লঙ্কাকাণ্ড ২ / অনুরাধাপুরের বোধিবৃক্ষটি বোধগয়ার সহোদরা

0
3866
সপ্তমী ঘোষ

হাতির রাজ্য থেকে যখন প্রবেশ করলাম শ্রীলঙ্কার পুরোনো রাজধানী অনুরাধাপুরে তখন সূর্য গেছে ঢলে। দেখতে বেশ ছিমছাম শহরটিতে কেমন যেন এক নস্টালজিক এক ছোঁয়া। সহযাত্রীদের আবদারের ঠেলায় কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হল ছোটো এক বাজারে।

অনুরাধাপুরে থাকার ব্যবস্থা ছিল মিরিদিয়া লেক রিসর্টে। তুলনামূলক ছোটো রিসেপশনের এয়ারকন্ডিশনড এলাকার বাইরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে পড়লাম বিশাল রিসর্ট এলাকায়। বিশাল বাগান আর সুইমিং পুলের মাঝ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে কাছের লেকটিতে। বাঁ পাশে বড়ো ভবন থাকার জন্য।

মিরিদিয়া লেক রিসর্ট সংলগ্ন লেকটির মতো অনুরাধাপুরে বিভিন্ন জায়গায় একাধিক লেকের দেখা পাওয়া যায়। দেশটির উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই শহরটি দেশের তুলনামূলক শুষ্ক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এই অঞ্চলে বছরে কেবল একটিবার বৃষ্টি হয় যা অতি প্রাচীন কাল থেকেই চাষবাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রতিকূল। তাই অতীতে এখানে গড়ে উঠেছিল দিঘিভিত্তিক সভ্যতা। জলের কমতির জন্য জায়গায় জায়গায় খনন করা হয় জলাশয়, যাতে বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে বছরের অন্যান্য সময় চাষবাস করা যায়।

শহরটি থেকে যখন রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল দেশের অন্য প্রান্তে, তখন এই দিঘিগুলি পড়ে রইল পরিত্যক্ত হয়ে। পরের দিকে এই দিঘিগুলি আবার চাষবাসের কাজে লাগানো হয়। অনুরাধাপুর শহরটির আশেপাশে ধান চাষের প্রাধান্য বেশি, যে হেতু এই দেশেরও প্রধান খাদ্য ভাত।

বাগানের পথ ধরে হাঁটা দিলাম লেকটির ধারে। সূর্যাস্তর পরের লাল আভায় ছোট্টো সুন্দর লেকটি লাগছিল বেশ মনোরম। কিন্তু ডাক পড়ল চেক ইনের জন্য। চেক ইন শেষ করতে করতে অন্ধকার নামল। অন্ধকারে ছোটো ছোটো আলোর মালায় সেজে উঠল সুইমিং পুল ও তার ধারের বাগানটি। রাতে সেই মনোরম পরিবেশটিকে অনেকক্ষণ উপভোগ করার ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। পরের দিন সক্কাল সক্কাল শুরু করতে হবে অনুরাধাপুরা ঘুরে দেখা। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষ করলাম সেই দিনটির অভিযান।

পর দিন সকালে প্রথম গন্তব্য ছিল বোধিবৃক্ষ ও বৌদ্ধস্তূপ। অনুরাধাপুরের বোধিবৃক্ষটি ভারতের মূল বোধিবৃক্ষের চারা থেকে উত্থিত। ২০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই গাছটির চারা ভারতের বোধগয়া থেকে এনেছিলেন রাজা অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা। ২৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা শ্রীলঙ্কায় আসেন বৌদ্ধধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে। সঙ্গে নিয়ে আসেন মুল বোধিবৃক্ষের এই চারা। সেই চারা থেকে জন্ম নেয় আজকের বিশাল বৃক্ষটি। পরে বোধগয়ার মুল বৃক্ষটি ধ্বংস হয়ে গেলে অনুরাধাপুরার বোধিবৃক্ষ থেকে চারা নিয়ে গিয়ে পুনরায় স্থাপিত করা হয় বোধগয়ায়। আজকের বোধগয়ার বোধিবৃক্ষটি সেই চারা থেকে বড়ো হওয়া গাছ। এ এক মজার কাহিনি। বলা যায় আজ আমরা বোধগয়ায় যে বোধিবৃক্ষ দেখতে পাই তা অনুরাধাপুরার বোধিবৃক্ষের সহোদরা।

মূল দরজা থেকে অনেকটা হেঁটে প্রবেশ করলাম মূল মন্দিরচত্বরে। বোধিবৃক্ষটির অবস্থান মাটি থেকে অনেকটাই উপরে। কিছুটা উঠে বৃক্ষটিকে ঘিরে রয়েছে প্রার্থনাস্থল। কিন্তু মূল বৃক্ষটির কাছে পৌঁছোনোর জন্য উঠতে হবে আরও কিছুটা। সেখানে প্রবেশ করতে পারেন শুধুমাত্র মন্দিরের মূল পূজারিরা।

নীচে শান্ত মন্দিরের প্রাঙ্গণে অনুভব করলাম এক অপার পবিত্রতা। মন্দিরের চত্বরে লোক কম নয়, তা-ও ছিল এক অপার শান্তির অনুভব। মন্দিরচত্বরে সবাইকে সাদা পোশাকে দেখে জানতে পারলাম শ্রীলঙ্কাবাসীরা মন্দিরে সাদা পোশাকে আসতে পছন্দ করেন, যে হেতু তা শান্তি ও পবিত্রতার প্রতীক।

গান গেয়ে এই মন্দিরচত্বর পরিক্রমা করছিলেন গেরুরা পোশাকের একদল অল্পবয়সি সাধক, হাতে এক গেরুয়া লম্বা চাদর। কয়েক বার পরিক্রমার পর তাঁরা মন্দিরে উঠে চাদরটি হাতে দিলেন পুরোহিতের, যা জড়িয়ে দেওয়া হল বোধিবৃক্ষের গায়ে। আমাদের গাইডের কাছে জানতে পারলাম এই ঘটনাটি খুব বিরল। কোনো বিশেষ বাসনা নিয়ে এই অল্পবয়সি সাধকবর্গ এসেছেন এই মন্দিরে, খুব সম্ভবত কোনো নতুন মন্দির স্থাপনের বাসনায়।

এই সুযোগে বোধিবৃক্ষটিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। গাছটির কয়েকটি ডাল সোনায় বাঁধানো। জানতে পারলাম ওই ডালগুলিই হল মূল গাছটির অংশ, যা ভারত থেকে আনা হয়েছিল।

বোধিবৃক্ষ সংলগ্ন অঞ্চলটি ঘুরে দেখে রওনা দিলাম বৌদ্ধস্তূপের দিকে। বোধিবৃক্ষ অঞ্চলটি থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত এই স্তূপটির দিকে যেতে ডান দিকে দেখতে পেলাম প্রাগৈতিহাসিক শহরটির নিদর্শন। প্রথমেই চোখে পড়ল দ্বিতল এক ইমারতের ধ্বংসাবশেষ। ইমারতের সামনে পাথরের কয়েকটি স্তম্ভ। পূর্বে এই ইমারতটি ছিল এক বহুতল অট্টালিকা, যার সামনের স্তম্ভগুলি দিয়ে ঘেরা জায়গাটি ব্যবহৃত হত ঘোড়া বা বাহনপশুর জন্য। জেনে বেশ মজা লাগল, আজকের দিনের বহুতলের নীচের তলায় গাড়ি রাখার চলের সূত্রপাত তা হলে হাজার দুয়েক বছর আগেই হয়েছে। নীচের তলে বসবাস না থাকায় বহুতলটি বন্যা, ভূমিকম্প, প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও ছিল সুরক্ষিত।

বাঁধানো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলাম স্তূপের দিকে। বিশালাকৃতি এই বৌদ্ধস্তূপটি অবস্থিত পুরোনো শহরের হাসপাতালটির উলটো দিকে। বর্তমানে যে বৌদ্ধস্তূপটি দেখতে পেলাম তা অনুরাধাপুরের আগেকার বৌদ্ধস্তূপ নয়। কারণ আদি বৌদ্ধস্তূপটি ধ্বংসের পরে পুনর্নির্মাণ করা হয় আজকের স্তূপটি, যদিও আসল স্তূপটির কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় এখুনও। স্তূপটির কাছে গিয়ে আর এক স্থাপত্য-প্রতিভার নিদর্শন পেলাম। স্তূপের একেবারে তলা থেকে গোলাকৃতি স্থাপত্যটির উপরে তাকালে স্তূপের মাথা দেখা যায় না। যত দূরে সরে আসা যায় তত ধীরে ধীরে দেখতে পাওয়া যায় এর মাথা। এই স্তূপটি পরিক্রমা করতে হলে সব সময় স্তূপটিকে ডান দিকে রেখে পরিক্রমা করতে হবে, তাই অর্ধ পরিক্রমা করা সম্ভভ নয় কোনোমতেই।

চটজলদি স্তূপের পরিক্রমা সেরে এগিয়ে গেলাম স্তূপটিতে অবস্থিত মন্দিরটির দিকে। বৌদ্ধস্তূপের প্রাঙ্গণে বৌদ্ধমন্দিরটিতে বুদ্ধের দুরকম মূর্তি রয়েছে, তার মধ্যে একটি ‘স্লিপিং বুদ্ধা’। বুদ্ধের শয়নরত মূর্তি দুটি ক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে, হয় বিশ্রাম, নয় মৃত্যু। মন্দির থেকে বেরিয়ে ডান দিকে দেখতে পেলাম, এই স্তূপটির প্রাচীন অভিজ্ঞানটি, যা এক সময় স্তূপের মাথায় বিরাজ করত।

বৌদ্ধস্তূপ দেখে বেরোনোর সময় আর একটু ভালো ভাবে দেখার চেষ্টা করলাম অতি প্রাচীন হাসপাতালটিকে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দেখা গেল পুরোনো বহিরাঙ্গন, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হত। একটু এগিয়ে যেতে দেখা মিলল একটি পাথরের কাঠামোর, যার ভিতরে মানুষের শোয়ার জন্য একটি গর্ত খনন করা আছে। জানতে পারলাম এটির ভিতরে মানুষদের শোয়ানোর পর তাদের শরীরে আয়ুর্বেদিক তেল মাখিয়ে চলত চিকিৎসা। প্রাচীনকালের মানুষজনও তবে বঞ্চিত হননি আধুনিক স্পা চিকিৎসার ব্যবস্থা থেকে।

বোধিবৃক্ষ ও বৌদ্ধস্তূপ দেখে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করলাম গাড়ির দিকে। কারণ বিশাল আয়তনের এই ধর্মস্থানটি পুরোটাই ঘুরে দেখতে হয় খালি পায়ে। ফেরার পথে লক্ষ করলাম মন্দিরে পুজো দিতে আসা ভক্তদের দিকে। সাদা পোশাকে আসা ভক্তদের বেশির ভাগের হাতেই স্টিলের থালা আর তাতে বুদ্ধের চরণে দেওয়ার জন্য নানা রঙের পদ্মফুল। জেনে বড়ো হিংসা হল, সপ্তাহান্তে ছুটি ছাড়াও শ্রীলঙ্কাবাসীরা ছুটি পায় প্রত্যেক পূর্ণিমায় -– এমনকি পূর্ণিমা যদি শনিবার বা রবিবার পড়ে তখন সোমবার থাকে ছুটি। এই প্রথম মনে হল, থেকে যাই এই ছোট্টো, সুন্দর, শান্ত দেশটিতে, যা বছরের বারো মাসই সবুজ, সুন্দর।

(চলবে)

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here