লঙ্কাকাণ্ড ১/ মাহা ওয়া নদীতে হাতির স্নানপর্ব

0
3852
সপ্তমী ঘোষ

‘আইবোয়ান’— নমস্কার-এর সিংহলিজ সংস্করণ। পা রাখলাম রাবণের রাজধানী লঙ্কায়। যদিও আগেই দেশটির গন্ধ পেয়েছি শ্রীলঙ্কান এয়ারওয়েজের বিমানে ছড়ানো সুগন্ধির মধ্যে। বিমানটি কলম্বোর বন্দরানাইকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন নামল তখন পাঁচটা বেজে গিয়েছে। ইমিগ্রেশন, মানি এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি সেরে যখন হোটেলের দিকে রওনা দিলাম তখন সূর্য গেছে ঢলে।

শ্রীলঙ্কার মাটিতে পা দেওয়ার পর থেকে ছায়াসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম এক অসাধারণ শ্রীলঙ্কান গাইডকে। তাঁর কাছেই জানতে পারলাম বন্দরানাইকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নেগম্বো শহরের কাছে অবস্থিত, কলম্বো শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। শহরে ঢুকতে লাগল মিনিট চল্লিশ।

বারজায়া হোটেল।

কলম্বো শহরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল বারজায়া হোটেলে। শহরের খানিকটা বাইরে, মাউন্ট লাভিনিয়ায় সমুদ্রের ধারে চারতারা এক হোটেল। হোটেল আর বিচের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে ট্রেনের লাইন। রাতের কন্টিনেন্টাল ডিনার সেরে ফেরার সময় দেখলাম একদল বিদেশি সুইমিং পুলের ধারে গান জমিয়েছে। প্রতিবেশী দেশের মাটিতে আরও দূরের এক দেশের সুরের মূর্ছনায় বুজে এল চোখ।

পরদিন ভোর হল পাশের সমুদ্র ও ঘনঘন ট্রেনের আওয়াজে। ছোট্টো চার কামরার ট্রেনগুলি বেশ ছিমছাম। তাড়াতাড়ি বেরোনোর তাড়ায় বিচে যাওয়ার সময় পাওয়া গেল না। শুধু আশ্বাস পেলাম শেষ দিনে ফিরব এখানেই।

সাতসকালেই রওনা দিলাম হাতি ও হাতির জন্য তৈরি পিন্নাওয়ালা অনাথালয় দেখার জন্য। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত এই পিন্নাওয়ালা অনাথালয়টি কলম্বো আর ক্যান্ডি শহর দু’টির মাঝে, সাবারাগামুভা অঞ্চলে অবস্থিত।

পথে যেতে যেতে আরও পরিচয় হল এই দেশটির সঙ্গে। প্রথমেই জানলাম হাতের চেটোর মতো দেখতে এই দেশটির নামের রহস্য। আমাদের মহাকাব্য রামায়ণে রাবণের ভূমির উল্লেখ আছে শুধুই লঙ্কা নামে। বৈদিক যুগে এই দেশটি শুধু লঙ্কা নামেই পরিচিত ছিল। লঙ্কা শব্দটি সম্ভবত তামিল শব্দ ‘ইলাঙ্কু’ থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘যা ঝলমল করে’। ‘লঙ্কা’ শব্দটি থেকে শ্রীলঙ্কা নামটি সোজা চলে আসেনি, বরং তার মাঝে কেটে গিয়েছে কয়েক শতক। এক সময়ে এই দ্বীপটির নাম হয় ‘তাম্বপন্নি’, এর অর্থ ‘লাল তামাটে হাত’ বা ‘লাল তামাটে মাটি’। সম্ভবত এই নামটি কিংবদন্তি রাজা বিজয়ের রাখা, তাঁর এই দ্বীপে আগমনের পর। কারণ তাঁর অনুগামীদের হাত এই দ্বীপভূমির লাল মাটির রঙে লাল হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী কালে এই ‘তাম্বপন্নি’ গ্রিক ভূগোলবিদদের হাতে পড়ে ‘তাপ্রবন’ হয়েছিল। ভারতের মতো এই দেশেও নানা সময়ে বিভিন্ন আরব ও ইউরোপীয়  ঔপনিবেশিকদের আগমন হয়েছে। তারাও নানা নামে ডেকেছে এই দেশটিকে। এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য ‘সিলোন’ নামটি, যা ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের দেওয়া। কিন্তু তারা এই নাম কোথা থেকে পেয়েছিল? ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা এখানে এসে এর নাম দেয় ‘সেইলাও’। সেই নাম থেকে ব্রিটিশদের নামকরণ ‘সিলোন’। ব্রিটিশ ক্রাউন কলোনি ১৯৪৮ সালে ‘ডোমিনিয়ন অব সিলোন’ নামে স্বাধীনতা পায়। ১৯৭২ সালে এই দেশটির আনুষ্ঠানিক নাম হয় ‘ফ্রি, সভ্‌রিন অ্যান্ড ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিপাবলিক অব শ্রীলঙ্কা’। তার পর থেকেই এই দেশটি শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত। শ্রীলঙ্কা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ সমৃদ্ধশালী ভূমি। সিংহলি ভাষায় শ্রী মানে সমৃদ্ধশালী, আর লঙ্কা শব্দটির অর্থ ভূমি।

