mousumi

ইরমের মাউন্টেন হাউস

মৌসুমি বিলকিস

ঠিক করেছিলাম ইতালিতে যাব শুধু। ইরমট্রডকে সে কথা জানালাম। সঙ্গে সঙ্গে তার অভিমান ভরা চিঠি ও ফোন। তার বক্তব্য, ‘আমার পাশের দেশে আসবে আর আমার এখানে আসবে না? তোমার সঙ্গে আলাপ করার জন্য আমার বন্ধুবান্ধবরা অপেক্ষা করছে।’ আমার আপত্তি ছিল এই কারণে যে আমি গেলেই তার একগাদা ইউরো খরচ হবে। আমার কাছে এত টাকাপয়সা নেই যে নিজে নিজেই তার সঙ্গে দেখা করতে যাব। সে কথা বলতেই সে জানাল, ‘টাকা জীবনের সব কিছু নয়।’ শেষমেশ রাজি হতেই হল। জানি, না গেলে এই মান অভিমান পর্ব চলবে বহু বহু দিন। পাশের দেশ মানে অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্স। এই দুই দেশে সে থাকে। কিন্তু ইতালিতে কয়েকটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করতে পারলাম না বলে পূর্ব পরিকল্পনা থাকলেও ফ্রান্সে যাওয়া হল না। ইরমট্রডের সঙ্গে আলাপ হওয়াটাও ছিল বেশ অদ্ভুত। ও প্রথম কলকাতা আসে‘শান্তি ইন্ডিয়া’ নামের এক ডকুমেন্টারি করতে। একটা সুত্রে আমার নম্বর পেয়ে যোগাযোগ করেছিল। সেই থেকেই এখানে এলেই তার যাপন আমার সঙ্গে। বয়সের বিভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। আর ও ইরমট্রড থেকে হয়ে গেল ইরম, এক জন সুহৃদ ও বন্ধু, সত্যি সত্যি যার সঙ্গে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করা যায়।

আগেই বলেছি, সে ফ্রান্স থেকে অস্ট্রিয়া যাওয়ার পথে লিভোর্নো পোর্ট থেকে আমাকে নিজের গাড়িতে তুলে রওনা দিল ইন্সব্রুকের উদ্দেশে। আমাদের গন্তব্য অবশ্য গ্লায়েন্স, তাঁর মাউন্টেন হাউসে। ইন্সব্রুক থেকে গাড়িতে আধ ঘন্টার পথ। গাড়িতে কী নেই! ফুলের টব থেকে নানা রকম জিনিসপত্র, চেলো, ডাবল বাস চেলো ইত্যাদিতে ভর্তি। রাস্তায় কী সব অসাধারণ দৃশ্য। পাহাড়ের ঢালুতে পাকা গম বা যবের খেত অথবা সবুজ অন্য কিছুর চাষবাস, কখনও বিশাল বিশাল হাওয়াকল। যেন ভ্যান গঘ-এর পেন্টিংগুলোর ভেতর দিয়েই যাচ্ছি। ফ্রান্সের সংসার থেকে এক মাস পর ইরম যাচ্ছেন অস্ট্রিয়ার সংসারে। ফ্রান্সে ওঁর পার্টনার ফিল্মমেকার জোয়েলের সঙ্গে ও ভাগাভাগি করে বাড়ি বানিয়েছে। ওর সঙ্গে প্রায় প্রতি বছর কলকাতায় মাসখানেক করে কাটালেও আমি তার এই রূপ দেখিনি। সব মিলিয়ে প্রায় সাত/আট ঘন্টা গাড়ি চালাচ্ছে। প্রথমে ইন্সব্রুকের বাড়িতে কয়েকটা জিনিস নামিয়ে রাত বারোটা নাগাদ গ্লায়েন্সে ওর মাউন্টেন হাউসে পৌঁছলাম আর তাল জাতীয় কোনও গাছ বা ফলের নির্যাস থেকে তৈরি পানীয় স্ন্যাপস্‌ স্লিভোভিচ দিয়ে আমাদের রাত শুরু হল। অতিরিক্ত আলো না থাকায় বাইরেটা খুব ভালো করে দেখা গেল না। কিন্তু ভেতরে যখন ইরম আলো জ্বালাল মনে হল এইমাত্র এখানে কেউ ছিল। ওর এক মাসের অনুপস্থিতিতে একটুও ধুলো জমেনি কোথাও। আর কী অসম্ভব সাজানো ভেতরটা, বাথরুম থেকে শোবার ঘর সব কিছু। আর ভারতীয় জিনিসপত্রে ভর্তি। তিনি প্রায় প্রতি বছর ভারতে আসেন। ইরম ফায়ারপ্লেস জ্বালানোর জন্য নীচের তলায় গেলেন। আমিও ওর পিছু নিলাম। টুকরো টুকরো কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ফায়ারপ্লেসের দরজা বন্ধ হল। ওখানে তখন ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ভাবলাম জমেই যাব। কিন্তু এদের বাড়ির ভেতরের উষ্ণতা বাইরের থেকে বেশি। আর ইরম তার মায়ের নিজের হাতে তৈরি এক জোড়া উলের জুতো আর একটা মোটা অস্ট্রেলিয়ান কোট যা ওর মা ব্যবহার করতেন পরতে দিলেন। পর দিন ইরম চলে গেলেন ইন্সব্রুক। ওই বাড়িতেই ওর ওয়ার্কস্টেশন। গ্লায়েন্সের বাড়িতে ইন্টারনেট কানেকশন বা ল্যাপটপ নেই। ইচ্ছে করেই রাখেনি। এ দিকেএক মাসে অনেক কাজ জমেছে। আমার জন্য খাবার রেখে গেছে, কাগজের ফ্লানেলের মধ্য দিয়ে ডাস্ট ও গরম জল ঢেলে কফি কী ভাবে করতে হবে দেখিয়ে দিয়েছে। ফিরলে এক সঙ্গে লাঞ্চ করব। আমি ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখছি, ছবি তুলছি। পাহাড়ের উঁচু-নিচুতে অনেক বাড়ি কিন্তু মানুষজন চোখে পড়ছে না। ওর বন্ধু ক্লদিয়া আর হেলমুট আমার সঙ্গে দেখা করতে না এলে কোনও মানুষজনের দেখাই পেতাম না প্রায়। ইরমের এই পাহাড়ি বাড়িটা এত সুন্দর যে এখানে এলেই প্রেমে পড়তে আর লিখতে ইচ্ছে করবে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দোতলার বারান্দা থেকে বরফ জমে থাকা ও না-থাকা পাহাড়গুলো দেখা যায়। তাদেরই একটি পাহাড় পাৎচেরকোফেল-এ ট্রেকিং করতে গেলাম এক দিন। আর এক দিন রোফানসেলবা(হ)ন-এ। আল্পস পর্বতমালার অংশ সব। পাৎচেরকোফেল-এ তিন বার শীতকালীন অলিম্পিক হয়েছিল (১৯৬৪, ১৯৭৬, ১৯৮৪)। কেবল-কারে করে ঝুলতে ঝুলতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়াটা একটা অভিজ্ঞতা। তার পর খিদে পেটে ওখানকার স্থানীয় রেস্তোরাঁয় স্থানীয় কিছু পদ অসাধারণ। পাহাড়ের গায়ে কত যে বুনো ফুল। তার মধ্যে বিখ্যাত ফরগেট মি নট। ‘থ্রি মেন ইন এ বোট’-এও এই ফুলটির উল্লেখ পেয়েছিলাম। হাবসব্রুক ফ্যামিলির রাজবাড়ি দেখতে গেলাম অন্য এক দিন। সারা ইউরোপে এই বংশের বেশ প্রতিপত্তি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবহাওয়া তৈরিতেও ছিল এদের সক্রিয় ভূমিকা। রাজবাড়ির অপেক্ষাকৃত নতুন অংশের সঙ্গে চারশো বছরের পুরোনো অংশটিও সুন্দর করে সংরক্ষণ করা। কত মানুষের ঘাম-রক্ত যে এই বৈভবের পিছনের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসে লেগে আছে।

ইরম ও ব্যাগের দোকানের মহিলা আমার ব্যাগের তালা খুলতে ব্যস্ত
ইরম ও ব্যাগের দোকানের মহিলা আমার ব্যাগের তালা খুলতে ব্যস্ত

আর এক দিন সন্ধের আবহাওয়া ছিল মনোরম। পুরোনো ইন্সব্রুকে ঘুরলাম। দেখলাম ট্রাম, ব্যারক ও রেনেসাঁ পিরিয়ডের তৈরি সুন্দর সুন্দর বাড়িঘর। অনেক লোকজন ছুটির মেজাজে রাস্তায়। দেখলাম ইন নদী। বাঁধানো কিন্তু জল টলটল করছে। ইরমের মা ছিলেন ফটোগ্রাফার। তাঁর বেশ কয়েকটা বই আছে, বাড়ি দু’টোও তাঁর। সে সব বই ও বাড়ির স্বত্ব এখন ইরমের। ওদের দেশের তুলনায় ইরমকে আপার ক্লাস বলা যায়। কিন্তু ফ্রান্স আর অস্ট্রিয়া মিলিয়ে তিনটে বাড়ি মেনটেন করতে তাকে সারা বছর খাটতে হয়। তিনি ফিল্ম পরিচালক এবং অসাধারণ চেলোবাদক। বিভিন্ন কনসার্টে বাজানো তাঁর আর একটা পেশা ও প্যাশন। ফ্রান্সে তাঁর মিউজিক দল ‘অরফিও’ (অরফিউস), শিল্পের দেবতা। এক দিন ইরম গেল তার মায়ের কবরে ফুল দিতে। ইন্সব্রুকের কবরখানা। গাছপালা আর ভাস্কর্য দিয়ে কী সুন্দর সাজানো। একটা কবরে একাধিক মৃতদেহ কবর দেওয়ার চল। ইরমের মা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খুন হওয়া সৈনিক তার একুশ বছরের মামা একই কবরে শায়িত। সেই কবরে তার মায়ের পরিবারের আরও এক জনের সৎকার হয়েছে। আমাদের কালচারে এই ব্যাপারটি নেই বলে বেশ অবাক হলাম। এ দিকে হয়েছে কী, এক বিখ্যাত কোম্পানির ট্রলি ব্যাগ নতুন কিনে নিয়ে গেছি। অথচ খারাপ হয়ে গিয়ে এমন ভোগালো, তালা খোলা গেল না কিছুতেই। বৃষ্টির দিনে ওই ভারী লাগেজ নিয়ে ইরম সারাতে গেল ইন্সব্রুকে তাঁর বান্ধবীর দোকানে। সেই বান্ধবীই সমস্যা সমাধান করলেন।এই কোম্পানিগুলো যে কী করতে চেক ইন ব্যাগ বানায় কে জানে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here