Connect with us

দূরে কোথাও

পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: কর্নাটক

পর্যটন সম্পদে রীতিমতো সমৃদ্ধ কর্নাটক। স্থাপত্য, জঙ্গল, প্রকৃতি – কী নেই এই রাজ্যে। সাধে এই রাজ্যের পর্যটনের স্লোগান ‘এক রাজ্য, অনেক বিশ্ব’! কিন্তু বাঙালি এই রাজ্যে বেঙ্গালুরু-মায়শুরু (মহীশুর) কেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসে। খবর অনলাইন আপনাদের জন্য সাজিয়ে দিল কর্নাটকের তিনটি ভ্রমণ-ছক। এ বার পুজোয় আপনার গন্তব্য হোক কর্নাটক। ভ্রমণ-ছক ১: দক্ষিণ কর্নাটক Loading videos… […]

Published

on

পর্যটন সম্পদে রীতিমতো সমৃদ্ধ কর্নাটক। স্থাপত্য, জঙ্গল, প্রকৃতি – কী নেই এই রাজ্যে। সাধে এই রাজ্যের পর্যটনের স্লোগান ‘এক রাজ্য, অনেক বিশ্ব’! কিন্তু বাঙালি এই রাজ্যে বেঙ্গালুরু-মায়শুরু (মহীশুর) কেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসে। খবর অনলাইন আপনাদের জন্য সাজিয়ে দিল কর্নাটকের তিনটি ভ্রমণ-ছক। এ বার পুজোয় আপনার গন্তব্য হোক কর্নাটক।

ভ্রমণ-ছক ১: দক্ষিণ কর্নাটক

Loading videos...

প্রথম দিন – বেঙ্গালুরুর উদ্দেশে ট্রেন বা বিমান। হাওড়া থেকে বেঙ্গালুরু যাওয়ার সব থেকে ভালো ট্রেন দুরন্ত এক্সপ্রেস সোম আর বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল ১১টায় হাওড়া ছেড়ে যশবন্তপুর পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৪টেয়। হাওড়া-যশবন্তপুর এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত ৮:৩৫-এ ছেড়ে যশবন্তপুর পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭:১৫-এ। কলকাতা থেকে দিনে অন্তত ১৪-১৫টা বিমান রয়েছে।

দ্বিতীয় দিন বেঙ্গালুরু পৌছনোর হিসেব করে এই সুচি দেওয়া হল।

লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে গ্লাস হাউস।

দ্বিতীয় দিন – বিকেলে বেঙ্গালুরু পৌঁছন।

তৃতীয় দিন – বেঙ্গালুরু ঘোরাঘুরি।

বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যানে।

বেঙ্গালুরুতে কী দেখবেন

(১) শহরে – টিপুর প্রাসাদ, লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, নন্দী মন্দির তথা বুল টেম্পল, বিধানসৌধ (রাস্তা থেকে দেখা), কুব্বন পার্ক

(২) বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যান – শহর থেকে ২২ কিমি

(৩) নন্দী হিলস – বেঙ্গালুরু থেকে ৫৫ কিমি। উচ্চতা ৪৮৫১ ফুট।

(৪) শিবগঙ্গা – চিত্রদুর্গের রাস্তায় ৫২ কিমি, ৪৫২৭ ফুট উঁচু পাহাড়।

শিবগঙ্গা।

চতুর্থ দিন –  শ্রবণবেলগোলা হয়ে বেলুর, ২৩০ কিমি। শ্রবণবেলগোলায় দেখে নিন গোমতেশ্বরের মূর্তি। বিকেলের মধ্যে পৌঁছোন বেলুর। রাত্রিবাস বেলুর।

পঞ্চম দিন ও ষষ্ঠ দিন – আজও থাকুন বেলুরে।

মন্দির ভাস্কর্য, বেলুর।

পঞ্চম দিনে দেখুন

(১) চেন্নাকেশব মন্দির – বেলুরের প্রধান আকর্ষণ। অসাধারণ কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত। ১১১৬ সালে মন্দির তৈরি শুরু, সম্পূর্ণ হয় ১০৩ বছরে। মন্দিরের গায়ে নানা ভাস্কর্য। মন্দির দেখতে অন্তত ঘণ্টা দুয়েক সময় দিন।

(২) হালেবিডু – বেলুর থেকে ১৬ কিমি। এই মন্দিরের খ্যাতিও তার ভাস্কর্যের জন্য। মন্দিরের ভেতরে প্রথমে হোয়েসলেশ্বর শিব, পরে সান্থালেশ্বর শিব।

বীরনারায়ণ মন্দির, বেলাওয়াড়ি।

(৩) বীরনারায়ণ মন্দির, বেলাওয়াড়ি – বেলুর আর হালেবিডুর কিছুটা আড়ালেই রয়েছে এটি। কিন্তু হোয়সলদের কীর্তির আরও এক অনন্য নিদর্শন। হালেবিডু থেকে ১৬ এবং বেলুর থেকে ৩২ কিমি।

ষষ্ঠ দিনে চলুন

বেলুর থেকে চিকমাগালুর হয়ে কেম্মানাগুন্ডি, ৮৯ কিমি। পথে দেখে দিন হেব্বে জলপ্রপাত। কফিবাগিচার মধ্য দিয়ে পথ, দারুণ শোভা। সবুজে ছাওয়া পাহাড়ি শহর কেম্মানাগুন্ডি, সূর্যাস্ত মনোরম।

বেলুর থেকে মাদিকেরির পথে।

সপ্তম দিন – বেলুর থেকে চলুন মাদিকেরি (১১৭০ মি), ১২৩ কিমি। রাত্রিবাস মাদিকেরি।

অষ্টম ও নবম দিন – থাকুন মাদিকেরিতে।

অ্যাবে ফলস্‌।

মাদিকেরিতে দেখুন

(১) ওঙ্কারেশ্বর মন্দির

(২) হিন্দুরাজাদের সমাধিসৌধ

(৩) অ্যাবে ফলস – মাদিকেরি শহর থেকে ৬ কিমি।

(৪) মাদিকেরি ফোর্ট – শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। পাহাড়চুড়োয় অবস্থিত এই দুর্গটি এখন জেলাশাসকের দফতর। এখানে সেন্ট মার্ক্স গির্জায় রয়েছে একটি ছোট্ট মিউজিয়াম।

(৫) রাজাস সিট – শহরের পশ্চিম প্রান্তে। এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দৃশ্যমান।

(৬) কুশলনগর, বায়লাকুপ্পে – মাদিকেরি থেকে ৩০ কিমি কুশলনগর। কাবেরীর জলে ঘেরা তৃণভূমি। এখান থেকে দু’কিমি দূরে নিসর্গধাম। পাখি, প্রজাপতি ও বাঁশ-চন্দন-সহ নানা বৃক্ষ শোভিত কাবেরীর দ্বীপ। কুশলনগর থেকে ১১ কিমি বায়লাকুপ্পে। ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম তিব্বতি বসতি। রয়েছে অনেক মনাস্ট্রি, যার মধ্যে প্রধান নামদ্রোলিং মনাস্ট্রি।

(৭) দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প – মাদিকেরি থেকে ৩৬ কিমি। কাবেরী নদীর ধারে অবস্থিত এই এলিফ্যান্ট ক্যাম্পটি। কর্নাটকের বনবিভাগের হাতিদের আবাসস্থল।

বাগমন্ডলা।

(৮) বাগমন্ডলা – মাদিকেরি থেকে ৩০ কিমি। কাবেরী, কনক এবং সুজ্যোতির সঙ্গম। শ্রীবাগান্ডেশ্বর মন্দির।

(৯) তলাকাবেরী – বাগমন্ডলা থেকে আরও ৯ কিমি। কোডাগু পর্বতমালায় কাবেরীর উৎসস্থল। তুলাসংক্রান্তিতে মেলা বসে এখানে। ৩৬৫ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে যাওয়া যায় ব্রহ্মগিরি পর্বতে ।

