্নি বাসে করতে পারেন, যেমন, পাঠানকোট-ডালহৌসি, ধরমশালা-কাংড়া, পালামপুর-চামুণ্ডা, পালামপুর-বৈজনাথ ইত্যাদি। তবে গাড়ি করলে সময় অনেক বাঁচে, ভ্রমণ আরামপ্রদ হয়।

আরও পড়ুন: পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: হিমাচল ১

ভ্রমণ ছক ৪: পব্বর ভ্যালি ছুঁয়ে কারসগ ভ্যালি হয়ে বিপাশা তীরে

প্রথম দিন– হাওড়া থেকে দিল্লি-কালকা মেলে তৃতীয় দিন ভোরে কালকা। সন্ধে ৭-৪০ মিনিটে ছেড়ে পৌঁছয় তৃতীয় দিন ভোর সাড়ে ৪টেয়।

ক্রিকেট মাঠ, চ্যেল।

তৃতীয় দিন – কালকা থেকে চলুন চ্যেল (২২৫০ মিটার, ৮১ কিমি)। ‘লিটল মাউনটেনস্‌ হেভেন’ এ দিনটা থাকুন। বিশ্বের সর্বোচ্চে ক্রিকেট খেলার মাঠ এখানে। রাত্রিবাস চ্যেল।

(কালকা থেকে শিমলাও আসতে পারেন। কালকা থেকে টয় ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে শিমলা। লাগবে তিন থেকে সওয়া পাঁচ ঘণ্টা, নির্ভর করবে কীসে যাবেন। বেশির ভাগ বাস আসে চণ্ডীগড় থেকে, তাই জায়গা পাওয়া মুশকিল। স্টেশনের পাশেই কালকা ট্যাক্সি ইউনিয়নের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। শিমলায় যেটুকু সময় পাবেন, ম্যালে ঘোরাঘুরি করুন। দেখে আসুন ম্যাল থেকে সামান্য চড়াই পথে শিমলা কালীবাড়ি। চলে যান দেড় কিমি চড়াই পথে উচ্চতম জাকু হিলস (২৪৫৫ মিটার)। এখান থেকে সূর্যাস্ত নয়নাভিরাম।)

চতুর্থ দিন – চলুন খাড়াপাথর (৮৯০০ ফুট, ৯৩ কিমি)। দুপুরে খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ুন গিরিগঙ্গার উৎস সন্ধানে। যাতায়াতে ১২ কিমি, যাওয়ার জন্য জিপ মেলে। রাত্রিবাস খাড়াপাথর।

খাড়াপাথর থেকে রোহড়ু যাওয়ার পথে পব্বর নদী।

পঞ্চম দিন – আজও খাড়াপাথরে, ঘুরে আসুন জুব্বল প্রাসাদ, হাটকোটি মায়ের মন্দির, পব্বর নদী তীরবর্তী রোহড়ু।

ষষ্ঠ দিন – চলুন ‘নল রাজার ডেরা’ নলদেরায় (২০৪৪ মিটার, ৮০ কিমি)। অনেক নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে শতদ্রু নদী, দেখে নিন মাহুং নাগের মন্দির, বিশ্বের প্রাচীনতম নাইন হোল গলফ্‌ কোর্স। রাত্রিবাস নলদেরায়।

কারসগ।

সপ্তম দিন – চলুন কারসগ ভ্যালির চিন্ডি (৭২ কিমি)। পথ ক্রমশ নীচে নেমে গেছে শতদ্রুর তীরে। ২৩ কিমি দূরে মাত্র ৬৫৫ মিটার উচ্চতায় তত্তপানি (উষ্ণ প্রস্রবণ) দেখে আসুন চিন্ডি। রাত্রিবাস চিন্ডি (১৮৫০ মিটার)। আজ দুপুরে চলুন কারসোগ টাউন, সেখান থেকে কাও। দেখুন মামলেশ্বর মন্দির, কামাখ্যাদেবী মন্দির।

অষ্টম দিন – আজও থাকুন চিন্ডিতে। চলুন মাহুনাগ মন্দির (২০ কিমি), দারু শিল্পশৈলীর এক অপূর্ব বিরল নিদর্শন মাগরু মহাদেব মন্দির (৫৩ কিমি)।

নবম দিন– চলুন বিপাশা তীরে মান্ডি (৮০০ মিটার, দূরত্ব ৮৫ কিমি। মন্দির-শহর মান্ডিতেই ঘোরাঘুরি করুন, ভালো বাজার, কেনাকাটি করতে পারেন।

বিপাশার তীরে মান্ডি।

দশম দিন– আজও থাকুন মান্ডিতে। সকালে চলুন ৪০ কিমি দূরে পরাশর লেক (২৭৩০ মিটার)। ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন রিওয়ালসর লেক (১৩৬০ মিটার), মান্ডিতে থেকে ৪০ কিমি।

একাদশ দিন– সক্কাল সক্কাল রওনা হয়ে চলুন মানালি (২০৫০ মিটার), ১২৩ কিমি। এ দিনই ঘুরে নিন হিড়িম্বা মন্দির, তিব্বতীয় মনাস্ট্রি, মানালি ক্লাব হাউস, ওল্ড মানালি, বশিষ্ঠ কুণ্ড।

দ্বাদশ দিন – আজও থাকুন মানালিতে, ঘুরে আসুন রোটাং পাস (৫১ কিমি, ৩৯৭৮ মিটার)। ফেরার পথে চলুন সোলাং ভ্যালি।

হিড়িম্বা মন্দির, মানালি।

ত্রয়োদশ দিন – মানালি থেকে ঘরপানে। সকালেই বেড়িয়ে পড়ুন। বাসে বা গাড়িতে চলে আসুন কালকা (২৮০ কিমি)। রাতে ফেরার ট্রেন ধরুন। হাওড়া মেল ছাড়ে রাত ১১.৫৫ মিনিটে। দিল্লি হয়ে ফিরতে চাইলে মানালি থেকে রাতের বাস ধরুন।

(হাতে দিন কম থাকলে, মান্ডি থেকেও ফিরে আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আসুন চণ্ডীগড়, ১৭৩ কিমি, রাতে সেখান থেকে ট্রেন ধরুন)

কী ভাবে ঘুরবেন – এই ভ্রমণেও পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়ি করতে পারেন। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে স্থানীয় গাড়িতে ঘোরাঘুরি করুন। মান্ডি থেকে মানালি বাস সার্ভিস ভালো।

কোথায় থাকবেন

(১) হিমাচলের প্রায় সব পর্যটন কেন্দ্রে হিমাচল পর্যটন উন্নয়ন নিগমের বাংলো আছে। অনলাইন বুকিং hpdtc.nic.in। কলকাতায় hpdtc মার্কেটিং অফিস, যোগাযোগ ০৩৩-২২১২৬৩৬১। ই-মেল [email protected]

(২) বেসরকারি হোটেল সব জায়গাতেই আছে। make my trip, goibibo, yatra.com, triviago.in  ইত্যাদির মতো ওয়েবসাইটগুলিতে সন্ধান পাবেন।

(৩) অমৃতসরে স্টেশনের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করুন। সক্কালে পাঠানকোটের ট্রেন ধরতে সুবিধা হবে।

মনে রাখবেন

(১) ট্রেনের সময় পালটাতে পারে। যাত্রার আগে ভালো করে চেক করে নেবেন।

(২) দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেনে চণ্ডীগড় আসা যায়। সেখানকার আইএসবিটি থেকে শিমলার বাস ছাড়ে, শিমলা যাওয়ার ট্যাক্সিও মেলে।

(৩) হিমাচল রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন দিল্লির কাশ্মীরি গেটে আইএসবিটি থেকে সারা দিনই শিমলা যাওয়ার নানা ধরনের বাস চালায়। দিল্লি এলে ট্রেনের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাস নির্বাচন করবেন। অনলাইন বুকিং-এর জন্য লগ ইন করুন www.hrtchp.com

(৪) পাহাড়ি অঞ্চলে পরের গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়বেন। রাস্তার অবস্থা কখন কেমন থাকে বলা যায় না।

(৫) যেখানেই যান ভালো শীতবস্ত্র রাখবেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here