মাহা ওয়া নদীতে স্নান করে ফিরছে হাতির দল।

শ্রীলঙ্কা নামের ইতিহাস শুনতে শুনতেই দেখি পেরিয়ে গিয়েছি শহরের সীমানা। রাস্তার দু’ধারে সবুজের সমারোহ দেখে মন গেল জুড়িয়ে। এই দেশের ট্র্যাফিক নিয়মাবলি বেশ কড়া, সাধারণ রাস্তায় ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতি নিষিদ্ধ। হাইওয়েতে ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। এই দেশে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ। ধীর, কিন্তু নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে প্রত্যেকটি গাড়ি। পথে পড়ল কাজুবাদামের গ্রাম, এ বারও আশ্বাস পেলাম ফেরার দিন সময় পাব এই গ্রামটি দেখার। আমাদের তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে হবে হাতির অনাথালয় পিন্নাওয়ালা-সংলগ্ন মাহা ওয়া নদীর ধারে। অনাথালয় থেকে হাতিদের রোজ এই নদীতে চান করাতে আনা হয়।

নানা পসরা নিয়ে রাস্তার ধারের দোকানগুলো।

রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে হাঁটা দিলাম নদীর ধারে। রাস্তার দু’ ধারে বিভিন্ন লোভনীয় পসরার দোকান। কিন্তু দোকানে সময় দেওয়ারও অনুমতি পাওয়া গেল না, হাতির চানের সময় হয়ে গিয়েছে যে। আমরা পৌঁছে দেখি একদল হাতি ইতিমধ্যেই নেমে গিয়েছে নদীতে। ভিড়ের মধ্যে কোনো মতে জায়গা করে কয়েকটা ছবি তুলতে না তুলতেই এই হাতির দলের চান শেষ হয়ে গেল। যে রাস্তা ধরে এসেছিলাম সেই রাস্তাটি খালি করে দিতে বলা হল, কারণ সেই রাস্তা ধরেই ফিরবে হাতির দল। হাতির দল নদী থেকে উঠতেই কিছু পর্যটক এগিয়ে দিলেন কলা, কেউ বা আপেল বা কমলালেবু। মহা আনন্দে শুঁড় দিয়ে সেই ফলগুলি তুলেও নিল হাতিগুলো। যে পথে এসেছিলাম সে পথ দিয়েই পিন্নাওয়ালা অনাথালয়ে হাতিগুলো ফিরে গেল। কিন্তু মন ভরল না, আর কিছুক্ষণ হাতিদের চান দেখতে পেলে ভালো হত।