দশম দিন– মাদিকেরি থেকে চলুন মহীশূর (মায়সুরু), ১১৭ কিমি। রাত্রিবাস মহীশূর।

মায়সুরু প্রাসাদ।

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ দিন – থাকুন মহীশূরে।

মহীশূরে কী দেখবেন

(১) মায়সুরু প্রাসাদ – সকাল ১০টা  থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। বিজয়া দশমীতে বিশেষ ভাবে সেজে ওঠে এই প্রাসাদ।

(২) চামরাজেন্দ্র চিড়িয়াখানা – চিড়িয়াখানার ভেতরে পথ নির্দেশ করা আছে। ব্যাটারিচালিত গাড়ি আছে।

(৩) চামুণ্ডী পাহাড় – মহীশূর থেকে ১৩ কিমি। পাহাড় বেয়ে পথ। প্রথমেই স্বাগত জানাবে দণ্ডায়মান মহিষাসুরের মূর্তি। রয়েছে চামুণ্ডী মন্দির, মহারাজার বিশ্রামাবাস, রাজেন্দ্রবিলাস প্রাসাদ। নামার পথে বিশাল নন্দীমূর্তি।

(৪) রেল মিউজিয়াম – দেশের প্রথম রেল মিউজিয়াম। স্টেশনের কাছেই।

(৫) সেন্ট ফিলোমেনা চার্চ – মায়সুরু প্রাসাদ থেকে ২ কিমি। দুশো বছরের পুরনো।

(৬) জগমোহন প্রাসাদ তথা জয়া চামরাজেন্দ্র আর্ট গ্যালারি।

দরিয়া দৌলত বাগ।

(৭) শ্রীরঙ্গপত্তন – টিপুর রাজধানী। রয়েছে শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির, ক্যাপ্টেন ডালির ডানজান (কারাকক্ষ), টিপুর নিহত হওয়ার জায়গা, জামি মসজিদ, দরিয়া দৌলতবাগ, গম্বুজ মসজিদ তথা হায়দর আলি, টিপু ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাধি, সঙ্গম, কারিঘাট্টা পাহাড় ও মন্দির।

বৃন্দাবন গার্ডেনস।

(৮) বৃন্দাবন গার্ডেন্স – মহীশূর থেকে ২২ কিমি। কাবেরী নদীতে কৃষ্ণরাজসাগর বাঁধ।  আলোর কারসাজি।

(৯) কেশব মন্দির – মহীশূর থেকে সোমনাথপুর, ৪০ কিমি। হোয়সলদের আরও এক অনন্য কীর্তি।

(১০) টি (তিরুমাকুদাল) নরসিপুরা ত্রিবেণী সঙ্গম – সোমনাথপুর থেকে ১০ এবং মহীশূর থেকে ৩৬ কিমি। দক্ষিণের প্রয়াগ। কাবেরী, কাবিনি এবং পৌরাণিক সরোবর গুপ্তগামিনীর সঙ্গম। রয়েছে গুঞ্জ নরসিংহস্বামীর মন্দির।

(১১) শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত – মহীশূর থেকে ৭২ কিমি। ৪০০ ফুট ওপর থেকে কাবেরীর ঝাঁপ। দু’টি অংশ বড়ো চুক্কি এবং গগন চুক্কি। বড়ো চুক্কি বিখ্যাত ব্যপ্তির জন্য, গগন চুক্কি উচ্চতার জন্য।

(১২) বিআর হিলস – মহীশূর থেকে ৮৩ কিমি। তামিলনাড়ুর সীমান্তে অবস্থিত অভয়ারণ্য। রয়েছে বিলিগিরি রঙ্গস্বামী মন্দির।

চতুর্দশ দিন – ফেরার দিন। মহীশূর বা বেঙ্গালুরু থেকে ফেরার ট্রেন ধরুন। মহীশূর থেকে সরাসরি ফেরার জন্য রয়েছে হাওড়া এক্সপ্রেস। প্রতি সোমবার রাত সাড়ে বারোটায় ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় মঙ্গলবার দুপুর ২:৫০-এ। বেঙ্গালুরু থেকে ফেরার জন্য রয়েছে যশবন্তপুর-হাওড়া দুরন্ত এক্সপ্রেস। ট্রেনটি বুধ এবং শনিবার বাদে রোজ যশবন্তপুর থেকে সকাল সওয়া এগারোটায় ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল সওয়া চারটেয়। যশবন্তপুর-হাওড়া এক্সপ্রেস প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭:৩৫-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬:১০-এ।

কোথায় থাকবেন

বেঙ্গালুরু ছাড়া এই সূচির সব জায়গাতেই রয়েছে কর্নাটক পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল। অনলাইনে বুক করতে পারেন। এ ছাড়াও রয়েছে বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

কর্নাটক রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের বাস পরিষেবা পাওয়া যায় রাজ্যের সর্বত্র। তবে আরামে ঘোরার জন্য গাড়িই সব থেকে ভালো উপায়। বেঙ্গালুরু থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে নিন। পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়িও করতে পারেন।

মনে রাখবেন

(১) বেঙ্গালুরুতে সকালে টিপুর প্রাসাদ দেখে চলুন বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যান। ৪৫ মিনিটের সাফারি করে দুপুরে চলে আসুন বেঙ্গালুরু। শহরের বাকি দ্রষ্টব্য দেখে নিন।

(২) যদি নন্দী হিলস ও শিবগঙ্গা যেতে চান তা হলে আরও একটা দিন বেঙ্গালুরুতে থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু থেকে ভোরে বেরিয়ে নন্দী হিলস ঘুরে এসে বেঙ্গালুরু ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন শিবগঙ্গা।

(৩) বেলুর, হালেবিডুতে অবশ্যই গাইড নেবেন।

(৪) মাদিকেরিতে তিন রাত থাকবেন। যে দিন পৌঁছোবেন সে দিন শহরের দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিন। এক দিন ঘুরে আসুন বাগমন্ডলা ও তলাকাবেরী। আরেক দিন চলুন কুশলনগর, বায়লাকুপ্পে ও দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প।

(৫) মহীশূরে চার রাত থাকবেন। প্রথম দু’ দিন শ্রীরঙ্গপত্তন-সহ শহরের দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিন। তৃতীয় দিন সকালে চলুন সোমনাথপুর ও টি (তিরুমাকুদাল) নরসিপুরা ত্রিবেণী সঙ্গম। সন্ধ্যায় বৃন্দাবন গার্ডেন্স। চতুর্থ দিন ভোরে বেরিয়ে পড়ুন। প্রথমে চলুন শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত। সেখান থেকে চলে আসুন বিআর হিলস (৫০ কিমি)। সন্ধ্যায় ফিরুন মহীশূরে।

(৬) বেঙ্গালুরু থেকে যদি ফেরার জন্য দুরন্ত এক্সপ্রেসে টিকিট থাকে তা হলে চোদ্দোতম দিন বেঙ্গালুরু ফিরে ওই রাতটা বেঙ্গালুরুতে কাটিয়ে নিন।


 

আরও পড়ুন: পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: মধ্যপ্রদেশ

ভ্রমণ-ছক ২: উত্তর কর্নাটক

প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন – কলকাতা থেকে সরাসরি হাম্পি চলুন। হাওড়া থেকে প্রতি সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনিবার রাত সাড়ে এগারোটায় ছাড়ে অমরাবতী এক্সপ্রেস। ট্রেনটি তৃতীয় দিন সকাল ৬:১৯-এ হসপেট জংশনে পৌঁছোয়। এখান থেকে হাম্পি ১৩ কিমি। অথবা ট্রেনে বেঙ্গালুরু পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে বা কর্নাটক রাষ্ট্রীয় পরিবহণের বাসেও হাম্পি যাওয়া যেতে পারে। বেঙ্গালুরু থেকে হাম্পির দূরত্ব ৩৪৩ কিমি। সরাসরি ট্রেনে এলে তৃতীয় দিন সকালের মধ্যে হাম্পি, বেঙ্গালুরু হয়ে এলে তৃতীয় দিন সন্ধ্যার মধ্যে হাম্পি। রাত্রিবাস হাম্পি।

চতুর্থ ও পঞ্চম দিন – থাকুন হাম্পিতে।

বিঠ্‌ঠল মন্দিরে পাথরের রথ।

হাম্পিতে কী দেখবেন –

(১) বিরুপাক্ষ মন্দির ঘিরে – তুঙ্গভদ্রা তীরে বিরুপাক্ষ মন্দির দেখে হেমকূট পাহাড়, কদলেই কলু গণেশ, সসিভে কলু গণেশ, শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, বড়ভি লিঙ্গ ও লক্ষ্মীনরসিংহ।

(২) অচ্যুতরায় মন্দিরের পথে – বিরুপাক্ষ মন্দিরের উলটো দিকে মাতঙ্গ পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল নন্দীমূর্তি দেখে তুঙ্গভদ্রার পাড় ধরে চলুন অচ্যুতরায় মন্দিরের দিকে। পথে কোদণ্ডরাম মন্দির।

(৩) বিঠ্‌ঠল মন্দিরের পথে – অচ্যুতরায় মন্দির দেখে তুঙ্গভদ্রার পাড় ধরে এগিয়ে একে একে দেখুন জৈন মন্দির, সুগ্রীব গুহা, কিংস ব্যাল্যান্স, অসমাপ্ত দরজা, বিষ্ণু মন্দির, পৌঁছে যান বিঠ্‌ঠল মন্দিরে। নিঃসন্দেহে হাম্পির সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির। এখানে রয়েছে পাথরের রথ। চাকাগুলো জোড়া, সারা গায়ে ভাস্কর্য।

লোটাস মহল।

(৪) রাজবাড়ি অঞ্চল – বিজয়নগর সাম্রাজ্যের আবাস স্থল। এখানে চোখে পড়বে নানান নিদর্শন। কুইন্স বাথ, চন্দ্রশেখর মন্দির, অক্টাগোনাল ট্যাঙ্ক, সরস্বতী মন্দির, ধাপওয়ালা পুষ্করিণী, টাঁকশাল, দরবার হল, দণ্ডনায়ক এনক্লোজার, মহানবমী ডিব্বা, লোটাস মহল (হাম্পির সব থেকে শ্রেষ্ঠ প্রত্ন নিদর্শন), হাতিশালা, রাজপ্রাসাদ, থ্রোন প্ল্যাটফর্ম, ওয়াটার টাওয়ার ইত্যাদি। রয়েছে হাম্পির আরও এক নাম করা মন্দির হাজাররামা মন্দির।

(৫) পট্টভিরমা মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়াম

(৬) ভীমের ফটক ও গণগিট্টি জৈন মন্দির হয়ে মাল্যবন্ত রঘুনাথ মন্দির – মাল্যবন্ত পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত নয়নাভিরাম।

(৭) প্রাচীন কিষ্কিন্ধ্যা – হাম্পির পৌরাণিক খ্যাতি রামায়ণের জন্য। তুঙ্গভদ্রা নদীর ওপারে আনেগুন্দি, প্রাচীন কিষ্কিন্ধ্যা নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে অঞ্জনা পাহাড়, পম্পা সরোবর, শবরী গুহা। কোরাকল বা ঝুড়ি নৌকায় নদী পেরিয়ে হাম্পি থেকে আনেগুন্দি যেতে পারেন। ঘুরপথে গাড়ির রাস্তাও রয়েছে।

(৮) তুঙ্গভদ্রা ড্যাম – কোনো এক বিকেলে সূর্যাস্ত দেখার জন্য চলুন হসপেটের তুঙ্গভদ্রা ড্যামে।

ষষ্ঠ দিন – হাম্পি থেকে চলুন বিজাপুর, ২১৫ কিমি। রাত্রিবাস বিজাপুর।

সপ্তম দিন – আজও থাকুন বিজাপুরে।

বিজাপুরে কী দেখবেন

(১) গোল গুম্বজ – ভারতের বৃহত্তম এবং রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম্বুজ।

(২) ইব্রাহিম রৌজা মসজিদ – দক্ষিণের তাজমহল হিসেবে পরিচিত।

(৩) উপ্পালি বুর্জ – আশি ফুটের মিনার থেকে বিজাপুর শহর দৃশ্যমান।

এ ছাড়াও বিজাপুর শহর জুড়ে রয়েছে আরও কিছু নিদর্শন। যেমন, মালিক-এ-ময়দান, চাঁদ বাওড়ি, আসর মহল, গগন মহল, জামি মসজিদ, জোড় গুম্বজ, মালিকা জাহান বেগমের মসজিদ ইত্যাদি।

অষ্টম দিন – বিজাপুর থেকে চলুন বাদামি ১১৫ কিমি। রাত্রিবাস বাদামি।

নবম দিন – আজও থাকুন বাদামিতে।

মালেগিট্টি পাহাড় থেকে বাদামির গুহা।

বাদামিতে কী দেখবেন

(১) গুহামন্দির – চারটে গুহা আর একটি দুর্গ নিয়ে গুহামন্দির। চারটে গুহার তিনটে ষষ্ঠ শতাব্দীর হিন্দু গুহা, চতুর্থটি ১০০ বছর পরের জৈন গুহা। গুহায় রয়েছে ফ্রেস্কো চিত্র। দু’নম্বর এবং তিন নম্বর গুহার মধ্যে বাদামি দুর্গ। মূল আকর্ষণ টিপুর কামান।

(২) অগস্ত্যতীর্থ বা ভূতনাথ লেক – গুহামন্দিরের পাহাড়ের পাদদেশে।

(৩) মহাকূটেশ্বর ও মালেগিট্টি – ভূতনাথ লেকের পাড়ে অনুচ্চ পাহাড়টিলায়।

(৪) পাট্টাডকাল মন্দিরগুচ্ছ – বাদামি থেকে ২৯ কিমি দূরে বিশ্ব হেরিটেজ। ৭ থেকে ৯ শতকের তৈরি দশটি মন্দির। অন্যতম দু’টি শ্রেষ্ঠ মন্দির বিরুপাক্ষ ও মল্লিকার্জুন। সঙ্গমেশ্বর, গলগনাথ, জম্বুলিঙ্গ, কাদ্দি সিদ্ধেশ্বর ইত্যাদি মন্দির।

(৬) আইহোলের মন্দিররাজি – পাট্টাডকাল থেকে ১৭ কিমি। এখানে রয়েছে জৈন এবং দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যের ১২৫টি মন্দির। এখানে রয়েছে লাডখান মন্দির, সূর্যনারায়ণ মন্দির, গৌডর গুড়ি, চিক্কি গুড়ি মন্দির, দুর্গ গুড়ি মন্দির, হুচ্চিমল্লিগুড়ি ইত্যাদি।

দুর্গ মন্দির, আইহোল।

দশম দিন – আসুন ১০৪ কিমি দূরের হুবলি। চলুন গডগ, ৪৭ কিমি। দেখুন ১৫ মিটার উঁচু গোপুরবিশিষ্ট বৈষ্ণব মন্দির, দুর্গে ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির, পিছে সরস্বতী নদী। রাত্রিবাস হুবলি।

একাদশ দিন – হুবলি থেকে ফেরার ট্রেন ধরুন। অমরাবতী এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র এবং রবিবার দুপুর সাড়ে বারোটায় ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় পরের দিন রাত সাড়ে দশটায়।

কী ভাবে ঘুরবেন

পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়ি করাই সব থেকে ভালো। তবে বাস পরিষেবাও পাবেন।

কোথায় থাকবেন

সব জায়গাতেই রয়েছে কর্নাটক উন্নয়ন নিগমের হোটেল। অনলাইনে হোটেল বুক করতে পারেন। এ ছাড়াও রয়েছে অনেক বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

মনে রাখবেন

(১) যদি তৃতীয় দিন সকালেই হাম্পি পৌঁছোতে পারেন তা হলে মোটামুটি সব কিছু দেখা সম্ভব। হাম্পি ঠিকঠাক দেখতে হলে কমপক্ষে তিনটে পুরো দিন লাগে। আর যদি তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় পৌঁছোন তা হলে প্রাচীন কিষ্কিন্ধ্যা বাদ দিতে পারেন।

(২) হাম্পি ঘোরার জন্য স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে নেবেন। অচ্যুতরায় মন্দির দেখে বিঠ্‌ঠল মন্দিরে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করলে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। সুগ্রীব গুহা পর্যন্ত দেখে ফিরে আসুন। বিঠ্‌ঠল মন্দিরে যাওয়ার অন্য গাড়ি-পথ আছে। রাজবাড়ি অঞ্চলেও বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি রেখে হেঁটে ঘুরতে হবে।

মাল্যবন্ত পাহাড়ে সূর্যাস্ত, হাম্পি।

(৩) মাল্যবন্ত পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখবেন, আবার হসপেটে তুঙ্গাভদ্রা ড্যাম থেকেও সূর্যাস্ত দেখবেন। সুতরাং দু’টো ভ্রমণ এক দিনে রাখবেন না।

(৪) বাদামি থেকে হুবলি আসতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। সুতরাং যে দিন হুবলি থেকে কলকাতা ফিরবেন, সে দিনই বাদামি থেকে হুবলি আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে গডগ বাদ দেবেন। চাইলে এক দিন হাম্পিতে বাড়িয়ে নেবেন। ঠকবেন না।

———————————————————————-

ভ্রমণ-ছক ৩: উপকূল কর্নাটক এবং গোয়া

প্রথম দিন থেকে তৃতীয় দিন – কলকাতা থেকে পৌঁছোন মেঙ্গালুরু। কলকাতা থেকে সরাসরি মেঙ্গালুরু পৌঁছোনোর জন্য রয়েছে হাওড়া-মেঙ্গালুরু সাপ্তাহিক বিবেক এক্সপ্রেস। ট্রেনটি প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল ৩:৫০-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে মেঙ্গালুরু পৌঁছোয় শনিবার সকাল সাড়ে ন’টায়। বেঙ্গালুরু হয়েও মেঙ্গালুরু পৌঁছতে পারেন। ট্রেনে যশবন্তপুর পৌঁছন। যশবন্তপুর থেকে রয়েছে কারওয়ার এক্সপ্রেস। ট্রেনটি সোম, বুধ এবং শুক্রবার সকাল সাতটায় যশবন্তপুর থেকে ছেড়ে মেঙ্গালুরু পৌঁছোয় বিকেল ৫:৪০-এ। গোমতেশ্বর এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং রবিবার সকাল ৭:৫৫-এ ছেড়ে মেঙ্গালুরু পৌঁছোয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। যে ভাবেই হোক তৃতীয় দিন বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাবেন মেঙ্গালুরু। রাত্রিবাস।

চতুর্থ দিন – আজও মেঙ্গালুরুতে।

সোমেশ্বর সৈকত।

মেঙ্গালুরুতে কী দেখবেন

(১) মঙ্গলদেবী মন্দির – কেরল শৈলীর মন্দির, অধিষ্ঠিত দেবী মঙ্গলাদেবী তথা দুর্গা।

(২) গোকর্ণাথেশ্বর মন্দির – শহর থেকে ২ কিমি।

(৩) মিলাগ্রেস চার্চ – ১৬৮০-র তৈরি।

(৪) তানিভাবি এবং পনাম্বুর সৈকত – ন’ কিলোমিটার ব্যবধানে অবস্থিত মেঙ্গালুরুর দুটি প্রধান সৈকত। সূর্যাস্ত নয়ানাভিরাম।

৫) সুরতকল সৈকত – মেঙ্গালুরু শহরতলিতে আরও এক সুন্দর সৈকত।

(৬) সোমেশ্বর সৈকত – মেঙ্গালুরু থেকে ১৮ কিমি দক্ষিণে উল্লাল শহরে। সৈকতেই সোমনাথ মন্দির।

কালাসার পথে চা বাগান।

পঞ্চম দিন – মেঙ্গালুরু থেকে চলুন কালাসা, ১১৯ কিমি। পথে দেখে নিন কারকালায় গোমতেশ্বর, বাহুবলীর মূর্তি। কারকালার কিছু পরে শুরু পাহাড়ি পথ। কুদ্রেমুখ জাতীয় উদ্যানের মধ্যে দিয়ে পথ গিয়েছে। দেখে নিন হনুমানগুন্ডি জলপ্রপাত। রাত্রিবাস কালাসা।

কালাসায় দেখে নিন

শ্রীকালাসেশ্বর শিব মন্দির, ৮ কিমি দূরে হোরোনাডুতে শ্রীঅন্নপূর্ণেশ্বরী মন্দির।

ষষ্ঠ দিন – কালাসা থেকে আবার নেমে আসুন উপকূলে। চলুন উদুপি, দূরত্ব ১১০ কিমি। রাত্রিবাস উদুপি।

সপ্তম দিন – আজও থাকুন উদুপিতে।

মালপে সৈকত।

উদুপিতে দেখুন

(১) শ্রীকৃষ্ণ মন্দির – শহরের প্রাণকেন্দ্রে বৈষ্ণবগুরু মাধবাচার্য প্রতিষ্ঠিত তেরো শতকের মন্দির।

(২) মালপে সৈকত – উদুপির প্রধান সৈকত।

(৩) সেন্ট মেরিজ দ্বীপ – মালপে থেকে জলযাত্রা। ঘুরে আসতে সময় লাগে ঘণ্টা তিনেক।

(৪) কাউপ সৈকত – উদুপি থেকে ১২ কিমি দক্ষিণে।

(৫) কোডি বেঙ্গড়ে সৈকত – উদুপি থেকে ২০ কিমি উত্তরে।

(৬) আগুম্বে – উদুপি থেকে ৫৫ কিমি, হাজার দুয়েক ফুট উঁচু। পথে চোদ্দোটি হেয়ারপিন বেন্ড। চেরাপুঞ্জি-মৌসিনরামের পর ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের স্থান। আগুম্বেতে দেখুন সানসেট পয়েন্ট, রেনফরেস্ট রিসার্চ স্টেশন এবং অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন, চেষ্টা করুন দুপুর নাগাদ উদুপি থেকে রওনা হতে, যাতে সানসেট পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারেন। ৪০ কিমি দূরে আরব সাগরে ডোবে সূর্য। প্যানোরমিক দৃশ্য। এর পাশাপাশি আগুম্বের অনতিদূরে রয়েছে দু’টি জলপ্রপাত যোগীগুন্ডি প্রপাত এবং কুঞ্চিকাল।

মেঘলা দিনে যোগ ফলস্‌।

অষ্টম দিন – উদুপি থেকে চলুন যোগ ফলস। পথে দেখে নিন মারাভান্থে সৈকত। দূরত্ব ১৬৩ কিমি। রাত্রিবাস যোগ ফলস।

মুরুদেশ্বর।

নবম দিন – আজ চলুন গোকর্ণ। মুরুদেশ্বর হয়ে। দূরত্ব ১৭০ কিমি।

দশম দিন – আজও থাকুন গোকর্ণে।

গোকর্ণে দেখুন

(১) ওম বিচ – গোকর্ণের প্রধান আকর্ষণ। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে উলটো ‘ওম’-এর আকার।

(২) আরও এক গুচ্ছ সৈকত – সব থেকে উত্তরে গোকর্ণ সৈকত। তার পর দক্ষিণে একে একে পড়বে প্যারাডাইস সৈকত, কুদলে সৈকত, হাফ-মুন সৈকত ইত্যাদি।

(৩) মহাবলেশ্বর মন্দির – দেড় হাজার বছরের পুরনো মন্দির।

একাদশ দিন  – কারওয়ার হয়ে চলুন গোয়া। কারওয়ারে দেখে নিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৈকত। গোয়ায় থাকতে পারেন মারগাঁওয়ের কাছে কোলভা সৈকতে। মোট দুরত্ব ১৩৬ কিমি। রাত্রিবাস কোলভা।

প্যালোলেম, দক্ষিণ গোয়া।

দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ দিন – গোয়ায় ঘোরাঘুরি।

গোয়ায় কী ভাবে ঘুরবেন

পরপর দু’দিন গোয়া পর্যটন উন্নয়ন নিগমের উত্তর গোয়া এবং দক্ষিণ গোয়া সফরে চলুন। আরও একটা দিন নিজের ইচ্ছামতো ঘুরুন – কোলভার কাছেই মাড়গাঁও শহর (৮ কিমি), কিছু দূরে পানজিম শহর (উত্তরে ৩২ কিমি) বা প্যাললেম সৈকত (দক্ষিণে ৪২ কিমি, অনিন্দ্যসুন্দর সূর্যাস্ত)। এ ছাড়াও অজস্র সৈকত আছে। স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করে চলে যেতে পারেন।

পঞ্চদশ দিন – মাড়গাঁও থেকে বাড়ি ফেরার ট্রেন। অমরাবতী এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র এবং রবিবার সকাল ৭:৪৫-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় পরের দিন রাত সাড়ে দশটায়।

কোথায় থাকবেন

কর্নাটকের উপকূলের কোনো জায়গাতেই কর্নাটক পর্যটন উন্নয়ন নিগমের কোনো হোটেল নেই। তবে বিভিন্ন মানের বেসরকারি হোটেল এবং রিসোর্ট রয়েছে। কোলভায় থাকতে পারেন গোয়া পর্যটন উন্নয়ন নিগমের কোলভা রেসিডেন্সিতে, একেবারে সমুদ্রের ধারে। অনলাইনে বুক করে নিতে পারে।

কী ভাবে ঘুরবেন

পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়ি করে নেওয়াই ভালো।

মনে রাখবেন

(১) মেঙ্গালুরু থেকে ভোর ভোর বেরোলে কারকালা দেখে, কুদ্রেমুখের মধ্য দিয়ে কালাসা পৌঁছে যাবেন দুপুরের আগে। খাওয়াদাওয়া সেরে চলে যান হোরোনাডু। শ্রীঅন্নপূর্ণেশ্বরী মন্দির দেখে ফিরে এসে কালাসায় শ্রীকালাসেশ্বর শিব মন্দির দেখুন।

(২) খুব সকালে কালাসা থেকে বেরিয়ে উদুপির শ্রীকৃষ্ণ মন্দির দেখে ঘণ্টা চারেকের মধ্যে চলে আসুন মালপে। থাকার চেষ্টা করুন মালপে বা তার কাছাকাছি। দুপুরে চলুন সেন্ট মেরিজ দ্বীপ। পরের দিন সকালে দেখে নিন কাউপ আর কোডি বেঙ্গড়ে সৈকত। দুপুরে চলুন আগুম্বে।

প্রয়োজনীয় তথ্য

১) কর্নাটক পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ওয়েবসাইট- www.kstdc.co

২) কর্নাটক রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের ওয়েবসাইট- www.ksrtc.in

৩) গোয়া পর্যটনের হোটেল এবং বাস বুকিং-এর জন্য ওয়েবসাইট- https://goa-tourism.com

 

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: শেষ পর্ব/ দুর্যোগ কাটিয়ে ঘরে ফেরা

Published

on

manas sarovar

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম নাজাং-এর উদ্দেশে। সবার মুখ থমথমে। লিয়াজঁ অফিসারদের খুব চিন্তাগ্রস্ত লাগছে। কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে কনকনে হাওয়া। চারিদিক থেকে ধসের খবর আসছে। দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না। বৃষ্টির মধ্যেই কালী নদীকে বাঁ হাতে রেখে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঘষে কোনো রকমে যাওয়া যায়। ঝুরঝুরে আলগা মাটি। একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদ। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরাগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

টানা দু’ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের চিত্র পুরো বদলে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। কখনও নদীর পাড়, তো কখনও পাহাড়ের চুড়ো – এ ভাবেই চড়াই-উতরাই ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি। বৃষ্টির জল পেয়ে কালী নদী ফুঁসছে। মনে হচ্ছে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। ঝরনার জলে আমরা সবাই ভিজে গিয়েছি। আমাদের যাওয়ার রাস্তা অবিরাম পরিষ্কার করে চলেছে বুলডোজার, কিন্তু ধসের বিরাম নেই। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। কোনো কোনো রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। বৃষ্টির জন্য পা প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছি। মুখে ঈশ্বরের নাম।

১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে সব কৈলাসযাত্রী মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতে মালপায় স্মারক।

এ ভাবেই ১০টা নাগাদ মালপায় এলাম। প্রাতরাশের জন্য পথ চলার সাময়িক বিরতি এখানে। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট শেষ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মালপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাসযাত্রী। তাঁরা ছিলেন ১৩ নম্বর ব্যাচের যাত্রী। কী অদ্ভুত সমাপতন! আজও ১৭ আগস্ট এবং আমরাও ১৩ নম্বর ব্যাচ। জানি না, পরমেশ্বর আমাদের কপালে কী রেখেছেন? পুরো যাত্রা এত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেললেন আমাদের তিনি?

প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা, পাশে গণেশ। কোনো কোনো ঘাসের ঝাড় ধরে ঝুলে নামা। নীচে কোথায় পা দেব, বুঝে উঠতে পাচ্ছি না, এত খাড়া পাহাড়ের গা। নীচে থেকে গণেশ হাতে ধরে পা বসিয়ে দিচ্ছে। ঘাসের গোড়া বা গাছের শিকড় মুঠিতে চেপে ধরে, বুক-পেট পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বর্ষার পর এ পথে আমরাই প্রথম। এ ভাবেই সেই ৪৪৪৪ সিঁড়িওয়ালা পাহাড় অতিক্রম করলাম। সামনে আরও একটা বড়ো পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামলেই নাজাং, যেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

লেখকের পথের সাথি গণেশ।

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই পা পিছলে যাচ্ছে। যেখানেই থমকে যাচ্ছি, গণেশ এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরা না থাকলে এতক্ষণে আমাদের চলে যেতে হত কালী নদীতে। কালী নদীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না, এখন তার রূপ এতটাই ভয়াল। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছোলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। এ দিকের রাস্তা আরও খারাপ। কোনো কোনো জায়গায় সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে নামতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় হামাগুড়ি। সারা গা কাদায় মাখামাখি। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টির দিনে এ ভাবেই কাদা মেখে ফুটবল খেলতাম। আর আজ? প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াই। অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরার লড়াই। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে গণেশও হাত ধরতে পারছে না। হাত ধরতে গেলেই দু’ জনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, পা আর চলছে না। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা সময় দেখলাম নাজাং-এ এসে গিয়েছি। নীচে নেমে শুয়ে পড়ে পাহাড়কে প্রণাম করলাম।

মনে একরাশ আনন্দ। হ্যাঁ, পেরেছি – হেঁটে কৈলাস-মানস দর্শন করতে। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। চোখে আমার জল। তখনও কি জানতাম, সামনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

নাজাং থেকে গাড়িতে ধারচুলা যাওয়ার কথা। কিন্তু ছ’ কিমি দূরে রাস্তা পুরো ধসে গিয়েছে। সব গাড়ি ওখানে আটকে। এখানে অপেক্ষা না করে লিয়াজঁ অফিসারদের নির্দেশে সামনে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রবল বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ। এই সব পাথর টপকে টপকে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। এক সময় সেই ছ’ কিমি পথ শেষ হল। আর রাস্তা নেই। দু’টি বুলডোজার ব্যস্ত রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। কিন্তু যে জায়গাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ধস নেমে সেই জায়গা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

লেখকের দুই যাত্রাসঙ্গী জহরভাই ও সুরজভাই।

আর উপায় নেই। এ বার এক এক করে এই জায়গাটা পার হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা বাঁশি বাজালে এক জন করে যাত্রী ধসের জায়গাটা পার হবেন। বাঁশি বাজতেই প্রথম যাত্রী দৌড় দিলেন। কিন্তু যেই মাঝপথে পৌঁছেছেন ওপর থেকে পাথর পড়া শুরু হয়ে গেল। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। যাত্রীভাই মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন। আবার বাঁশি বাজল, কিন্তু প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ এগিয়ে গেল না। সবাই ভয়ে পিছিয়ে আসছেন।

আমি দেখলাম এই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। কতক্ষণ এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে থাকতে হবে তার কোনো হিসেব নেই। সামনে এগোতেই হবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমিই দৌড় লাগালাম। সামনেই একটা ঝরনা। ঝরনার জল প্রবল বেগে নেমে এসে খাদ দিয়ে গড়িয়ে নীচের কালী নদীতে গিয়ে মিশছে। কোনো ভাবে পা হড়কে গেলে সোজা নদীতে। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি। চিরকালই আমি ডানপিটে, মৃত্যুভয় আমার নেই। যে দিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সে দিন নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আর যে দিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিনও নিজের ইচ্ছায় হবে না। তা হলে কেন এই মৃত্যুভয়?

ঝরনা অতিক্রম করে দেখি, সামনে এক বিশাল পাথর। টিকটিকির মতো বুকে ভর দিয়ে সেই পাথরও পেরিয়ে এলাম। এ বারে একটা পাথর থেকে আরেকটা পাথর লাফিয়ে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো পেরিয়ে এসে অন্য বিপদ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা দু’টো আটকে গেল। কোনো দৈবশক্তি জেন আমার উপর ভর করল। কে যেন আমাকে এক হাত ধরে তুলে নিল। তবে কি আমার প্রভু আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেন? সারা গায়ে কাদা মেখে এ পারে আসতেই ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে এ প্রান্তের মানুষজন আমায় জড়িয়ে ধরল। পরে জহরভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার দৌড় শুরু করার কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই পাহাড় থেকে পাথর পড়া শুরু হয়্। দু’-একটা মুহূর্ত এ-দিক ও-দিক হলেই…।

সেই বিপজ্জনক জায়গা।

এ পারে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কখন দলের বাকি সদস্যরা আসবে? পাথর পড়া যখন দু’-তিন মিনিটের জন্য বন্ধ হচ্ছে, এক জন করে যাত্রী এ পারে আসছেন। তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটতে লাগল। এ পারে আসতে গিয়ে গণেশ কাদার মধ্যে পড়ে গেল দেখলাম। হাঁটু থেকে রক্ত বার হচ্ছে। এক মহিলা যাত্রী কাদার মধ্যে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিলেন। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করলেন। অনেকক্ষণ পর জহরভাই আর সুরজভাইও পেরিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই অক্ষত অবস্থায় এ পারে এলেন।

এ বার গাড়িতে করে রওনা ধারচুলা। আমাদের লাগেজ পড়ে রইল গুনজিতে। এক কাপড়ে ধারচুলা থেকে দিল্লি, তার পর কলকাতা। কলকাতায় আসার দশ দিন পর এল আমার লাগেজ। এসে পৌঁছোল কৈলাস-মানসের পবিত্র জলও। এটাই সব চেয়ে দামি আমার কাছে। (শেষ)

ছবি: লেখক    

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

Published

on

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

কাল প্রায় সারা রাত জেগে কেটেছে। চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি, তাতে মনে অপার শান্তি। অতিথিশালায় ফিরে এসে বাকি সময়টা বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ মানসকে বিদায় জানানোর পালা।

আরেক বার গেলাম মানসের পাড়ে। দূরে উজ্জ্বল কৈলাস পর্বত। ভোররাতের ঘটনার কথা ভেবে এখনও লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ভেসে আসছে ‘ওম মণি পদ্মে হুম’-এর সুর। ভেসে আসছে ড্রামের আওয়াজ। মন কিছুতেই চাইছে না এই জায়গা ছেড়ে যেতে। বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে। শেষ বারের মতো মানসের জল মুখে নিয়ে, পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ছুটলাম বাসের দিকে। বাসের যাত্রীরা সবাই শিবের ভজন গাইছে। বাস এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আমার স্বপ্নের মানস-কৈলাস। আমার দু’ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কে যেন কানে কানে বলছে – আবার আসিস।

আরেক বার মানস দর্শন।

কখন যে তাকলাকোট পৌঁছে গিয়েছি, খেয়াল করিনি। হোটেলে ফিরেও হোয়াটস অ্যাপে বাড়ির সঙ্গে কথা বললাম। কত দিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা হল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে এলাম।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ১৫ আগস্ট। এই পুণ্য দিনে ফিরে চলেছি ভারতে। তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৯টা নাগাদ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল চিনা অভিবাসন দফতরে। তার পর কাস্টমস অফিসে। আমাদের মালপত্র পরীক্ষার পর তিব্বত তথা চিন ত্যাগের অনুমতি পেলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাসে করে চলে এলাম লিপুলেখ পাস সংলগ্ন ভারত-চিন সীমান্তে। চিনা অফিসারেরা আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন। মিলল পাহাড়ে চড়ার অনুমতি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণেশ যথারীতি চলে এসেছে। ওর কাছে আমার রুকস্যাক দিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা আমাদের দেখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আজ স্বাধীনতা দিবস। তাই মহাদেবের পাশাপাশি ভারতমাতার নামেও জয়ধ্বনি হল।

মানস থেকে ফেরার পথে মন্যাস্টেরি।

লিপুলেখ পাসের নীচেই আইটিবিপি-র ক্যাম্প। গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। আইটিবিপি-র জওয়ানদের সঙ্গে ছবি তোলা হল।

আজ আমাদের গন্তব্য গুনজি, ২৬ কিমি। আসার সময় যে পথ তিন দিনে এসেছিলাম, সেই পথ এক দিনে পেরোব। একটু যে টেনশন হচ্ছে না, তা নয়। তবু হাঁটতে তো হবেই।

খুব জোরে হাঁটতে পারছি না। পথের সৌন্দর্যও সে ভাবে আকর্ষণ করছে না। কেবল কৈলাস-মানসের কথা মনে পড়ছে। মানস সরোবরে ভোররাতের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ যেন চোখের সামনে ভাসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা বিশাল ঝরনার কাছে চলে এলাম। গোটা পথকে প্লাবিত করে ঝরনা প্রবল বেগে নীচে নেমে যাচ্ছে। লাঠির সাহায্যে অতি সন্তর্পণে পথটুকু অতিক্রম করলাম। চলে এলাম নাভিডাং। এখানে সেনাশিবিরে স্বল্পক্ষণের যাত্রাবিরতি। দেখলাম জওয়ানরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে ব্যাস্ত। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। এখানে প্রাতরাশ সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম কালাপানির উদ্দেশে।

কিছুটা হাঁটার পর বুঝতে পারছি, বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পাথরের উপর বসে রইলাম। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকটা মসৃণ হল, বেশ আরাম লাগছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু চলার ক্ষমতা যে বেশ কমছে, বুঝতে পারছি। বাঁ পায়ের হাঁটুতে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। জহরভাইয়েরও একই সমস্যা হয়েছিল। আমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে কিছুটা সামলেছে। সমতলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু চড়াই-উতরাই এলেই সমস্যা।

পথের দু’ পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা। তার মধ্যের উপত্যকা দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেছে। সেই নদীকে ডান হাতে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। মখমলের মতো সবুজ ঘাস আর গুল্ম দিয়ে মোড়া পুরো উপত্যকা। অসংখ্য রঙিন ফুল ফুটে রয়েছে। এ যেন এক স্বপ্নলোক। এ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কালাপানির অতিথিশালায়। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা এখানেই। আমি দুপুরের খাবার না খেয়ে এগিয়ে চললাম। কালাপানিতে পাসপোর্টে সিল মারিয়ে আবার এগিয়ে চলা। পথেই আলাপ হল আইটিবিপি-র এক জওয়ানভাইয়ের সঙ্গে। উনি আমাদের হাতে চকোলেট তুলে দিলেন। বাড়িতে ওঁর ছোটো একটা ছেলে আছে। তার বিদেশি মুদ্রা জমানোর খুব শখ। আমি ওঁর হাতে ১০০ চিনা ইউয়ানের একটি নোট তুলে দিলাম। সারা পথ ওঁদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেল নাগাদ পৌঁছে গেলাম গুনজি ক্যাম্পে। এসেই দেখি মনীশভাই আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। গুনজি ক্যাম্পে আজ খুব ভিড়। ক্যাম্পের পাশেই পাহাড়ে মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসী আসছেন। গুনজি আইটিবিপি ক্যাম্প রাতে আমাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করেছে। অনেক দিন পর দেশের খাবার খেলাম। জওয়ানভাইদের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়।

গুনজি ক্যাম্প।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই চার দিক থেকে ধসের খবর আসতে লাগল। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরা বিশাল আকার ধারণ করে। এখানেও তাই। আজ গণেশ ছাড়াই পথ চলা শুরু হয়েছে। মেলার জন্য গণেশ একদিন গুনজিতে থেকে গেল। কাল সকালে বুধিতে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

গুনজি থেকে ছায়লেক পর্যন্ত রাস্তা সমতল। তার পর পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। সেই পথটা খুব বিপজ্জনক। দু’-তিন ঘণ্টা একটানা হেঁটে চলেছি। ফুসফুস ক্রমশ হাপর হয়ে উঠছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। লজেন্স মুখে দিলাম। লজেন্সের মোড়ক বুকপকেটে রেখে দিলাম প্রকৃতির বুকে দূষণ এড়ানোর জন্য। কৈলাস পরিক্রমার সময় দেখেছিলাম জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রাখা। আমাদের উত্তরাখণ্ডে সে সবের বালাই নেই।

আরও কিছুটা এগোনোর পর জলপতনের গর্জন শোনা গেল। যতই এগোচ্ছি, গর্জন ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হুড়হুড় করে পড়ছে ঝরনার জল। যেন বিরাট তুলোর বস্তা। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা সেই জল রাস্তা ভাসিয়ে কালী নদীতে পড়ছে। ঝরনার জল সারা গা ভিজিয়ে দিল। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা নয়, চিন্তা ক্যামেরাটা নিয়ে। ক্যামেরার ছবি আমার কাছে মহা মূল্যবান, আমার সারা জীবনের সম্পদ, আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ক্যামেরা বাঁচিয়ে কোনো রকমে পেরিয়ে এলাম সেই জায়গা।

১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ছায়লেকে। খাওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি। আবার পথ চলা শুরু। এ বার নীচে নামার পালা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, পথ ভয়ংকর পিছল। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ের বুকে আমি একা। ট্রেকিং-এ এ রকম হয়, কেউ যায় এগিয়ে, কেউ থাকে পিছিয়ে – যার যেমন চলার সামর্থ্য বা গতি।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথা প্রচণ্ড বেড়েছে। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাধ্য হয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ খেলাম। অনেক নীচে বুধির ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বৃষ্টির তেজ প্রচণ্ড বাড়ল। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে লাঠি নিয়ে, পা টিপে টিপে পরমেশ্বরের নাম করতে করতে এগিয়ে চললাম ক্যাম্পের দিকে।

ঈশ্বরকে মনেপ্রাণে ডাকছি – আর একটা দিন তুমি শক্তি দাও, এতটা রাস্তা যদি হেঁটে আসতে পারি, তা হলে শেষ বেলায় কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছ? তোমার কৃপা না থাকলে এতটা পথ আসতে পারতাম না। হাঁটুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা কমানোর মলম স্প্রে করলাম। একটু যেন স্বস্তি এল। ধীরে ধীরে নেমে চললাম। পৌঁছে গেলাম বুধি। কেএমভিএন-এর এক কর্মীভাই যথারীতি শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। (চলবে)

ছবি: লেখক                 

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

Published

on

view of Kailas from Kailas

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Loading videos...

বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কিউগুতে। মানসের তীরে এই জনপদ। সরোবরের নীল জলরাশি সূর্যের আলোয় হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শত সহস্র জলকণা সূর্যের আলোয় তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। সরোবর সংলগ্ন এক অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মানসের জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকেই সবাই বেরিয়ে গেলাম। ছুটলাম মানসের জলে অবগাহন করতে। হিমশীতল জল। বাইরের তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির কাছাকাছি, সঙ্গে প্রবল হাওয়া। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বাধাই আর বাধা নয়। মানস সরোবর যেন দু’ হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। এই সেই মানস সরোবর। স্বয়ং দেবাদিদেব যেখানে অবগাহন করেন।

কিউগুতে মানস সরোবর।

মানস সরোবরের জলে নেমে স্নান করার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বালতি করে জল তুলে এনে স্নান করতে হয়। কিন্তু কে মানে সেই বিধিনিষেধ! মানসের জলে নেমে সবাই আনন্দে আত্মহারা। ‘হর হর মহাদেব’ আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। মানসের জল আর চোখের অশ্রু মিলেমিশে তখন সব একাকার। মানসের জল তো শুধু জল নয়, এর মধ্যে আছে ঈশ্বরের ছোঁয়া। এ আমার কাছে চরণামৃত। সরোবরের জলে অবগাহন করতে করতে বললাম –

করচরণকৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাহপরাধম। / বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত ক্ষমস্ব জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো।।

(হে প্রভু, আমার এই জন্মে হস্তপদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবণজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ, সব ক্ষমা কোরো।)

সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। হে প্রভু, তুমি না থাকলে এই পুণ্যধামে আমার আসার সুযোগ হত না। কত বাধা, কত বিঘ্ন উপস্থিত হয়েছে। তুমি সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে আমাকে এই পুণ্যধামে নিয়ে এসেছ। এ তোমার অপার মহিমা। আমাকে তোমার চরণে স্থান দাও।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে হয় না। পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হব, এ আশাও আমি করি না। যত দিন বাঁচব, পিতৃঋণ আমি সানন্দে বহন করতে চাই। এই বলে মানস সরোবরের জল নিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ শুরু করলাম। তর্পণ করার কোনো সামগ্রীই আমার কাছে ছিল না, সামান্য একটু তিল ছাড়া। সেই তিল হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতৃদেবকে স্মরণ করে বললাম –

ওঁ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ/পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।

কতক্ষণ জলের মধ্যে ছিলাম জানি না, জহরভাইয়ের ডাকে হুঁশ এল – তাড়াতাড়ি চলুন স্যর, হোমযজ্ঞ যে শুরু হয়ে যাবে। মানসের জলে ডুব দিয়ে কিছু পাথর সংগ্রহ করে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালাম।

সরোবরের পাশেই যজ্ঞের স্থান। মুম্বইনিবাসী মুকেশভাই যজ্ঞ করার দায়িত্ব নিলেন। তাঁকে সাহায্য করলেন জহরভাই। যজ্ঞের সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ যেন এক আলাদা অনুভূতি। সবাই মিলে হোম-যজ্ঞে পরমেশ্বরের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। মুকেশভাই বেদির উপর মাথা ঠুকতে ঠুকতে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্তব পাঠ করতে লাগলেন।

সব তীর্থযাত্রীর চোখে জল। আসলে এই চোখের জল তো শুধুমাত্র জল নয়, এ আনন্দাশ্রু – ঈশ্বরকে দেখার, ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার যে আনন্দ, তারই প্রকাশ। এই বিরল মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করলাম অতি দ্রুত।

যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর অতিথিশালায় ফিরে জানলার ধারে বসে রইলাম। মানস সরোবরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নীল জলের অপর প্রান্তে কৈলাস পর্বত এখনও ঝকঝক করছে। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছে, টের পাইনি। জহরভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোররাতে উঠতে হবে। শুনেছি, ভোররাতেই শিব-পার্বতী মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন। চিত্রকল্পটা মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে কখন যে ঘুম এসে গেল!

