সপ্তমী ঘোষ[/caption] শ্রীলঙ্কার মানুষের কাছে রাবণ আমাদের রামায়ণে দেখানো সীতা-অপহরণকারী ভিলেন নন, বরং এখানে তিনি একজন বীর ও মহামান্য রাজা হিসাবে শ্রদ্ধেয়। সীতাদেবী তাদের কাছে সীতা আম্মা, অর্থাৎ সীতামা। রাবণের অশোকবনে কেমন ছিল তাঁর জীবন? শ্রীলঙ্কার মানুষজনের উদার আতিথেয়তা দেখে বলতেই পারা যায় খুব একটা খারাপ হওয়ার কথা নয় – এ সব ভাবতে ভাবতেই মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখি এক ‘জরুরি অবস্থা’। আমাদের ছোট্টো সুন্দর রথ, লাল বাসটি গিয়েছে খারাপ হয়ে। মনে হল, স্বয়ং সীতাদেবীও চান না আমি তার কাহিনির খোঁজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাই। আরও পড়ুন লঙ্কাকাণ্ড ৪ / আলোর শহর নুয়ারা এলিয়া যাই হোক, এ বার কী করা হবে? এই চিন্তায় যখন আমরা মশগুল, তখন আমাদের জানানো হল, এখানকার জন-পরিবহনে চাপিয়ে আমাদের পাঠানো হবে গ্রেগরি লেকে। সেখানে লেকটি উপভোগ করার ফাঁকে নতুন বাহন পৌঁছে যাবে আমাদের কাছে। ডাকা হল কয়েকটি অটো, যাকে এরা বলে টুকটুক। এই দেশে এই টুকটুকে পিছনে শুধু তিন জন বসতে পারে। সব সহযাত্রীর জায়গা হয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল একজন অতিরিক্ত। প্রস্তাব দিলাম, গাড়ির সামনে বসে চলে যাব এই ৫ কিলোমিটার। এই প্রস্তাবে একদম আকাশ থেকে পড়লেন ওখানে উপস্থিত শ্রীলঙ্কানরা। তাদের বুঝিয়ে বললাম, প্রতিনিয়ত অভ্যাস আছে এই গাড়িটির সামনে বসে যাতায়াত করার। কখনও বা আরও দু-তিনজন সহযাত্রীর সঙ্গে সামনের এই সিটটি শেয়ার করেও যেতে হয়। এ ভাবেই সবাইকে আশ্বস্ত করে উঠে পড়লাম টুকটুকে। টুকটুকের ড্রাইভার, আমাদের গাইড, সবার আচরণেই বোঝাই গেল, আমিই প্রথম ট্যুরিস্ট যে এই বাহনের সামনে বসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। টুকটুকের সামনে বসে শুরু হল যাত্রা। কলকাতায় সামনে বসে যাতায়াতের অভ্যাস থাকলেও এই পাহাড়ি পথে অটোর সামনে বসে যাত্রার মজাই ছিল আলাদা। একে এ দেশের নিয়ম অনুযায়ী গাড়ির গতিবেগ কম, তার উপর আমার সামনে বসার কারণে আরও  কমানো হল গাড়ির গতিবেগ। যাই হোক, পাহাড়ি পথে এই টুকটুক-যাত্রা ভীষণ ভালো লাগলেও মিনিট পনেরোর মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। এসে পৌঁছোলাম গ্রেগরি লেকের ধারে। গ্রেগরি লেকটি ইংরেজ আমলে নির্মিত এক ‘ম্যান-মেড’ লেক। পাহাড়ে ঘেরা এই লেকটিতে বোটিং করার সুব্যবস্থা রয়েছে। নানা রকমের বোট, যেমন স্পিড-বোট, ব্যানানা-বোট ইত্যাদি সাজানো থাকলেও, সেই সময় খালি মোটর-বোটে ঘোরার সুযোগ ছিল। ভাবলাম বোট থাক, তার চেয়ে ভালো হাঁটা। ইচ্ছে হোলো লেকের ধারের রাস্তাটি ধরে ধীর পায়ে হেঁটে যাই কিছুক্ষণ। জায়গাটির সৌন্দর্য ধরে রাখি ক্যামেরায়। বেরিয়ে পড়লাম লেক-সংলগ্ন পাহাড়ি রাস্তা ধরে। দূরে লেকের অন্য প্রান্তে দেখা যাচ্ছিল একটি হাউজবোট। সেটা সম্ভবত কোনো হোটেল বা কোনো নামী রেস্তোরাঁ। সেটিতে যেতে মনে হয় ব্যবহার করা হয় প্রাইভেট জেটি। পাহাড়-ঘেরা লেকটি এমনিতেই খুব সুন্দর, পাশাপাশি সুসজ্জিত লেকের পাড়ে নানা ধরনের গাছপালা আর সবুজ ঘাসজমি আরও বাড়িয়েছে সৌন্দর্য। আর একটু এগোতেই চোখে পড়ল কিছু কাঠের কুটির, মনে হোলো সেগুলিতে থাকার ব্যবস্থা আছে ভ্রমণকারীদের জন্য। ফেরার পথে রাস্তার ডানদিকে পড়ল একটি হিন্দু মন্দির, সম্ভবত গণেশদেবের। লেকের পারে এক চক্কর কেটে এসে বসলাম সেই জায়গায় যেখানে টুকটুকগুলো আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল। এখানে বসে নুয়ারা এলিয়া সম্পর্কে আরও একটু জানতে পারলাম। এই শহরটি প্রধানত ছিল ইংরেজদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর জায়গা। কিন্তু এখানকার পাহাড়ে চা চাষের সম্ভাবনা দেখতে পান ব্রিটিশরা। এখানে চিনাদের চা বাগান ছিল। চিনাদের কাছ থেকে সেই বাগান ব্রিটিশরা কিনে নেন ১৮২৪ সালে। সেটিই ছিল ইংরেজদের প্রথম চা বাগান। চা চাষ নিয়ে গবেষণা করার জন্য চা গাছ রোপণও করা হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য জেমস টেলর নামের এক ভদ্রলোকের নাম। ১৮৬৪ সাল নাগাদ তিনি এখানে চা উৎপাদনে আনেন এক নতুন দিশা। তাঁরই নেতৃত্বে এই দেশের চা পৌঁছে যায় সুদূর আমেরিকায়। জেমস টেলরকে এই দেশের চা চাষের জনকও বলা হয়ে থাকে। ইংরেজরা দক্ষিণ ভারত থেকে দক্ষ চাষি ও শ্রমিক নিয়ে আসেন চা চাষের জন্য। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ইংরেজ মালিকরা তাঁদের অনুগত ম্যানেজারদের হাতে তুলে দেন এই চা বাগানগুলির দায়িত্ব। তাই নুয়ারা এলিয়ার চা বাগানগুলির মালিক দক্ষিণ ভারতীয় তামিল অভিবাসীরা। নুয়ারা এলিয়ার গল্প যখন জোর কদমে চলছে তখনই অন্য একটি বাস নিয়ে হাজির আমাদের দক্ষ গাইড। তড়িঘড়ি বাসে উঠে রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্যর দিকে। আমরা এখন চলেছি নুয়ারা এলিয়ার কোনো চা বাগানে। সেখানে চা পান সহযোগে চলবে চা বাগান দর্শন। গ্রেগরি লেক পেরিয়ে আবার নুয়ারা এলিয়া শহরের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে এসে পৌঁছোলাম ব্লু ফিল্ড টি গার্ডেনে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ এক বিশাল ক্যাফেটেরিয়া, যেখানে আমাদের পরিবেশন করা হল উচ্চ মানের শ্রীলঙ্কান চা। স্বাদে-গন্ধে বেশ অন্য রকম লাগল এই চা। তাই দেরি না করে কয়েক প্যাকেট শ্রীলঙ্কান চা কিনেই ফেললাম, ফিরে এসে আত্মীয়, বন্ধুদের উপহার দেওয়ার জন্য।  চা পানের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হল নুয়ারা এলিয়ার পর্ব। পাহাড়ের কোল থেকে নেমে চললাম, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ক্যান্ডি। ক্যান্ডি শহরটি এই দেশের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই শহরের প্রধান আকর্ষণ টুথ রেলিক মন্দির, যার মধ্যে আছে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের দাঁত। এ ছাড়াও এই শহরটির গুরুত্ব শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে। এর প্রথম ঝলক দেখলাম সে দিনের লাঞ্চে। লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস রেস্তোরাঁয়। এক সুসজ্জিত অট্টালিকার ভেতরে এই রেস্তোরাঁ। এ দিনের মধ্যাহ্নভোজই ছিল আমাদের পুরো সফরে খাওয়ার সব চেয়ে অভিজাত ব্যবস্থা। জাপানিজ জাপানি পদ থেকে শ্রীলঙ্কার মাছ, সব মিলিয়ে মোট ৮৮টি পদ ছিল খাদ্য তালিকায়। এরই মাঝে পেয়ে গেলাম ভাজা স্কুইড। তবে নানা বর্ণের মিষ্টির পদগুলোও কম যায় না। দারুণ ভাবে মধ্যাহ্নভোজ উপভোগ করে এলাম বহুমূল্য পাথরের এক দোকানে — হান্দুনিস জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি। এ দেশের ইতিহাস ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে বহুমূল্য পাথরের অবদান অনেকখানি। এই বিশ্বে শ্রীলঙ্কার সব থেকে বেশি খ্যাতি নীলা উৎপাদনের জন্য। এখানকার নীলা একবাক্যে পৃথিবীসেরা। সুসজ্জিত দোকানটি তিন তলা বিশিষ্ট। দ্বিতীয় তলে ছিল এক সুসজ্জিত রত্ন প্রদর্শশালা। সেখানে প্রদর্শিত হয়েছে প্রকৃতি থেকে পাওয়া নানা রত্নের অপরিশোধিত রূপ। এরই মাঝে একটি ছোট্টো ঘরে এক ভিডিওর মাধ্যমে দেখানো হল খনি থেকে অপরিশোধিত রত্ন পাওয়ার পদ্ধতি। প্রদর্শশালা দর্শন শেষ করে এসে পৌঁছোলাম রত্ন বিক্রয় কেন্দ্রে। এ দেশের সব থেকে বেশি উল্লেখযোগ্য রত্ন গাঢ় নীল নীলা। যদিও নীলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে ভারতীয় বিশ্বাস, শনিদেবের অস্তিত্ব, তবু শ্রীলঙ্কার গাঢ় নীল নীলার মধ্যে মনে হল খোদিত আছে কত রহস্য, কত ইতিহাস, কত গভীর বিশ্বাস।  ]]>

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন