Connect with us

দূরে কোথাও

শীতের ভ্রমণ ৮ / অন্ধ্র ঘুরে তেলঙ্গানায়

উপকূল অন্ধ্র ঘোরার আদর্শ সময় শীতকাল। প্রচণ্ড শীতে কাবু হওয়ার আশঙ্কা নেই। শীতটা বেশ উপভোগ করবেন। তার পর তেলঙ্গানায়। সেখানেও শীত বেশ আনন্দ দেবে। তা হলে দেরি কেন, প্ল্যান করে ফেলুন।

রাজামুন্দ্রিবিজয়ওয়াড়ানাগার্জুনসাগরহায়দরাবাদ

করোমণ্ডল এক্সপ্রেস দুপুর ২.৫০এ হাওড়া ছেড়ে রাজামুন্দ্রি পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৭টায়। যশোবন্তপুর এক্সপ্রেস রাত ৮.৩৫এ ছেড়ে রাজামুন্দ্রি পৌঁছোয় পরের দিন দুপুর ১.৪৮এ। মাদ্রাজ মেল রাত ১১.৪৫এ ছেড়ে রাজামুন্দ্রি পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৫.২৯এ। হাওড়া থেকে রাজামুন্দ্রি যাওয়ার সাপ্তাহিক, দ্বিসাপ্তাহিক ট্রেনও আছে। চেন্নাই থেকে ট্রেনে রাজামুন্দ্রি ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টার পথ। দিনে দিনে যেমন পৌঁছোনো যায়, তেমনি রাতের ট্রেন ধরে পরের দিন সকালেও পৌঁছোনো যায়। মুম্বই থেকে ২৫ ঘণ্টা সময় লাগে। দৈনিক দুটি ট্রেন একটি সকাল ৮টা নাগাদ, অন্যটি বিকেল ৪.৩০তে রাজামুন্দ্রি পৌঁছোয়। দিল্লি নিজামুদ্দিন থেকে রাত ১১টায় ছেড়ে দক্ষিণ এক্সপ্রেস তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে ৯টায় রাজামুন্দ্রি পৌঁছোয়।

godavari bridge in rajahmundry

রাজামুন্দ্রিতে গোদাবরীর উপর সেতু।

প্রথম থেকে তৃতীয় দিন – রাত্রিবাস রাজামুন্দ্রিরাজামুন্দ্রিতে কী দেখবেন

গোদাবরী তীরে রাজামুন্দ্রি। সাগর-অভিমুখী নদী এখানে ৫ কিমি প্রশস্ত। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলসড়ক সেতু এখানে।

() গোদাবরী তীরে পুষ্করঘাট। ১২ বছর অন্তর ১২ দিনের পুষ্করতীর্থম তথা দক্ষিণের কুম্ভমেলা বসে এখানে। ঘাটে নানা দেবদেবীর মন্দির, দুর্গাই মুখ্য

() গোদাবরী কিনারে মার্কণ্ডেয় স্বামী মন্দিরে হরপার্বতী, নারায়ণ ও সূর্য দেবতা।

() দুকিমি দূরে কোটিলিঙ্গেশ্বরে লিঙ্গরূপী মহাদেব।

() দুএকর এলাকা জুড়ে ইস্কন মন্দির

popikondalu boat cruise

গোদাবরীতে জলযাত্রা।

() অন্ধ্র পর্যটন আয়োজিত গোদাবরী বরাবর সারা দিনের ক্রুজে বেরিয়ে পড়ুন। উপভোগ করুন পপিকোন্ডালু পাহাড়শ্রেণির সৌন্দর্য। দেখে নিন নানা মন্দির। প্রাতরাশ, মধ্যাহ্নভোজ বোটেই।

() চলুন ৬৫ কিমি দূরে কাকিনাড়া সৈকত। দেখে নিন কাকিনাড়া শহর থেকে ১৭ কিমি দূরের কোরিঙ্গা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি

kanakdurga temple, vijayawada

কনকদুর্গা মন্দির, বিজয়ওয়াড়া।

চতুর্থ দিন থেকে ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস বিজয়ওয়াড়া

চতুর্থ দিন সকালে রাজামুন্দ্রি থেকে বিজয়ওয়াড়া চলে আসুন ট্রেনে, ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা।

বিজয়ওয়াড়ায় কী দেখবেন

কৃষ্ণার তীরে বিজয়ওয়াড়া। এখানেই প্রকাশম ব্যারাজ।

() বিজয়ওয়াড়া শহরে দেখুন ইন্দ্রকিলাদ্রি পাহাড়ে কনকদুর্গা মন্দির। মন্দিরের পথেই পাহাড় কেটে ১৭ শতকে কুতবশাহী মন্ত্রীদের গড়া আক্কান্না ও মাডান্না গুহা। অদূরে আরও এক গুহায় ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ্বর। বন্দর রোডে ভিক্টোরিয়া জুবিলি মিউজিয়াম। কৃষ্ণার পাড়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাজীব গান্ধী পার্ক। দেখে নিন গান্ধী হিল

() ৫ কিমি দূরে মোগলরাজাপুরমে রাজা মাধববর্মার (৪৬২৫০২ খ্রিঃ) গড়া তিনটি গুহামন্দিরundavalli caves () প্রকাশম ব্যারাজ পেরিয়ে ৮ কিমি দূরে সাত শতকের গ্রানাইট পাহাড় ঢালে পাঁচ ধাপে উন্ডাভল্লি গুহা। পাথর কেটে তৈরি স্থাপত্য, পল্লব শৈলীর অপূর্ব নিদর্শন অনন্তশয়ান বিষ্ণুর মনোলিথিক মূর্তি। অনেকে একে বুদ্ধও বলে থাকেন। রয়েছে জৈন মন্দির

