Connect with us

দূরে কোথাও

বর্ষায় ভারতে এক ডজন গন্তব্য: খবর অনলাইনের বাছাই

বেশির ভাগ মানুষের কাছে বর্ষাকালটা ঘুরে বেড়ানোর সময়ই নয়। চার দিকে জল-কাদা মাখামাখি, এর মধ্যে ঘোরা যায় না কী! কিন্তু বর্ষার সত্যিকারের রূপ যদি উপভোগ করতে হয়, তা হলে বাড়িতে না থেকে বেরিয়ে পড়ুন। খুব বেশি দিন নয়, দিন পাঁচেক থেকে এক সপ্তাহ ছুটি নিলেই ঘুরে আসা যায়, ভারতের এমন এক ডজন জায়গার সন্ধান দিচ্ছে খবর অনলাইন। আর সত্যি কথা বলতে কী, বর্ষা পর্যটক-মরশুম না হওয়ায় বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। ট্রেনে টিকিট পাওয়া সহজ, বেশির ভাগ জায়গায় হোটেল-ভাড়ায় ছাড়, ঘোরাঘুরির জন্য গাড়িভাড়াতেও ছাড় মেলে।

জিম করবেট (উত্তরাখণ্ড)

বন্যপ্রাণী যাঁরা ভালোবাসেন বর্ষায় তাঁদের আদর্শ গন্তব্য। পর্যটকদের ভিড় নেই। একটা গুজব খুব প্রচলিত। বর্ষায় বন্ধ থাকে জিম করবেট। না, তা নয়। ধিকালা, বিজরানি, দুর্গাদেবী আর ঝির্না – এই  চারটি জোনের মধ্যে ঝির্না সারা বছরই খোলা থাকে। আর কোশী নদীতে র‍্যাফটিং তো বর্ষাতেই সম্ভব। বছরের বাদ বাকি সময়ে তো জলই থাকে না। প্রতি দিন সকালে আর সন্ধ্যায় তিন ঘণ্টার জিপ সাফারির আয়োজন করা হয়। বর্ষায় করবেটে হাতি সাফারিরও ব্যবস্থা করা হয়। বনশুয়োর আর হরিণ দেখার সুবিধা বর্ষাতেই। প্রচুর পাখিও দেখা যায় এই সময়ে।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা, দিল্লি থেকে সরাসরি ট্রেনে মোরাদাবাদ। মোরাদাবাদ থেকে দু’ ঘণ্টার ট্রেনযাত্রায় রামনগর। মোরাদাবাদ-রামনগর বাস চলে। গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। দিল্লি থেকেও সরাসরি রামনগরের বাস ও ট্রেন আছে। ট্রেনে হলদোয়ানি বা কাঠগোদাম এসে সেখান থেকেও বাসে বা গাড়িতে রামনগর আসা যায়। বিমানে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে যাওয়া যায় রামনগর। দিল্লি থেকে গাড়িতে ৬ ঘণ্টা। রামনগর থেকে ঝির্না ১৬ কিমি। রামনগরে ব্যাঘ্র প্রকল্পের ফিল্ড ডিরেক্টরের অফিস থেকে সাফারি বুক করতে হয়। যোগাযোগ- (০৫৯৪৭)২৫১৪৮৯।

কোথায় থাকবেন

কুমায়ন মণ্ডল বিকাশ নিগমের টুরিস্ট রেস্ট হাউস। যোগাযোগ – ৮৬৫০০০২৫২২। অনলাইন বুকিং – www.kmvn.gov.in। ঝির্নায় বন দফতরের রেস্ট হাউস বুক করতে হলে রামনগরে ফিল্ড ডিরেক্টরের অফিসে যোগাযোগ। এ ছাড়া রামনগরে বেসরকারি হোটেল, রিসোর্ট আছে।

মান্ডু (মধ্যপ্রদেশ)

সংগীতজ্ঞা সুন্দরী হিন্দু কন্যা রূপমতী আর মুসলিম শাসক সংগীতপ্রিয় বাজবাহাদুরের প্রেমগাথা আজও মান্ডুর আকাশেবাতাসে ছড়িয়ে। ইতিহাস আর প্রকৃতির অপূর্ব মিলনক্ষেত্র এই মান্ডু। বর্ষায় এর রূপ যেন আরও খোলে। মান্ডুর পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর রূপ বর্ষার জলে উপচে পড়ে। জলভরা মেঘ সমতল ছেড়ে ভেসে বেড়ায় মান্ডুর আকাশে। অবিরাম রিমঝিম বৃষ্টি অপূর্ব সুর সৃষ্টি করে। নদী-নালা-লেক জলে টইটম্বুর। পাহাড়ি-কন্যা মান্ডু সবুজের গালিচায় নিজেকে মুড়ে নিয়ে এক রোমান্টিক রূপে ডুবে যায়।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে কলকাতা-সহ ভারতের যে কোনও বড়ো শহর থেকে ইনদওর। সেখান থেকে মান্ডু ৯৫ কিমি। অনেক ট্রাভেল এজেন্সি দিনে দিনে মান্ডু বেড়িয়ে আনে। মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমও সপ্তাহান্তিক ট্যুরে মান্ডু বেড়িয়ে আনে। তবে মান্ডুতে অন্তত দিন দুয়েক না কাটাতে পারলে মন ভরে না।

কোথায় থাকবেন

মান্ডুতে এমপি পর্যটনের দু’টি থাকার ব্যবস্থা আছে। মান্ডু মালব রিট্রিট এবং মান্ডু মালব রিসোর্ট। অনলাইন বুকিং www.mptourism.com। এ ছাড়া মান্ডুতে বেসরকারি হোটেল, রিসোর্টও আছে।

আগুমবে (কর্নাটক)

‘দক্ষিণ ভারতের চেরাপুঞ্জি’ বলে কথিত আগুমবে যাওয়া উচিত বর্ষাতেই। ভারতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের জায়গা আগুমবে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭৬৪০মিমি। কর্নাটকের মালনাড় অঞ্চলের এই গ্রাম ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর – উঁচু পাহাড়, জলপ্রপাত, ঝরনা, নদী আর ঘন সবুজ জঙ্গল। ২১১০ ফুট উঁচু এই অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য ট্রেক রুট। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর আগুমবে বহু ওষধি বৃক্ষের আবাসস্থল। তাই এর আরেক নাম ‘হাসিরু হন্নু’ বা ‘সবুজ সোনা’। দেশের একমাত্র রেনফরেস্ট রিসার্চ স্টেশনটি এই আগুমবেতেই।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বিমানে বেঙ্গালুরু গিয়ে বাস বা গাড়িতে আগুমবে ৩৮০ কিমি। কাছাকাছি শহর উদুপি, ৫৫ কিমি। কোঙ্কন রেলে উদুপি স্টেশন। মুম্বই থেকে উদুপি ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে আগুমবে।

কোথায় থাকবেন

উদুপি শহর বা সেখান থেকে ৬ কিমি দূরে মালপে সৈকতে প্রচুর বেসরকারি হোটেল আছে। সেখানে থেকে আগুমবে ঘুরে আসা যায়। তবে মন ভরবে না। আগুমবেতে থাকার জায়গা হাতে গোনা। আগুমবে বাস স্ট্যান্ড থেকে হাঁটা দূরত্বে কস্তুর আকার বাড়ি ‘দোদ্দা মানে’। বাড়ির মতো ঘরোয়া থাকা। আগে থেকে ফোন করে ব্যবস্থা করতে হয়। যোগাযোগ কস্তুর আকা (০৮১৮১-২৩৩০৭৫) বা ওঁর জামাই রবিকুমার পাই (৯৪৪৮৬০৩৩৪৩)।

বাসস্ট্যান্ড থেকে ১০০ মিটার দূরে মাল্য রেসিডেন্সি। যোগাযোগ – ৮১৮১২৩৩০৪২/৯৪৪৮৭৫৯৩৬৩/৯৪৮০০৬১১২৭। ই মেল – [email protected]

থাকা যায় আগুমবে রেনফরেস্ট রিসার্চ স্টেশনেও। যোগাযোগ – ৯৯৫৫৫৫৫৮৫৪।

গোয়া 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বর্গরাজ্য গোয়া বর্ষায় যেন আরও মোহময় হয়ে ওঠে। মনসুনে গোয়া অত্যন্ত আদরণীয়। পশ্চিমঘাট পাহাড়শ্রেণির কোলের গোয়াকে বর্ষায় দেখে মনে হয়, কে যেন গোটা প্রদেশটাকে সবুজ জাজিমে মুড়ে দিয়েছে। গাছের পাতায় তখন বৃষ্টির মাতন, শাখে শাখে রংবেরঙের ফুলের বর্ণালি। পাখির কুজন মন মাতায়। আর আরব সাগরে ঢেউয়ের দোলা মন ভরায়। আর একটা মস্ত সুবিধা মনসুনে গোয়া বেড়ানোর। হোটেলগুলোতে ছাড় পাওয়া যায় প্রায় অর্ধেক। ১৫ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর গোয়ায় অফ সিজন।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে গোয়া এখন সরাসরি বিমান যাচ্ছে। দেশের অন্য মেট্রো শহর থেকে গোয়ার বিমান সার্ভিস আছে। কলকাতা বা দিল্লি থেকে সরাসরি ট্রেনে পৌঁছে যাওয়া যায় মাড়গাঁও। কলকাতা বা দিল্লি থেকে ট্রেনে মুম্বই গিয়ে সেখান থেকেও কোঙ্কন রেলপথে সোজা গোয়া পৌঁছে যাওয়া যায়। পশ্চিম ভারত তথা দেশের নানা দিক থেকে মিরাজ বা লোন্ডা এসে সেখান থেকে ট্রেনে চলে যাওয়া যায় মাড়গাঁও-ভাস্কো।   মুম্বই থেকে গোয়ার রাজধানী পানাজি পর্যন্ত প্রচুর বাস চলে। এ ছাড়াও মেঙ্গালুরু, পুনে-সহ পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের নানা শহর থেকে বাস সংযোগ আছে গোয়ার।

কোথায় থাকবেন

গোয়া ট্যুরিজমের হোটেল আছে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও সৈকতগুলোতে। অনলাইন বুকিং goa-tourism.com। এ ছাড়া সারা গোয়া জুড়ে প্রচুর বেসরকারি হোটেল, রিসোর্ট, লজ আছে।

চেরাপুঞ্জি (মেঘালয়)   

বৃষ্টি দেখার জন্যই চেরাপুঞ্জি (খাসি ভাষায় সোহরা) যাওয়া। চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয় বছরে ১১ হাজার মিমির বেশি আর তৎসন্নিহিত মৌসিনরামে বছরে বৃষ্টি হয় ১২ হাজার মিমির বেশি, যার ৯৫ শতাংশেরও বেশি হয় বর্ষার চার মাসে। বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের জায়গা মেঘালয়ের এই পাহাড়ি অঞ্চল। ৪৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চেরাপুঞ্জিতে কখনও কখনও টানা বৃষ্টি হয়, ন’ দিন ধরে, এগারো দিন ধরে। সাধারণত অত্যধিক বৃষ্টির জায়গায় যা দেখা যায়, সেই ঘন সবুজ জঙ্গল এখানে নেই। এখানে আছে ফলের বাগান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কমলালেবু। বিশ্বের সব চেয়ে আর্দ্র জায়গায় যে দিন রোদ ওঠে, সে দিন আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। নীচে যতদূর চোখ যায়, বাংলাদেশের সমভূমি সুরমা ভ্যালি চোখে পড়ে। মন ভরে যায় এক নস্টালজিয়ায়।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বিমানে গুয়াহাটি। সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে ১০৩ কিমি দূরে শিলং। শিলং থেকে পাহাড়ি পথ ধরে বাসে বা গাড়িতে ৫৪ কিমি দূরে চেরাপুঞ্জি। কলকাতা থেকে বিমানে সরাসরি শিলং আসা যায়।

কোথায় থাকবেন

শিলং থেকে দিনে দিনে ঘুরে নিতে পারেন চেরাপুঞ্জি। তা না হলে থাকতে পারেন চেরাপুঞ্জির ১৬ কিমি আগে চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট। যোগাযোগ – (০৩৬৩৭)২৪৪২১৮/২১৯/২২০ অথবা ৯৪৩৬১১৫৯২৫। থাকতে পারেন সোহরা প্লাজা (৯৭৭৪৯৭০৮২৫/৯৪৩৬৩০৮০০৭), কনিফেরাস রিসোর্টে (৯৪৩৬১৭৮১৬৪/৯৬১৫৭৯১৭৫২) বা পোলো অর্কিড রিসোর্টে (০৯৮৫৬০০০২২২)।

কোদাইকানাল (তামিলনাড়ু)

নীলগিরিরই অংশ পালনি পাহাড়। সেই পাহাড়েই কোদাইকানালের অবস্থান (২১৩৩ মিটার)। ভারতের অন্যান্য অংশে যখন বর্ষাকাল, তামিলনাড়ুতে তখন বর্ষাকাল হলেও সেই বর্ষায় তত জোর থাকে না, যতটা থাকে ফিরতি মৌসুমী বায়ুর সময়ে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে। তাই জুন-জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কোদাইয়ে বৃষ্টি হলেও তা ভোগায় না। নীল পাহাড়ের ছায়ায় ঘেরা সবুজে ছাওয়া সুন্দর প্রকৃতির মাঝে স্বাস্থ্যকর শহর কোদাই। কলা-কমলা আর পাইন-ইউক্যালিপ্টাসের শহর কোদাই। লেকের শহর, ফুলের শহর, পাখির শহর, ঝরনার শহর কোদাই। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হোটেল ভাড়ায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড়।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বিমানে চেন্নাই হয়ে বাস বা গাড়িতে কোদাইকানাল যাওয়া যেতে পারে। দূরত্ব ৪৫২ কিমি। চেন্নাই থেকে ট্রেনে মাদুরাই পৌঁছে, সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে কোদাই (১২০ কিমি) অথবা ট্রেনে কোদাই রোড পৌঁছে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে কোদাই (৮০ কিমি) যাওয়া যেতে পারে। হাওড়া থেকে সাপ্তাহিক কন্যাকুমারী এক্সপ্রেসে কোদাই রোড আসা যায়। হাওড়া থেকে ট্রেনে সোজা ত্রিচি পৌঁছে সেখান থেকেও বাস বা গাড়িতে ১৯২ কিমি দূরে কোদাই যাওয়া যেতে পারে।

কোথায় থাকবেন

কোদাইতে নানা মানের, নানা দামের বেসরকারি হোটেল রয়েছে। এ ছাড়া আছে তামিলনাড়ু পর্যটনের হোটেল তামিলনাড়ু। অনলাইন বুকিং www.tamilnadutourism.org

লাহুল-স্পিতি (হিমাচল প্রদেশ)

লাহুল-স্পিতি খ্যাত তার নৈসর্গিক শোভা, মনাস্ট্রি, গ্লেসিয়ার আর লেকের জন্য। গাছপালা নেই, ন্যাড়া পাহাড়, উপত্যকা জুড়ে বরফ আর গ্লেসিয়ার। সূর্যের প্রখর কিরণ, কনকনে বাতাস, গ্রীষ্মের দিনেও শীতের আধিক্য। অক্টোবর থেকে মে, বরফে মোড়া থাকে উপত্যকা। গাড়িও চলে না। হোটেলও বন্ধ থাকে। তাই এই অঞ্চলে বেড়ানোর মরশুম জুন থেকে সেপ্টেম্বর।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বিমানে দিল্লি গিয়ে, সেখান থেকে বাসে সরাসরি সিমলা। বা ট্রেনে সরাসরি বা দিল্লিতে বদল করে কালকা গিয়ে সেখানে থেকে টয় ট্রেন, বাস বা গাড়িতে সিমলা। তার পর সিমলা থেকে গাড়িতে হিন্দুস্তান-টিবেট রোড ধরে শতদ্রুর পাশ দিয়ে লাহুল-স্পিতির দিকে এগিয়ে চলা। এই পথে বাসও চলে। তবে খুব বেশি নয়। দিল্লি বা চণ্ডীগড় থেকে বাসে মানালি এসে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে রোটাং পাস পেরিয়ে লাহুল-স্পিতিতে ঢোকা যায়।

কোথায় থাকবেন

এই পথে নারকান্ডা, রামপুর, সারাহান, কল্পা, কাজা, কেলং-এ হিমাচল পর্যটনের হোটেল আছে। অনলাইন বুকিং www.hptdc.nic.in।

এ সব জায়গা ছাড়াও নাকো, তাবোতে বেসরকারি হোটেল আছে।

লাদাখ (জম্মু-কাশ্মীর)

জলবায়ু, ভূ-বৈচিত্র্যে খুব একটা তফাৎ নেই লাহুল-স্পিতির সঙ্গে লাদাখের। তাই লাদাখেও বেড়ানোর মরশুম জুন থেকে সেপ্টেম্বর।

কী ভাবে যাবেন

সরাসরি বিমানে দিল্লি বা চণ্ডীগড় হয়ে লাদাখের প্রধান শহর লে যাওয়া যেতে পারে। শহর থেকে বিমানবন্দর ৯ কিমি। বাস বা গাড়ি পাওয়া যায়। ট্রেনে জম্মু গিয়ে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে শ্রীনগর। সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে কারগিলে এক রাত কাটিয়ে ৪৩৪ কিমি দূরের লে যাওয়া যেতে পারে। আবার মানালি থেকে বাস বা গাড়িতে সারচুতে এক রাত কাটিয়ে পরের দিন পৌঁছে যান ৪৭৭ কিমি দূরের লে শহরে। লে পৌঁছে অন্তত ২৪ ঘণ্টা বিশ্রাম নিন। তার পর ভ্রমণ শুরু করুন। খুব তাড়াহুড়ো করবেন না। ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে ঘুরুন। না হলে মাউন্টেন সিকনেস হতে পারে। গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে নিন দ্রষ্টব্য। কাশ্মীরের অনিশ্চিত পরিস্থিতির জন্য মানালি দিয়ে যাওয়াই ভালো।

কোথায় থাকবেন

লে শহরে থাকার জন্য হরেক দামের হরেক মানের হোটেল আছে। তা ছাড়া জম্মু-কাশ্মীর পর্যটনের লে রিসোর্ট রয়েছে। অনলাইন বুকিং www.jktdc.co.in । আর লাদাখ অঞ্চলের যেখানে যেখানে রাত কাটাবেন সেখানকার হোটেলের সন্ধান লে শহরেই পেয়ে যাবেন।

মালসেজ ঘাট (মহারাষ্ট্র)

ভরা বর্ষাতেই রূপ খোলতাই হয় রূপসী মালসেজ ঘাটের। চার পাশে সহ্যাদ্রি পাহাড়, ধারা নামছে জলপ্রপাতের – তারই মাঝে ৭০০ মিটার উচ্চতায় সবুজে মোড়া উপত্যকা। বন্যজন্তু আর চেনা-অচেনা নানা পাখির কুজন মধুময় করে তোলে চার পাশের পরিবেশ। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যাযাবরী ফ্লেমিংগোরা ভিড় জমায় মালসেজ ঘাটে।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বিমানে মুম্বই বা পুনে। মুম্বই থেকে আহমেদনগর হয়ে বাস বা গাড়িতে মালসেজ ঘাট ১৫৪ কিমি। পুনে থেকেও ১৬৪ কিমি দূরের মালসেজ ঘাট পৌঁছনো যায় বাস বা গাড়িতে। ট্রেনে কল্যাণ পৌঁছে সেখান থেকেও বাস বা গাড়িতে চলা যেতে পারে মালসেজ ঘাট।

কোথায় থাকবেন

থাকার জন্য আছে মহারাষ্ট্র পর্যটনের এমটিডিসি মালসেজঘাট। অনলাইন বুকিং www.maharashtratourism.gov.in । বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আছে সাজ বাই দ্য লেক মালসেজ। ই মেলে যোগাযোগ – [email protected]

সাপুতারা (গুজরাত)

মহারাষ্ট্র-গুজরাত সীমানায় সহ্যাদ্রি পাহাড়ে ৮৭৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গুজরাতের এক মাত্র শৈলশহর সাপুতারা। বছরে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মিমি বৃষ্টি হয় সাপুতারায়। বর্ষায় সবুজ শৈলশহর ঢেকে থাকে মেঘে। ভ্যালি ভিউ পয়েন্টে গিয়ে মনে হয় মেঘের জালে বন্দি আমরা। মেঘ আসে, মেঘ যায়, সব কিছু দৃশ্যমান হয়, আবার মেঘ ঢেকে দিয়ে যায়। এ ভাবেই চলে লুকোচুরি। সাপুতারা লেকও কখনও দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আবার কখনও ভেসে ওঠে চোখের সামনে, বোঝা যায় এর রূপ। বর্ষায় মনসুন ফেস্টিভ্যালে মেতে ওঠে সাপুতারা।

কী ভাবে যাবেন

সাপুতারা যাতায়াতে মহারাষ্ট্রের নাসিকই সুবিধাজনক। ট্রেনে নাসিক রোড পৌঁছে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে চলে যাওয়া যায় সাপুতারা। দূরত্ব ৮০ কিমি।

কোথায় থাকবেন

গুজরাত পর্যটনের তোরান হিল রিসোর্ট। অনলাইন বুকিং www.gujarattourism.com। এ ছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে।

ওয়েনাড় (কেরল)

সমুদ্রতীর মাত্র ৭৬ কিমি দূরে। বৃষ্টির মনভোলানো রূপের সুবাদে ওয়েনাড় এখন ক্রমশই ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘মনসুন ডেস্টিনেশন’ হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠছে। বর্ষায় ওয়েনাড়ের পাহাড়-জঙ্গলের রূপ কেমন খোলে তা বোঝাতে তিন দিন ধরে মনসুন ফেস্টিভ্যাল ‘স্প্ল্যাশ’-এর আয়োজন করা হয় এখানে। নাম-না-জানা অসংখ্য ঝরনার অবিরাম ধারাপাত মোহময়ী করে তোলে ওয়েনাড়কে।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে কোঝিকোড় পৌঁছে সেখান থেকে বাসে ওয়েনাড়ের বিভিন্ন জায়গা ভাইথিরি, কালপেট্টা আর সুলতান বাথেরি যাওয়া যায়। বেঙ্গালুরু থেকে গাড়িতে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। মাইশুরু, উটি, কান্নুর থেকে বাস বা গাড়িতে আসা যায় ওয়েনাড়ের নানা জায়গা।

কোথায় থাকবেন

সুলতান বাথেরিতে আছে কেরল পর্যটনের পেপ্পার গ্রোভ। অনলাইন বুকিং www.ktdc.com । এ ছাড়া সুলতান বাথেরি, ভাইথিরি, কালপেট্টা ও মান্নানথাভেড়িতে বেসরকারি হোটেল আছে।

দারিংবাড়ি (ওড়িশা)

প্রায় ৪ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ দারিংবাড়ি। জোর এক পশলা বৃষ্টি হওয়ার পরে জল কোথায় গড়িয়ে যায় টের পাওয়া যায় না। অথচ আবহাওয়া হয়ে ওঠে মনোরম। চার দিকের পাহাড়গুলো আরও সবুজ হয়ে যায়। নীল আকাশ আরও নীল হয়। ফলস্‌গুলো জলে ভরে ওঠে। প্রকৃতি কেমন যেন ঝলমল করে। এত ঝকঝকে আবহাওয়া ভাবাই যায় না।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বিশাখাপত্তনম পথে ট্রেনে ব্রহ্মপুর। সেখান থেকে দারিংবাড়ি ১২০ কিমি বাস বা গাড়িতে। ট্রেনে ভুবনেশ্বর এসে সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ২৫০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে আসা যায় এই দারিংবাড়িতে।

কোথায় থাকবেন

এখানে থাকার জন্য বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আছে পাহাড়ের ঢালে ডিয়ার ইকো রিসোর্ট (০৯৪৩৮৪২২৪৫২/০৯৮৬১৫৯৬২৬১/০৯৩৩৮৮৮০৮৯৪), মেন রোডে ইউটোপিয়া হোটেল (০৯৪৩৭৭৮১৯৭২), হোটেল পদ্মা (০৮৮৯৫২২৬৮৯৩) এবং  হোটেল হিল ভিউ (০৯৪৩৯৩৬১২০৩)।

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: শেষ পর্ব/ দুর্যোগ কাটিয়ে ঘরে ফেরা

manas sarovar

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম নাজাং-এর উদ্দেশে। সবার মুখ থমথমে। লিয়াজঁ অফিসারদের খুব চিন্তাগ্রস্ত লাগছে। কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে কনকনে হাওয়া। চারিদিক থেকে ধসের খবর আসছে। দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না। বৃষ্টির মধ্যেই কালী নদীকে বাঁ হাতে রেখে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঘষে কোনো রকমে যাওয়া যায়। ঝুরঝুরে আলগা মাটি। একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদ। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরাগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

টানা দু’ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের চিত্র পুরো বদলে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। কখনও নদীর পাড়, তো কখনও পাহাড়ের চুড়ো – এ ভাবেই চড়াই-উতরাই ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি। বৃষ্টির জল পেয়ে কালী নদী ফুঁসছে। মনে হচ্ছে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। ঝরনার জলে আমরা সবাই ভিজে গিয়েছি। আমাদের যাওয়ার রাস্তা অবিরাম পরিষ্কার করে চলেছে বুলডোজার, কিন্তু ধসের বিরাম নেই। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। কোনো কোনো রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। বৃষ্টির জন্য পা প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছি। মুখে ঈশ্বরের নাম।

১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে সব কৈলাসযাত্রী মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতে মালপায় স্মারক।

এ ভাবেই ১০টা নাগাদ মালপায় এলাম। প্রাতরাশের জন্য পথ চলার সাময়িক বিরতি এখানে। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট শেষ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মালপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাসযাত্রী। তাঁরা ছিলেন ১৩ নম্বর ব্যাচের যাত্রী। কী অদ্ভুত সমাপতন! আজও ১৭ আগস্ট এবং আমরাও ১৩ নম্বর ব্যাচ। জানি না, পরমেশ্বর আমাদের কপালে কী রেখেছেন? পুরো যাত্রা এত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেললেন আমাদের তিনি?

প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা, পাশে গণেশ। কোনো কোনো ঘাসের ঝাড় ধরে ঝুলে নামা। নীচে কোথায় পা দেব, বুঝে উঠতে পাচ্ছি না, এত খাড়া পাহাড়ের গা। নীচে থেকে গণেশ হাতে ধরে পা বসিয়ে দিচ্ছে। ঘাসের গোড়া বা গাছের শিকড় মুঠিতে চেপে ধরে, বুক-পেট পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বর্ষার পর এ পথে আমরাই প্রথম। এ ভাবেই সেই ৪৪৪৪ সিঁড়িওয়ালা পাহাড় অতিক্রম করলাম। সামনে আরও একটা বড়ো পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামলেই নাজাং, যেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

লেখকের পথের সাথি গণেশ।

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই পা পিছলে যাচ্ছে। যেখানেই থমকে যাচ্ছি, গণেশ এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরা না থাকলে এতক্ষণে আমাদের চলে যেতে হত কালী নদীতে। কালী নদীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না, এখন তার রূপ এতটাই ভয়াল। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছোলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। এ দিকের রাস্তা আরও খারাপ। কোনো কোনো জায়গায় সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে নামতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় হামাগুড়ি। সারা গা কাদায় মাখামাখি। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টির দিনে এ ভাবেই কাদা মেখে ফুটবল খেলতাম। আর আজ? প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াই। অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরার লড়াই। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে গণেশও হাত ধরতে পারছে না। হাত ধরতে গেলেই দু’ জনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, পা আর চলছে না। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা সময় দেখলাম নাজাং-এ এসে গিয়েছি। নীচে নেমে শুয়ে পড়ে পাহাড়কে প্রণাম করলাম।

মনে একরাশ আনন্দ। হ্যাঁ, পেরেছি – হেঁটে কৈলাস-মানস দর্শন করতে। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। চোখে আমার জল। তখনও কি জানতাম, সামনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

নাজাং থেকে গাড়িতে ধারচুলা যাওয়ার কথা। কিন্তু ছ’ কিমি দূরে রাস্তা পুরো ধসে গিয়েছে। সব গাড়ি ওখানে আটকে। এখানে অপেক্ষা না করে লিয়াজঁ অফিসারদের নির্দেশে সামনে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রবল বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ। এই সব পাথর টপকে টপকে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। এক সময় সেই ছ’ কিমি পথ শেষ হল। আর রাস্তা নেই। দু’টি বুলডোজার ব্যস্ত রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। কিন্তু যে জায়গাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ধস নেমে সেই জায়গা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

লেখকের দুই যাত্রাসঙ্গী জহরভাই ও সুরজভাই।

আর উপায় নেই। এ বার এক এক করে এই জায়গাটা পার হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা বাঁশি বাজালে এক জন করে যাত্রী ধসের জায়গাটা পার হবেন। বাঁশি বাজতেই প্রথম যাত্রী দৌড় দিলেন। কিন্তু যেই মাঝপথে পৌঁছেছেন ওপর থেকে পাথর পড়া শুরু হয়ে গেল। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। যাত্রীভাই মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন। আবার বাঁশি বাজল, কিন্তু প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ এগিয়ে গেল না। সবাই ভয়ে পিছিয়ে আসছেন।

আমি দেখলাম এই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। কতক্ষণ এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে থাকতে হবে তার কোনো হিসেব নেই। সামনে এগোতেই হবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমিই দৌড় লাগালাম। সামনেই একটা ঝরনা। ঝরনার জল প্রবল বেগে নেমে এসে খাদ দিয়ে গড়িয়ে নীচের কালী নদীতে গিয়ে মিশছে। কোনো ভাবে পা হড়কে গেলে সোজা নদীতে। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি। চিরকালই আমি ডানপিটে, মৃত্যুভয় আমার নেই। যে দিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সে দিন নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আর যে দিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিনও নিজের ইচ্ছায় হবে না। তা হলে কেন এই মৃত্যুভয়?

ঝরনা অতিক্রম করে দেখি, সামনে এক বিশাল পাথর। টিকটিকির মতো বুকে ভর দিয়ে সেই পাথরও পেরিয়ে এলাম। এ বারে একটা পাথর থেকে আরেকটা পাথর লাফিয়ে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো পেরিয়ে এসে অন্য বিপদ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা দু’টো আটকে গেল। কোনো দৈবশক্তি জেন আমার উপর ভর করল। কে যেন আমাকে এক হাত ধরে তুলে নিল। তবে কি আমার প্রভু আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেন? সারা গায়ে কাদা মেখে এ পারে আসতেই ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে এ প্রান্তের মানুষজন আমায় জড়িয়ে ধরল। পরে জহরভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার দৌড় শুরু করার কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই পাহাড় থেকে পাথর পড়া শুরু হয়্। দু’-একটা মুহূর্ত এ-দিক ও-দিক হলেই…।

সেই বিপজ্জনক জায়গা।

এ পারে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কখন দলের বাকি সদস্যরা আসবে? পাথর পড়া যখন দু’-তিন মিনিটের জন্য বন্ধ হচ্ছে, এক জন করে যাত্রী এ পারে আসছেন। তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটতে লাগল। এ পারে আসতে গিয়ে গণেশ কাদার মধ্যে পড়ে গেল দেখলাম। হাঁটু থেকে রক্ত বার হচ্ছে। এক মহিলা যাত্রী কাদার মধ্যে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিলেন। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করলেন। অনেকক্ষণ পর জহরভাই আর সুরজভাইও পেরিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই অক্ষত অবস্থায় এ পারে এলেন।

এ বার গাড়িতে করে রওনা ধারচুলা। আমাদের লাগেজ পড়ে রইল গুনজিতে। এক কাপড়ে ধারচুলা থেকে দিল্লি, তার পর কলকাতা। কলকাতায় আসার দশ দিন পর এল আমার লাগেজ। এসে পৌঁছোল কৈলাস-মানসের পবিত্র জলও। এটাই সব চেয়ে দামি আমার কাছে। (শেষ)

ছবি: লেখক    

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

কাল প্রায় সারা রাত জেগে কেটেছে। চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি, তাতে মনে অপার শান্তি। অতিথিশালায় ফিরে এসে বাকি সময়টা বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ মানসকে বিদায় জানানোর পালা।

আরেক বার গেলাম মানসের পাড়ে। দূরে উজ্জ্বল কৈলাস পর্বত। ভোররাতের ঘটনার কথা ভেবে এখনও লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ভেসে আসছে ‘ওম মণি পদ্মে হুম’-এর সুর। ভেসে আসছে ড্রামের আওয়াজ। মন কিছুতেই চাইছে না এই জায়গা ছেড়ে যেতে। বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে। শেষ বারের মতো মানসের জল মুখে নিয়ে, পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ছুটলাম বাসের দিকে। বাসের যাত্রীরা সবাই শিবের ভজন গাইছে। বাস এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আমার স্বপ্নের মানস-কৈলাস। আমার দু’ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কে যেন কানে কানে বলছে – আবার আসিস।

আরেক বার মানস দর্শন।

কখন যে তাকলাকোট পৌঁছে গিয়েছি, খেয়াল করিনি। হোটেলে ফিরেও হোয়াটস অ্যাপে বাড়ির সঙ্গে কথা বললাম। কত দিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা হল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে এলাম।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ১৫ আগস্ট। এই পুণ্য দিনে ফিরে চলেছি ভারতে। তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৯টা নাগাদ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল চিনা অভিবাসন দফতরে। তার পর কাস্টমস অফিসে। আমাদের মালপত্র পরীক্ষার পর তিব্বত তথা চিন ত্যাগের অনুমতি পেলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাসে করে চলে এলাম লিপুলেখ পাস সংলগ্ন ভারত-চিন সীমান্তে। চিনা অফিসারেরা আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন। মিলল পাহাড়ে চড়ার অনুমতি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণেশ যথারীতি চলে এসেছে। ওর কাছে আমার রুকস্যাক দিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা আমাদের দেখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আজ স্বাধীনতা দিবস। তাই মহাদেবের পাশাপাশি ভারতমাতার নামেও জয়ধ্বনি হল।

মানস থেকে ফেরার পথে মন্যাস্টেরি।

লিপুলেখ পাসের নীচেই আইটিবিপি-র ক্যাম্প। গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। আইটিবিপি-র জওয়ানদের সঙ্গে ছবি তোলা হল।

আজ আমাদের গন্তব্য গুনজি, ২৬ কিমি। আসার সময় যে পথ তিন দিনে এসেছিলাম, সেই পথ এক দিনে পেরোব। একটু যে টেনশন হচ্ছে না, তা নয়। তবু হাঁটতে তো হবেই।

খুব জোরে হাঁটতে পারছি না। পথের সৌন্দর্যও সে ভাবে আকর্ষণ করছে না। কেবল কৈলাস-মানসের কথা মনে পড়ছে। মানস সরোবরে ভোররাতের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ যেন চোখের সামনে ভাসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা বিশাল ঝরনার কাছে চলে এলাম। গোটা পথকে প্লাবিত করে ঝরনা প্রবল বেগে নীচে নেমে যাচ্ছে। লাঠির সাহায্যে অতি সন্তর্পণে পথটুকু অতিক্রম করলাম। চলে এলাম নাভিডাং। এখানে সেনাশিবিরে স্বল্পক্ষণের যাত্রাবিরতি। দেখলাম জওয়ানরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে ব্যাস্ত। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। এখানে প্রাতরাশ সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম কালাপানির উদ্দেশে।

কিছুটা হাঁটার পর বুঝতে পারছি, বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পাথরের উপর বসে রইলাম। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকটা মসৃণ হল, বেশ আরাম লাগছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু চলার ক্ষমতা যে বেশ কমছে, বুঝতে পারছি। বাঁ পায়ের হাঁটুতে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। জহরভাইয়েরও একই সমস্যা হয়েছিল। আমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে কিছুটা সামলেছে। সমতলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু চড়াই-উতরাই এলেই সমস্যা।

পথের দু’ পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা। তার মধ্যের উপত্যকা দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেছে। সেই নদীকে ডান হাতে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। মখমলের মতো সবুজ ঘাস আর গুল্ম দিয়ে মোড়া পুরো উপত্যকা। অসংখ্য রঙিন ফুল ফুটে রয়েছে। এ যেন এক স্বপ্নলোক। এ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কালাপানির অতিথিশালায়। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা এখানেই। আমি দুপুরের খাবার না খেয়ে এগিয়ে চললাম। কালাপানিতে পাসপোর্টে সিল মারিয়ে আবার এগিয়ে চলা। পথেই আলাপ হল আইটিবিপি-র এক জওয়ানভাইয়ের সঙ্গে। উনি আমাদের হাতে চকোলেট তুলে দিলেন। বাড়িতে ওঁর ছোটো একটা ছেলে আছে। তার বিদেশি মুদ্রা জমানোর খুব শখ। আমি ওঁর হাতে ১০০ চিনা ইউয়ানের একটি নোট তুলে দিলাম। সারা পথ ওঁদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেল নাগাদ পৌঁছে গেলাম গুনজি ক্যাম্পে। এসেই দেখি মনীশভাই আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। গুনজি ক্যাম্পে আজ খুব ভিড়। ক্যাম্পের পাশেই পাহাড়ে মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসী আসছেন। গুনজি আইটিবিপি ক্যাম্প রাতে আমাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করেছে। অনেক দিন পর দেশের খাবার খেলাম। জওয়ানভাইদের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়।

গুনজি ক্যাম্প।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই চার দিক থেকে ধসের খবর আসতে লাগল। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরা বিশাল আকার ধারণ করে। এখানেও তাই। আজ গণেশ ছাড়াই পথ চলা শুরু হয়েছে। মেলার জন্য গণেশ একদিন গুনজিতে থেকে গেল। কাল সকালে বুধিতে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

গুনজি থেকে ছায়লেক পর্যন্ত রাস্তা সমতল। তার পর পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। সেই পথটা খুব বিপজ্জনক। দু’-তিন ঘণ্টা একটানা হেঁটে চলেছি। ফুসফুস ক্রমশ হাপর হয়ে উঠছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। লজেন্স মুখে দিলাম। লজেন্সের মোড়ক বুকপকেটে রেখে দিলাম প্রকৃতির বুকে দূষণ এড়ানোর জন্য। কৈলাস পরিক্রমার সময় দেখেছিলাম জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রাখা। আমাদের উত্তরাখণ্ডে সে সবের বালাই নেই।

আরও কিছুটা এগোনোর পর জলপতনের গর্জন শোনা গেল। যতই এগোচ্ছি, গর্জন ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হুড়হুড় করে পড়ছে ঝরনার জল। যেন বিরাট তুলোর বস্তা। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা সেই জল রাস্তা ভাসিয়ে কালী নদীতে পড়ছে। ঝরনার জল সারা গা ভিজিয়ে দিল। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা নয়, চিন্তা ক্যামেরাটা নিয়ে। ক্যামেরার ছবি আমার কাছে মহা মূল্যবান, আমার সারা জীবনের সম্পদ, আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ক্যামেরা বাঁচিয়ে কোনো রকমে পেরিয়ে এলাম সেই জায়গা।

১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ছায়লেকে। খাওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি। আবার পথ চলা শুরু। এ বার নীচে নামার পালা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, পথ ভয়ংকর পিছল। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ের বুকে আমি একা। ট্রেকিং-এ এ রকম হয়, কেউ যায় এগিয়ে, কেউ থাকে পিছিয়ে – যার যেমন চলার সামর্থ্য বা গতি।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথা প্রচণ্ড বেড়েছে। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাধ্য হয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ খেলাম। অনেক নীচে বুধির ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বৃষ্টির তেজ প্রচণ্ড বাড়ল। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে লাঠি নিয়ে, পা টিপে টিপে পরমেশ্বরের নাম করতে করতে এগিয়ে চললাম ক্যাম্পের দিকে।

ঈশ্বরকে মনেপ্রাণে ডাকছি – আর একটা দিন তুমি শক্তি দাও, এতটা রাস্তা যদি হেঁটে আসতে পারি, তা হলে শেষ বেলায় কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছ? তোমার কৃপা না থাকলে এতটা পথ আসতে পারতাম না। হাঁটুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা কমানোর মলম স্প্রে করলাম। একটু যেন স্বস্তি এল। ধীরে ধীরে নেমে চললাম। পৌঁছে গেলাম বুধি। কেএমভিএন-এর এক কর্মীভাই যথারীতি শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। (চলবে)

ছবি: লেখক                 

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

view of Kailas from Kailas

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কিউগুতে। মানসের তীরে এই জনপদ। সরোবরের নীল জলরাশি সূর্যের আলোয় হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শত সহস্র জলকণা সূর্যের আলোয় তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। সরোবর সংলগ্ন এক অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মানসের জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকেই সবাই বেরিয়ে গেলাম। ছুটলাম মানসের জলে অবগাহন করতে। হিমশীতল জল। বাইরের তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির কাছাকাছি, সঙ্গে প্রবল হাওয়া। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বাধাই আর বাধা নয়। মানস সরোবর যেন দু’ হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। এই সেই মানস সরোবর। স্বয়ং দেবাদিদেব যেখানে অবগাহন করেন।

কিউগুতে মানস সরোবর।

মানস সরোবরের জলে নেমে স্নান করার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বালতি করে জল তুলে এনে স্নান করতে হয়। কিন্তু কে মানে সেই বিধিনিষেধ! মানসের জলে নেমে সবাই আনন্দে আত্মহারা। ‘হর হর মহাদেব’ আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। মানসের জল আর চোখের অশ্রু মিলেমিশে তখন সব একাকার। মানসের জল তো শুধু জল নয়, এর মধ্যে আছে ঈশ্বরের ছোঁয়া। এ আমার কাছে চরণামৃত। সরোবরের জলে অবগাহন করতে করতে বললাম –

করচরণকৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাহপরাধম। / বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত ক্ষমস্ব জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো।।

(হে প্রভু, আমার এই জন্মে হস্তপদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবণজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ, সব ক্ষমা কোরো।)

সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। হে প্রভু, তুমি না থাকলে এই পুণ্যধামে আমার আসার সুযোগ হত না। কত বাধা, কত বিঘ্ন উপস্থিত হয়েছে। তুমি সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে আমাকে এই পুণ্যধামে নিয়ে এসেছ। এ তোমার অপার মহিমা। আমাকে তোমার চরণে স্থান দাও।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে হয় না। পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হব, এ আশাও আমি করি না। যত দিন বাঁচব, পিতৃঋণ আমি সানন্দে বহন করতে চাই। এই বলে মানস সরোবরের জল নিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ শুরু করলাম। তর্পণ করার কোনো সামগ্রীই আমার কাছে ছিল না, সামান্য একটু তিল ছাড়া। সেই তিল হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতৃদেবকে স্মরণ করে বললাম –

ওঁ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ/পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।

কতক্ষণ জলের মধ্যে ছিলাম জানি না, জহরভাইয়ের ডাকে হুঁশ এল – তাড়াতাড়ি চলুন স্যর, হোমযজ্ঞ যে শুরু হয়ে যাবে। মানসের জলে ডুব দিয়ে কিছু পাথর সংগ্রহ করে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালাম।

সরোবরের পাশেই যজ্ঞের স্থান। মুম্বইনিবাসী মুকেশভাই যজ্ঞ করার দায়িত্ব নিলেন। তাঁকে সাহায্য করলেন জহরভাই। যজ্ঞের সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ যেন এক আলাদা অনুভূতি। সবাই মিলে হোম-যজ্ঞে পরমেশ্বরের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। মুকেশভাই বেদির উপর মাথা ঠুকতে ঠুকতে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্তব পাঠ করতে লাগলেন।

সব তীর্থযাত্রীর চোখে জল। আসলে এই চোখের জল তো শুধুমাত্র জল নয়, এ আনন্দাশ্রু – ঈশ্বরকে দেখার, ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার যে আনন্দ, তারই প্রকাশ। এই বিরল মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করলাম অতি দ্রুত।

যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর অতিথিশালায় ফিরে জানলার ধারে বসে রইলাম। মানস সরোবরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নীল জলের অপর প্রান্তে কৈলাস পর্বত এখনও ঝকঝক করছে। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছে, টের পাইনি। জহরভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোররাতে উঠতে হবে। শুনেছি, ভোররাতেই শিব-পার্বতী মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন। চিত্রকল্পটা মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে কখন যে ঘুম এসে গেল!

