mousumiমৌসুমি বিলকিস

একটা বিষয় বেশ চমৎকার। এক বারও কেউ আমার পাসপোর্ট দেখতে চায়নি। এমনকি একটা দেশের সীমানা অতিক্রম করে যখন অন্য দেশে ঢুকছি তখনও নয়। সীমান্তগুলোতে কোনও চেকপোস্ট নেই। শুধু একটা ছোট বোর্ডে যে দেশে ঢুকছি সেই দেশের নাম লেখা। ট্রেনের অনলাইনে কাটা টিকিট দেখেও টিকিট চেকার পরিচয়পত্র দেখতে চাননি। নিজের দেশেই যেটা অসম্ভব। কেবল রোম এয়ারপোর্টে বেরোনোর সময় আর সেখান থেকে দেশে ফেরার সময় পাসপোর্টে দু’ বার স্ট্যাম্প মারা হয়েছিল। আসলে সেনগেন চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশের নাগরিকরা স্বাধীন ভাবে ওই দেশগুলোর মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। আমার ভিসা ছিল সেনগেন ভিসা। ফলত কেউ ভিসা দেখতে চাইলেও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না।

ব্রিসলেভ স্টেশনে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিলেন ইরমট্রড। এ যাত্রায় এখানেই ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা। জড়িয়ে ধরে পরস্পরকে বিদায় জানালাম। তিন তরুণী আর এক তরুণের কেবিনে আমার জায়গা হল। কিছু ক্ষণের মধ্যে ওদের সঙ্গে আলাপ জমে গেল। ক্লডিয়া, আরান্ত্‌জা, ক্যান্ডেলা আর আদ্রিয়ান। স্পেনের নাগরিক। বিলবাও শহরে থাকে। স্কুল শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ছুটির ফাঁকে বেড়াতে বেরিয়েছে। আমার মতোই ওদের গন্তব্যও প্রাগ। ওরা কেউ কেউ দু’টো কোর্সে এক সঙ্গে ভর্তি হবে। আমি অবাক হয়ে জানালাম আমাদের দেশে এক সঙ্গে দু’টো কোর্স করা যায় না। এ বার ওরা অবাক হল। বলল, এ ভাবে তো অনেক সময় নষ্ট হয়। আর কেউ যদি দু’টো বিষয় এক সঙ্গে টানতে পারে তা হলে কেন পড়বে না? মানতে বাধ্য হলাম ওদের রীতিনীতি অনেক বেশি প্র্যাক্টিক্যাল। ওদের দেশে পড়াশোনার খরচ অনেক। সরকারি কলেজে ফি কম, কিন্তু সুযোগ পাওয়া মুশকিল। তাই বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়তে বাধ্য হয়। ওদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে প্রাগ স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

ট্রেনের মধ্যে স্পেনের ছেলেমেয়েরা
ট্রেনের মধ্যে স্পেনের ছেলেমেয়েরা

আমার ইউরোপ ভ্রমণের শেষ তিন দিনের দু’দিন প্রাগে থাকব। তৃতীয় দিন রোমে গিয়ে দেশে ফেরার উড়ান। কথামতো প্রাগ স্টেশনে এলিস্‌কা আমাকে নিতে এল। স্টেশনটা বড়োসড় হলেও একেবারেই ভিড়ভাট্টা নেই। তাই পূর্ব পরিচয় না থাকলেও আমাকে চিনে নিতে ওঁর সমস্যা হয়নি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ট্রাম ধরার জন্য একটা স্টপেজে আমাকে দাঁড় করিয়ে এলিস্‌কা গেল আমার জন্য টিকিট কাটতে। কিন্তু সে ফিরে এসে জানাল এই মধ্য বেলায় কাউন্টার বন্ধ। সম্ভবত লাঞ্চ ব্রেক। এখানে টিকিট কেনার কোনও মেশিনও পাওয়া গেল না। এবং অবধারিত ভাবে আমরা বিনা টিকিটে ট্রামে উঠলাম। কলেজজীবনের কথা মনে পড়ে গেল। আমরা এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরতাম বিনা টিকিটে। তাদের প্রায় কারও সঙ্গেই আজ যোগাযোগ নেই। কিন্তু সেই উচ্ছ্বল দিনগুলো এক ঝলক ফিরে এল এলিস্‌কার তারুণ্যের দুঃসাহসিকতায়। যদিও বুক দুরুদুরু ভয়ে। রাস্তায় যেতে যেতে দেখলাম ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতো এ শহরও তার পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ভেরতাভা (ভেরতাবা) নদীর দু’তীরে খুবই ঘনবসতিপূর্ণ কিন্তু সাজানো শহর। সেই খ্রিস্টজন্মের পাঁচশো বছর আগে থেকেই নাকি এ অঞ্চলে জনবসতি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী হয় এ শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এ শহরও নাজিদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এই সময় ইহুদি বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায় বা নিহত হয়। এ ঘটনার পর খুব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায় শহরের ইহুদি জনসংখ্যা। ‘প্রাগের বসন্ত’ থেকে বার্লিন প্রাচীর ভাঙার সমসাময়িক ‘বেগুনি বিপ্লব’- এর মধ্যবর্তী সময় এ শহর ছিল বামপন্থী শাসকদের। এ শহর নাজিমুক্ত করেছিল রাশিয়ান সৈন্যদল। তখন থেকেই ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহল কমিউনিস্ট মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। নাজিদের নারকীয় গণহত্যা যে মানুষেরা দেখেছে তাদের কাছে এটাই ছিল খুব স্বাভাবিক।এ সব ঐতিহাসিক তথ্য অনেকেই জানেন বা ইচ্ছে হলে সহজেই জেনে নিতে পারেন। কিন্তু এলিস্‌কা যেটা বলল, ওর মা-বাবা এক সঙ্গে থাকবে বলে যখন একটা ঘর ভাড়া খুঁজেছিল প্রাগে কেউ ওদের ঘর ভাড়া দেয়নি। বিয়ে না করে এক জোড়া ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে থাকবে, এই ব্যাপারটা তখনও ছিল নিন্দিত। শেষে এলিস্‌কার দিদা ওদের জন্য নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর এলিস্‌কার জন্মের পর ওর মা যে হেতু চাকরি করতে বাইরে বেরোতেন জামাকাপড় সহজে কাচার জন্য একটা ওয়াশিং মেশিন কিনতে চেয়েছিলেন। মেশিনটা প্রাগের বাজারে কোথাও খুঁজে পাননি। বাম জমানায় কোনও কিছু পাওয়া নাকি খুব সহজ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের বাম জমানার সঙ্গেও মেলে না ব্যাপারটা। মানুষের জীবনের খুব ছোট ছোট বিষয়। কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। বিশেষ করে ইউরোপের একটা শহর তিরিশ/পঁয়ত্রিশ বছর আগেও এ রকম ছিল ভাবতে বেশ অবাক লাগে।

তেরতাভা নদীর তীরে
তেরতাভা নদীর তীরে

এলিস্‌কা ও ভইতা আজ বিয়ে না করেই এক সঙ্গে থাকে। তার জন্য পারিবারিক বা বাইরে থেকেও কোনও সমস্যা হয়নি। ওদের ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টটি মূল প্রাগ থেকে খুব জোর দশ মিনিট। এলাকাটি বেশ নির্জন। দিনেরবেলায়ও একা একা হাঁটলে গা ছমছম করে। রাতে তো কথাই নেই। খুব বেশি মানুষজনকে এই এলাকার রাস্তায় দেখা যায় না। কিন্তু প্রাগের কেন্দ্রে ট্যুরিস্টের ছড়াছড়ি। অনেক জাপানি ট্যুরিস্টকে দেখলাম। তা ছাড়া রাস্তায় প্রচুর মধ্য প্রাচ্যের মহিলা পুরুষ। তাঁরা ট্যুরিস্ট না এখানকার বাসিন্দা, বোঝা গেল না। কিছু ভারতীয়ও চোখে পড়ল। আমি এ পর্যন্ত যে সব শহরে ঘুরেছি কোথাও এত গুচ্ছ গুচ্ছ ট্যুরিস্ট দেখিনি। এমনকি ভিয়েনা বা রোমেও নয়।

অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেই এলিস্‌কা দু’কাপ কফি বানিয়ে আমাকে গান শোনাতে বসল। অ্যাকর্ডিয়ন বাজিয়ে সে শোনাল চেক লোকসঙ্গীত এবং অনুবাদ করে বুঝিয়ে দিল। সান ড্রাম নামের এক ছোট বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। কী অসাধারণ তার শব্দ। এই শহরের কোনও এক শিল্পীর সৃষ্টি এই সান ড্রাম। তাঁর মনে হয়েছে সূর্যালোকের সঙ্গে সংযোগ আছে যন্ত্রটির। তাই এ রকম নামকরণ করেছেন। এই প্রথম কোনও সংগীত শিল্পী কোনও উদ্বেগ ছাড়াই তার বাদ্যযন্ত্রগুলো আমার হাতে ছেড়ে দিল আর বাজানোর পদ্ধতিও বলে দিল। ক’দিন ওর সঙ্গে থাকলে হয়তো অ্যাকর্ডিয়ন বাজানো শিখেই যেতাম। এলিস্‌কা চার্লস ইউনিভারসিটিতে গবেষণা করছে। বিষয় তামিল লোকসঙ্গীত। সে জন্যই দু’ বার ভারতে এসেছে, তামিলনাড়ুতে। আর ভাষাটিও শিখে নিয়েছে। আমার বেশ লজ্জা হল। দক্ষিণ ভারত সম্পর্কে কিছুই জানি না আর ভাষাগুলির একটি বর্ণও বুঝি না।

