সপ্তমী ঘোষ

ভারত মহাসাগরে নীল তিমি অভিযান – রাবণের দেশে সব থেকে উপভোগ্য এক অভিজ্ঞতা। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ও-পাশে সমুদ্রের কিনারে আকাশটি ফরসা হতে না হতেই উঠে পড়তে হল। নীল তিমির অভিযানে যেতে হবে তো। তাই নিজের ঘরটি থেকে সমুদ্রের ওপরে সকাল হওয়ার দৃশ্যটি সে দিনের মতো বর্জন করতে হল। এ দিন সকাল সকাল রওনা দিতে হল মিরিসা বিচের দিকে, যেখান থেকে ক্রুজবোটে শুরু হবে আমাদের নীল তিমি অভিযান।

মিরিসা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণতম জায়গা, যেখানে হাতের চেটোর মতো দেখতে এই দ্বীপটির শেষ প্রান্ত এসে মেশে ভারত মহাসাগরে। এই প্রান্ত থেকেই শুরু হবে আমাদের যাত্রা, ভারত মহাসাগরের অভ্যন্তরে। বেনটোটা থেকে মিরিসা এসে পৌঁছোতে সময় লাগল এক ঘণ্টার একটু বেশি। জানানো হল এটা মিরিসা পৌঁছোনোর শর্টকাট — আসল রাস্তা দিয়ে পৌঁছোতে বেশি সময় লাগবে বলে এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

cruise boat for whale watching
এই বোটেই যাওয়া হয়েছিল নীল তিমি অভিযানে।

ভোরের অন্ধকার চিরে যখন মিরিসা এসে পৌঁছোলাম তখন আলো সবে ফুটেছে। মিরিসার তিমি অভিযানের জন্য প্রধান জেটির মধ্যে প্রবেশ করে দেখলাম সারি সারি বোট সাজানো আছে সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সারি সারি বোটের ভিতর দিয়ে অনেকটা হেঁটে গিয়ে উঠলাম আমাদের জন্য বরাদ্দ বোটটিতে। ছোট্টো অথচ খোলামেলা বোটটির দু’টি তল, নীচে চেয়ারের মতো বসার ব্যবস্থা আর ওপরে তুলনামূলক খোলামেলা একটি অংশ। পিছনে কয়েকটা চেয়ার, আর সামনের দিকে রেলিং লাগোয়া বসার গদি। আমরা ছাড়া বাকিরা সবাই ইউরোপিয়ান, কেউ বা রাশিয়ান, কেউ বা ডাচ। ওপরে উঠে বসতেই বলা হল লাইফজ্যাকেট পরে নিতে। বেশ ভারী গোছের একটা লাইফজ্যাকেট পরে নিতেই শুরু হল যাত্রা।

জেটি ছেড়ে এগোতেই চোখে পড়ল একটি ছোট্টো পাহাড়ের গায়ে একটা লাইট হাউস। তার পাশেই প্রশস্ত একটি রিসর্ট, সম্ভবত সেটি এ দেশের দক্ষিণতম বসতি। এটি পেরিয়ে কিছু দূর এগোতেই একটু একটু করে ভূমির সীমানা গেল শেষ হয়ে। চারি দিকে তাকিয়ে দেখি খালি জল আর জল, যা মিশেছে নীল আকাশে। পরের ঘণ্টাটি ভেসে চললাম ভারত মহাসাগরের কোলে।

যত দূর চোখ যায় তত দূর জল দেখতে দেখতে যখন কোথাও একটা হারিয়ে গিয়েছি, তখন হঠাৎ আশেপাশে ভেসে উঠল ডলফিন। ক্রমশ একটি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিন ভেসে উঠতে লাগল। কখনও তারা চলল আমাদের জলযানের সঙ্গে, কখনও বা রওনা দিল উলটো দিকে। আমার আগে দেখা ডলফিনদের থেকে এরা আকারে একটু ছোটো। তবে জলযানের সঙ্গে দূরত্বে তা মনে হতেই পারে।

a glimpse of galle
এক টুকরো গল।

এই প্রসঙ্গে এই জলযানের পরিচালক একদল সিংহলীর কথা কয়ে নেওয়া দরকার। এঁরা অত্যন্ত যত্নে আমাদের এই সমুদ্র-সাম্রাজ্য ভ্রমণে সহায়তা করছিলেন বার বার। বেশ অনেক ক্ষণ ডলফিনদের রাজ্যে কাটিয়ে তাঁরা জানালেন, এ বার পালা নীল তিমির।