মানসের ধারে যজ্ঞের আয়োজন।

১৩ আগস্ট। রাত ৩টের সময় সুরজভাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, কয়েক জন যাত্রী মানসের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে এখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। বাইরে এসে দেখি আমাদের বন্ধুরা সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। সবার মুখে তখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। ওই মন্ত্র ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যের উদয় হল। চারি দিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু স্বপ্নপূরণ হল না। তাঁরা এলেন না। অতিথিশালায় ফিরে এলাম।

আজ আমাদের অখণ্ড অবসর। আজ শুধু মানসের চার পাশে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। অতিথিশালার সংলগ্ন গুম্ফায় গেলাম। চার দেওয়ালে বৌদ্ধের বাণী আর তৈলচিত্র। বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে এক উপাসক ড্রাম বাজাচ্ছেন। ড্রামের ডুম ডুম আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ চারি দিকে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমিও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। লাউডস্পিকারে অতি মৃদু স্বরে ভেসে আসছে – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)/ধম্মং শরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ নিলাম)/ সংঘং শরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ নিলাম)। জানতে পারলাম এই গুম্ফা ৩০০ বছরের পুরোনো। ভিতরের তৈলচিত্রগুলোও সেই সময়কার। অথচ এখনও কত উজ্জ্বল।

মানসের ধারে গুম্ফা।

দুপুর হতেই দল বেঁধে চললাম স্নান করতে। কেউ নিয়ম মানছেন না। আশেপাশে কোনো পাহারাদার নেই দেখে সবাই ডুব দিতে জলে নেমে পড়ল। আমিও নেমে পড়লাম মানসের জলে। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। সরোবরের অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার পর মানসের জল আনতে ছুটলাম। বোতলে ভরলাম। কলকাতার অনেকেই মানসের জল আনতে বলেছেন। জানি না, এই জল শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছোবে কি না। ঘোড়ার পিঠে করে আমাদের মালপত্র যাবে নাজাং পর্যন্ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে দিল্লি, তার পর ট্রেনে কলকাতা। তখনও জানতাম না ফেরার সময় আমাদের জন্য কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।

রাতের খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল ঘড়ির অ্যালার্ম। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আকাশ মেঘলা থাকলে দৃশ্যমানতা কমে যায়। তবে কি আজও তাঁর দেখা পাব না? এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মানস সরোবরে আজই আমাদের শেষ রাত। কাল সকালেই আমরা রওনা দেব তাকলাকোটের উদ্দেশে। হাতে ছাতা নিয়ে মানসের জেটিতে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছু যাত্রী অনেক আগে থেকেই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কৈলাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রভুকে ডেকে চলেছি।

ঠিক ৩.২৫ মিনিট। হঠাৎ দেখি মানসের জল স্থির হয়ে গেল। কৈলাস পর্বতের মাথায় একটা হলুদ আলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। অনেকটা হ্যালোজেন আলোর মতো। সেই আলোর জ্যোতিতে মানস আলোকিত। আলোটা কৈলাস পর্বত থেকে নেমে এসে মানসের জলে ঘুরপাক খেতে লাগল। ৩০-৪০ সেকেন্ডের পর আলোটা জল থেকে উঠে কৈলাস পর্বতে মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় আমাদের শরীর কাঁপছে, আমরা মূক। কতক্ষণ যে এই ভাবে ছিলাম, জানি না। পাশের যাত্রীর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমি কী দেখলাম! পরমেশ্বর অবশেষে আমাদের দেখা দিলেন। তা হলে কি সেই কাহিনি সত্যি? সত্যিই কি শিব-পার্বতী ভোররাতে মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন?

এই অলৌকিক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। কী ভাবে এই আলোর উৎপত্তি? কেনই বা সেই আলো এসে পড়ে মানসের জলে? আমার সারা শরীর শিহরিত। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। সহযাত্রী জহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম জহরভাই আর সুরজভাই উত্তেজনায় কাঁপছে, মুখে শুধু ‘হর হর মহাদেব’। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। পবিত্র মানসের জল মুখে-মাথায় দিলাম। পরমেশ্বরের এই রূপ দেখতেই তো এত কষ্ট করে, বাড়ি-ঘর-সংসার ফেলে এখানে ছুটে আসা। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যদেব দেখা দিলেন। আমরা এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ়। (চলবে)

ছবি: লেখক

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
বাংলাদেশ1 hour ago

Bangladesh: বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর প্রয়াণ

বাংলাদেশ2 hours ago

Bangladesh Lockdown: দেশ জুড়ে কঠোর লকডাউন, পথে পথে তল্লাশি চৌকি, মুভমেন্ট পাশ ছাড়া চলাচল বন্ধ

ক্রিকেট2 hours ago

IPL 2021: আরসিবির হয়ে জ্বলে উঠলেন বাংলার শাহবাজ, তীরে এসে তরী ডোবাল হায়দরাবাদ

রাজ্য3 hours ago

Bengal Polls 2021: পঞ্চম দফায় ভোটগ্রহণ শনিবার, দেখে নিন ৪৫ কেন্দ্রে কোন দলের প্রার্থী কে

AstraZeneca-twiter
বিদেশ4 hours ago

অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোভিড ভ্যাকসিনের ব্যবহার স্থায়ী ভাবে বন্ধ করল ডেনমার্ক

রাজ্য5 hours ago

নজরে কোভিড পরিস্থিতি, ভোটের প্রচারে বড়ো জমায়েত নিয়ে বামফ্রন্টের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত

রাজ্য5 hours ago

Bengal Corona: ভয়াবহ পরিস্থিতি! একদিনেই আক্রান্ত প্রায় ছ’হাজার

দেশ6 hours ago

ফের লকডাউনের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকরা, কন্ট্রোল রুমে ফোনের পর ফোন ঝাড়খণ্ডে

ক্রিকেট2 days ago

IPL 2021: কাজে এল না সঞ্জু স্যামসনের মহাকাব্যিক শতরান, পঞ্জাবের কাছে হারল রাজস্থান

প্রবন্ধ2 days ago

First Man In Space: ইউরি গাগারিনের মহাকাশ বিজয়ের ৬০ বছর আজ, জেনে নিন কিছু আকর্ষণীয় তথ্য

দেশ3 days ago

Kumbh Mela 2021: করোনাবিধিকে শিকেয় তুলে এক লক্ষ মানুষের সমাগম, আজ কুম্ভের প্রথম শাহি স্নান হরিদ্বারে

ক্রিকেট3 days ago

IPL 2021: সাড়ে ৭টায় খেলা শুরু হওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তুষ্ট মহেন্দ্র সিংহ ধোনি

দেশ2 days ago

Vaccination Drive: এসে গেল তৃতীয় টিকা, স্পুটনিক ফাইভে অনুমোদন দিয়ে দিল কেন্দ্র

দেশ3 days ago

Corona Update: এক ধাক্কায় সক্রিয় রোগীর সংখ্যায় প্রায় ১ লক্ষের বৃদ্ধি, তবে দৈনিক মৃত্যুহার ০.৫৩ শতাংশ

দেশ2 days ago

Election Commission of India: নতুন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুশীল চন্দ্র, মঙ্গলবার থেকে দায়িত্ব নিচ্ছেন

দেশ2 days ago

Sputnik V: এপ্রিলের শেষে ভারতের বাজারে চলে আসবে টিকা, জানাল রাশিয়া

ভোটকাহন

কেনাকাটা

কেনাকাটা4 weeks ago

বাজেট কম? তা হলে ৮ হাজার টাকার নীচে এই ৫টি স্মার্টফোন দেখতে পারেন

আট হাজার টাকার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন দুর্দান্ত কিছু ফিচারের স্মার্টফোনগুলি।

কেনাকাটা2 months ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা2 months ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা3 months ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা3 months ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা3 months ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা3 months ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা3 months ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা3 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা3 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

নজরে