() ১২ কিমি দূরে মঙ্গলাগিরি, ভারতের যে আটটি জায়গায় বিষ্ণু নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন তাদের অন্যতম এই মঙ্গলাগিরি। এখানে তিনটি নরসিং মন্দির আছে। পাহাড়চুড়োয় গন্ডালা নরসিংহ স্বামী মন্দির, ওই পাহাড়ে পনাকালা নরসিংহ স্বামী মন্দির এবং পাহাড়ের পাদদেশে লক্ষ্মী নরসিংহ স্বামী মন্দির। পাহাড়ের গড়নটি হাতির মতো। মন্দিরের যাওয়ার জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যে সিঁড়ি আছে, সেই সিঁড়ির ডান দিকে বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের একটি শিলালিপি আছে। আর একটু ওঠার পর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের পায়ের ছাপ আছে।

dhyanabuddha statue, amaravathi

ধ্যানবুদ্ধ, অমরাবতী।

() মঙ্গলাগিরি থেকে ৩৮ কিমি এবং বিজয়ওয়াড়া থেকে ৪২ কিমি দূরে অমরাবতী। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তৈরি বৌদ্ধদের মহাচৈত্যের জন্য খ্যাতি অমরাবতীর। এখানে যে স্তূপ ছিল তা সাঁচির চেয়েও বড়ো ছিল। রয়েছে ধ্যানবুদ্ধ, মিউজিয়াম আর কৃষ্ণা নদীর পাড়ে অমরেশ্বর শিব মন্দির। অন্ধ্রের রাজধানী তৈরি হচ্ছে এই অমরাবতীতেই।

() বিজয়ওয়াড়াহায়দরাবাদ পথে ১৬ কিমি দূরে কোন্ডাপল্লি, খ্যাতি কাঠের পুতুলের জন্য। রয়েছে পাহাড় শিরে নায়ক রাজাদের তৈরি ১৪ শতকের দুর্গ। গাড়ি চলে যায় দুর্গ পর্যন্ত।

artisan busy in toy making

কোন্ডাপল্লির ব্যস্ত শিল্পী।

() বিজয়ওয়াড়া থেকে ৪৬ কিমি দূরে কুচিপুড়ি নাচের স্রষ্টা সিদ্ধেন্দ্র যোগীর জন্মভূমি কুচিপুড়ি গ্রাম

() কুচিপুড়ি থেকে ৪১ কিমি, বিজয়ওয়াড়া থেকে ৮১ কিমি দূরে মাগিনাপুড়ি সৈকত

সপ্তম ও অষ্টম দিন – রাত্রিবাস নাগার্জুন সাগর

সপ্তম দিন সকালে রওনা হয়ে যান নাগার্জুন সাগর। বিজয়ওয়াড়া থেকে বাসে চলে আসুন নাগার্জুন সাগর, ১৯০ কিমি। ঘণ্টা পাঁচেকের পথ। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন।

ওই দিন বিকেলে দেখে নিন ১১ কিমি দূরের ইথিপোথালা জলপ্রপাত

ethipothala falls

ইথিপোথালা ফলস্‌।

পরের দিন চলুন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক নাগার্জুন সাগর দেখতে। নাগার্জুন সাগরে ১১ কিমি জলযাত্রা করে দেখে নিন অতীতের নানা নিদর্শন সম্ভার নিয়ে নাগার্জুনকোন্ডায় গড়ে ওঠা মিউজিয়াম। নাগার্জুনকোন্ডা ছিল বিজয়পুরী, সাতবাহন রাজাদের রাজধানী। প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগেকার নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়েছিল নাগার্জুনকোন্ডা, বৌদ্ধ আচার্য নাগার্জুনের নামে যার নাম। ১৯৫৫য় কৃষ্ণা নদীতে বিশ্বের অন্যতম উঁচু বাঁধ তৈরির সময় জীবন্ত প্রত্নশালার ঘটে। কিন্তু সেই সব পুরা নিদর্শন নিয়ে নাগার্জুনকোন্ডায় তৈরি হয়েছে মিউজিয়াম। সেই দিনই দেখুন অনুপু গ্রামে ওপেন এয়ার মিউজিয়াম। সেই সময়কার অ্যাম্ফিথিয়েটার, হারিতি মন্দির, মঠ, চৈত্য ইত্যাদি নিয়ে গড়া।

hussain sagar, hyderabad

হুসেন সাগর, হায়দরাবাদ।

নবম, দশম ও একাদশ দিন – রাত্রিবাস হায়দরাবাদ

নবম দিন সকালেই বেরিয়ে পড়ুন হায়দরাবাদের পথে, দূরত্ব ১৫০ কিমি। বাসে ঘণ্টা চারেকের পথ। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন।

আরও পড়ুন শীতের ভ্রমণ ৭ / উপকূল অন্ধ্র ঘুরে ছত্তীসগঢ়ের অন্দরে

 হায়দরাবাদে কী দেখবেন

() হুসেন সাগর। এর পাড়ে ৩৪ একর ব্যাপ্ত ফাইবার গ্লাসে তৈরি নানা সম্ভারের এনটিআর গার্ডেন

() হুসেন সাগর লেকের নিজামিয়া অবজারভেটরিতে বুদ্ধপূর্ণিমা কমপ্লেক্স তথা লুম্বিনী পার্ক। লেকের মধ্যমণি রক অব জিব্রাল্টারে ভগবান বুদ্ধের মনোলিথিক মূর্তি। ফেরি নৌকায় পারাপার।

() কাছেই নওবত পাহাড়ে খাজুরাহো ও বোধগয়ার শৈলীতে বিড়লাদের তৈরি শ্বেত মর্মরের শ্রী বেঙ্কটশ্বর স্বামীর মন্দির। নওবত পাহাড় থেকে হুসেন সাগরের দৃশ্য নয়নাভিরাম।

() মুসি নদীর দক্ষিণ পাড়ে সালার জং মিউজিয়াম অবশ্য দ্রষ্টব্য।

charminar, hyderabad

চারমিনার, হায়দরাবাদ।

() সালার জং থেকে বাজারমুখী পথে হলুদ রঙা চারমিনার

() চারমিনারের পশ্চিমে হায়দরাবাদের পুরোনো লাডবাজার

() চারমিনারের অদূরে দক্ষিণ পশ্চিমে দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম মসজিদ মক্কা মসজিদ

() চারমিনার থেকে আড়াই কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে ২০ কিমি ব্যাপ্ত কৃত্রিম লেক মীর আলম ট্যাঙ্ক। এরই অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছে নেহরু জুলজিক্যাল পার্ক তথা চিড়িয়াখানা

() নিজামদের বাসস্থান চৌমহল্লা প্রাসাদ

(১০) গোলকুণ্ডা দুর্গ ও সন্ধ্যায় অমিতাভ বচ্চনের গ্রন্থনায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো

(১১) দুর্গের এক কিমি উত্তরে ফুলবাগিচায় ঘেরা কুতবশাহী সমাধি

(১২) দুর্গ থেকে ২ কিমি দূরে তারামতী বরাদরি। শেষ কুতবশাহীর শিক্ষয়িত্রী তারামতীর নাচগানের আসর বসত।

(১৩) গোলকুণ্ডা থেকে তিন কিমি উত্তরে দুর্গম চেরুভু, চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা প্রকৃতিদত্ত লেক চেরুভু অর্থাৎ গুপ্ত লেক

(১৪) দুর্গের মক্কা দরজা দিয়ে বেরিয়ে ডাইনে এগোতেই ওসমান সাগর। লেক ও বাগিচা

(১৫) রামোজি ফিল্ম সিটি

ramoji film city

রামোজি ফিল্ম সিটি।

দ্বাদশ দিন – ঘরে ফেরা।

ট্রেনে বা বিমানে ফিরে আসুন নিজের শহরে।

কোথায় থাকবেন

() বিজয়ওয়াড়াতে পাবেন অন্ধ্র পর্যটনের হোটেল। তবে সেখানে না থেকে থাকুন কৃষ্ণা নদীর বুকে ভবানী দ্বীপে। এখানেও অন্ধ্র পর্যটনের রিসর্ট আছে। বিজয়ওয়াড়া থেকে লঞ্চে নদী পেরিয়েই ভবানী দ্বীপ। অনলাইন বুকিং www.aptdc.gov.in

bhavani island resort

ভবানী দ্বীপে রিসর্ট।

() নাগার্জুন সাগরে থাকুন নাগার্জুন সাগর হিল কলোনিতে তেলঙ্গানা পর্যটনের হারিথা বিজয় বিহার হোটেলে। অনলাইন বুকিং www.telanganatourism.gov.in

() হায়দরাবাদে থাকার জন্য তেলঙ্গানা পর্যটনের দুটি হোটেল আছে। একটি বেগমপেটে হোটেল দ্য প্লাজা, তুলনায় দামি। অন্যটি গোলকুণ্ডা দুর্গের কাছে ইব্রাহিমবাগে তারামতী বরাদরি। অনলাইন বুকিং www.telanganatourism.gov.in

() সব জায়গাতেই বেসরকারি হোটেল আছে। রাজামুন্দ্রিতে বেসরকারি হোটেলেই থাকতে হবে। make my trip, goibibo, yatra.com, triviago.in ইত্যাদির মতো ওয়েবসাইটগুলিতে বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাবেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

() রাজামুন্দ্রি পৌঁছে প্রথম দিন স্থানীয় যান ভাড়া করে দেখে নিন স্থানীয় দ্রষ্টব্য। দ্বিতীয় দিন করুন বোট ক্রুজ। তৃতীয় দিন রাজামুন্দ্রি থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসুন কাকিনাড়া।

() রাজামুন্দ্রিতে অন্ধ্র পর্যটনের বোট ক্রুজের জন্য অনলাইন বুকিং করুন www.aptdc.gov.in

() বিজয়ওয়াড়ায় অবস্থানকালে প্রথম দিন অটো ভাড়া করে স্থানীয় দ্রষ্টব্য দেখে নিন। দ্বিতীয় দিন গাড়ি ভাড়া করে চলুন উন্ডাভল্লি, অমরাবতী ও মঙ্গলগিরি। তৃতীয় দিন সকালে গাড়ি ভাড়া করে চলুন কোন্ডাপল্লি। বিজয়ওয়াড়া ফিরে চলুন কুচিপুড়ি ও মাগিনাপুড়ি। পথে দুপুরের খাওয়া সেরে নিন।

nagarjunakonda

নাগার্জুনকোন্ডা।

() নাগার্জুন সাগরে স্থানীয় যান ভাড়া করে দেখে নিন ইথিপোথালা জলপ্রপাত ও অনুপু গ্রাম। আর নাগার্জুন সাগরের জেটিঘাট থেকে লঞ্চে চলুন নাগার্জুন পাহাড়ে মিউজিয়াম দেখতে।

() হায়দরাবাদে স্থানীয় যান ভাড়া করে ঘুরে নিন। প্রথম দু’ দিন হায়দরাবাদ শহরের দ্রষ্টব্য দেখে নিন। তৃতীয় দিন দেখে আসুন রামোজি ফিল্ম সিটি। বিশদ বিবরণ ও অনলাইন বুকিং-এর জন্য দেখুন ওয়েবসাইট www.ramojifilmcity.com । 

মনে রাখবেন

() ট্রেনের যাবতীয় খবরের জন্য দেখুন erail.in

(২) বিমানের খোঁজ পাবেন make my trip, goibibo, yatra.com, triviago.in ইত্যাদির মতো ওয়েবসাইটগুলি থেকে।

(৩) বিজয়ওয়াড়া স্টেশন থেকে অটোয় চার কিমি দূরের বার্ম পার্কে অন্ধ্র পর্যটনের চত্বরে চলে আসুন। এখানে থাকতে পারেন অথবা কৃষ্ণা নদী পেরিয়ে ভবানী দ্বীপে থাকতে পারেন। ভবানী দ্বীপে বুকিং থাকলে অন্ধ্র পর্যটনের লঞ্চ আপনাকে সেখানে পৌঁছে দেবে। প্রয়োজনে যতবার খুশি আপনি নিখরচায় নদী পারাপার করতে পারেন।

(৪) ভবানী দ্বীপে অন্ধ্র পর্যটনের হারিথা রিসর্টের ম্যানেজারকে বলে রাখলে গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যায়।

(৫) নাগার্জুন সাগরের জেটিঘাট থেকে লঞ্চে নাগার্জুন পাহাড় ৪০৪৫ মিনিটের জলযাত্রা। যাওয়াআসার টিকিট এক সঙ্গে কাটতে হয়। প্রথমে জেটিঘাটে এসে লঞ্চের সময় দেখে নিয়ে অনুপু ঘুরে আসবেন। অনেক সময় পর্যটকের অভাবে সকালের দিকে লঞ্চের ট্রিপ বাতিল করা হয়। সে ক্ষেত্রে আগেই অনুপু ঘুরে আসবেন। তা না হলে নাগার্জুন পাহাড় ঘুরে এসে অনুপু যাবেন।

(৬) নাগার্জুনকোন্ডার মিউজিয়াম সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা। শুক্রবার বন্ধ। নাগার্জুনকোন্ডা থেকে শেষ লঞ্চ ছাড়ে বিকেল সাড়ে ৪টেয়। জেটিঘাটে লঞ্চের সময় চেক করে নেবেন।

(৭) শুক্রবার ও ছুটির দিন ছাড়া সালার জং মিউজিয়াম ১০৫টা খোলা।

(৮) গোলকুণ্ডা দুর্গে এমন সময়ে আসবেন যাতে বেশি ক্ষণ অপেক্ষা না করে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখে নিতে পারেন।

hyderabadi biryani

হায়দরাবাদী বিরিয়ানি

(৯) হায়দরাবাদে  বিরিয়ানির স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

(১০) তেলঙ্গানা পর্যটন এক দিনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে হায়দরাবাদ ঘোরায়। বিশদ বিবরণ ও অনলাইন বুকিং-এর জন্য দেখুন ওয়েবসাইট www.telanganatourism.gov.in । তবে এতে মন ভরে না। 

 

 

 

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: শেষ পর্ব/ দুর্যোগ কাটিয়ে ঘরে ফেরা

manas sarovar

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম নাজাং-এর উদ্দেশে। সবার মুখ থমথমে। লিয়াজঁ অফিসারদের খুব চিন্তাগ্রস্ত লাগছে। কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে কনকনে হাওয়া। চারিদিক থেকে ধসের খবর আসছে। দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না। বৃষ্টির মধ্যেই কালী নদীকে বাঁ হাতে রেখে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কোথাও কোথাও রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঘষে কোনো রকমে যাওয়া যায়। ঝুরঝুরে আলগা মাটি। একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদ। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরাগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

টানা দু’ দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ের চিত্র পুরো বদলে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মীরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। কখনও নদীর পাড়, তো কখনও পাহাড়ের চুড়ো – এ ভাবেই চড়াই-উতরাই ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি। বৃষ্টির জল পেয়ে কালী নদী ফুঁসছে। মনে হচ্ছে চার দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। ঝরনার জলে আমরা সবাই ভিজে গিয়েছি। আমাদের যাওয়ার রাস্তা অবিরাম পরিষ্কার করে চলেছে বুলডোজার, কিন্তু ধসের বিরাম নেই। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অসম লড়াই। কোনো কোনো রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। বৃষ্টির জন্য পা প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছি। মুখে ঈশ্বরের নাম।

১৯৯৮ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে সব কৈলাসযাত্রী মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতে মালপায় স্মারক।

এ ভাবেই ১০টা নাগাদ মালপায় এলাম। প্রাতরাশের জন্য পথ চলার সাময়িক বিরতি এখানে। ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট শেষ রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মালপা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাসযাত্রী। তাঁরা ছিলেন ১৩ নম্বর ব্যাচের যাত্রী। কী অদ্ভুত সমাপতন! আজও ১৭ আগস্ট এবং আমরাও ১৩ নম্বর ব্যাচ। জানি না, পরমেশ্বর আমাদের কপালে কী রেখেছেন? পুরো যাত্রা এত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এ কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেললেন আমাদের তিনি?

প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে ছাতা, পাশে গণেশ। কোনো কোনো ঘাসের ঝাড় ধরে ঝুলে নামা। নীচে কোথায় পা দেব, বুঝে উঠতে পাচ্ছি না, এত খাড়া পাহাড়ের গা। নীচে থেকে গণেশ হাতে ধরে পা বসিয়ে দিচ্ছে। ঘাসের গোড়া বা গাছের শিকড় মুঠিতে চেপে ধরে, বুক-পেট পাহাড়ের গায়ে লাগিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। বর্ষার পর এ পথে আমরাই প্রথম। এ ভাবেই সেই ৪৪৪৪ সিঁড়িওয়ালা পাহাড় অতিক্রম করলাম। সামনে আরও একটা বড়ো পাহাড়। সেই পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামলেই নাজাং, যেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে।

লেখকের পথের সাথি গণেশ।

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই পা পিছলে যাচ্ছে। যেখানেই থমকে যাচ্ছি, গণেশ এসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরা না থাকলে এতক্ষণে আমাদের চলে যেতে হত কালী নদীতে। কালী নদীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না, এখন তার রূপ এতটাই ভয়াল। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছোলাম।

এ বার নীচে নামার পালা। এ দিকের রাস্তা আরও খারাপ। কোনো কোনো জায়গায় সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে নামতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় হামাগুড়ি। সারা গা কাদায় মাখামাখি। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টির দিনে এ ভাবেই কাদা মেখে ফুটবল খেলতাম। আর আজ? প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াই। অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফেরার লড়াই। কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে গণেশও হাত ধরতে পারছে না। হাত ধরতে গেলেই দু’ জনেরই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, পা আর চলছে না। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে একটা সময় দেখলাম নাজাং-এ এসে গিয়েছি। নীচে নেমে শুয়ে পড়ে পাহাড়কে প্রণাম করলাম।

মনে একরাশ আনন্দ। হ্যাঁ, পেরেছি – হেঁটে কৈলাস-মানস দর্শন করতে। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে। চোখে আমার জল। তখনও কি জানতাম, সামনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

নাজাং থেকে গাড়িতে ধারচুলা যাওয়ার কথা। কিন্তু ছ’ কিমি দূরে রাস্তা পুরো ধসে গিয়েছে। সব গাড়ি ওখানে আটকে। এখানে অপেক্ষা না করে লিয়াজঁ অফিসারদের নির্দেশে সামনে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। প্রবল বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ। এই সব পাথর টপকে টপকে সন্তর্পণে এগোতে লাগলাম। এক সময় সেই ছ’ কিমি পথ শেষ হল। আর রাস্তা নেই। দু’টি বুলডোজার ব্যস্ত রাস্তা পরিষ্কারের কাজে। কিন্তু যে জায়গাটা পরিষ্কার করা হচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে ধস নেমে সেই জায়গা আবার অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিলেন।

লেখকের দুই যাত্রাসঙ্গী জহরভাই ও সুরজভাই।

আর উপায় নেই। এ বার এক এক করে এই জায়গাটা পার হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা বাঁশি বাজালে এক জন করে যাত্রী ধসের জায়গাটা পার হবেন। বাঁশি বাজতেই প্রথম যাত্রী দৌড় দিলেন। কিন্তু যেই মাঝপথে পৌঁছেছেন ওপর থেকে পাথর পড়া শুরু হয়ে গেল। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম। যাত্রীভাই মাঝপথ থেকে ফিরে এলেন। আবার বাঁশি বাজল, কিন্তু প্রাণ হাতে নিয়ে কেউ এগিয়ে গেল না। সবাই ভয়ে পিছিয়ে আসছেন।

আমি দেখলাম এই ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। কতক্ষণ এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে থাকতে হবে তার কোনো হিসেব নেই। সামনে এগোতেই হবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমিই দৌড় লাগালাম। সামনেই একটা ঝরনা। ঝরনার জল প্রবল বেগে নেমে এসে খাদ দিয়ে গড়িয়ে নীচের কালী নদীতে গিয়ে মিশছে। কোনো ভাবে পা হড়কে গেলে সোজা নদীতে। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে আমি কখনও দেখিনি। চিরকালই আমি ডানপিটে, মৃত্যুভয় আমার নেই। যে দিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সে দিন নিজের ইচ্ছায় আসিনি। আর যে দিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিনও নিজের ইচ্ছায় হবে না। তা হলে কেন এই মৃত্যুভয়?

ঝরনা অতিক্রম করে দেখি, সামনে এক বিশাল পাথর। টিকটিকির মতো বুকে ভর দিয়ে সেই পাথরও পেরিয়ে এলাম। এ বারে একটা পাথর থেকে আরেকটা পাথর লাফিয়ে এগিয়ে চললাম। পাথরগুলো পেরিয়ে এসে অন্য বিপদ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা দু’টো আটকে গেল। কোনো দৈবশক্তি জেন আমার উপর ভর করল। কে যেন আমাকে এক হাত ধরে তুলে নিল। তবে কি আমার প্রভু আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করলেন? সারা গায়ে কাদা মেখে এ পারে আসতেই ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে এ প্রান্তের মানুষজন আমায় জড়িয়ে ধরল। পরে জহরভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার দৌড় শুরু করার কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই পাহাড় থেকে পাথর পড়া শুরু হয়্। দু’-একটা মুহূর্ত এ-দিক ও-দিক হলেই…।

সেই বিপজ্জনক জায়গা।

এ পারে এসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কখন দলের বাকি সদস্যরা আসবে? পাথর পড়া যখন দু’-তিন মিনিটের জন্য বন্ধ হচ্ছে, এক জন করে যাত্রী এ পারে আসছেন। তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটতে লাগল। এ পারে আসতে গিয়ে গণেশ কাদার মধ্যে পড়ে গেল দেখলাম। হাঁটু থেকে রক্ত বার হচ্ছে। এক মহিলা যাত্রী কাদার মধ্যে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিলেন। দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মীরা ছুটে গিয়ে তাঁকে রক্ষা করলেন। অনেকক্ষণ পর জহরভাই আর সুরজভাইও পেরিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই অক্ষত অবস্থায় এ পারে এলেন।

এ বার গাড়িতে করে রওনা ধারচুলা। আমাদের লাগেজ পড়ে রইল গুনজিতে। এক কাপড়ে ধারচুলা থেকে দিল্লি, তার পর কলকাতা। কলকাতায় আসার দশ দিন পর এল আমার লাগেজ। এসে পৌঁছোল কৈলাস-মানসের পবিত্র জলও। এটাই সব চেয়ে দামি আমার কাছে। (শেষ)

ছবি: লেখক    

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১১/ ফেরার পথে গুনজি হয়ে বুধিতে

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

কাল প্রায় সারা রাত জেগে কেটেছে। চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি, তাতে মনে অপার শান্তি। অতিথিশালায় ফিরে এসে বাকি সময়টা বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ মানসকে বিদায় জানানোর পালা।

আরেক বার গেলাম মানসের পাড়ে। দূরে উজ্জ্বল কৈলাস পর্বত। ভোররাতের ঘটনার কথা ভেবে এখনও লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ভেসে আসছে ‘ওম মণি পদ্মে হুম’-এর সুর। ভেসে আসছে ড্রামের আওয়াজ। মন কিছুতেই চাইছে না এই জায়গা ছেড়ে যেতে। বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে। শেষ বারের মতো মানসের জল মুখে নিয়ে, পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে ছুটলাম বাসের দিকে। বাসের যাত্রীরা সবাই শিবের ভজন গাইছে। বাস এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আমার স্বপ্নের মানস-কৈলাস। আমার দু’ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কে যেন কানে কানে বলছে – আবার আসিস।

আরেক বার মানস দর্শন।

কখন যে তাকলাকোট পৌঁছে গিয়েছি, খেয়াল করিনি। হোটেলে ফিরেও হোয়াটস অ্যাপে বাড়ির সঙ্গে কথা বললাম। কত দিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা হল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে এলাম।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ১৫ আগস্ট। এই পুণ্য দিনে ফিরে চলেছি ভারতে। তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৯টা নাগাদ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল চিনা অভিবাসন দফতরে। তার পর কাস্টমস অফিসে। আমাদের মালপত্র পরীক্ষার পর তিব্বত তথা চিন ত্যাগের অনুমতি পেলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে বাসে করে চলে এলাম লিপুলেখ পাস সংলগ্ন ভারত-চিন সীমান্তে। চিনা অফিসারেরা আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করলেন। মিলল পাহাড়ে চড়ার অনুমতি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণেশ যথারীতি চলে এসেছে। ওর কাছে আমার রুকস্যাক দিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম। ১৫ নম্বর ব্যাচের যাত্রীরা আমাদের দেখে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আজ স্বাধীনতা দিবস। তাই মহাদেবের পাশাপাশি ভারতমাতার নামেও জয়ধ্বনি হল।

মানস থেকে ফেরার পথে মন্যাস্টেরি।

লিপুলেখ পাসের নীচেই আইটিবিপি-র ক্যাম্প। গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। আইটিবিপি-র জওয়ানদের সঙ্গে ছবি তোলা হল।

আজ আমাদের গন্তব্য গুনজি, ২৬ কিমি। আসার সময় যে পথ তিন দিনে এসেছিলাম, সেই পথ এক দিনে পেরোব। একটু যে টেনশন হচ্ছে না, তা নয়। তবু হাঁটতে তো হবেই।

খুব জোরে হাঁটতে পারছি না। পথের সৌন্দর্যও সে ভাবে আকর্ষণ করছে না। কেবল কৈলাস-মানসের কথা মনে পড়ছে। মানস সরোবরে ভোররাতের অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ যেন চোখের সামনে ভাসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটা বিশাল ঝরনার কাছে চলে এলাম। গোটা পথকে প্লাবিত করে ঝরনা প্রবল বেগে নীচে নেমে যাচ্ছে। লাঠির সাহায্যে অতি সন্তর্পণে পথটুকু অতিক্রম করলাম। চলে এলাম নাভিডাং। এখানে সেনাশিবিরে স্বল্পক্ষণের যাত্রাবিরতি। দেখলাম জওয়ানরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনে ব্যাস্ত। ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। এখানে প্রাতরাশ সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম কালাপানির উদ্দেশে।

কিছুটা হাঁটার পর বুঝতে পারছি, বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। কিছুক্ষণ পাথরের উপর বসে রইলাম। শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকটা মসৃণ হল, বেশ আরাম লাগছে। আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু চলার ক্ষমতা যে বেশ কমছে, বুঝতে পারছি। বাঁ পায়ের হাঁটুতে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। জহরভাইয়েরও একই সমস্যা হয়েছিল। আমার দেওয়া ওষুধ খেয়ে কিছুটা সামলেছে। সমতলে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু চড়াই-উতরাই এলেই সমস্যা।

পথের দু’ পাশে সুউচ্চ পর্বতমালা। তার মধ্যের উপত্যকা দিয়ে একটি নদী বয়ে চলেছে। সেই নদীকে ডান হাতে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। মখমলের মতো সবুজ ঘাস আর গুল্ম দিয়ে মোড়া পুরো উপত্যকা। অসংখ্য রঙিন ফুল ফুটে রয়েছে। এ যেন এক স্বপ্নলোক। এ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কালাপানির অতিথিশালায়। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা এখানেই। আমি দুপুরের খাবার না খেয়ে এগিয়ে চললাম। কালাপানিতে পাসপোর্টে সিল মারিয়ে আবার এগিয়ে চলা। পথেই আলাপ হল আইটিবিপি-র এক জওয়ানভাইয়ের সঙ্গে। উনি আমাদের হাতে চকোলেট তুলে দিলেন। বাড়িতে ওঁর ছোটো একটা ছেলে আছে। তার বিদেশি মুদ্রা জমানোর খুব শখ। আমি ওঁর হাতে ১০০ চিনা ইউয়ানের একটি নোট তুলে দিলাম। সারা পথ ওঁদের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেল নাগাদ পৌঁছে গেলাম গুনজি ক্যাম্পে। এসেই দেখি মনীশভাই আমাদের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। গুনজি ক্যাম্পে আজ খুব ভিড়। ক্যাম্পের পাশেই পাহাড়ে মেলা বসেছে। দূরদূরান্ত থেকে গ্রামবাসী আসছেন। গুনজি আইটিবিপি ক্যাম্প রাতে আমাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করেছে। অনেক দিন পর দেশের খাবার খেলাম। জওয়ানভাইদের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে যায়।

গুনজি ক্যাম্প।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই চার দিক থেকে ধসের খবর আসতে লাগল। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝোরা বিশাল আকার ধারণ করে। এখানেও তাই। আজ গণেশ ছাড়াই পথ চলা শুরু হয়েছে। মেলার জন্য গণেশ একদিন গুনজিতে থেকে গেল। কাল সকালে বুধিতে আমার সঙ্গে দেখা করবে।

গুনজি থেকে ছায়লেক পর্যন্ত রাস্তা সমতল। তার পর পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হবে। সেই পথটা খুব বিপজ্জনক। দু’-তিন ঘণ্টা একটানা হেঁটে চলেছি। ফুসফুস ক্রমশ হাপর হয়ে উঠছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। লজেন্স মুখে দিলাম। লজেন্সের মোড়ক বুকপকেটে রেখে দিলাম প্রকৃতির বুকে দূষণ এড়ানোর জন্য। কৈলাস পরিক্রমার সময় দেখেছিলাম জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রাখা। আমাদের উত্তরাখণ্ডে সে সবের বালাই নেই।

আরও কিছুটা এগোনোর পর জলপতনের গর্জন শোনা গেল। যতই এগোচ্ছি, গর্জন ক্রমশ বাড়ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হুড়হুড় করে পড়ছে ঝরনার জল। যেন বিরাট তুলোর বস্তা। প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা সেই জল রাস্তা ভাসিয়ে কালী নদীতে পড়ছে। ঝরনার জল সারা গা ভিজিয়ে দিল। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা নয়, চিন্তা ক্যামেরাটা নিয়ে। ক্যামেরার ছবি আমার কাছে মহা মূল্যবান, আমার সারা জীবনের সম্পদ, আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ক্যামেরা বাঁচিয়ে কোনো রকমে পেরিয়ে এলাম সেই জায়গা।

১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ছায়লেকে। খাওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি। আবার পথ চলা শুরু। এ বার নীচে নামার পালা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, পথ ভয়ংকর পিছল। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। পাহাড়ের বুকে আমি একা। ট্রেকিং-এ এ রকম হয়, কেউ যায় এগিয়ে, কেউ থাকে পিছিয়ে – যার যেমন চলার সামর্থ্য বা গতি।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথা প্রচণ্ড বেড়েছে। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না। বাধ্য হয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ খেলাম। অনেক নীচে বুধির ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বৃষ্টির তেজ প্রচণ্ড বাড়ল। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে লাঠি নিয়ে, পা টিপে টিপে পরমেশ্বরের নাম করতে করতে এগিয়ে চললাম ক্যাম্পের দিকে।

ঈশ্বরকে মনেপ্রাণে ডাকছি – আর একটা দিন তুমি শক্তি দাও, এতটা রাস্তা যদি হেঁটে আসতে পারি, তা হলে শেষ বেলায় কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছ? তোমার কৃপা না থাকলে এতটা পথ আসতে পারতাম না। হাঁটুতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যথা কমানোর মলম স্প্রে করলাম। একটু যেন স্বস্তি এল। ধীরে ধীরে নেমে চললাম। পৌঁছে গেলাম বুধি। কেএমভিএন-এর এক কর্মীভাই যথারীতি শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। (চলবে)

ছবি: লেখক                 

Continue Reading

দূরে কোথাও

পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ১০/ সেই জ্যোতিদর্শন

view of Kailas from Kailas

সুব্রত গোস্বামী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কিউগুতে। মানসের তীরে এই জনপদ। সরোবরের নীল জলরাশি সূর্যের আলোয় হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শত সহস্র জলকণা সূর্যের আলোয় তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দূরে দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। সরোবর সংলগ্ন এক অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই যেন মানসের জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। ঘরে ঢুকেই সবাই বেরিয়ে গেলাম। ছুটলাম মানসের জলে অবগাহন করতে। হিমশীতল জল। বাইরের তাপমাত্রা ৭-৮ ডিগ্রির কাছাকাছি, সঙ্গে প্রবল হাওয়া। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বাধাই আর বাধা নয়। মানস সরোবর যেন দু’ হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে। এই সেই মানস সরোবর। স্বয়ং দেবাদিদেব যেখানে অবগাহন করেন।

কিউগুতে মানস সরোবর।

মানস সরোবরের জলে নেমে স্নান করার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বালতি করে জল তুলে এনে স্নান করতে হয়। কিন্তু কে মানে সেই বিধিনিষেধ! মানসের জলে নেমে সবাই আনন্দে আত্মহারা। ‘হর হর মহাদেব’ আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। মানসের জল আর চোখের অশ্রু মিলেমিশে তখন সব একাকার। মানসের জল তো শুধু জল নয়, এর মধ্যে আছে ঈশ্বরের ছোঁয়া। এ আমার কাছে চরণামৃত। সরোবরের জলে অবগাহন করতে করতে বললাম –

করচরণকৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাহপরাধম। / বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত ক্ষমস্ব জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো।।

(হে প্রভু, আমার এই জন্মে হস্তপদের দ্বারা কৃত অপরাধ, বাক্যজ, শরীরজ, কর্মজ, শ্রবণজ, নয়নজ কিংবা মানস অপরাধ, সঞ্চিত কিংবা ভবিতব্য অপরাধ, সব ক্ষমা কোরো।)

সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। হে প্রভু, তুমি না থাকলে এই পুণ্যধামে আমার আসার সুযোগ হত না। কত বাধা, কত বিঘ্ন উপস্থিত হয়েছে। তুমি সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে আমাকে এই পুণ্যধামে নিয়ে এসেছ। এ তোমার অপার মহিমা। আমাকে তোমার চরণে স্থান দাও।

আরও পড়ুন: পরমেশ্বরের সন্ধানে কৈলাস-মানসে: পর্ব ৯/ পরিক্রমা অন্তে হোর-এ

পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে হয় না। পিতৃঋণ থেকে মুক্ত হব, এ আশাও আমি করি না। যত দিন বাঁচব, পিতৃঋণ আমি সানন্দে বহন করতে চাই। এই বলে মানস সরোবরের জল নিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ শুরু করলাম। তর্পণ করার কোনো সামগ্রীই আমার কাছে ছিল না, সামান্য একটু তিল ছাড়া। সেই তিল হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পিতৃদেবকে স্মরণ করে বললাম –

ওঁ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপঃ/পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।

কতক্ষণ জলের মধ্যে ছিলাম জানি না, জহরভাইয়ের ডাকে হুঁশ এল – তাড়াতাড়ি চলুন স্যর, হোমযজ্ঞ যে শুরু হয়ে যাবে। মানসের জলে ডুব দিয়ে কিছু পাথর সংগ্রহ করে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালাম।

সরোবরের পাশেই যজ্ঞের স্থান। মুম্বইনিবাসী মুকেশভাই যজ্ঞ করার দায়িত্ব নিলেন। তাঁকে সাহায্য করলেন জহরভাই। যজ্ঞের সামনে বসে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ যেন এক আলাদা অনুভূতি। সবাই মিলে হোম-যজ্ঞে পরমেশ্বরের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। মুকেশভাই বেদির উপর মাথা ঠুকতে ঠুকতে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্তব পাঠ করতে লাগলেন।

সব তীর্থযাত্রীর চোখে জল। আসলে এই চোখের জল তো শুধুমাত্র জল নয়, এ আনন্দাশ্রু – ঈশ্বরকে দেখার, ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার যে আনন্দ, তারই প্রকাশ। এই বিরল মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দি করলাম অতি দ্রুত।

যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর অতিথিশালায় ফিরে জানলার ধারে বসে রইলাম। মানস সরোবরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নীল জলের অপর প্রান্তে কৈলাস পর্বত এখনও ঝকঝক করছে। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছে, টের পাইনি। জহরভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। রাতের খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। ভোররাতে উঠতে হবে। শুনেছি, ভোররাতেই শিব-পার্বতী মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন। চিত্রকল্পটা মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে কখন যে ঘুম এসে গেল!

মানসের ধারে যজ্ঞের আয়োজন।

১৩ আগস্ট। রাত ৩টের সময় সুরজভাইয়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি, কয়েক জন যাত্রী মানসের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে এখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে। সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। বাইরে এসে দেখি আমাদের বন্ধুরা সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। সবার মুখে তখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’। ওই মন্ত্র ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যের উদয় হল। চারি দিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু স্বপ্নপূরণ হল না। তাঁরা এলেন না। অতিথিশালায় ফিরে এলাম।

আজ আমাদের অখণ্ড অবসর। আজ শুধু মানসের চার পাশে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। অতিথিশালার সংলগ্ন গুম্ফায় গেলাম। চার দেওয়ালে বৌদ্ধের বাণী আর তৈলচিত্র। বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে এক উপাসক ড্রাম বাজাচ্ছেন। ড্রামের ডুম ডুম আওয়াজ আর ধূপের গন্ধ চারি দিকে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমিও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। লাউডস্পিকারে অতি মৃদু স্বরে ভেসে আসছে – বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)/ধম্মং শরণং গচ্ছামি (আমি ধর্মের শরণ নিলাম)/ সংঘং শরণং গচ্ছামি (আমি সংঘের শরণ নিলাম)। জানতে পারলাম এই গুম্ফা ৩০০ বছরের পুরোনো। ভিতরের তৈলচিত্রগুলোও সেই সময়কার। অথচ এখনও কত উজ্জ্বল।

মানসের ধারে গুম্ফা।

দুপুর হতেই দল বেঁধে চললাম স্নান করতে। কেউ নিয়ম মানছেন না। আশেপাশে কোনো পাহারাদার নেই দেখে সবাই ডুব দিতে জলে নেমে পড়ল। আমিও নেমে পড়লাম মানসের জলে। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। সরোবরের অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের খাওয়ার পর মানসের জল আনতে ছুটলাম। বোতলে ভরলাম। কলকাতার অনেকেই মানসের জল আনতে বলেছেন। জানি না, এই জল শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক গন্তব্যে পৌঁছোবে কি না। ঘোড়ার পিঠে করে আমাদের মালপত্র যাবে নাজাং পর্যন্ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে দিল্লি, তার পর ট্রেনে কলকাতা। তখনও জানতাম না ফেরার সময় আমাদের জন্য কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে।

রাতের খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল ঘড়ির অ্যালার্ম। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আকাশ মেঘলা থাকলে দৃশ্যমানতা কমে যায়। তবে কি আজও তাঁর দেখা পাব না? এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। মানস সরোবরে আজই আমাদের শেষ রাত। কাল সকালেই আমরা রওনা দেব তাকলাকোটের উদ্দেশে। হাতে ছাতা নিয়ে মানসের জেটিতে গিয়ে বসলাম। বেশ কিছু যাত্রী অনেক আগে থেকেই অধীর আগ্রহে বসে আছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কৈলাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রভুকে ডেকে চলেছি।

ঠিক ৩.২৫ মিনিট। হঠাৎ দেখি মানসের জল স্থির হয়ে গেল। কৈলাস পর্বতের মাথায় একটা হলুদ আলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। অনেকটা হ্যালোজেন আলোর মতো। সেই আলোর জ্যোতিতে মানস আলোকিত। আলোটা কৈলাস পর্বত থেকে নেমে এসে মানসের জলে ঘুরপাক খেতে লাগল। ৩০-৪০ সেকেন্ডের পর আলোটা জল থেকে উঠে কৈলাস পর্বতে মিলিয়ে গেল। উত্তেজনায় আমাদের শরীর কাঁপছে, আমরা মূক। কতক্ষণ যে এই ভাবে ছিলাম, জানি না। পাশের যাত্রীর ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমি কী দেখলাম! পরমেশ্বর অবশেষে আমাদের দেখা দিলেন। তা হলে কি সেই কাহিনি সত্যি? সত্যিই কি শিব-পার্বতী ভোররাতে মানসের জলে অবগাহন করতে আসেন?

এই অলৌকিক ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান আজও দিতে পারেনি। কী ভাবে এই আলোর উৎপত্তি? কেনই বা সেই আলো এসে পড়ে মানসের জলে? আমার সারা শরীর শিহরিত। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। সহযাত্রী জহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলাম জহরভাই আর সুরজভাই উত্তেজনায় কাঁপছে, মুখে শুধু ‘হর হর মহাদেব’। আমার দু’ চোখে জলের ধারা। পবিত্র মানসের জল মুখে-মাথায় দিলাম। পরমেশ্বরের এই রূপ দেখতেই তো এত কষ্ট করে, বাড়ি-ঘর-সংসার ফেলে এখানে ছুটে আসা। ধীরে ধীরে পুব আকাশে সূর্যদেব দেখা দিলেন। আমরা এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ়। (চলবে)

ছবি: লেখক

Continue Reading
Advertisement

বিশেষ প্রতিবেদন

Advertisement
শিল্প-বাণিজ্য9 hours ago

লকডাউনেও ২২ শতাংশ নিট মুনাফা বাড়ল বিপিসিএলের

রাজ্য9 hours ago

আক্রান্তের সংখ্যায় রেকর্ড, তবে দীর্ঘদিন পর রাজ্যে দৈনিক সংক্রমণের হার নামল দশ শতাংশের নীচে

বিজ্ঞান10 hours ago

অক্সফোর্ড করোনা ভ্যাকসিন আপডেট: নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে হিউম্যান ট্রায়াল

গাড়ি ও বাইক11 hours ago

ব্যাটারি ছাড়াই কেনা যাবে ইলেকট্রিক গাড়ি, নির্দেশ কেন্দ্রের

অনুষ্ঠান11 hours ago

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির হাত ধরে প্রয়াত অমলা শঙ্করের প্রতি অনলাইন অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অগ্নিবীণা ডান্স অ্যাকাডেমির

দেশ11 hours ago

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক রক্তের, বললেন নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী

রাজ্য11 hours ago

পেশাগত রোগ সিলিকোসিসে ঝরছে শ্রমিকের প্রাণ! দায় নেবে কে?

ক্রিকেট12 hours ago

কোহলি-স্মিথ-উইলিয়ামসনরা অভিষেক করার আগে শেষ টেস্ট খেলেছিলেন তিনি, ফের সুযোগ পেলেন বৃহস্পতিবার

কেনাকাটা

care care
কেনাকাটা18 hours ago

চুল ও ত্বকের বিশেষ যত্নের জন্য ১০০০ টাকার মধ্যে এই জিনিসগুলি ঘরে রাখা খুবই ভালো

খবরঅনলাইন ডেস্ক : পার্লার গিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়ার সময় অনেকেরই নেই। সেই ক্ষেত্রে বাড়িতে ঘরোয়া পদ্ধতি অনেকেই অবলম্বন করেন। বাড়িতে...

কেনাকাটা1 week ago

ঘর ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিনতে চান? অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ৫০% পর্যন্ত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্ক : অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ঘর আর রান্না ঘরের একাধিক সামগ্রিতে প্রচুর ছাড়। এই সেলে পাওয়া যাচ্ছে ওয়াটার...

কেনাকাটা1 week ago

এই ১০টির মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্টটি প্রাইম ডে সেলে কিনতে পারেন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : চলছে অ্যামাজনের প্রাইমডে সেল। প্রচুর সামগ্রীর ওপর রয়েছে অনেক ছাড়। ৬ ও ৭  তারিখ চলবে এই সেল।...

কেনাকাটা1 week ago

শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল, জেনে নিন কোন জিনিসে কত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্: শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল। চলবে ২ দিন। চলতি মাসের ৬ ও ৭ তারিখ থাকছে এই অফার।...

things things
কেনাকাটা2 weeks ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা2 weeks ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা3 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা4 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা4 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

নজরে

Click To Expand