Connect with us

দূরে কোথাও

পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: কেরল

২৬ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী, দুর্গাপুজো শুরু। এখনই করে ফেলতে হবে পুজোর ভ্রমণ পরিকল্পনা। খবর অনলাইন বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। সাজিয়ে দিচ্ছে কতগুলি ভ্রমণ-ছক। এ বার কেরল। রইল দু’টো ভ্রমণ সূচি। ভ্রমণ-ছক ১: দক্ষিণ কেরল Loading videos… প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন – হাওড়া থেকে এর্নাকুলামের উদ্দেশে যাত্রা।  হাওড়া-এর্নাকুলাম অন্ত্যোদয় এক্সপ্রেস, শনিবার বিকেল ৫টায় হাওড়া ছেড়ে এর্নাকুলাম […]

Published

on

২৬ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী, দুর্গাপুজো শুরু। এখনই করে ফেলতে হবে পুজোর ভ্রমণ পরিকল্পনা। খবর অনলাইন বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। সাজিয়ে দিচ্ছে কতগুলি ভ্রমণ-ছক। এ বার কেরল। রইল দু’টো ভ্রমণ সূচি।

ভ্রমণ-ছক ১: দক্ষিণ কেরল

Loading videos...

প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন – হাওড়া থেকে এর্নাকুলামের উদ্দেশে যাত্রা।  হাওড়া-এর্নাকুলাম অন্ত্যোদয় এক্সপ্রেস, শনিবার বিকেল ৫টায় হাওড়া ছেড়ে এর্নাকুলাম পৌঁছোয় সোমবার সকাল ৬টায়। শালিমার-নাগেরকোয়েল সাপ্তাহিক গুরুদেব এক্সপ্রেস, বুধবার রাত ১১:০৫-এ ছাড়ে, এর্নাকুলাম পৌঁছোয় শুক্রবার বিকেল ৩:১৫-য়। শালিমার-তিরুঅনন্তপুরম এক্সপ্রেস ছাড়ে প্রতি মঙ্গল এবং রবিবার রাত ১১:০৫-এ। এর্নাকুলাম পৌঁছোয় বৃহস্পতিবার এবং মঙ্গলবার বিকেল ৪টেয়। চেন্নাই হয়েও এর্নাকুলাম যাওয়া যায়। হাওড়া থেকে করমণ্ডল বা চেন্নাই মেলে পৌঁছন চেন্নাই। চেন্নাই থেকে রোজ সন্ধে ৭:৪৫-এ ছাড়ে তিরুঅনন্তপুরম মেল, এর্নাকুলাম পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৬:৫০-এ। আছে আলেপ্পি এক্সপ্রেস। ২০:৪৫-এ ছেড়ে পরের দিন সকাল ৮:৪০-এ পৌঁছোয়। রোজ বিকেল ৩:২৫-এ চেন্নাই ছেড়ে তিরুঅনন্তপুরম এক্সপ্রেস এর্নাকুলাম পৌঁছোয় রাত ৩টেয়। তৃতীয় দিনে এর্নাকুলামে ঘোরাঘুরি। রাত্রিবাস এর্নাকুলম।

চাইনিজ ফিশিং নেট।

এর্নাকুলামে দেখুন — (১) চাইনিজ ফিশিং নেট- ভেম্বানাড় হ্রদের ধারে। সূর্যাস্ত নয়নাভিরাম। (২) সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ – চাইনিজ ফিশিং নেটের কাছেই। কোচিতে মৃত্যুর পর ভাস্কো-দা-গামার দেহ কয়েক বছর এখানেই রাখা হয়েছিল। (৩) সিনাগগ – ১৫৬৭ সালে তৈরি। মাতাঞ্চেরিতে। (৪) মাতাঞ্চেরি প্রাসাদ – সিনাগগের পাশেই। (৫) ভেম্বানাড়ে নৌকাযাত্রায় ভাইপিন দ্বীপ – ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম নোনাজলের হ্রদ ভেম্বানাড় লেকে আধঘণ্টার নৌকাবিহারে ঘুরে আসুন ভাইপিন দ্বীপে। কোচির জেটি থেকে নিয়মিত লঞ্চ ছাড়ছে।

চতুর্থ দিন – থাকুন এর্নাকুলামে। ঘুরে আসুন শঙ্করাচার্যের জন্মস্থান খ্যাত কালাডি, ৪৩ কিমি এবং সেখান থেকে আথিরাপল্লি জলপ্রপাত, ৩৫ কিমি।

পঞ্চম দিন – এর্নাকুলামে থেকে আজ চলুন গুরুবায়ুর, ৮৮ কিমি। বিখ্যাত শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। পোশাকবিধি পালনীয়।

মুন্নার।

ষষ্ঠ দিন – এর্নাকুলাম থেকে চলুন মুন্নার (১৭০০ মিটার), ১২৭ কিমি। কেরলের শৈলশহর। চা-বাগানের জন্য বিখ্যাত। রাত্রিবাস মুন্নার।

সপ্তম দিন – মুন্নারে ঘোরাঘুরি, রাত্রিবাস।

মুন্নারে দ্রষ্টব্য — (১) এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান- মুন্নার থেকে ৭ কিমি। নীলগিরি থরের জন্য বিখ্যাত। অভয়ারণ্যের মধ্যেই রয়েছে সুন্দর ঝরনা। (২) পল্লিভাসাল জলপ্রপাত – মুন্নার থেকে ২৩ কিমি। কোচির দিকে কিছুটা এসে বাঁ দিকে রাস্তা নেমে গিয়েছে, পথের শেষে জলপ্রপাত। (৩) ইকো পয়েন্ট – টপ স্টেশনের পথে ১৮ কিমি দূরে। মাট্টুপেট্টি ড্যামের জলে তৈরি হ্রদ। হ্রদের এ-পার থেকে চিৎকার করলে, ও-পারের পাহাড়ে ধাক্কা লেগে তা ইকো হয়। (৫) কুন্ডলা ড্যাম – ইকো পয়েন্ট থেকে ৭ কিমি। (৬) টপ স্টেশন ভিউ পয়েন্ট (৬১০০ ফুট) – কুন্ডলা ড্যাম থেকে ১০ কিমি। এক দিকে পশ্চিমঘাট পর্বতশ্রেণি, অন্য দিকে তামিলনাড়ুর থেনি জেলার উপত্যকা দেখা যায়।

অষ্টম দিন– মুন্নার থেকে আসুন পেরিয়ার, ৯৮ কিমি। রাত্রিবাস পেরিয়ার।

নবম দিন– ঘোরাঘুরি। রাত্রিবাস পেরিয়ার।

পেরিয়ারে সাফারি ছাড়াও করতে পারেন প্ল্যান্টেশন ট্যুর অর্থাৎ মশলার বাগান দেখা।

দশম দিন– চলুন আলাপুজা (আলেপ্পি) ১২৮ কিমি। রাত্রিবাস।

আলেপ্পির দ্রষ্টব্য – (১) আম্বালাপুজায় পনেরো শতকের শ্রীকৃষ্ণ মন্দির – আলাপুজা স্টেশন থেকে ১৪ কিমি। (২) আলেপ্পি সৈকত ও লাইট হাউস। (৩) বিকাশনম সৈকত – আলাপুজা স্টেশন থেকে সাড়ে ৪ কিমি। (৪) থুম্পলি সৈকত – বিকাশনমের পাশে।

আলেপ্পি থেকে কোল্লাম চলুন বোটে।

একাদশ দিন – আলেপ্পি থেকে কোল্লাম। সড়কপথে দূরত্ব ৮৬ কিমি। ট্রেনে দেড় ঘণ্টার মতো। বোটে ৮ ঘণ্টা। (তবে বোটেই আসা উচিত)। বাস/গাড়ি বা ট্রেনে কোল্লাম এলে সে দিনই ঘুরে আসুন ৩২ কিমি দূরে ভারকালা সৈকত। কোল্লামে ফিরে সন্ধ্যায় দেখে নিতে পারেন মহাত্মা গান্ধী সৈকত। রাত্রিবাস কোল্লাম।

দ্বাদশ দিন – আগের দিন আলাপুজা থেকে বোটে কোল্লাম এলে আজ ভারকালা সৈকত হয়ে চলুন তিরুঅনন্তপুরম, ৭৯ কিমি। দেখে নিন (১) পদ্মনাভস্বামী মন্দির, (২) চিড়িয়াখানা, (৩) সম্মুঘম সৈকত, স্টেশন থেকে ৯ কিমি ও (৪) ভেলি টুরিস্ট ভিলেজ, সম্মুঘম ৪ কিমি।

বিকেলে চলুন ১৮ কিমি দূরে কোভালম সৈকত। সূর্যাস্ত দেখুন।

পোনমুড়ি আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

ত্রয়োদশ দিন – আজও থাকুন তিরুঅনন্তপুরমে, চলুন নেয়ার ড্যাম ও অভয়ারণ্য হয়ে হিলস্টেশন পোনমুড়ি (১১০০ মিটার)। ২২টি হেয়ারপিন বেন্ড পোনমুড়ির পথে। পথে পড়বে কাল্লার ও মিনমুট্টি ফলস্‌। যাতায়াত ১৩৫ কিমি।

চতুর্দশ দিন– ফিরুন ঘরপানে। তিরুঅনন্তপুরম থেকে বৃহস্পতি এবং শনিবার বিকেল ৫টায় শালিমার এক্সপ্রেস। শালিমার পৌঁছোয় শনি এবং সোমবার দুপুর ১:৫০-এ। নাগেরকোয়েল-শালিমার গুরুদেব এক্সপ্রেস প্রতি রবিবার বিকেল ৪:০৫-এ ছেড়ে শালিমার পৌঁছোয় মঙ্গলবার দুপুর ১:৫০-এ। চেন্নাই হয়েও ফিরতে পারেন। চেন্নাই মেল দুপুর ২:৫০-এ ছেড়ে চেন্নাই পৌঁছোয় পরের দিন সকাল সাড়ে ৭টায়। চেন্নাই এক্সপ্রেস বিকেল ৫:১৫-য় ছেড়ে চেন্নাই পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ১০টায়।

কী ভাবে ঘুরবেন

কেরলে বাস পরিষেবা ভালো। কিছু কিছু জায়গায় অনলাইনে বাসের টিকিট বুকিং-এর ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে নিজের ইচ্ছেমতো ঘুরতে চাইলে মুন্নার যাওয়ার দিন এর্নাকুলাম থেকে গাড়ি ভাড়া করে তিরুঅনন্তপুরমে ছেড়ে দিন।

কোথায় থাকবেন

সব জায়গাতেই রয়েছে কেরল পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল। তবে এর্নাকুলমের বোলগাট্টি আইল্যান্ড রিসোর্ট এবং মুন্নারে টি-কাউন্টিতে ঘরভাড়া তুলনায় অনেক বেশি। পেরিয়ারে আছে পেরিয়ার হাউস, আলেপ্পিতে আছে ট্যামারিন্ড আলাফুজা, কোল্লামে রয়েছে ট্যামারিন্ড কোল্লাম এবং তিরুঅনন্তপুরমে রয়েছে হোটেল চৈত্রম। হোটেলগুলি অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন www.ktdc.com। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

মনে রাখবেন

(১) পেরিয়ারে পৌঁছেই যেখানে থাকবেন সাফারি নিয়ে খোঁজখবর করে নেবেন। চেষ্টা করবেন প্রথম দিনেই বিকেলের সাফারি ধরতে।

(২) পেরিয়ারে অটো ভাড়া করে প্ল্যান্টেশন ট্যুর করতে পারেন।

(৩) আলাপুজায় ১৮৬২ সালের লাইটহাউসে টিকিট ১০ টাকা। সোম থেকে শুক্রবার বিকেল ৩টে থেকে সাড়ে ৪টে খোলা।

(৪) আলাপুজা থেকে কোল্লাম চলুন বোটে। স্টেট ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের জেটি থেকে বোট ছাড়ে রোজ সকাল সাড়ে ১০টায়। পাম্বা নদী, কায়ামকুলাম কয়াল ও অষ্টমুড়ি লেক দিয়ে ৮ ঘণ্টার এই যাত্রা এক বিরল অভিজ্ঞতা। বোট যায় কুট্টানাড় দিয়ে, সমুদ্রতল থেকে ২.২ মিটার নীচে অবস্থিত ভারতের একমাত্র অঞ্চল। এখন জনপ্রতি ভাড়া ৩০০ টাকা। যাওয়ার আগে বোটের সময় ও ভাড়া জেনে নেবেন।


আরও পড়ুন পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: হিমাচল ২

ভ্রমণ-ছক ২: উত্তর কেরল

যাত্রা শুরু করুন বেঙ্গালুরু থেকে। চলে আসুন ওয়েনাড়, সেখান থেকে কোঝিকোড়, কান্নুর, বেকাল দেখে কাসারগোড়।

প্রথম দিন– ট্রেনে বেঙ্গালুরু রওনা। হাওড়া-যশবন্তপুর দুরন্ত এক্সপ্রেস সোম ও বৃহস্পতি বাদে পাঁচ দিন বেলা ১১টায় হাওড়া ছেড়ে পরের দিন যশবন্তপুর পৌঁছোয় বিকেল ৪টেয়। যশবন্তপুর এক্সপ্রেস রোজ বিকেল ৮:৩৫-এ হাওড়া ছেড়ে যশবন্তপুর পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭:১৫-য়।

দ্বিতীয় দিন– দুরন্তয় গেলে বেঙ্গালুরুতে রাত্রিবাস। পরের দিন সকালে সুলতান বাথেরি রওনা।

তৃতীয় দিন– যশবন্তপুর এক্সপ্রেসে বেঙ্গালুরু পৌঁছলে ট্রেন থেকে নেমেই রওনা হয়ে যান সুলতান বাথেরি, ২৬৯ কিমি। রাত্রিবাস সুলতান বাথেরি।

মুথুঙ্গার জঙ্গলে।

চতুর্থ দিন– সুলতান বাথেরি ঘোরাঘুরি। সকালে যান এড়াক্কাল গুহা। টিকিট কেটে পাহাড়ে ওঠা শুরু। প্রথম ৭০০ মিটার বাঁধানো রাস্তা, তার পর পাহাড়ের গা বেয়ে খাড়া ওঠা। কিছুটা অংশ পাথরের ওপর দিয়ে সন্তর্পণে উঠে শেষ চড়াইটা সিঁড়িতে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের আঁকা গুহাচিত্রের জন্যই বিখ্যাত এই এড়াক্কাল। এড়াক্কাল গুহা দেখে ফিরে মধ্যাহ্নভোজন সেরে চলুন হাতির জন্য বিখ্যাত মুথাঙ্গা অভয়ারণ্য।  মুথাঙ্গা থেকে ফেরার সময়ে দেখে নিন জৈন মন্দির। রাত্রিবাস সুলতান বাথেরি।

লক্কিড়ি থেকে কোঝিকোড়ের পথ।

পঞ্চম দিন – সক্কালেই চলুন কোঝিকোড়, ৯৭ কিমি। পথে দেখুন পুকোট লেক (৩৭ কিমি) এবং লক্কিড়ি ভিউ পয়েন্ট (আরও ৪ কিমি)। লক্কিড়িতে পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা যায় দূরের সমতলভূমি। জঙ্গলের মাঝেমাঝে উঁকি দেয় জাতীয় সড়ক। মধ্যাহ্নভোজন সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। দেখুন –

১) কেরল শৈলীর তিরুভাচিরা শ্রীকৃষ্ণ মন্দির – মুন্ডু পরতে হয় না, তবে জামা খুলতে হয়।

বেপোর সৈকত।

(২) বেপোর সৈকত – ১১ কিমি দূরে, সমুদ্রের মধ্যে দিয়েই এক কিমি দীর্ঘ বাঁধানো পথ। ডান দিকে আরব সাগরের ক্লান্তিহীন ঢেউ, বাঁ দিকে শান্ত ব্যাকওয়াটার তথা চেলিয়ার নদী। পথের শেষে পুরোটাই সমুদ্র। সূর্যাস্ত দেখার মতো।

(৩) মানানচিরা স্কোয়ার – দিঘি ও পার্ক। সান্ধ্যভ্রমণের আদর্শ জায়গা, বিকেল  সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা।

ষষ্ঠ দিন – ভোরবেলায় ঘুরে আসুন কোঝিকোড়ের সৈকতে। প্রাতরাশ সেরে চলুন কান্নুর, ৯৭ কিমি। পথে দেখুন কাপ্পাড় সৈকত, ১৮ কিমি। ১৪৯৮ সালে এখানেই নেমেছিলেন ভাস্কো। স্মারক আছে। এখান থেকে চলুন মুড়াপ্পিলানগাড় সৈকত, ৬৩ কিমি। গাড়ি চলাচলে উপযুক্ত ভারতের দীর্ঘতম। গাড়ি চলাচলের জন্য বিবিসি নির্বাচিত বিশ্বের ষষ্ঠ সৈকত। মুড়াপ্পিলানগাড় থেকে চলুন থোটাড্ডা সৈকত, ৬ কিমি। সেখান থেকে কান্নুর ১০ কিমি। কান্নুরের হোটেলে চেক ইন করে বিকেলে চলুন সেন্ট অ্যাঞ্জেলো ফোর্ট। সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত খোলা। রাত্রিবাস কান্নুর।

সপ্তম দিন – সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন, গন্তব্য কাসারগোড়, ৭৭ কিমি। পথে দেখুন –

(১) কান্নুর থেকে ১৮ কিমি দূরে চেরুকুন্নুর অন্নপূর্ণেশ্বরী মন্দির।

(২) আরও ১৭ কিমি গিয়ে এড়িমালা ভিউ পয়েন্ট – আছে সৈকত, ন্যাভাল অ্যাকাডেমি, ৪১ ফুটের হনুমান মূর্তি, ২৮৬ মিটার উঁচু পাহাড়।

বেকাল ফোর্ট।

(৩) বেকাল ফোর্ট – আরও ৫৫ কিমি, ভারতের এক অনন্য রত্ন এই দুর্গ এবং লাগোয়া সৈকত।

বেকাল দেখে চলুন কাসারগোড়, ১২ কিমি। রাত্রিবাস কাসারগোড়।

মাধুর মন্দির।

অষ্টম দিন– আজই ঘরে ফেরা। তবে তার আগে সকালে চলুন ৭ কিমি দুরের মাধুর মন্দিরে, মধুবাহিনী নদীর ধারে। কেরলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।

সরাসরি কলকাতা ফিরতে চাইলে প্রতি শনিবার বিবেক এক্সপ্রেস। কাসারগোড় ছাড়ে রাত ১১.৪০-টায়, সাঁতরাগাছি পৌঁছয় সোমবার সকাল ৬টায়।

তবে হাতে আরও সময় আছে। সুতরাং ফেরার পথে চেন্নাই, বেঙ্গালুরু বা মহীশুরে দিন দুয়েক কাটিয়ে ফিরতে পারেন। সে ক্ষেত্রে —

(১) চেন্নাইয়ের ট্রেন — চেন্নাই মেল দুপুর ২.১০-এ ছেড়ে পৌঁছয় ভোর ৫.৪০-এ, চেন্নাই এক্সপ্রেস বিকেল ৫টায় ছেড়ে পৌঁছয় সকাল ৮টায় এবং ওয়েস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস রাত ১১টায় ছেড়ে পৌঁছয় দুপুর ২.৪০-এ।

(২) মহীশুর/বেঙ্গালুরুর ট্রেন – বেঙ্গালুরু এক্সপ্রেস বিকেল ৫.৫৫-য় ছেড়ে মহীশুর পৌঁছয় ভোর ৫.১৫-য়, বেঙ্গালুরু সকাল ৮.২০-তে।

কী ভাবে ঘুরবেন

(১) বেঙ্গালুরু থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন সুলতান বাথেরি। সুলতান বাথেরি ঘুরুন স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে।

(২) সুলতান বাথেরি থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন কোঝিকোড়।

(৩) এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গাড়ি ছেড়ে দিন কাসারগোড়ে।

ভ্রমণ-ছক ২-এর বিকল্প

প্রথম দিন ও দ্বিতীয় দিন — ভ্রমণ-ছক ২-এর মতো।

তৃতীয় দিন – যশবন্তপুর স্টেশন থেকে রাত ৮টায় ধরুন কান্নুর এক্সপ্রেস।

চতুর্থ দিন – সকাল ৭.২৫-এ পৌঁছন কোঝিকোড়। স্টেশন থেকে বাস বা গাড়ি ভাড়া করে চলে যান ৯৭ কিমি দুরের সুলতান বাথেরি।

(এর পর বাকিটা পুরোপুরিই ভ্রমণ-ছক ২-এর মতো। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণ ১টা দিন বাড়বে। কলকাতা থেকে সরাসরি কোঝিকোড় আসতে চাইলে সাঁতরাগাছি থেকে মেঙ্গালুরুগামী সাপ্তাহিক বিবেক এক্সপ্রেস ধরুন। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল ৩:৫০-এ ছেড়ে কোঝিকোড় পৌঁছোয় শনিবার ভোর ৪:৫৫-এ। তৃতীয় দিন চলে যান সুলতান বাথেরি। ওখানে দু’ রাত কাটিয়ে ফিরুন কোঝিকোড়, ঘুরুন ভ্রমণ-ছক ২ অনুযায়ী।

কোথায় থাকবেন

কাসারগোড় ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে কেরল পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল। সুলতান বাথেরিতে আছে পেপ্পার গ্রোভ, কোঝিকোড় বিমানবন্দরের কাছে আছে ট্যামারিন্ড কোন্ডুত্তি, কান্নুরে আছে ট্যামারিন্ড কান্নুর। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন www.ktdc.com। এ ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি অনেক হোটেল, রিসোর্ট। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

মনে রাখবেন

(১) মাথা ঘোরার সমস্যা থাকলে এড়াক্কাল গুহা না যাওয়াই ভালো।

(২) সুলতান বাথেরি থেকে ১০ কিমি দূরে মুথাঙ্গার প্রবেশফটক থেকে শুরু হয় দেড় ঘণ্টার জিপ সাফারি।

(৩) কোঝিকোড়ে কেরল পর্যটনের হোটেল যে হেতু শহর থেকে কিছু দূরে তাই এখানে শহরের মাঝে বেসরকারি হোটেলেই থাকা ভালো। এখানে প্যারাগন রেস্তোরাঁয় ব্রেকফাস্ট করতে ভুলবেন না।

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: শেষ পর্ব/ দুর্যোগ কাটিয়ে ঘরে ফেরা

Published

on

manas sarovar

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম নাজাং-এর উদ্দেশে। সবার মুখ থমথমে। লিয়াজঁ অফিসারদের খুব চিন্তাগ্রস্ত লাগছে। কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে কনকনে হাওয়া। চারিদিক থেকে ধসের খবর আসছে। দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না। বৃষ্টির মধ্যেই কালী নদীকে বাঁ হাতে রেখে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঘষে কোনো রকমে যাওয়া যায়। ঝুরঝুরে আলগা মাটি। একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদ। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরাগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

টানা দু’ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের চিত্র পুরো বদলে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। কখনও নদীর পাড়, তো কখনও পাহাড়ের চুড়ো – এ ভাবেই চড়াই-উতরাই ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি। বৃষ্টির জল পেয়ে কালী নদী ফুঁসছে। মনে হচ্ছে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। ঝরনার জলে আমরা সবাই ভিজে গিয়েছি। আমাদের যাওয়ার রাস্তা অবিরাম পরিষ্কার করে চলেছে বুলডোজার, কিন্তু ধসের বিরাম নেই। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। কোনো কোনো রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। বৃষ্টির জন্য পা প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছি। মুখে ঈশ্বরের নাম।

১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে সব কৈলাসযাত্রী মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতে মালপায় স্মারক।

এ ভাবেই ১০টা নাগাদ মালপায় এলাম। প্রাতরাশের জন্য পথ চলার সাময়িক বিরতি এখানে। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট শেষ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মালপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাসযাত্রী। তাঁরা ছিলেন ১৩ নম্বর ব্যাচের যাত্রী। কী অদ্ভুত সমাপতন! আজও ১৭ আগস্ট এবং আমরাও ১৩ নম্বর ব্যাচ। জানি না, পরমেশ্বর আমাদের কপালে কী রেখেছেন? পুরো যাত্রা এত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেললেন আমাদের তিনি?

প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা, পাশে গণেশ। কোনো কোনো ঘাসের ঝাড় ধরে ঝুলে নামা। নীচে কোথায় পা দেব, বুঝে উঠতে পাচ্ছি না, এত খাড়া পাহাড়ের গা। নীচে থেকে গণেশ হাতে ধরে পা বসিয়ে দিচ্ছে। ঘাসের গোড়া বা গাছের শিকড় মুঠিতে চেপে ধরে, বুক-পেট পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বর্ষার পর এ পথে আমরাই প্রথম। এ ভাবেই সেই ৪৪৪৪ সিঁড়িওয়ালা পাহাড় অতিক্রম করলাম। সামনে আরও একটা বড়ো পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামলেই নাজাং, যেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

লেখকের পথের সাথি গণেশ।

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই পা পিছলে যাচ্ছে। যেখানেই থমকে যাচ্ছি, গণেশ এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরা না থাকলে এতক্ষণে আমাদের চলে যেতে হত কালী নদীতে। কালী নদীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না, এখন তার রূপ এতটাই ভয়াল। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছোলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। এ দিকের রাস্তা আরও খারাপ। কোনো কোনো জায়গায় সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে নামতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় হামাগুড়ি। সারা গা কাদায় মাখামাখি। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টির দিনে এ ভাবেই কাদা মেখে ফুটবল খেলতাম। আর আজ? প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াই। অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরার লড়াই। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে গণেশও হাত ধরতে পারছে না। হাত ধরতে গেলেই দু’ জনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, পা আর চলছে না। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা সময় দেখলাম নাজাং-এ এসে গিয়েছি। নীচে নেমে শুয়ে পড়ে পাহাড়কে প্রণাম করলাম।

মনে একরাশ আনন্দ। হ্যাঁ, পেরেছি – হেঁটে কৈলাস-মানস দর্শন করতে। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। চোখে আমার জল। তখনও কি জানতাম, সামনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

নাজাং থেকে গাড়িতে ধারচুলা যাওয়ার কথা। কিন্তু ছ’ কিমি দূরে রাস্তা পুরো ধসে গিয়েছে। সব গাড়ি ওখানে আটকে। এখানে অপেক্ষা না করে লিয়াজঁ অফিসারদের নির্দেশে সামনে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রবল বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ। এই সব পাথর টপকে টপকে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। এক সময় সেই ছ’ কিমি পথ শেষ হল। আর রাস্তা নেই। দু’টি বুলডোজার ব্যস্ত রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। কিন্তু যে জায়গাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ধস নেমে সেই জায়গা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

লেখকের দুই যাত্রাসঙ্গী জহরভাই ও সুরজভাই।

আর উপায় নেই। এ বার এক এক করে এই জায়গাটা পার হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা বাঁশি বাজালে এক জন করে যাত্রী ধসের জায়গাটা পার হবেন। বাঁশি বাজতেই প্রথম যাত্রী দৌড় দিলেন। কিন্তু যেই মাঝপথে পৌঁছেছেন ওপর থেকে পাথর পড়া শুরু হয়ে গেল। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। যাত্রীভাই মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন। আবার বাঁশি বাজল, কিন্তু প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ এগিয়ে গেল না। সবাই ভয়ে পিছিয়ে আসছেন।

আমি দেখলাম এই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। কতক্ষণ এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে থাকতে হবে তার কোনো হিসেব নেই। সামনে এগোতেই হবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমিই দৌড় লাগালাম। সামনেই একটা ঝরনা। ঝরনার জল প্রবল বেগে নেমে এসে খাদ দিয়ে গড়িয়ে নীচের কালী নদীতে গিয়ে মিশছে। কোনো ভাবে পা হড়কে গেলে সোজা নদীতে। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি। চিরকালই আমি ডানপিটে, মৃত্যুভয় আমার নেই। যে দিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সে দিন নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আর যে দিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিনও নিজের ইচ্ছায় হবে না। তা হলে কেন এই মৃত্যুভয়?

ঝরনা অতিক্রম করে দেখি, সামনে এক বিশাল পাথর। টিকটিকির মতো বুকে ভর দিয়ে সেই পাথরও পেরিয়ে এলাম। এ বারে একটা পাথর থেকে আরেকটা পাথর লাফিয়ে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো পেরিয়ে এসে অন্য বিপদ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা দু’টো আটকে গেল। কোনো দৈবশক্তি জেন আমার উপর ভর করল। কে যেন আমাকে এক হাত ধরে তুলে নিল। তবে কি আমার প্রভু আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেন? সারা গায়ে কাদা মেখে এ পারে আসতেই ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে এ প্রান্তের মানুষজন আমায় জড়িয়ে ধরল। পরে জহরভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার দৌড় শুরু করার কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই পাহাড় থেকে পাথর পড়া শুরু হয়্। দু’-একটা মুহূর্ত এ-দিক ও-দিক হলেই…।

সেই বিপজ্জনক জায়গা।

এ পারে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কখন দলের বাকি সদস্যরা আসবে? পাথর পড়া যখন দু’-তিন মিনিটের জন্য বন্ধ হচ্ছে, এক জন করে যাত্রী এ পারে আসছেন। তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটতে লাগল। এ পারে আসতে গিয়ে গণেশ কাদার মধ্যে পড়ে গেল দেখলাম। হাঁটু থেকে রক্ত বার হচ্ছে। এক মহিলা যাত্রী কাদার মধ্যে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিলেন। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করলেন। অনেকক্ষণ পর জহরভাই আর সুরজভাইও পেরিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই অক্ষত অবস্থায় এ পারে এলেন।

এ বার গাড়িতে করে রওনা ধারচুলা। আমাদের লাগেজ পড়ে রইল গুনজিতে। এক কাপড়ে ধারচুলা থেকে দিল্লি, তার পর কলকাতা। কলকাতায় আসার দশ দিন পর এল আমার লাগেজ। এসে পৌঁছোল কৈলাস-মানসের পবিত্র জলও। এটাই সব চেয়ে দামি আমার কাছে। (শেষ)

ছবি: লেখক    

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

Published

on

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

কাল প্রায় সারা রাত জেগে কেটেছে। চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি, তাতে মনে অপার শান্তি। অতিথিশালায় ফিরে এসে বাকি সময়টা বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ মানসকে বিদায় জানানোর পালা।

আরেক বার গেলাম মানসের পাড়ে। দূরে উজ্জ্বল কৈলাস পর্বত। ভোররাতের ঘটনার কথা ভেবে এখনও লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ভেসে আসছে ‘ওম মণি পদ্মে হুম’-এর সুর। ভেসে আসছে ড্রামের আওয়াজ। মন কিছুতেই চাইছে না এই জায়গা ছেড়ে যেতে। বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে। শেষ বারের মতো মানসের জল মুখে নিয়ে, পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ছুটলাম বাসের দিকে। বাসের যাত্রীরা সবাই শিবের ভজন গাইছে। বাস এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আমার স্বপ্নের মানস-কৈলাস। আমার দু’ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কে যেন কানে কানে বলছে – আবার আসিস।

