moitryমৈত্রী মজুমদার

অসম বা নর্থইস্ট যেতে হলে যে জায়গা না পেরোলেই নয় তা হল অসমের রাজধানী গুয়াহাটি। আর গুয়াহাটিতেও ভ্রমণবিলাসীদের দেখার জায়গা নেহাত কম নেই। জানি জানি, এক্ষুনি বলবেন আপনারাও জানেন। নিশ্চই জানবেন, কিন্তু যা যা জানেন না সে রকম কিছু জানাই আজ।

অসমের প্রাণকেন্দ্র হল ব্রহ্মপুত্র নদ যার দয়ায় অসমের আদিগন্ত সবুজ হয়ে থাকে আবার বর্ষায় যার দু’কূল ছাপানো উল্লাস অসমের হাজার হাজার মানুষদের জীবনে দুর্দশা ডেকে আনে।

তাই বোধহয় একে শান্ত রাখা অসমিয়াদের জীবনের এক প্রবল দায়। আর তার থেকেই উঠে আসে পূজার্চনা আর মন্দির স্থাপনের তাগিদ। সে ভাবেই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে নানা জায়গায় আছে নানা দেবতার মন্দির। তবে আজ যার কথা বলব সেটা হল নদের এক্কেবারে মাঝে থাকা উমানন্দ মন্দির।

umananda-1

গুয়াহাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র কাছারিঘাট বা পানবাজার থেকে আপনি ফেরি পেয়ে যাবেন উমানন্দ মন্দিরে যাওয়ার। উমানন্দ ব্রহ্মপুত্রের মাঝে থাকা এক টুকরো দ্বীপ। ফেরি থেকে নেমেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে হবে মন্দিরে। অনেকগুলি সিঁড়ি আছে। সেখানে আছে শিবের মন্দির। বেশ পরিচ্ছন্ন মন্দির। আর সচরাচর ভিড় খুব বেশি হয় না। নির্বিঘ্নে পুজো দিন এখানে। তবে এখানে ‘গোল্ডেন লেঙ্গুর’ প্রজাতির বানর পাওয়া যায় অনেক। একটু সাবধানতা নেওয়া ভালো।

golden-lengur-umananda

ফেরি নেওয়ার সময় দরদস্তুর করে নেবেন। এই দ্বীপে থাকা শিবের মন্দিরটি সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টে অবধি খোলা থাকে। তারপর আবার ফেরিতেই ফিরে আসুন গুয়াহাটি। তবে বলে রাখা ভালো, বর্ষার সময় মন্দিরের তলদেশ-সহ দ্বীপের বাকি অংশ জলের তলায় থাকে, তাই সেই সময়, বছরের বেশ কয়েক মাস মন্দির বন্ধ থাকে।

umananda-temple-from-ferri-ghat

উমানন্দ হল পৃথিবীর মানুষ বসবাসকারী সব চেয়ে ছোটো দ্বীপ। তা হলে ঘরের বেশ কাছেই পৃথিবী-বিখ্যাত এক জায়গার সন্ধান পেলেন তো। প্রসঙ্গত বলে রাখি, শুধুমাত্র ক্ষুদ্রতম নয়, পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপটির অধিকারীও কিন্তু এই ব্রহ্মপুত্রই। আর তার নাম হল মাজুলি, জোরহাট জেলায় পড়ে। এর কথা অন্য কোনো সময় আলোচনা করা যাবে।

গুয়াহাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে আরও একটি অন্য রকম দেখার জায়গা আছে, তা হল নবগ্রহ পাহাড়ের ওপর থাকা নবগ্রহ মন্দির। শিলপুখুরি বাসস্টপ থেকে একটা অটোরিক্সা নিয়ে চলে যেতে পারবেন এখানে।

navagraha-temple

মন্দিরটির আবহ অনেকটা প্ল্যানেটোরিয়ামের মতো এবং এখানে কোনোরকম মূর্তি পুজো হয় না। গ্রহের আকারে পাথরের স্থাপত্য আছে। যেন এক বিশাল পাথুরে মহাকাশের গায়ে খোদাই করা আছে পাথুরে গ্রহগুলি। সেখানেই পুজোর ব্যবস্থা। বেশ অন্ধকার এই মন্দির অভ্যন্তরটি বহু প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকে। আর এই পরিবেশে মন্ত্রোচ্চারণ যেভাবে অনুরণন তোলে তা বেশ রোমহর্ষক। আর সঙ্গে আছে এক মহাজাগতিক শূন্যতার অনুভূতি।

আবার অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে, এই জায়গাটি আসলে বহু প্রাচীন সময় থেকে জ্যোতিষচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। তাই মন্দিরের পাশাপাশি প্রথাগত ভাবে জ্যোতিষচর্চা শেখানোর প্রতিষ্ঠান আছে এবং সেখানে গুরুশিষ্য পরম্পরায় আবাসিক হিসেবে শিক্ষা গ্রহণের এবং প্রদানের প্রচলন আছে। শিক্ষান্তে এই মন্দিরে সেবায়েতের কাজও পাওয়া যায়। আবার কেউ অন্য জায়গায় যেতে চাইলেও যেতে পারে।

navagraha-temple-staircase

প্রাকৃতিক দিক থেকে দেখতে গেলে শহরের ঠিক মাঝামাঝি হওয়ায়, পাহাড়ের ওপর থেকে গুয়াহাটি শহরের ভালো ভিউ পাওয়া যায়। আবার অন্য দিক থেকে পাওয়া যায় ব্রহ্মপুত্রের ভিউ। সব দিক থেকে দেখতে গেলে শহরের মধ্যে অথচ রোজের রোজনামচা থেকে মুক্তির এক জায়গা নবগ্রহ মন্দির আর পাহাড়। তাই এর পর গুয়াহাটি গেলে অবশ্যই মাথায় রাখবেন এখানে আসার কথা। সাবধান থাকবেন লালমুখো (মলুয়া) বানরের উপদ্রব থেকে।

guwahatiview-from-nabagraha

এ বার চলে আসি শহর থেকে একটু দূরে। ওই যে বলেছিলাম জল-জঙ্গল-পাহাড়ের দেশ এই অসম। অল্প দু’পা এ-দিক ও-দিক বাড়ালেই প্রকৃতির হাতছানি। গুয়াহাটি শহর থেকে ৩৫-৪০ কিমি গেলেই মরিগাও জেলার মায়ং। মায়ং বিখ্যাত তার কালো জাদুর ইতিহাসের জন্য। কিছু দিন আগে পর্যন্ত না কি মানুষকে পশু বানিয়ে দিতে পারত এখানকার জাদুবিদ্যার অধিকারীরা। কালো জাদু সংক্রান্ত ডাইনি হত্যা ইত্যাদিরও ইতিহাস আছে এই জায়গায়। তার কত দূর সত্যি মিথ্যা আমার জানা নেই। কিন্তু এখানকার বিভিন্ন স্থান থেকে ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়ার কথা শোনা যায়। এ সব বেশি করে জানার জন্য আপনাকে আসতে হবে মায়ং মিউজিয়াম দেখতে।

কিন্তু আমরা যাব অন্য জায়গায়। রাজামায়ং পাহাড় আর তার তলদেশের মোট ৩৮ বর্গকিমি অঞ্চল জুড়ে আছে ‘পবিতরা’ অভয়ারণ্য। হ্যাঁ, এলাকা হিসেবে বেশ ছোটো হলেও এই জায়গা বিখ্যাত কারণ, ‘ভারতীয় এক শৃঙ্গ গন্ডার’ যা অসমের গর্ব, তা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পাওয়া যায় এখানে, এই পবিতরা অভয়ারণ্যে। পুরো এলাকার মাত্র ১৬ বর্গকিমিতেই এদের বাস। মজার কথা হল যে সময় চারদিকে চোরাশিকারিদের হাতে গন্ডার-হত্যা হচ্ছে, সেখানে অতীতে দু-দুবার এখানকার গন্ডারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের মানস আর কাজিরাঙায় পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। মজার ব্যাপার না ?

rhino-at-pobitora

এখানে এলে গন্ডার দেখতে পাওয়ার ১০০ শতাংশ সুযোগ আছে। কখনও কখনও জঙ্গলে না ঢুকে পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ও দূর থেকে এদের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়াও আছে হাতি, বুনোমোষ,বার্কিং ডিয়ার আর পাখি। শীতের সময় প্রায় ২০০০ পরিযায়ী পাখি আসে এই অঞ্চলে। তাই বার্ড ওয়াচারদেরও প্যারাডাইস এই পবিতরা। এখানে হাতির পিঠে এবং জিপে সাফারির ব্যবস্থা আছে। থাকার জন্য আছে ইকো রিসর্ট। এ ছাড়াও হাইওয়ের ধারে ‘ব্রহ্মপুত্র জাঙ্গল রিসর্ট’ এবং ‘স্প্রিংভ্যালি’ এই দুটি ভিন্নধর্মী থাকার জায়গা আছে, যেখানে বেশ কিছু ‘ইনহাউস’ বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। তা ছাড়া বেশি দূরত্ব না থাকায়,  গুয়াহাটি ফিরে আসার বিকল্প ব্যবস্থা তো আছেই।

pobitora-suurroundings

দু’ভাবে যেতে পারেন এইখানে। হাইওয়ে হয়ে কাজিরাঙা যাওয়ার রাস্তায় একদিন থেকে যেতে পারেন পবিতরায় অথবা, শহরের মাঝখান দিয়ে, চন্দ্রপুর হয়ে, একধারে ব্রহ্মপুত্র আর একধারে পাহাড় জঙ্গলের মাঝ দিয়ে, অসমিয়া মানুষের গ্রামীন জীবনযাত্রার চালচিত্র দেখতে দেখতে পৌঁছে যেতে পারেন এক শৃঙ্গ গন্ডারের রাজ্যে। তা হলে আর দেরি কেন ? জল-জঙ্গল-পাহাড়ের দেশের উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়ার জন্য তৈরি হন।

ছবি: লেখক

1 মন্তব্য

  1. আসাম অনেক বার গেছি। উল্লেখিত দুই একটি স্থানে গেলেও কিছু জায়গার কথা জানা ছিল না। জেনে ভাল লাগল জেনে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here