লঙ্কাকাণ্ড ৭ / টুথ রেলিক মন্দির দর্শন করে সৈকতশহর বেনটোটায়

0
সপ্তমী ঘোষ

শ্রীলঙ্কার প্রত্যেকটি মন্দিরে ঢোকার শর্ত একটি – মেয়েদের পরতে হবে হাঁটুর নীচ অবধি পোশাক। প্রতি মন্দিরে ঢোকার আগে তাই রক্ষীরা বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখেন ব্যাপারটির দিকে। টুথ রেলিক মন্দিরে ঢোকার মুখে দেখি খুব যত্ন করে এক বিদেশিনির কোমরে ওড়না বেঁধে দিচ্ছেন এক মহিলা রক্ষী। যা-ই হোক, জটলা পেরিয়ে মন্দিরচত্বরে ঢুকতেই বুঝতে পারলাম আগের দিন রাতের অন্ধকারে যেটা আন্দাজ করা যায়নি সেটা হল ঠিক কতখানি প্রশস্ত পুরো মন্দিরচত্বর।

tooth relic temple, kandy
টুথ রেলিক মন্দির, ক্যান্ডি।

টুথ রেলিক মন্দিরটি কেবল শ্রীলঙ্কার ধর্মেরই এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, এটি এই দেশের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মন্দিরে ঢুকে প্রথমে চোখে পড়ল ডান দিকে এক মূর্তি, এই দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট গোপাল্বায়ার।

মন্দিরেচত্বরে এগোতে এগোতে পড়ল আরও কিছু মূর্তি, সম্ভবত তাদের সঙ্গে যুক্ত এ দেশের নানা ইতিহাস। সময় কম থাকায় এগিয়ে গেলাম মন্দিরের দিকে। বিশাল মন্দিরটির বাঁ পাশে জুতো খুলে উঠতে হয় ওপরে। এক সিংহদ্বারের মধ্যে দিয়ে ঢুকে কিছুটা উঠে প্রথমে এসে পড়লাম এক বিশাল প্রাসাদের মধ্যে।

রাজসভার মতো বিশাল এক ঘরের এক পাশ দিয়ে উঠে গিয়েছে সিঁড়ি, যার মধ্যে দিয়ে ঢুকে বুদ্ধের দাঁতের গর্ভগৃহে পৌঁছোনো যায়। উপরে উঠতে গেলে বলা হল আগে নীচের কিছু অংশ দেখে নিতে। গিয়ে পড়লাম সুসজ্জিত এক আঙিনায়। আঙিনাটির এক দিকে কয়েকটি মন্দির, হাতির দাঁত দিয়ে সজ্জিত করা। আঙিনার এক পাশে খুব সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল কিছু নাম-না-জানা ফুলের গাছ।

inner sanctorium of tooth relic temple
টুথ রেলিক মন্দিরের গর্ভগৃহ।

এর পর সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম টুথ রেলিক মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ বুদ্ধের দাঁতের গর্ভগৃহের সামনে। এই মন্দিরের দরজা খুলে দাঁতটিকে লোকসম্মুখে আনা হয় পাঁচ বছর অন্তর। এই সময় ভক্তরা প্রায় ৩-৪ দিন লাইনে দাড়িয়ে দর্শন পান এই মহাপবিত্র জিনিসটির। বুদ্ধের দাঁত শ্রীলঙ্কার এই মন্দিরে আসার ইতিহাস এ দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের পর এই পবিত্র দাঁতটির উত্তরাধিকারী ছিলেন কলিঙ্গের রাজা।

কোনো কারণে কলিঙ্গে বিদ্রোহ শুরু হলে বাবা রাজা গুহশিবের আদেশে কন্যা রাজকুমারী হেমামালি ও তাঁর স্বামী দান্থ এই দাঁতটি নিয়ে কোনো সুরক্ষিত স্থানে যাত্রা করেন। হেমামালি এই পবিত্র দাঁতটিকে তাঁর চুলের মধ্যে লুকিয়ে যাত্রা শুরু করেন। তাঁরা এসে পৌঁছোন লঙ্কাপত্তনা অর্থাৎ আজকের দিনের শ্রীলঙ্কার রাজা সিরিমেঘবন্নার রাজ্যে, যাঁর রাজধানী ছিল অনুরাধাপুর। সেই সময় শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মহারাজা সিরিমেঘবন্না খুব আনন্দিত হন স্বয়ং বুদ্ধের এই বিশেষ জিনিসটি পেয়ে। তিনি এই দাঁতটি স্থাপন করেন অনুরাধাপুরের মেঘাগিরি বিহারে। তার পর থেকে এই দাঁতটি রক্ষা করা এই দেশের প্রত্যেক রাজার বংশপরম্পরায় পাওয়া এক বিশেষ ধর্ম।

আরও পড়ুন: লঙ্কাকাণ্ড ৬ / যে শহরে ঐতিহ্য আর একুশ শতকের সহাবস্থান

ক্যান্ডির এই বিশাল টুথ রেলিক মন্দিরটি আসলে এই শহরের রাজপ্রাসাদ। এই দেশে পর্তুগিজদের আগমনের পর প্রতিটি রাজা এই পবিত্র জিনিসটিকে কখনও ডাম্বুলার গুহায়, কখনও বা রত্নপুরার ডেলগামুভা বিহারে লুকিয়ে রেখে এটিকে সযত্নে রক্ষা করে গিয়েছেন। ক্যান্ডি শহরে এই দাঁত রক্ষার জন্য প্রথম মন্দির স্থাপন করেন রাজা বিমলধর্মসুরিয়া। বর্তমান মন্দিরটি রাজা ভিরা নরেন্দ্র সিংহের গড়া, যদিও তাঁর পরবর্তী সময় অনেক পরিবর্তন হয়েছে এই মন্দিরটি। এই মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহটি বাইরে থেকে দেখতে অষ্টকোণী এক স্থাপত্য।

যদিও দাঁতের দর্শন পাওয়া যায় না, তা-ও মন্দিরের এই গর্ভগৃহের সামনে ভক্তের জনসমাগম কম নয়। পুরো মন্দিরটিতে গর্ভবতী মহিলাদের প্রাধান্য দেখে জিজ্ঞাসা করলাম তার কারণ। জানানো হল, সারা দেশ থেকে গর্ভবতী মহিলারা এখানে আসেন, যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে চলেছে, তার শুভকামনায় পুজো দেন এখানে। আর মানত করেন স্বাস্থ্যবান সন্তান হলে তাকে নিয়ে আসবেন এখানে। সন্তানের জন্মের পর প্রথমেই তাকে নিয়ে আসা হয় এখানে, তার পরে তার জন্মকে ঘিরে নানা উৎসব পালন করা হয়।

lines of earthen lamps
সারি সারি সাজানো প্রদীপ।

দেশের অন্য মন্দিরগুলির মতো এই মন্দিরটিতেও সাদা জামা পরিহিত ভক্তের সমাগমে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছিল পুরো পরিবেশটিতে, যদিও সময় ফুরিয়ে আসাতে এগিয়ে যেতে হল। এর পর নীচে নেমে আঙিনার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে এলাম এক বিশাল চত্বরে। পথে পড়ল এক বুদ্ধের বিশাল মন্দির, খোলা প্রাঙ্গণটির এক পাশে ছিল সারি সারি সাজানো প্রদীপের সমারোহ, এক পাশে মিউজিয়াম যার মধ্যে সম্ভবত ছিল এই মন্দির ও পুরো শহরের ইতিহাসের কিছু নিদর্শন। এই জায়গাটি থেকে পুরো এলাকার এক দারুন ছবি পাওয়া যাচ্ছিল। তাই তা ছেড়ে মিউজিয়াম পরিদর্শনে যাওয়ার ইছা আর হল না। অন্যদের মিউজিয়াম পরিদর্শন হয়ে গেলে অগত্যা উঠে পড়তে হল। যদিও শান্তস্নিগ্ধ এই জায়গাটির জন্য এক আত্মিক টান থেকে গেল।

বাইরে এসে জুতো পরে মন্দিরের আর-এক পাশ দিয়ে বের হওয়ার রাস্তা পাওয়া গেল। এখানে এসে দেখলাম দলের কয়েক জন আলাপ জমিয়েছে মালয়েশিয়া থেকে আসা কিছু পর্যটকের সঙ্গে। জানতে পারলাম কয়েক জন মাঝবয়সি ভদ্রমহিলার একটি দল এসেছেন এই দেশ পরিদর্শনে। বেশ হাসিখুশি এই ভদ্রমহিলাদের সঙ্গে কিছুটা গল্পগাছা করে এগিয়ে গেলাম আমাদের রথের দিকে। তাদের ভারতে আসার ইচ্ছা শুনে আনন্দিত হয়ে জানালাম, সে দেশে গেলে তাদের আতিথিয়তার কোনো কমতি রাখব না।

এ দিনের আমাদের গন্তব্য ছিল বেনটোটা। পাহাড়, ইতিহাসের পথ ছাড়িয়ে এ বার আমাদের যাত্রা সমুদ্রের দিকে। পথে যেতে যেতে কথা হচ্ছিল এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। জেনে কিছুটা হিংসা হল, কিছুটা ভালো লাগল। এই দেশেটির শিক্ষার খরচ বেশির ভাগটাই বহন করে সরকার। এই দেশের পথেঘাটে ছোটো ছোটো বাচ্চাদের দেখেছি সাদা স্কুলপোশাক পরে। এখন জানলাম সরকারি স্কুলের পোশাক হল সাদা। এই সব সরকারি স্কুল ছাড়াও কিছু প্রাইভেট স্কুল আছে। স্কুলপর্ব শেষ করার পর এদের ভর্তি হতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, যদিও সেখানে জায়গা পাওয়া খুব মুশকিল।

indradyumna beach resort, bentota
ইন্দ্রদ্যুম্ন বিচ রিসর্ট, বেনটোটা।

নানা দিক দেখতে দেখতে দেখলাম পেরিয়েছি শহরের সীমানা। বেনটোটা এখানকার খুব জনপ্রিয় জায়গা, সমুদ্র দেখার জন্য। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল ইন্দ্রদুম্ন বিচ রিসোর্টে। হোটেলে পৌঁছোনোর আগে এক জায়গায় নেমে লাঞ্চের ব্যবস্থা হল। এখানে প্রথম স্বাদ পেলাম সামুদ্রিক মাছের। এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ থাকায় অনেকের ভালো না লাগলেও ছিল অত্যন্ত উপাদেয়। প্রথম দর্শনে ইন্দ্রদ্যুম্ন বিচ রিসোর্টটি এক অন্য জগৎ। নেমেই লবির ও-পারে দেখলাম সমুদ্র এসে মিশে গিয়েছে হোটেলের সুইমিং পুলটিতে। যাত্রার এই অধ্যায়ে আর কী কী আশ্চর্য জিনিস দেখতে পাব ভাবতে ভাবতে পা বাড়ালাম সমুদ্রের দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.