আরেক বার মানস দর্শন।

কখন যে তাকলাকোট পৌঁছে গিয়েছি, খেয়াল করিনি। হোটেলে ফিরেও হোয়াটস অ্যাপে বাড়ির সঙ্গে কথা বললাম। কত দিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা হল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে এলাম।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ১৫ আগস্ট। এই পুণ্য দিনে ফিরে চলেছি ভারতে। তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৯টা নাগাদ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল চিনা অভিবাসন দফতরে। তার পর কাস্টমস অফিসে। আমাদের মালপত্র পরীক্ষার পর তিব্বত তথা চিন ত্যাগের অনুমতি পেলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাসে করে চলে এলাম লিপুলেখ পাস সংলগ্ন ভারত-চিন সীমান্তে। চিনা অফিসারেরা আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন। মিলল পাহাড়ে চড়ার অনুমতি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণেশ যথারীতি চলে এসেছে। ওর কাছে আমার রুকস্যাক দিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা আমাদের দেখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আজ স্বাধীনতা দিবস। তাই মহাদেবের পাশাপাশি ভারতমাতার নামেও জয়ধ্বনি হল।

মানস থেকে ফেরার পথে মন্যাস্টেরি।

লিপুলেখ পাসের নীচেই আইটিবিপি-র ক্যাম্প। গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। আইটিবিপি-র জওয়ানদের সঙ্গে ছবি তোলা হল।

আজ আমাদের গন্তব্য গুনজি, ২৬ কিমি। আসার সময় যে পথ তিন দিনে এসেছিলাম, সেই পথ এক দিনে পেরোব। একটু যে টেনশন হচ্ছে না, তা নয়। তবু হাঁটতে তো হবেই।

খুব জোরে হাঁটতে পারছি না। পথের সৌন্দর্যও সে ভাবে আকর্ষণ করছে না। কেবল কৈলাস-মানসের কথা মনে পড়ছে। মানস সরোবরে ভোররাতের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ যেন চোখের সামনে ভাসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা বিশাল ঝরনার কাছে চলে এলাম। গোটা পথকে প্লাবিত করে ঝরনা প্রবল বেগে নীচে নেমে যাচ্ছে। লাঠির সাহায্যে অতি সন্তর্পণে পথটুকু অতিক্রম করলাম। চলে এলাম নাভিডাং। এখানে সেনাশিবিরে স্বল্পক্ষণের যাত্রাবিরতি। দেখলাম জওয়ানরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে ব্যাস্ত। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। এখানে প্রাতরাশ সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম কালাপানির উদ্দেশে।

কিছুটা হাঁটার পর বুঝতে পারছি, বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পাথরের উপর বসে রইলাম। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকটা মসৃণ হল, বেশ আরাম লাগছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু চলার ক্ষমতা যে বেশ কমছে, বুঝতে পারছি। বাঁ পায়ের হাঁটুতে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। জহরভাইয়েরও একই সমস্যা হয়েছিল। আমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে কিছুটা সামলেছে। সমতলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু চড়াই-উতরাই এলেই সমস্যা।

পথের দু’ পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা। তার মধ্যের উপত্যকা দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেছে। সেই নদীকে ডান হাতে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। মখমলের মতো সবুজ ঘাস আর গুল্ম দিয়ে মোড়া পুরো উপত্যকা। অসংখ্য রঙিন ফুল ফুটে রয়েছে। এ যেন এক স্বপ্নলোক। এ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কালাপানির অতিথিশালায়। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা এখানেই। আমি দুপুরের খাবার না খেয়ে এগিয়ে চললাম। কালাপানিতে পাসপোর্টে সিল মারিয়ে আবার এগিয়ে চলা। পথেই আলাপ হল আইটিবিপি-র এক জওয়ানভাইয়ের সঙ্গে। উনি আমাদের হাতে চকোলেট তুলে দিলেন। বাড়িতে ওঁর ছোটো একটা ছেলে আছে। তার বিদেশি মুদ্রা জমানোর খুব শখ। আমি ওঁর হাতে ১০০ চিনা ইউয়ানের একটি নোট তুলে দিলাম। সারা পথ ওঁদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেল নাগাদ পৌঁছে গেলাম গুনজি ক্যাম্পে। এসেই দেখি মনীশভাই আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। গুনজি ক্যাম্পে আজ খুব ভিড়। ক্যাম্পের পাশেই পাহাড়ে মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসী আসছেন। গুনজি আইটিবিপি ক্যাম্প রাতে আমাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করেছে। অনেক দিন পর দেশের খাবার খেলাম। জওয়ানভাইদের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়।

গুনজি ক্যাম্প।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই চার দিক থেকে ধসের খবর আসতে লাগল। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরা বিশাল আকার ধারণ করে। এখানেও তাই। আজ গণেশ ছাড়াই পথ চলা শুরু হয়েছে। মেলার জন্য গণেশ একদিন গুনজিতে থেকে গেল। কাল সকালে বুধিতে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

গুনজি থেকে ছায়লেক পর্যন্ত রাস্তা সমতল। তার পর পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। সেই পথটা খুব বিপজ্জনক। দু’-তিন ঘণ্টা একটানা হেঁটে চলেছি। ফুসফুস ক্রমশ হাপর হয়ে উঠছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। লজেন্স মুখে দিলাম। লজেন্সের মোড়ক বুকপকেটে রেখে দিলাম প্রকৃতির বুকে দূষণ এড়ানোর জন্য। কৈলাস পরিক্রমার সময় দেখেছিলাম জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রাখা। আমাদের উত্তরাখণ্ডে সে সবের বালাই নেই।

আরও কিছুটা এগোনোর পর জলপতনের গর্জন শোনা গেল। যতই এগোচ্ছি, গর্জন ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হুড়হুড় করে পড়ছে ঝরনার জল। যেন বিরাট তুলোর বস্তা। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা সেই জল রাস্তা ভাসিয়ে কালী নদীতে পড়ছে। ঝরনার জল সারা গা ভিজিয়ে দিল। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা নয়, চিন্তা ক্যামেরাটা নিয়ে। ক্যামেরার ছবি আমার কাছে মহা মূল্যবান, আমার সারা জীবনের সম্পদ, আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ক্যামেরা বাঁচিয়ে কোনো রকমে পেরিয়ে এলাম সেই জায়গা।

১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ছায়লেকে। খাওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি। আবার পথ চলা শুরু। এ বার নীচে নামার পালা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, পথ ভয়ংকর পিছল। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ের বুকে আমি একা। ট্রেকিং-এ এ রকম হয়, কেউ যায় এগিয়ে, কেউ থাকে পিছিয়ে – যার যেমন চলার সামর্থ্য বা গতি।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথা প্রচণ্ড বেড়েছে। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাধ্য হয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ খেলাম। অনেক নীচে বুধির ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বৃষ্টির তেজ প্রচণ্ড বাড়ল। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে লাঠি নিয়ে, পা টিপে টিপে পরমেশ্বরের নাম করতে করতে এগিয়ে চললাম ক্যাম্পের দিকে।

ঈশ্বরকে মনেপ্রাণে ডাকছি – আর একটা দিন তুমি শক্তি দাও, এতটা রাস্তা যদি হেঁটে আসতে পারি, তা হলে শেষ বেলায় কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছ? তোমার কৃপা না থাকলে এতটা পথ আসতে পারতাম না। হাঁটুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা কমানোর মলম স্প্রে করলাম। একটু যেন স্বস্তি এল। ধীরে ধীরে নেমে চললাম। পৌঁছে গেলাম বুধি। কেএমভিএন-এর এক কর্মীভাই যথারীতি শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। (চলবে)

ছবি: লেখক                 

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

Published

on

view of Kailas from Kailas

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কিউগুতে। মানসের তীরে এই জনপদ। সরোবরের নীল জলরাশি সূর্যের আলোয় হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শত সহস্র জলকণা সূর্যের আলোয় তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। সরোবর সংলগ্ন এক অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মানসের জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকেই সবাই বেরিয়ে গেলাম। ছুটলাম মানসের জলে অবগাহন করতে। হিমশীতল জল। বাইরের তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির কাছাকাছি, সঙ্গে প্রবল হাওয়া। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বাধাই আর বাধা নয়। মানস সরোবর যেন দু’ হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। এই সেই মানস সরোবর। স্বয়ং দেবাদিদেব যেখানে অবগাহন করেন।

কিউগুতে মানস সরোবর।

মানস সরোবরের জলে নেমে স্নান করার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বালতি করে জল তুলে এনে স্নান করতে হয়। কিন্তু কে মানে সেই বিধিনিষেধ! মানসের জলে নেমে সবাই আনন্দে আত্মহারা। ‘হর হর মহাদেব’ আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। মানসের জল আর চোখের অশ্রু মিলেমিশে তখন সব একাকার। মানসের জল তো শুধু জল নয়, এর মধ্যে আছে ঈশ্বরের ছোঁয়া। এ আমার কাছে চরণামৃত। সরোবরের জলে অবগাহন করতে করতে বললাম –

করচরণকৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাহপরাধম। / বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত ক্ষমস্ব জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো।।

(হে প্রভু, আমার এই জন্মে হস্তপদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবণজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ, সব ক্ষমা কোরো।)

সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। হে প্রভু, তুমি না থাকলে এই পুণ্যধামে আমার আসার সুযোগ হত না। কত বাধা, কত বিঘ্ন উপস্থিত হয়েছে। তুমি সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে আমাকে এই পুণ্যধামে নিয়ে এসেছ। এ তোমার অপার মহিমা। আমাকে তোমার চরণে স্থান দাও।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে হয় না। পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হব, এ আশাও আমি করি না। যত দিন বাঁচব, পিতৃঋণ আমি সানন্দে বহন করতে চাই। এই বলে মানস সরোবরের জল নিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ শুরু করলাম। তর্পণ করার কোনো সামগ্রীই আমার কাছে ছিল না, সামান্য একটু তিল ছাড়া। সেই তিল হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতৃদেবকে স্মরণ করে বললাম –

ওঁ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ/পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।

কতক্ষণ জলের মধ্যে ছিলাম জানি না, জহরভাইয়ের ডাকে হুঁশ এল – তাড়াতাড়ি চলুন স্যর, হোমযজ্ঞ যে শুরু হয়ে যাবে। মানসের জলে ডুব দিয়ে কিছু পাথর সংগ্রহ করে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালাম।

সরোবরের পাশেই যজ্ঞের স্থান। মুম্বইনিবাসী মুকেশভাই যজ্ঞ করার দায়িত্ব নিলেন। তাঁকে সাহায্য করলেন জহরভাই। যজ্ঞের সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ যেন এক আলাদা অনুভূতি। সবাই মিলে হোম-যজ্ঞে পরমেশ্বরের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। মুকেশভাই বেদির উপর মাথা ঠুকতে ঠুকতে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্তব পাঠ করতে লাগলেন।

সব তীর্থযাত্রীর চোখে জল। আসলে এই চোখের জল তো শুধুমাত্র জল নয়, এ আনন্দাশ্রু – ঈশ্বরকে দেখার, ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার যে আনন্দ, তারই প্রকাশ। এই বিরল মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করলাম অতি দ্রুত।

যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর অতিথিশালায় ফিরে জানলার ধারে বসে রইলাম। মানস সরোবরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নীল জলের অপর প্রান্তে কৈলাস পর্বত এখনও ঝকঝক করছে। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছে, টের পাইনি। জহরভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোররাতে উঠতে হবে। শুনেছি, ভোররাতেই শিব-পার্বতী মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন। চিত্রকল্পটা মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে কখন যে ঘুম এসে গেল!

মানসের ধারে যজ্ঞের আয়োজন।

১৩ আগস্ট। রাত ৩টের সময় সুরজভাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, কয়েক জন যাত্রী মানসের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে এখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। বাইরে এসে দেখি আমাদের বন্ধুরা সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। সবার মুখে তখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। ওই মন্ত্র ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যের উদয় হল। চারি দিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু স্বপ্নপূরণ হল না। তাঁরা এলেন না। অতিথিশালায় ফিরে এলাম।

আজ আমাদের অখণ্ড অবসর। আজ শুধু মানসের চার পাশে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। অতিথিশালার সংলগ্ন গুম্ফায় গেলাম। চার দেওয়ালে বৌদ্ধের বাণী আর তৈলচিত্র। বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে এক উপাসক ড্রাম বাজাচ্ছেন। ড্রামের ডুম ডুম আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ চারি দিকে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমিও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। লাউডস্পিকারে অতি মৃদু স্বরে ভেসে আসছে – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)/ধম্মং শরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ নিলাম)/ সংঘং শরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ নিলাম)। জানতে পারলাম এই গুম্ফা ৩০০ বছরের পুরোনো। ভিতরের তৈলচিত্রগুলোও সেই সময়কার। অথচ এখনও কত উজ্জ্বল।

মানসের ধারে গুম্ফা।

দুপুর হতেই দল বেঁধে চললাম স্নান করতে। কেউ নিয়ম মানছেন না। আশেপাশে কোনো পাহারাদার নেই দেখে সবাই ডুব দিতে জলে নেমে পড়ল। আমিও নেমে পড়লাম মানসের জলে। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। সরোবরের অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার পর মানসের জল আনতে ছুটলাম। বোতলে ভরলাম। কলকাতার অনেকেই মানসের জল আনতে বলেছেন। জানি না, এই জল শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছোবে কি না। ঘোড়ার পিঠে করে আমাদের মালপত্র যাবে নাজাং পর্যন্ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে দিল্লি, তার পর ট্রেনে কলকাতা। তখনও জানতাম না ফেরার সময় আমাদের জন্য কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।

রাতের খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল ঘড়ির অ্যালার্ম। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আকাশ মেঘলা থাকলে দৃশ্যমানতা কমে যায়। তবে কি আজও তাঁর দেখা পাব না? এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মানস সরোবরে আজই আমাদের শেষ রাত। কাল সকালেই আমরা রওনা দেব তাকলাকোটের উদ্দেশে। হাতে ছাতা নিয়ে মানসের জেটিতে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছু যাত্রী অনেক আগে থেকেই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কৈলাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রভুকে ডেকে চলেছি।

ঠিক ৩.২৫ মিনিট। হঠাৎ দেখি মানসের জল স্থির হয়ে গেল। কৈলাস পর্বতের মাথায় একটা হলুদ আলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। অনেকটা হ্যালোজেন আলোর মতো। সেই আলোর জ্যোতিতে মানস আলোকিত। আলোটা কৈলাস পর্বত থেকে নেমে এসে মানসের জলে ঘুরপাক খেতে লাগল। ৩০-৪০ সেকেন্ডের পর আলোটা জল থেকে উঠে কৈলাস পর্বতে মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় আমাদের শরীর কাঁপছে, আমরা মূক। কতক্ষণ যে এই ভাবে ছিলাম, জানি না। পাশের যাত্রীর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমি কী দেখলাম! পরমেশ্বর অবশেষে আমাদের দেখা দিলেন। তা হলে কি সেই কাহিনি সত্যি? সত্যিই কি শিব-পার্বতী ভোররাতে মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন?

এই অলৌকিক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। কী ভাবে এই আলোর উৎপত্তি? কেনই বা সেই আলো এসে পড়ে মানসের জলে? আমার সারা শরীর শিহরিত। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। সহযাত্রী জহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম জহরভাই আর সুরজভাই উত্তেজনায় কাঁপছে, মুখে শুধু ‘হর হর মহাদেব’। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। পবিত্র মানসের জল মুখে-মাথায় দিলাম। পরমেশ্বরের এই রূপ দেখতেই তো এত কষ্ট করে, বাড়ি-ঘর-সংসার ফেলে এখানে ছুটে আসা। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যদেব দেখা দিলেন। আমরা এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ়। (চলবে)

ছবি: লেখক

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
রাজ্য14 mins ago

Bengal Corona Update: রাজ্যে আরও বাড়ল সংক্রমণ, তবে কলকাতা-সহ ১০ জেলায় সক্রিয় রোগীর সংখ্যায় পতন

দঃ ২৪ পরগনা14 mins ago

কোভিডরোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালু করল জয়নগর মজিলপুর পুরসভা

sputnik v vaccine
দেশ53 mins ago

Sputnik V: আগামী সপ্তাহেই ভারতের বাজারে তৃতীয় কোভিড ভ্যাকসিন, জানাল কেন্দ্র

দেশ2 hours ago

অমিত শাহকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? দিল্লি পুলিশে ‘নিখোঁজ ডায়েরি’

ক্রিকেট2 hours ago

ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে হার কেন? অদ্ভুত যুক্তি দিলেন টিম পেইন

মুর্শিদাবাদ3 hours ago

অনাস্থার আগেই মুর্শিদাবাদের জেলা সভাধিপতির পদ থেকে পদত্যাগ শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠর

রাজ্য3 hours ago

কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত মরণোত্তর দেহ ও অঙ্গদান আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্রজ রায়

Coronavirus Delhi
দেশ3 hours ago

Coronavirus Second Wave: সংক্রমণের হার ১৪ শতাংশে, সংক্রমণ নামল ১০ হাজারে, অভাবী রাজ্যগুলিকে অক্সিজেন দিয়ে সাহায্য করতে চায় দিল্লি

Madhyamik examination west bengal
শিক্ষা ও কেরিয়ার2 days ago

Madhyamik 2021: আপাতত সম্ভব নয় মাধ্যমিক পরীক্ষা, সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পর্ষদ

বিজ্ঞান2 days ago

জানেন কি, কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার পর অ্যান্টিবডিগুলি কত দিন পর্যন্ত রক্তে থেকে যায়

দেশ2 days ago

Covid Crisis: সংক্রমণের ধার কমাতে একটি বিশেষ ওষুধে ছাড়পত্র দিল গোয়া, খেতে হবে সবাইকে

বিজ্ঞান2 days ago

রক্তের গ্রুপের উপর কি কোভিড আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, গবেষণায় জানাল সিএসআইআর

শরীরস্বাস্থ্য1 day ago

করোনার এই দুঃসহ সময়ে অক্সিজেন বিপর্যয়ের সহজ সমাধান দিলেন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল

প্রযুক্তি2 days ago

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোভিড অ্যাপ, সহজে জানা যাবে যাবতীয় তথ্য

দেশ2 days ago

Corona Update: দৈনিক সংক্রমণকে ছাপিয়ে গেল সুস্থতা, দু’মাস ধরে টানা বৃদ্ধির পর অবশেষে কমল সক্রিয় রোগী

সম্পর্ক1 day ago

Corona Crisis: এই কঠিন সময়ে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই সম্পর্ক অটুট থাকবে

ভিডিও

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 months ago

বাজেট কম? তা হলে ৮ হাজার টাকার নীচে এই ৫টি স্মার্টফোন দেখতে পারেন

আট হাজার টাকার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন দুর্দান্ত কিছু ফিচারের স্মার্টফোনগুলি।

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা4 months ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা4 months ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা4 months ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা4 months ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা4 months ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা4 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা4 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

নজরে