প্রাগের রাস্তায়
প্রাগের রাস্তায়

প্রথম দিন কথা ছিল এলিস্‌কার ঘরে লাঞ্চ সেরে ঘুরতে বেরোব। কিন্তু রাস্তায় লক্ষ করলাম ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। জিজ্ঞাসা করাতে লজ্জা লজ্জা করে বলল, পায়ে ব্যথা। তবুও আমাকে সঙ্গে নিয়ে শহর ঘোরাতে চায়। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাইরে বেরোব না। ওর সঙ্গেই গল্প করে কাটাব। সেই সন্ধেটা গান আর গল্পে ভালোই কাটল। ইন্দ্রা আর লুবোমির এর সঙ্গে ফোনে কথা হল। মাত্র দু’দিনে ওদের সঙ্গে দেখা করার কোনও সুযোগ হল না। ওরা দু’জনেই গবেষণার কাজে কলকাতায় কাটিয়েছে। এখনও আসে। বাংলার গ্রাম্য দেবদেবী নিয়ে লুবোমির-এর গবেষণাগ্রন্থ আছে চেক ভাষায়। ওরা দু’জনেই বাংলা জানে। লুবোমির অবশ্য চার্লস ইউনিভারসিটিতে ইন্দ্রার সিনিয়র। ইন্দ্রার বিষয় ম্যানুস্ক্রিপ্ট। বাংলার গ্রামেগঞ্জে সে ঘুরে বেড়ায় লোক সাহিত্যের ম্যানুস্ক্রিপ্ট খুঁজতে। দ্বিতীয় দিন আমরা বেরোলাম। তখনও এলিস্‌কার পায়ে ব্যথা কমেনি। কিছু ক্ষণ শহরের ভেতর ঘোরাঘুরি করে আমরা ছোট্ট ট্রামে করে পেত্রিন পাহাড়ে উঠলাম। এখান থেকে পাওয়া যায় শহরটার প্যানোরামিক ভিউ। এই পাহাড়ের চূড়ায় আইফেল টাওয়ারের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে পেত্রিন লুকআউট টাওয়ার। এত ক্ষণ এই শহরের ঘোরাঘুরি খুব সাধারণ পর্যায়েই ছিল, যেমন করে ট্যুরিস্টরা দেখে। কিন্তু যখন আমরা পায়ে হেঁটে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করলাম দু’জনে আবিষ্কার করলাম ফলের বাগান। সব ফল এলিস্‌কাও চেনে না। তাই বেছে বেছে ফল পেড়ে খেতে থাকলাম দু’জনে। একটা টকটক কাঁচা আপেলও খেয়ে ফেললাম। ঈশ্বরের বাগানের নিষিদ্ধ ফল। একটা ইটের জঙ্গলময় শহরে যে এই রকম এক সবুজ তৃণভূমি ও ফলের বাগান পেয়ে যাব, ধারণার বাইরে ছিল। এমনকি এই শহরের বাসিন্দা হয়ে এলিস্‌কাও জানত না এ খবর। দু’জনে দারুণ উপভোগ করলাম।

এই সন্ধেতেই ভইতা (ওর নাম উচ্চারণ এত কঠিন। বাংলায় মোটামুটি দাঁড়ায় ভইতা নেয়েলডি।) ও তাঁর মিউজিসিয়ান বাবা সামার স্কুল শেষ করে ভালতিসে থেকে ফিরে এলেন। ভইতার সঙ্গে ওর বাদ্যযন্ত্রগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে ওর বাবা আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। সামার স্কুলে এত খাটনি গেছে ভইতা ফ্রেশ হয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। পর দিন খুব ভোরে রেডি হয়ে ভইতা অফিস যাওয়ার পথে আমাকে এয়ারপোর্টের রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে দিল। ট্রেন যখন একটা স্টেশনে দাঁড়িয়েছে হুইলচেয়ারে বসা এক যুবতীকে এক জন লোক চেয়ারসুদ্ধ তুলে দিল ট্রেনে। ভেবেছিলাম লোকটি মেয়েটির সঙ্গেই আছে। কিন্তু দেখলাম ওকে তুলে দিয়েই লোকটি চলে গেল। হাসিখুশি মেয়েটি তেরেসা। কথা হল ওর সঙ্গে। একাই হুইল চেয়ার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কাজে যায়। কেউ না কেউ ওকে ঠিক সাহায্য করে। ইউরোপে বাসে ও ট্রেনে সাইকেল, প্যারাম্বুলেটর, হুইলচেয়ার নিয়ে ওঠা যায়। এ সবের জন্য আলাদা ফাঁকা জায়গা আছে। ট্রেন থেকে নেমে যখন ভারী লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি পিছন থেকে কেউ বলল, ‘মে আই হেল্প উ?’ তার পর সেই রোমান নামের যুবক আর আমি এয়ারপোর্টগামী বাসে উঠলাম। সে যাবে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ–এ আর আমি রোম। সে ইঞ্জিনিয়ার, রাশিয়াতে চাকরি করে।

রোম এয়ারপোর্টে দেখা করতে এসেছেন বিজয়জি ও আলবের্তো, প্রায় পাঁচ ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে। ওঁদের সঙ্গে কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে চেক ইন করার জন্য চলে গেলাম। মাস খানেক বাদে কলকাতায় ফিরব। প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হবে সেই আনন্দ এবং নতুন বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ তখন মিলেমিশে একাকার।

(শেষ)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here