সঞ্জয় চক্রবর্তী

বছরের এই সময়টা পাহাড় জুড়ে শুধু শুকনো সাদা আচরের দাগ। বর্ষা এলে, যা ছুঁয়ে যায় গিরিখাত। উচ্ছ্বল জলপ্রপাত। শীতের এই সময়টা..গায়ে গায়ে লেগে থাকে কদিনের আহ্লাদি ছুটি। শীত আচরে..শহুরে ময়্যাসচারাইজার…পাহাড় ভ্রমণ। খানিক ভিড় কম যেখানে,চাইলেই স্ট্যাটাস দিতে বেগ পেত হবে…সেরকম জায়গায় আপাতত কদিন। আমরা চলেছি ইয়াকতেন, সিকিমের এক গ্রাম। তবে হ্যাঁ,ঘরে ঘরে টিভি,স্টার জলসার সিরিয়াল মিস হবার চান্স নেই। খালি ঐ ডেটার ব্যাপারটা, যা খানিক ভ্রূ কোঁচকানো। ঘুরে যত না আনন্দ, ভ্রমণ স্ট্যাটাস-এ লাইকে খানিক বেশি আনন্দপ্রদ এখন মানব জীবন!

তা কী ভাবে যাবেন? ধরে নিলাম, ট্রেন ধরে চলে এসেছেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। এবার আমাদের যাত্রা শুরু করি। যাব ইয়াকতেন। ৮ টা হোমস্টে আছে। সিকিম গভর্নমেন্ট টুরিজম ডেভেলপমেন্টের, সহায়তায় গড়ে উঠেছে এই হোমস্টেগুলো। পৌঁছনো অপেক্ষা, আতিথেয়তার ডালি নিয়ে হাজির সুব্বাজি ও তাঁর পরিবার, আমরা সামনের কদিন থাকছি ওখানেই। ওনাকে বললেই গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন এনজিপি স্টেশনে। ভারা কম বেশি ৩৫০০-৪০০০ টাকা। চাইলে নিজেরাও চলে যাওয়া যায়। শিলিগুড়ি থেকে উঠে পড়ুন গ্যাংটকের শাটল জিপে। ভাড়া ২৫০-৩০০ মাথাপিছু।  নেমে পড়ুন গ্যংটকের খানিক আগেই ‘রানিপুল’। সেখান ত্থেকে আমাদের গন্তব্য পাকয়িং। যারা সিকিমে আগে গেছেন, পাকয়িং নামটার সঙ্গে পরিচিত। এখানেই গড়ে উঠেছে, সিকিমের একমাত্র এয়ারপোর্ট। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে বিমান ওঠা-নামা। ইয়াকতেন,পাকয়িং থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার। গ্যাংটক থেকে পাকয়িং ৩০ কিমি। গাড়িতে ঘন্টাদেড়।

এইতো পৌছে গেছেন ইয়াকতেন। গ্রামটা পাকয়িং গ্রাম পঞ্চায়েতের অর্ন্তগত। আপাতত কদিন মেঘ পাহাড়ের সুর। ক্যাকটাস, ফুল, ঘরোয়া রান্না, এলাচের খেত, গোয়াল, গরু, সেই দুধের চা,ঘোল!ছাং…অথচ আপনি এখন সমুদ্র তল থেকে ৬০০০ ফুট ওপরে। এবার মোটামুটি ইটিনিয়ারি-টা ঠিক করে নিন…

এই যেমন প্রথম দিন…মিনিট আটেক হেঁটে ভিউ পয়েন্ট। দেখুন কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর সুব্বাজির ক্যাকটাস বাগান। গতবছর সিকিমের ইন্টারন্যশানাল ফ্লাওয়ার শোতে…ওনার তৈরি ফুল দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে। কাছা কাছি আছে…আরো কয়েকটা অর্কিড বাগান। আকাশ পরিস্কার থাকলে পুরো গ্যাংটক শহরটা আপনার বাঁদিকে, ডানদিকের কোনায় জুলুকের স্পাইরাল রোড। আপনি বসে আছেন জঙ্গল ঘেরা গ্রামে।

দ্বিতীয় দিন একটু ভোরে উঠুন…জঙ্গল পথ ধরে হাঁটা। সঙ্গে গাইড আছে (গাইড চার্জ ৫০০ টাকা)। ৪ কিমির ছোট্ট ট্রেক। পথে জঙ্গলের রোমাঞ্চ…দেখা না গেলেও হরিণের ডাক শোনা। আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে ঝান্ডি-দারা ট্রেক। কাঞ্চনজঙ্ঘার পূর্ণ অবয়ব। খানিক দুরেই বুদাংগারি। প্রাচীন ফোর্টের ধ্বংসাবশেষ। ঘরে ফিরে অর্গানিক ব্রেকফাস্ট। এর পর ঘুরে নিন কাছাকাছির মধ্যে বওজেতারকেভ, কার্তকমনাস্ট্রি। ফিরে এসে লাঞ্চ, ঘুম, পানীয়, আগুন জ্বেলে হাত পোহানো, মুরগি সেঁকতে সেঁকতে…এবার আপনি ভাবুন। আমি বরং পরের দিনের প্ল্যানটা বলে ফেলি এই ফাঁকে…

পরেরদিন…একটা গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন।পরাখা, বরপথাং, রোলেপ ঘুরে চলে আসুন। লাঞ্চ রাস্তায়। রাতে আগের দিনটাই রিপিট করুন, অথবা হোমস্টেড থেকে আয়োজন করা হয় লোকাল কালচারাল প্রোগ্রাম। ব্যাস আমার বলা শেষ। আপাতত তিন দিন শেষ…আমার ছুটিও শেষ। কাল ফিরে যাবো…

আপনার হাতে আরো ছুটি থাকলে, দেড়-ঘন্টা দুরেই গ্যংটক।ভাবুন কী করবেন। ওদিকে গেলে জানাবেন, কেমন ঘুরলেন। ইয়াকতেনে রজন্য সুব্বাজিকে ফোন করে নিন- ৮৭৬৮৭৪৮১৪৬। আর চাইলে পুরো ব্যবস্থাটাই কলকাতা থেকে করে দিতে পারে- ‘ট্রাভেল এন্ড বিয়ন্ড’, ৯৮৩১০৩০৭০২,যারা আপনার ছুটি অনুযায়ী সাজিয়ে দেবে, আপনার পরের সফরটি।

আরও পড়ুন: পশ্চিম সিকিম যখন লাল

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন