mousumiমৌসুমি বিলকিস

ভ্রমণের ধারাবাহিকতা মানলে এই পর্বে লেখা উচিত চেক রিপাবলিকের ভালতিজে শহরের কথা। কিন্তু চলে যাচ্ছি ভিয়েনা। ওয়েন মেডলিং স্টেশনে যখন নামলাম সুজানে আর হেলমুট (ইরমট্রড-এর দিদি-জামাইবাবু) ‘নমস্তে মৌসুমি’ লেখা ও ডেকরেট করা ছোট্ট হার্ডবোর্ড নিয়ে স্বাগত জানাতে উপস্থিত। প্রথম থেকেই ওরা দু’জন এমন ব্যবহার করলেন যেন আমরা পরস্পরের বহু দিনের চেনা। প্রথমেই আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন ভিয়েনা ঘোরার জন্য তিন দিনের একটা টিকিট। টিকিটটি যে দিন পাঞ্চ করব সে দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন ট্রামে, বাসে, ট্রেনে বৈধ ভাবে শহর ঘুরতে পারি। সারা ইউরোপ জুড়েই এমন ব্যবস্থা। নব্বই মিনিট থেকে শুরু করে এক মাস বা সারা বছরের টিকিট এক সঙ্গে কাটা যায়। পাঞ্চ করে নিলে তবেই আপনি বৈধ যাত্রী। প্রথমেই চার তলায় ওঁদের অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। কী সুন্দর সাজানো! বাড়িটার স্থাপত্যও অনেকটাই পুরোনো। ওরা দু’জনেই ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী। নিজেদের আঁকা ছবি দিয়ে সাজিয়েছেন বসবাস। দু’জনেই এখন অবসর নিয়েছেন। কিন্তু এখনও সুজানে তাঁর ডায়েরিতে প্রত্যেক দিন কয়েকটা করে ছবি আঁকেন। তিনি যেখানেই যান ডায়েরি, কালো কালির জাপানি কলম, কয়েক রকম রং ব্যাগে থাকে তাঁর। আর রাস্তায় বা যে কোনও জায়গায় কিছু ইন্টারেস্টিং মনে হলেই ছবি আঁকেন। এ রকম করে তাঁর দু’শোর বেশি ডায়েরি জমেছে। দু’জনেই বয়স্ক। কিন্তু দু’জনেই এত মজার মানুষ। সারাক্ষণ মজা করছেন। হেলমুট ভালো করে শুনতে পান না বলে সুজানে তাঁর কানের কাছে গিয়ে সব কিছু খুব ধীরে ধীরে নীচু স্বরে বুঝিয়ে দেন। সারা ক্ষণ ওঁদের পরস্পরকে জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া চলতে থাকে, একেবারে কমবয়সি জোড়দের মতো। ওঁরা উজ্জ্বল, ইতিবাচক, প্রেমময় দম্পতির উদাহরণ হয়ে থাকবে আমার কাছে।

italy-travel5
সুজানের ডায়েরি

সে দিন সুজানে সুন্দর কয়েকটা পদ বানিয়েছিলেন আমার আগমন উপলক্ষে। হাতে মাত্র দু’দিন। তাই লাঞ্চ সেরেই বেরিয়ে পড়লাম। ওঁরা জানতে চাইলেন আমি প্রথমে কোথায় যেতে চাই। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের বাড়ি যেতে চাইলাম, যিনি সারা পৃথিবীকে মন- ব্যাখ্যার নতুন দিশা দিয়েছেন। তাঁর তত্ত্ব বাংলার সাহিত্য ও চিত্রকলাকে প্রভাবিত করেছিল, আর অবশ্যই পৃথিবীর চলচ্চিত্রকে। এই মুহূর্তে জগদীশ গুপ্ত’র সেই আশ্চর্য অতলে নিয়ে যাওয়া গল্পগুলোর কথা মনে পড়ছে। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কয়েক দিনের ভিয়েনা সফরে ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যখন তিনি মূল ভিয়েনায় থাকেন না এবং খুব বৃদ্ধ। সে বিষয়ে তাঁর লেখাও আছে (‘ভিয়েনা—ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা’, এবং মুশায়েরা, সিগমুন্ড ফ্রয়েড সংখ্যা, জানু- মার্চ, ২০১৪)। বাঙালি ফ্রয়েডতত্ত্বের চর্চাকারীদের সঙ্গে ফ্রয়েডের চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। ফ্রয়েডের বাড়ি এখন একটা আস্ত মিউজিয়াম। সেখানে তাঁর লেখা চিঠি, আসবাবপত্র, ব্যবহৃত কলম, চশমা, বই, ছবি, সংক্ষিপ্ত জীবনী সুন্দর করে সাজানো রয়েছে। একটা লাইব্রেরি আছে ফ্রয়েডতত্ত্বের গবেষকদের জন্য। তাঁর বাড়িতে এখন সংরক্ষিত-সংকেতবাহী বিশেষ পতাকা ঝোলানো। এই বাড়ির নীচে একটা ক্যাফে তাঁর নামে উৎসর্গীকৃত।

italy-travel2
ভিয়েনায় ফ্রয়েডের বাড়ি এখন মিউজিয়াম

এখানকার ক্যাফেগুলো পুরোনো কৌলীন্য হারিয়েছে ঠিকই তবে এখনও কিছু কিছু কবি ও লেখক ক্যাফেতে সময় কাটান, লেখেন। কয়েক জন লেখকের নামই হয়ে গেছে ‘কফি হাউস রাইটার’; যেমন স্টেফান জায়েক, পিটার আইয়েনবার্গ, কার্ল ক্রাউস। ফ্রয়েড মিউজিয়াম দেখা শেষ করে আমরা যখন একটা ক্যাফেতে খেতে গেলাম দেখি একটা টেবিল জুড়ে বসে এক লেখক লিখছেন। আমার মতো এক বিজাতীয় মানুষকে বার বার দেখলেন আর ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রাখলেন হাসি আর কী সব লিখতে থাকলেন। সুজানে যথারীতি এক ইন্টারেস্টিং আফ্রিকান  মহিলার ছবি আঁকতে শুরু করলেন। ভিয়েনা সব অর্থেই সংস্কৃতির শহর। ‘বিফোর সানরাইজ’ ফিল্‌মটির কথা মনে পড়ছে। এক ভিয়েনার কবি ‘মিল্কশেক’ শব্দটি দিয়ে তৎক্ষণাৎ কবিতা লিখে পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। যে রাস্তায় হাঁটছি আশ্চর্য সব ভাস্কর্য, রাস্তার দু’পাশে পুরোনো ও সুন্দর স্থাপত্যের বাড়ি, ছেলেমেয়েরা চেলো-ভায়োলিন-গিটার নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে, যে কোনও প্রদর্শনী বা মিউজিয়ামের প্রধান দরজার কাছে রাখা সারা শহরের আগামী দিনের আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানসূচি। সেগুলো সংগ্রহ করে জানতে পারলাম এক এক দিনে কত যে অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী। এবং, আশ্চর্য প্রায় কোনওটাই ফ্রি নয়। অথচ দর্শক-শ্রোতার অভাব হয়নি। স্টানলি কুব্রিকের তোলা ফটোগ্রাফি নিয়ে এক প্রদর্শনী দেখতে গেলাম। আটটি বড় বড় হল জুড়ে প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে। প্রত্যেকটি ছবির সঙ্গে তথ্য। ফটোগ্রাফার স্ট্যানলি কুব্রিকের ওপর এক তথ্যচিত্র বার বার চলছে। দেখছে অনেকে। তিনি যে সব যন্ত্রবাদক দলের ছবি তুলেছেন সেই সংশ্লিষ্ট গানগুলো শোনারও ব্যবস্থা আছে।‘২০০১- এ স্পেস ওডিসি’ বা ‘লোলিটা’র পরিচালক নন, এক অন্য কুব্রিককে পেলাম।

italy-travel4
রাঠহৌসপ্লাৎস্‌-এর সামনে সিনেমা উৎসব

এই সময় গথিক স্থাপত্যের রাঠহৌসপ্লাৎস্‌-এর সামনে চলছিল উন্মুক্ত সিনেমা উৎসব। সত্যিই আকাশের নীচে। ভিড়ে ভিড়াক্কার আর খাবারদাবারের দোকানে ভর্তি। সুজানে আর হেলমুট সঙ্গ দিয়েছেন সারাক্ষণ। কিন্তু ওঁরা ন’টার সময় ঘুমোতে চলে যায় আর স্ক্রিনিং শুরু হবে সাড়ে আটটায় সূর্য ডোবার পর। অনেকটা সময়। তাই ঘরে ফিরে আবার গেলাম উৎসব চত্বরে। সে রাতে খুব হাওয়া, শীত আর মেঘলা আকাশ। তবু দর্শকের অভাব নেই। দেখলাম ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার পঞ্চাশতম জন্মদিনে তৈরি ‘এ ম্যান অ্যান্ড হিজ মিউজিক’। তিনশো বর্গমিটারের স্ক্রিন আর অসাধারণ শব্দ ব্যবস্থা। মনে হচ্ছে কোনও হলের ভেতর বসে ফিল্‌ম দেখছি। শব্দের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন হ্যাগাইড স্মাৎস্‌। তিনি ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিলেন কোন প্রান্তে কী রকম স্পিকার এত ভালো শব্দের অনুভূতি দিচ্ছে। ওঁর সঙ্গে আলাপ জমে গেল দিব্যি। ফিল্‌মের মাঝপথে বৃষ্টি শুরু হল। ফাঁকা হয়ে গেল দর্শক আসন। আমি স্মাৎস্‌ আর ওঁর সহযোগীর ছাউনিতে গিয়ে পুরো ফিল্‌ম দেখলাম। তার পর মধ্যরাতে শহর দেখতে দেখতে শেষ ট্রাম ধরে সুজানের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরা। তিনি আমাকে আগেই ঘরের চাবি দিয়েছিলেন আর কী করে কোন দরজা খুলতে হবে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। মূল দরজা খুলতে গিয়ে আলোর ঝলকে চমকে ওপরে তাকিয়ে দেখি এক ক্যামেরা ছবি তুলছে এই মধ্যরাতের অনুপ্রবেশকারীর।

এ শহরে এত আর্ট মিউজিয়াম! দু’দিনে কোনটা ছেড়ে কোনটায় যাব ঠিক করা মুশকিল। সুজানের হাতে ছেড়ে দিলাম। যাওয়া হল লিওপোল্ড মিউজিয়ামে। কত প্রদর্শনী চলছে! শেষে লাইন অ্যান্ড ফর্ম-এর ওপর এক অস্থায়ী ও রুডল্ফ লিওপোল্ডের সংগ্রহ করা পেন্টিং-এর স্থায়ী প্রদর্শনী দেখে আপ্লুত হলাম। মিউজিয়ামের রেস্তোরাঁতে লাঞ্চ সেরে সুজানে আর হেলমুট আমাকে নিয়ে গেলেন পৃথিবীবিখ্যাত জেন্তাল ফ্রিদফ কবরখানায়। এটি এত বড় যে এক দিনে পায়ে হেঁটে পুরোটা ঘোরা সম্ভব নয়। এখানে মধ্যমণিতে যে চার্চ তার আশেপাশে ভিয়েনার বিখ্যাত মানুষদের কবর। বেঠোফেন, মোৎজার্ট, জোহান স্ট্রস প্রমুখ পৃথিবী বিখ্যাত মিউজিসিয়ানদের কবর বা স্মৃতিস্তম্ভ দেখে আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়লাম। ফুলের গাছ বা ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো সব কবর। আর ইন্সব্রুকের মতোই পারিবারিক কবরে একাধিক মৃতেরা কবরস্থ।

italy-travel3
আশ্চর্য সুন্দর, জেন্তালফ্রিদফ কবরখানা

ভিয়েনায় দু’ পা হাঁটলেই দাঁড়িয়ে দেখতে হয় বাড়িঘর, চার্চ, ভাস্কর্য। এখানকার পুরোনো বাড়িগুলোর নানা রকম গঠনশৈলী কত যুগকে যে ধরে রেখেছে। সেগুলো পুনঃসংরক্ষণ করে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ, হলঘর, নানা রকম অফিস। ভিয়েনায় বহুতল তৈরি নিষিদ্ধ। খুব আধুনিক বাড়ি মধ্য ভিয়েনায় চোখে পড়বে না। সব মিলিয়ে দু’ একটা আধুনিক কাচ-ঘেরা ব্যবসাকেন্দ্র দেখেছি। গথিক, আরবীয়, ক্লাসিক, ব্যারক এবং অবশ্যই সব স্টাইলের মিশেল বাড়ি ও চার্চগুলোর নির্মাণশৈলীতে। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখব। শেষে স্টিফেন ক্যাথিড্রাল, প্লেগ মনুমেন্ট, সেন্ট মিখাইল গেট, দ্য হুফবার্গ, ‘পাওয়ার অন দ্য সি’ ভাস্কর্য, পার্লামেন্ট, স্টেট অপেরা ইত্যাদি খুব কাছ থেকে বা বাইরে থেকে দেখার সুযোগ হল।

যে দিন স্টিফেন ক্যাথিড্রাল দেখতে গেলাম সে দিন সালের্নোর চিজারে ওঁর কাজে ভিয়েনায়। আবার দেখা হল আর তিনি খাওয়াতে নিয়ে গেলেন চকোলেট তৈরিতে বিখ্যাত ও প্রাচীন‘দেমেল’-এ। দেখলাম ওখানকার কর্মচারীরা নানা রকম চকোলেট তৈরি করছে। সাকেরতর্তে আর ওয়ারনেস চো কুলাডে নামক হট চকোলেট দিয়ে হল সান্ধ্যআহার। পরে সুজানের কাছে শুনলাম দেমেল না কি খুবই কস্টলি আর ঘ্যামা রেস্তোরাঁ।

হাবসব্রুক রাজবংশের প্রথম মহিলা শাসক (১৭৪০- ১৭৮০) হয়ে বসলেন ষষ্ট চার্লস-এর কন্যা মারিয়া তেরেসা।  বাবারই কল্যাণে। এক জন মহিলা শাসককে তৎকালীন ইউরোপের অন্য শাসকরা মেনে নিতে পারেননি। তাই নিয়ে কত চাপানউতোর। যদিও তিনি খুব সফল ভাবেই পালন করেছিলেন তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু আমি ভাবছি, প্রতি বছর যিনি বাচ্চার জন্ম দেন আর তাঁদের অধিকাংশই অকালে প্রাণ হারান তিনি কেমন করে এত কিছু সামলেছেন। ভিয়েনার কন্যা মারিয়া তেরেসা, সেলাম।  

ছবিঃ লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here