নদী-সংলগ্ন হোটেলগুলির রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজন সারতে সারতে দেখা যায় হাতির স্নানপর্ব। আরও ভালো করে হাতির চান দেখার সব থেকে ভালো উপায় আগের দিন রাতে পিন্নাওয়ালা পৌঁছে নদীর পাশের হোটেলগুলির বারান্দায় কোনো টেবিলের দখল নিয়ে নেওয়া। যাই হোক, সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন ফেরার রাস্তা ধরব ভাবছি, এমন সময় খবর এল আর এক দল হাতি আসছে নদীতে।

দোকানে সাজানো হাতি।

হাতির পথ থেকে সরতে সরতেই চলে এল সেই দল, আগের চেয়ে কিছু ছোটো। দলটিতে ছোটো হাতির সংখ্যা আগেরটার থেকে বেশি। দর্শনার্থীর ভিড় কম, ফলে ভালো করে দেখা গেল হাতির চান। মিনিট পনেরো হাতির চান উপভোগ করে ঢুকে পড়লাম লোভনীয় দোকানগুলিতে। জামাকাপড়, জুতো, ব্যাগ ইত্যাদির সুন্দর সংগ্রহ থাকলেও সব থেকে বেশি আকর্ষণীয় ছিল নানা সাইজের হাতির মূর্তি। আমাদের অবশ্য জানানো হল, অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে দাম বেশি। তাই অগত্যা কিছু না কিনেই এগিয়ে গেলাম হাতির অনাথালয়ের দিকে।

১৯৭৫ সালে মোটে ৫টি পরিত্যক্ত হাতিকে নিয়ে এখানকার বন দফতর শুরু করে এই অনাথালয়টি। কারণ, চিড়িয়াখানায় জায়গা ছিল না এদের রাখার। শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতিতে হাতিকে সৌভাগ্যের প্রতীক মানা হয়। পিন্নাওয়ালায় হাতি অনাথালয়ে বড়ো যত্নে প্রতিপালন হয় এই হাতিদের। শ্রীলঙ্কার প্রধান উৎসবে যোগদান করানো হয় এদের। ক্যান্ডির এসাল্লাহ পেরেহেরা  বা দন্ত উৎসবে প্রয়োজন হয় এক বিশেষ ধরনের হাতির। সেই হাতিটিকে সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয় এখানে।

ভিলা পিন্নাওয়ালা রিসোর্ট।

এই  অনাথালয়ে হাতি প্রতিপালনের নানা ঝলক দেখতে দেখতে হঠাৎ উপলব্ধি হল পেটে ছুঁচোর দৌড় শুরু হয়ে গিয়েছে। লাঞ্চের জন্য এলাম ভিলা পিন্নাওয়ালা রিসোর্টের রেস্তোরাঁয়। ভিলা পিন্নাওয়ালা রিসোর্টের ছোট্টো সুন্দর রেস্তোরাঁটি সুইমিং পুলের ঠিক পাশেই। রোদের তেজটা বেশ প্রখর। খোলা ধানজমির পাশে রিসোর্ট-পুলের সৌন্দর্য ছিল এই দিনের মধ্যাহ্নভোজনের উপরি পাওনা। মেনুটা কন্টিনেন্টাল হলেও কিছু ঝলক পেলাম শ্রীলঙ্কান খাদ্যাভ্যাসের। যেমন সাউথ ইন্ডিয়ার মতো টকদই খাওয়ার অভ্যাস থাকলেও দেওয়া হয় মধুও, টকের সঙ্গে একটু মিষ্টতা যোগ করতে।

এক দুর্দান্ত মধ্যাহ্নভোজনের পর তৈরি হয়ে নিলাম লম্বা যাত্রার জন্য। আমাদের পরের গন্তব্য অনুরাধাপুর — শ্রীলঙ্কার অন্যতম পুরোনো শহর। নতুন শ্রীলঙ্কার অনেক কিছু দেখা বাকি থাকলেও পা বাড়ালাম শ্রীলঙ্কা ইতিহাসের দিকে, দেশের প্রাচীন রাজধানীর পথে।

(চলবে)

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here