এগিয়ে চললাম মহাসাগরের আরও ভিতরে। আরও বেশ কিছু ক্ষণ পর প্রথম দেখা পেলাম নীল তিমির, আকারে বিশাল, হঠাৎ করে সমুদ্রের ওপরে ভেসে উঠছে তারা। ডলফিনদের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে নয়, একা একা। এক একটি নীল তিমি দু-তিন বার সমুদ্রের কোলে ভেসে উঠে শেষে বিদায়ের সময় লেজ দেখিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের অতলে। এই জায়গায় শুধু আমরাই নই,  আমাদের মতোই আরও অনেক জলযান ভিড় করেছে তিমি দেখার আশায়। যখনই তিমি দেখা যাচ্ছে তখনই খুবই দ্রুত গতিতে সেই দিকে চলেছে আমদের বোটটি।

আরও পড়ুন: লঙ্কাকাণ্ড ৭ / টুথ রেলিক মন্দির দর্শন করে সৈকতশহর বেনটোটায়

বেশ মজা লাগছিল তিমিদের সঙ্গে এই লুকোচুরি খেলা খেলতে। বোট দ্রুতগতিতে তিমিকে ধাওয়া করছে, আর আমরা প্রায় সবাই প্রাণের দায়ে রেলিং চেপে ধরে বসে আছি। খুব বিরক্তি লাগলেও তখন বুঝতে পারলাম কেন সবাইকে লাইফজ্যাকেট পরতেই হয়েছিল। প্রায় এক ঘণ্টা নীল তিমির দর্শনে কাটিয়ে ফেরার উদ্যোগ শুরু হল এ বার।

mirissa beach
মিরিসা সৈকত।

উত্তেজনা কাটিয়ে ফেরার যাত্রা শুরু হতেই বুঝতে পারলাম প্রবল ঝাঁকুনিতে সারা শরীর গিয়েছে গুলিয়ে। আশেপাশে সবার একই অবস্থা দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। ইতিমধ্যে একজন সহযাত্রীর অবস্থা একটু বেশিই খারাপ হতে জলযানের বাহকরা খুব যত্নে স্মেলিং সল্ট ও আরও কিছু দিয়ে কিছু ক্ষণের মধ্যেই তাঁকে সারিয়ে তুললেন। বোঝাই গেল এই ব্যাপার কিছু নতুন নয়। যা-ই হোক, বাকিরা আমরা খোলা হাওয়ায় ক্রমে সুস্থ হতে হতে এসে গেল কিছু জলখাবার, স্যান্ডউইচ, কেক, ফল আর শেষে জুস। সব খাবারই বেশ সযত্নে তৈরি, এই যাত্রার কষ্ট দূর করতে। এমনকি ছোট্টো লজেন্সটিও কমিয়ে দিল গা গোলানো।

ইতিমধ্যে জলযানের বাহকরা ধরেছেন গান। এক অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় ভেসে গেলাম আমরা। হঠাৎ বুঝতে পারলাম এটি এই ভূমির নিজস্ব সুর। কিন্তু হায়, দু’টো গানের পরই শুরু হল আমাদের হিন্দি গান। শেষে শ্রীলঙ্কায়ও বলিউড পিছন ছাড়ল না আমাদের।

traditional fishing in sri lanka
মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।

প্রায় চার ঘণ্টার এই যাত্রা শেষে পরের গন্তব্য ছিল মিরিসা বিচ। সহযাত্রীরা চা খেতে বসলে্ন, আর আমিও একটু হেঁটে এলাম পাড় ধরে। এটি পৃথিবীর অন্যান্য বিচের মতোই লোকারণ্য, সঙ্গে জলক্রীড়ার নানা উপকরণ সাজানো। এই বিচ থেকে বেরিয়ে পরবর্তী গন্তব্য ছিল মধ্যাহ্নভোজন। মাঝে এক জায়গায় থামলাম এ দেশে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি দেখতে। সমুদ্রের ধারে কিছু বাঁশ পোতা রয়েছে, যাতে একটি করে ছোট্টো বসার জায়গা করা। এখানে বসে মাছ ধরেন জেলেরা, যে পদ্ধতি আজও চলে আসছে।

মধ্যাহ্নভোজনের পর পরবর্তী গন্তব্য ছিল গল। ক্রিকেটের সূত্রে এই জায়গাটি জনপ্রিয় হলেও এখানকার প্রধান আকর্ষণ গল দুর্গ। প্রধানত পর্তুগিজদের নির্মিত হলেও এটি বেশি ব্যবহার করেছিলেন ওলন্দাজ (ডাচ) ঔপনিবেশিকরা। গলের জনপ্রিয় ক্রিকেটমাঠের পাশ দিয়ে দেওয়াল পরিবেষ্টিত কেল্লার মধ্যে ঢুকে মনে হল এসে পড়েছি এক অন্য জগতে। এখানকার বাড়ি, রাস্তাঘাট, সব তৈরি ইউরোপীয় শহরের আদলে।

galle city centre
গলের সিটি সেন্টার।

পরিবেষ্টিত দেওয়ালের উপর উঠে নীচে দেখা যায় সমুদ্র, এক দিকে বড়ো একটা লাইটহাউস। কেল্লার ভিতরে আস্ত একটা আলাদা শহর, আরও কিছুটা গিয়ে পৌঁছোলাম এক খোলা জায়গায়, যেটিকে সিটি সেন্টার বলা যেতে পারে। এই পুরো শহরটি হেঁটে ঘোরার মজাই ছিল আলাদা, যদিও সময়ের অভাবে তা সম্ভব ছিল না।

church at galle
গলের গির্জা।

সিটি সেন্টার থেকে উঠে কিছুটা এসে পেলাম দু’টি গির্জা, ইউরোপীয় স্তাপত্যের আদলে তৈরি। এর পর এসে থামলাম ক্লক টাওয়ারে, যার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে গল ক্রিকেটমাঠের এক ঝলক পাওয়া যায়। গল ক্রিকেটমাঠ নিয়ে খুব উৎসাহ ছিল না আমার। তাই বাইরেটাই ভালো করে উপভোগ করছিলাম। আর সেই ফাঁকে জুটে গেল এক অভাবনীয় উপহার। সুসজ্জিত পথ ধরে এগিয়ে এল সেই পুরোনো আমলের এক নীল অস্টিন, মনে হল শতাব্দী পেরিয়ে ফিরে গিয়েছি সেই পর্তুগিজ বা ব্রিটিশ আমলে।

austin in galle
গলের রাস্তায় অস্টিন।

গল শহরদর্শন শেষ করেও কোথাও একটা খেদ রয়ে গেল। মনে হল যদি একটা দিন পাওয়া যেত পায়ে হেঁটে শহরটি দেখার। কাকতালীয় ভাবে এই দিনটি আবার ছিল শিবরাত্রি। সেটি উদারমনস্ক  শ্রীলঙ্কানদের জানাতে তাঁরা নিয়ে এলেন এ দেশের শিবমন্দিরে, যেখানে চলছে পুজোর প্রস্তুতি। প্রাণভরে শিবদর্শন করে ফিরে এলাম বেনটোটার রিসোর্টে। পর দিনই রওনা দিতে হবে কলম্বোর উদ্দেশে। তাই সূর্যাস্তের আগেই ফিরিয়ে আনা হল। সুইমিং পুল সংলগ্ন ডেকচেয়ারগুলিতে বসে এক অসাধারণ সূর্যাস্তের সঙ্গে বিদায় জানালাম সেই অভিযানপূর্ণ দিনটিকে, যা ছিল এই সমুদ্র-শহরে আমাদের শেষ দিন। (চলবে)

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন