moitryমৈত্রী মজুমদার

জল জঙ্গলের দেশ অসম। তবু এখানে বেড়ানোর কথা উঠলেই লোকে বলে “হ্যাঁ গেছি কাজিরাঙ্গা”। কাজিরাঙ্গা তো অবশ্যই যাবেন, ইউনেস্কো হেরিটেজ বলে কথা, কিন্তু তাছাড়াও অসমের যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে পাহাড় জঙ্গল, নদীর সীমাহীন রহস্য উন্মোচনের অবারিত হাতছানি। এই যেমন ধরুন অসমের শোনিতপুর জেলার সদর শহর তেজপুর থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে, ‘নামেরি ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি’।

তেজপুরের মিশন চারিয়ালি থেকে যে রাস্তাটি লখিমপুরের দিকে চলে গেছে সেটি ধরে সোজা বালিপাড়া এসে,অরুণাচলের তাওয়াং যাওয়ার রাস্তা ধরতে হবে। সেই রাস্তায় ভালুকপং পৌঁছনোর আগেই, চারিদুয়ার গ্রাম পেরিয়ে, পৌঁছে যাবেন জিয়াভরালি নদীর ধারে নামেরির জঙ্গলে।

jungle

ব্রিটিশ আমল থেকেই জিয়াভরালিতে মাছ ধরার জন্য বিখ্যাত এই জায়গা।

আধা পর্ণমোচি এবং আধা চিরহরিৎ গাছের এই জঙ্গল ,সংরক্ষিত স্যাংচুযারির মর্যাদা পায় ১৯৭৮ সাল নাগাদ। পরবর্তী কালে এর সীমা বাড়তে বাড়তে ১৯৯৮ সাল নাগাদ ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়। উত্তরে, এটি অরুণাচলের ‘পাংখুই’ ন্যাশনাল পার্কের সঙ্গে মিশেছে। এই দুটি মিলে মোট ১০০০ বর্গ কিমি জুড়ে এই পার্কটির অবস্থান।

বিশেষত্ব হল একাধারে বেত, বাঁশ আর অর্কিডের সমাহার। পশুদের মধ্যে প্রধান হাতি। একশৃঙ্গ গন্ডার বাদ দিলে, অসম হাতিদের স্বর্গরাজ্য। এছাড়া আছে নানা প্রজাতির চিতা, বাঘ, ঢল (বন্যকুকুর), পিগমিহগ, বন্যমহিষ। বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ, সরিসৃপ আর ৩১৫-রও বেশি প্রজাতির পাখি আছে এই জঙ্গলে।

jungle-1

এসব দেখার জন্য নামেরিতে তো আপনাকে আসতেই হবে। আবার থাকতেও  হবে। আর থাকবার জন্য যে ব্যবস্থাটি এখানে আছে সেটি হল ‘নামেরি ইকো ক্যাম্প’। এখানে আছে মোট ১২টি দ্বিসজ্জা বিশিষ্ট থাকার জায়গা। যার মধ্যে দুটি কটেজ আর বাকি ১০টি তাঁবু। কিন্তু ভিতরের ব্যবস্থা সবই আন্তর্জাতিক মানের। খরচাপাতিও ‘পকেট ফ্রেন্ডলি’। সঙ্গে ১২ সজ্জা বিশিষ্ট দুটি ডরমেটরিও আছে।

ক্যাম্পের ভিতর মোবাইল-এর টাওয়ার প্রায় পাওয়াই যায় না। আর যেকোনো ধরনের যান্ত্রিক আওয়াজকে ক্যাম্পের বাইরে রেখে আসাই নিয়ম এখানকার। তাই যেকটা দিন এখানে থাকবেন, আপনার আর প্রকৃতির মাঝখানে তৃতীয় কেউ ঢুকে পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

eco-camp

কিন্তু এখানে করার মতো অনেক কিছু আছে।

জঙ্গলে ট্রেকিং-এর জন্য খুব ভোরে উঠে সশস্ত্র গার্ড নিয়ে জঙ্গলে ঢুকতে হবে। গার্ডই আপনাকে ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। কিন্তু খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না।

বার্ড ওয়াচিং– এই ব্যাপারে যারা উৎসাহী তাদের জন্য নামেরি প্যারাডাইস। বেশিরভাগ বিদেশি পর্যটকই বার্ড ওয়াচিং-এর জন্যই নামেরি আসেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল লুপ্তপ্রায় ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান হর্নবিল’ বা ধনেশ পাখির দেখা মেলে এই জঙ্গলে। গার্ডকে বিশেষ ভাবে বললে নিশ্চয় দেখা পাবেন এর।

eco-camp-at-night

কিন্তু এই সবের মধ্যেও অন্যতম হল, জিয়াভরালি নদীতে রিভার রাফটিং করা আর সঙ্গে বনভোজন । রিসর্টের স্টাফদের বললেই ওনারা ব্যবস্থা করে দেন।

স্থানীয় মিসিং জনজাতির বিশেষজ্ঞ গাইডের সঙ্গে রাফট করে নদীতে ভেসে পড়ুন। বনভোজনের যাবতীয় সরঞ্জাম ওরাই সঙ্গে করে নিয়ে নেবে। এক পারে হিমালয়ের পাদদেশের নামেরির গভীর জঙ্গল, যেখান থেকে যেকোনো মুহূর্তে জংলি জানোয়ার বেরোতে পারে আর অন্যদিকে ফেলে আসা ইকো ক্যাম্প। মাঝখানে খরস্রোতা জিয়াভরালি, যা বর্ষার সময় অসমের দুর্দশার কাহিনি বহন করে আনে প্রতি বছর।

rafting-security

এ নদী আবার একমুখী নয়। চলার পথে বাঁকেবাঁকে লুকিয়ে আছে বিস্ময়। যে কোনো মুহূর্তে সামনে আসবে দুই, তিন বা চারমাথার মোড়। অবাক হচ্ছেন ? হওয়ারই কথা। খরস্রোতায় তার শাখা নদী, উপনদীর মেলামেশা কজনেই বা দেখেছে। তার ওপর আবার সেই স্রোতের ওপর ভাসমান অবস্থায়। সত্যিই গা ছমছমে হাড় হিম করা সে অভিজ্ঞতা। এরকম চলতে চলতে এক চিলতে পাথুরে দ্বীপে এসে ভিড়বে আপনার রাফট আর এখানেই হবে বনভোজনের আয়োজন।

raft-and-the-river

আপনি পাড়ে নেমে চারপাশের শোভা দেখতে থাকুন। এরই মধ্যে আদিবাসী ভাইরা জঙ্গলের কাঠকুটো জোগাড় করে, পাথুরে উনুন বানিয়ে, চুলায় রান্না বসিয়ে ফেলবে। রাফটের তলা থেকে হিমশীতল খরস্রোতায় ঠান্ডা করা ‘চিলড’ বিয়ারও পেয়ে যেতে পারেন। সঙ্গে সদ্য কাটা সালাড। আর পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যেই চোখের নিমেশে তৈরি আপনার জন্য ‘৫ কোর্স লাঞ্চ’। ভাত, ডাল, আলু, বেগুনপিতিকা(ভরতা), শুকনো সবজি, আর দেশি মুরগির ঝোল আর সঙ্গে সালাড,নুন,লেবু, লঙ্কা। আর কী চাই ? এই অসাধারণ পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে,জঙ্গলের গন্ধ আর তাঁর ভূমিপুত্রদের হাতে রাঁধা স্নেহের ‘এখাজ’ (এক থালা ভাত) এই পুরো যাত্রাটির অনুভুতিতে এক নৈসর্গিক মাত্রা যোগ করে দেয়। যদি আপনি চান তাহলে আশেপাশের গ্রাম থেকে নদীতে খেলতে বা কাজ করতে আসা বাচ্চাদেরও আপনার বনভোজনে সামিল করতে পারেন। এই প্রান্তিক এলাকার নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ ভরে খেতে দেখার অনুভুতিও আপনাকে সারাজীবন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা দেবে। এরপর যাত্রা, ক্যাম্প-এ ফেরার।

food-on-oven

বিকেল বেলা যেতে পারেন আশেপাশের আদিবাসী গ্রামে বেড়াতে। শীতল সন্ধ্যায় আঙ্গিনায় জ্বালানো কাঠের আগুনের পাশে বসে ‘আপং’(স্থানীয় রাইস বিয়ার) সহযোগে,জংলি কায়দায় বানানো শুয়োরের কাবাব, বেশ এক আমেজের সৃষ্টি করবে।

tribal-treat

ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল, নামেরি যাওয়ার ভালো সময়। এরপর জঙ্গল বন্ধ হয়ে যায়। এখানকার ইকো ক্যাম্পের ব্যবস্থা, খাবারদাবার এবং কর্মীরা সবাই অত্যন্ত ভালো ও যত্নশীল। তাই একবার গেলে আপনি বারবার ফিরে যেতে চাইবেনই নামেরির জঙ্গলে।

ছবি:লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here