মানসের ধারে যজ্ঞের আয়োজন।

১৩ আগস্ট। রাত ৩টের সময় সুরজভাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, কয়েক জন যাত্রী মানসের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে এখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। বাইরে এসে দেখি আমাদের বন্ধুরা সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। সবার মুখে তখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। ওই মন্ত্র ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যের উদয় হল। চারি দিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু স্বপ্নপূরণ হল না। তাঁরা এলেন না। অতিথিশালায় ফিরে এলাম।

আজ আমাদের অখণ্ড অবসর। আজ শুধু মানসের চার পাশে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। অতিথিশালার সংলগ্ন গুম্ফায় গেলাম। চার দেওয়ালে বৌদ্ধের বাণী আর তৈলচিত্র। বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে এক উপাসক ড্রাম বাজাচ্ছেন। ড্রামের ডুম ডুম আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ চারি দিকে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমিও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। লাউডস্পিকারে অতি মৃদু স্বরে ভেসে আসছে – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)/ধম্মং শরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ নিলাম)/ সংঘং শরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ নিলাম)। জানতে পারলাম এই গুম্ফা ৩০০ বছরের পুরোনো। ভিতরের তৈলচিত্রগুলোও সেই সময়কার। অথচ এখনও কত উজ্জ্বল।

মানসের ধারে গুম্ফা।

দুপুর হতেই দল বেঁধে চললাম স্নান করতে। কেউ নিয়ম মানছেন না। আশেপাশে কোনো পাহারাদার নেই দেখে সবাই ডুব দিতে জলে নেমে পড়ল। আমিও নেমে পড়লাম মানসের জলে। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। সরোবরের অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার পর মানসের জল আনতে ছুটলাম। বোতলে ভরলাম। কলকাতার অনেকেই মানসের জল আনতে বলেছেন। জানি না, এই জল শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছোবে কি না। ঘোড়ার পিঠে করে আমাদের মালপত্র যাবে নাজাং পর্যন্ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে দিল্লি, তার পর ট্রেনে কলকাতা। তখনও জানতাম না ফেরার সময় আমাদের জন্য কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।

রাতের খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল ঘড়ির অ্যালার্ম। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আকাশ মেঘলা থাকলে দৃশ্যমানতা কমে যায়। তবে কি আজও তাঁর দেখা পাব না? এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মানস সরোবরে আজই আমাদের শেষ রাত। কাল সকালেই আমরা রওনা দেব তাকলাকোটের উদ্দেশে। হাতে ছাতা নিয়ে মানসের জেটিতে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছু যাত্রী অনেক আগে থেকেই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কৈলাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রভুকে ডেকে চলেছি।

ঠিক ৩.২৫ মিনিট। হঠাৎ দেখি মানসের জল স্থির হয়ে গেল। কৈলাস পর্বতের মাথায় একটা হলুদ আলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। অনেকটা হ্যালোজেন আলোর মতো। সেই আলোর জ্যোতিতে মানস আলোকিত। আলোটা কৈলাস পর্বত থেকে নেমে এসে মানসের জলে ঘুরপাক খেতে লাগল। ৩০-৪০ সেকেন্ডের পর আলোটা জল থেকে উঠে কৈলাস পর্বতে মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় আমাদের শরীর কাঁপছে, আমরা মূক। কতক্ষণ যে এই ভাবে ছিলাম, জানি না। পাশের যাত্রীর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমি কী দেখলাম! পরমেশ্বর অবশেষে আমাদের দেখা দিলেন। তা হলে কি সেই কাহিনি সত্যি? সত্যিই কি শিব-পার্বতী ভোররাতে মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন?

এই অলৌকিক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। কী ভাবে এই আলোর উৎপত্তি? কেনই বা সেই আলো এসে পড়ে মানসের জলে? আমার সারা শরীর শিহরিত। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। সহযাত্রী জহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম জহরভাই আর সুরজভাই উত্তেজনায় কাঁপছে, মুখে শুধু ‘হর হর মহাদেব’। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। পবিত্র মানসের জল মুখে-মাথায় দিলাম। পরমেশ্বরের এই রূপ দেখতেই তো এত কষ্ট করে, বাড়ি-ঘর-সংসার ফেলে এখানে ছুটে আসা। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যদেব দেখা দিলেন। আমরা এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ়। (চলবে)

ছবি: লেখক

Continue Reading
Advertisement
দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৭১১৪, সুস্থ ১৯৮৭৩

কলকাতা3 days ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

ক্রিকেট3 days ago

১১৬ দিন পর শুরু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, হাঁটু গেড়ে বসে জর্জ ফ্লয়েডকে স্মরণ ক্রিকেটারদের

দেশ2 days ago

সক্রিয় করোনা রোগীর ৯০ শতাংশই আটটি রাজ্যে!

রাজ্য2 days ago

ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন মহীনের অন্যতম ‘ঘোড়া’ রঞ্জন ঘোষাল

LPG
দেশ3 days ago

উজ্জ্বলা যোজনায় বিনামূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ার মেয়াদ বাড়ল আরও তিন মাস

কলকাতা2 days ago

করোনার পাশাপাশি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে শুরু হচ্ছে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা

শিক্ষা ও কেরিয়ার2 days ago

শুক্রবার আইসিএসই, আইএসসি-র ফল

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

ঘরের একঘেয়েমি আর ভালো লাগছে না? ঘরে বসেই ঘরের দেওয়ালকে বানান অন্য রকম

খবরঅনলাইন ডেস্ক : একে লকডাউন তার ওপর ঘরে থাকার একঘেয়েমি। মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের রদবদল করুন। জিনিসপত্র এ-দিক থেকে...

কেনাকাটা4 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা5 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা6 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

নজরে