IMG_7247শম্ভু সেন

মেশিন বোট নয়, দেশি নৌকা, হাল-দাঁড়ের, ছতরি দেওয়া। মাঝি অনেক ক্ষণ ধরে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। আমরা নদীর ধার বরাবর বাঁধ-রাস্তায় ইতিউতি হাঁটছি। অলস পদচারণা। আমার মন বলছে, ওর ডাকে সাড়া দিই। কিন্তু সতীর্থরা রাজি নয়। তাঁদের দৃষ্টি আকাশপানে। আকাশ তখন সাজছে। শ্রাবণগগন অঙ্গনে ছুটে আসছে পথিক মেঘের দল। তারা জোট বাঁধছে। নদীর আঁচলে পড়ল ঘন মেঘের ছায়া। আকাশ অসংবৃত হয়ে পড়ল। বৃষ্টিও নামল দুদ্দাড়। আমরা কাকভেজা হয়ে টুরিস্ট লজের আস্তানায়।

শুরু হয়ে গেল ফিসফাস – ভাগ্যিস, মাঝির ডাকে সাড়া দিইনি। না হলে কী যে হত! যা চেহারা এখানকার নদীর।

সত্যি, এ তো নদী নয়, মিনি সমুদ্দুর। দূরের ও-পার তো দেখাই যায় না। স্রোতও তীব্র। হবে না ? এ যে দুই নদী এক ধারায় মিলিত হয়ে উন্মুখ হয়ে ছুটে চলেছে সাগরপানে। এই টুরিস্ট লজটা একেবারে গঙ্গা তথা হুগলি আর রূপনারায়ণের সঙ্গমে। কাছেই আছে দামোদর, সে-ও পড়েছে গঙ্গায়। এখানে গঙ্গা পুব থেকে বয়ে এসে সিধে দক্ষিণে ঘুরে গেছে, আর রূপনারায়ণ সোজা উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে গেছে। উল্টো দিকেই নুরপুর, আর দূরে একটু ডান দিকে গেঁওখালি। আর ওই নদী সোজা চলে যাচ্ছে হলদিয়ার দিকে। এ সবই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন খাটো ধুতিপরা খালি গায়ের মানুষটি।gadi2        

এখানে একটা ফোর্ট ছিল – ফোর্ট মর্নিংটন। ব্রিটিশরাজের দুর্গ। বাণিজ্যের মাধ্যমে লক্ষ্মীকে বসত করানোর সংগ্রামে যখন ব্যস্ত ব্রিটিশরা, তখনই জলদস্যু ঠেকাতে এই দুর্গ গড়া হয়। লোকমুখে নাম ছড়িয়ে পরে ক্লাইভের দুর্গ বলে।

তা সে দুর্গ কোথায় ?

“দুর্গ তো নদীগভ্‌ভে” – সেই মানুষটি মাছ ধরার জাল বুনতে বুনতে জবাব দিয়েছিলেন – “বিকেলের দিকে ভাটা পড়লি দেখতে পাবেন।”

সত্যি, ভাটার সময় নদীর বুক চিরে বেরিয়ে এল দুর্গের ভাঙা দেওয়াল। ব্রিটিশ আমলেই এই দুর্গ পরিত্যক্ত হয়েছিল। তার পর ১৯৪২-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে তা বিধ্বস্ত হয়। রোজ দু’ বেলা সেই দুর্গ তার কঙ্কাল নিয়ে হাজির হয় পর্যটকদের কাছে।

নৌকা হয়নি, লঞ্চও কি হবে না ? একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল দলের মধ্য থেকে। চলো, যাওয়া যাক জেটিঘাটে। টুরিস্ট লজ থেকে অল্প হাঁটা। এখান থেকেই নিয়মিত লঞ্চ যায় নুরপুর আর গেঁওখালি। কিন্তু না, আমাদের ভাগ্যে জলবিহার নেই। জেটিঘাটে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে চোখ চলে গেল – “নুরপুর ও গেঁওখালিতে জেটিঘাট নেই। সেখানে যাত্রীসাধারণকে অতি সাবধানে নিজ দায়িত্বে ওঠানামা করতে বলা হচ্ছে”।

এর পর আর লঞ্চভ্রমণ! মাথায় থাক। গাদিয়াড়ায় বাঁধ-রাস্তার ধারে বসার বেঞ্চগুলোই ভালো। ওখান থেকে বসে বসে নদী দেখা যাক, সঙ্গে চা-টা। কোনও দ্বিমত নেই। সবাই এককাট্টা।gadi-1    

টুরিস্ট লজে প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান হাতে যে ব্রিটিশ আমলের পুরোনো বাড়িটা, তার কলি ফেরানো হয়েছে অতি সম্প্রতি। এখানেও লজ কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করবেন। আদতে এই বাড়িটা ছিল মণ্ডল, মান্না আর মল্লিকদের হাতে গড়া রাইস মিলের অফিসঘর। নদীর গ্রাসে চলে যাচ্ছিল এই মিল। রাজ্য সরকার সেই মিল অধিগ্রহণ চালু করল গাদিয়াড়া পর্যটন কেন্দ্র। টুরিস্ট লজের নতুন বাড়ি পরে হয়েছে।

স্নিগ্ধ নীল, শান্ত সবুজ আর উথালপাথাল গেরুয়ার মায়ায় তিরতির করে কেটে গেল দিনটা। নদীবক্ষে এখন আয়োজন চলছে সূর্যাস্তের এক বর্ণময় প্রদর্শনীর। আরাম পেল চোখ, তৃপ্ত হল প্রাণ, মন হল খুশ।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে গাড়িতে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে উলুবেড়িয়া। সেখান থেকে উলুবেড়িয়া বাজার-আটান্ন গেট-গড়চুমুক-শ্যামপুর হয়ে গাদিয়াড়া। খড়গপুরের দিকে থেকে গাড়িতে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে বাগনান। ডান দিকে রেলপথ টপকে গোবিন্দপুর- শ্যামপুর হয়ে গাদিয়াড়া। টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে সিটিসি-র বাস রোজ গাদিয়াড়া যায়। তবে সময় জেনে নিতে হবে ডিপো থেকে। হাওড়া, ধর্মতলা থেকেও নিয়মিত গাদিয়াড়া বাস চলে। হাওড়া বা খড়গপুরের দিক থেকে ট্রেনে উলুবেড়িয়া বা বাগনান এসে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে শ্যামপুর হয়ে গাদিয়াড়ার শিবপুর বাস স্ট্যান্ড আসা যায়। বাস স্ট্যান্ড থেকে লজ ১ কিমি, হেঁটে বা ভ্যানে। ধর্মতলা থেকে বাসে নুরপুর গিয়ে সেখান থেকে লঞ্চে গাদিয়াড়া আসা যায়। জেটিঘাট থেকে টুরিস্ট লজ ২০০ মিটার।

কোথায় থাকবেন

গাদিয়াড়ায় থাকার সর্বোত্তম জায়গা পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রূপনারায়ণ টুরিস্ট লজ। থাকার অঢেল ব্যবস্থা। অনলাইন বুকিং www.wbtdc.gov.in  ।

(সংস্কারের জন্য পুজোর ঠিক আগে পর্যন্ত টুরিস্ট লজের কিছু ঘরে বুকিং দেওয়া হচ্ছে না। তবে পুজোর সময় সব ঘরে বুকিং পাওয়া যাবে।)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here