পাপিয়া মিত্র

কলকাতা-সহ আশপাশ ফুটছে খরপ্রবাহে। ছিটেফোঁটা বৃষ্টির লেশ নেই। এক এক দিন ঝলসে দিচ্ছে রোদের ঝাঁঝ। এক এক দিন আর্দ্রতায় সারা শরীর ঘামে জপজপে। এমনই এক বিশ্রী-বিরক্তিকর মুহূর্তে ফোনটা গেয়ে উঠেছিল ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে…’। বেশিক্ষণ বাজতে দেয়নি ফোনটাকে। কানে তুলতেই চোখ কপালে ওঠার মতো প্রশ্ন, দিঘা যাবে?

এ কি ক্ষ্যাপামি না ভুল শুনছে শালুক! চলোই না। কাল দুরন্তয় যাব, পরের দিন কাণ্ডারিতে ফিরব। না বোলো না। টিকিট কাটছি, ঘর বুকিং করছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শালুক দেখল দুপুর দেড়টা। গল গল ঘামে নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু এক রাত? না না, দু’রাতের ব্যবস্থা হোক। হাতে থাকুক দিন-তিন। তুলল ঝোলা, চলল ভোলা। এ যে নিশিডাক! শালুকদেরও অবস্থা সেই রকম।

নতুন কোথাও যাওয়া হবে নাকি? নাকি শুধু আড্ডা, নাকি কলকাতার পোড়া মন ভিজবে তরলে, নাকি যে যার মতো করে দিন যাপন করবে। আসল উপলক্ষ হল সমুদ্রের কোলে শুয়ে থাকা। চার দিক ফেটে পড়ছে শেষ জ্যৈষ্ঠের রোদ। যেন রুপোলি শস্য লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। নানা জল্পনায় ট্রেনের কয়েক ঘণ্টা হাপিস। দুপুর দু’টোয় দিঘার প্ল্যাটফর্মে ঢুকল সুপার এসি। ফুটছে চারধার, হুজুক-রসিক শালুকরা পুড়তে পুড়তে হোটেলে। এখন নাড়িতে টান। সুতরাং খেতে চলো।

দিঘা।

চারধার লু-এর প্রতাপে চোখ খুলে রাখা দায়। কিন্তু হাল ছাড়া নয়। জোয়ারের টান এসেছে সাগরে। নোনা বাতাস ভিজিয়ে দিচ্ছে শালুকদের। হোটেলের বারান্দা এখন কোল খুঁজছে সফেন ঢেউয়ে। ভাতঘুমে চোখ বুজে আসে। ছিটকে আসে উদ্দাম স্রোতের নুনজল। বৃষ্টি? নাহ, কী কথা ছিল? ফিরে যাবে সেই পথে! গল্প শুরু হল। ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে যায় শালুকদের আলাপচারিতায়। আজ এ-ধার ও-ধার, কাল যাব নতুনের ঠিকানায়। মোটরভ্যান ডেকে ঘুরে আসা যাক উদয়পুর। সেই বছর সতেরো আগের জায়গায়। অনেক বার দিঘা আসা হয়েছে, ঠিকই কিন্তু উদয়পুর যাওয়া হয়নি। বরং বলা ভালো শালুকের উদয়পুর যেতে মন চায়নি।

এ বারে সঙ্গীদের মধ্যে এক জন নতুন। তা-ও নয় নয় করে বছর দশ হবে। সব মাথা এক। কথায় বলে সব পাগল একখানে। উদয়পুর আসলে শালুকের একটুও ভালো লাগে না। এ বারেও মন ভরল না। বড় ভিড়, বড় নোংরা। তিন সঙ্গী চটি হাতে বালি-জলে নেমে পড়ল। শালুক ততক্ষণে দেখে ফেলেছে কেয়া-ঝাউয়ের কপালে সিঁদুরের টিপখানিকে। সোহাগে আদরে আপন করে রাখল তাকে। এ ছবি তার একান্ত নিজের। মুঠোফোনে ধরা রইল ছবি ঘিরে অনেক স্মৃতি।

সমুদ্রের বুকে পাতা শয্যায় শরীর ভিজে যায় নোনা হাওয়ায়। কার যেন আসার কথা ছিল। বাধাই সিমেন্টের গায়ে এসে কে যেন শালুককে ডাক দিল। এসেই যখন পড়েছ, তখন সাগরের উদ্দামতায় নিজেকে সমর্পণ করো। কীসের জন্য অপেক্ষা? কার জন্য অপেক্ষা? আকাশে স্নানযাত্রার পূর্ণিমার চাঁদ। সে দিকে চোখ ফেরাল শালুক। উঠে বসল বিছানায়। পাশে শুয়ে থাকা মানুষটাকে ধুয়ে দিচ্ছে দুধফেনা। নতুনের খোঁজে এ বার আসা। তালসারি, মন্দারমণি, উদয়পুর, শঙ্করপুর, জুনপুট, দরিয়াপুর, তাজপুর, গোপালপুর সব তো চষে ফেলা হল। কলকাতার বাতাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে এসেছে দিঘায়। নতুন দিশা পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ঘরছাড়া। কার আদরে রাতবিরেতে হারিয়ে গিয়েছিল শালুক?

এলোমেলো সমুদ্রবায়ু ঘুম কেড়ে নিয়ে দূরে দেখিয়ে দিল দেউল জেগে উঠেছে। সব ভিড় আছড়ে পড়েছে সেখানে। শালুক একা তার সমুদ্রশয্যায়। দেউল থেকে বাতাস বেয়ে এল এক ফিসফিসানি। সময় নষ্ট করার মতো সময় যে হাতে নেই। বেরিয়ে পড়ো বাঁকিপুট। সেটা আবার কোথায়? দৌড়ে এল সখারা। সবাই কি এক কথা শুনেছে? ঠিকই তো। গত কাল উদয়পুরে যখন সান্ধ্য-চা খাচ্ছিলাম, তখনই কানে এসেছিল শব্দটা।

গাড়ি ঠিক হল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালির তাপ জ্বালিয়ে দিচ্ছে চোখ-মুখ। ২৭ কিলোমিটার পথে পড়ল রামনগর, বালিসাই, চাউলখোলা। জুনপুট বাসস্ট্যান্ডকে বাঁ দিকে রেখে ডান দিকে প্রায় দশ কিলোমিটার উঁচু-নিচু পথ। পথের বাঁ দিকে গ্রাম, ডান দিকে সমুদ্রতট, বাঁকিপুট। অচেনা পথে চাকা থেমেছে বেশ কয়েক বার। বাঁকিপুট কোথায়? কত দূর? তাপ বাড়ছে। পথের উৎসুক মুখ তাকিয়ে থাকে। পাগল না হলে এই মাঠফাটা রোদে ঘরের বাইরে!

বাঁকিপুট।

বাঁকিপুট, সুন্দর মিষ্টি নাম। কুমারী তট। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ায় সম্বিৎ ফিরল। দলের উঁকিঝুঁকিতে গাড়ি থামল। নেমে পড়ে উঠে গেলাম পথ থেকে ফুট দশেক ওপরে। বাঁধানো পাড়ে দাঁড়িয়ে হতবাক ক’জনা। এখানে এই ভাবে চরাচর জুড়ে যে জলরাশি, তাকে আগলে রেখে যে তট, এ তো রবি কবির শ্যামল কিনারের সেই সুনীল সাগর। সবুজ বনরাজির গা ঘেঁষে পরম শান্তিতে এগিয়ে গিয়েছে আমাদের নতুন ঠিকানা বাঁকিপুট সমুদ্রতট।

অনেক কৌতূহল মনে এসেছিল, কেন এমন ধরণের নাম? সারা রাস্তা মনে করতে করতে আসা। চাঁদিপুরের সমুদ্রের সঙ্গে বেশ মিল। জোয়ারের সময় উঠে আসে জল কানায় কানায়। আর ভাটার সময় জল সরে যায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার পিছনে। তটে নামার পথ সুগম না হওয়ায় তাই বাঁকিপুট এত লাবণ্যময়ী। এক নিমেষে হারিয়ে যায় শালুক। অনেক কথা বলার আছে। আমিত্বকে জানতে হলে এ রকম নির্জন সাগরকিনারার বড় প্রয়োজন।

দরিয়াপুরে বঙ্কিম স্মৃতিফলক।

এই পথে আসতে গিয়ে সতেরো বছর আগের দেখা দরিয়াপুরের কপালকুণ্ডলার মন্দির, শিবের মন্দির আর এক বার পরখ করা। এই মন্দির ঘিরে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাস। বঙ্কিমস্মৃতিধন্য হয়ে আছে জায়গাটি।

অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে। নাহ, আজ আর কোনও কথা নয়। বাঁকিপুট তটে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ল। কলকাতার ঝলসে যাওয়া মন জুড়িয়ে দিল তট। নতুনের ঠিকানায় গাছের ছায়ায়, ক্লান্ত চোখে নেমে আসছে আলসেমির ছোঁয়া। ‘বাবু হোটেল ফিরবেন না?’ সামনে দাঁড়িয়ে চালক মগনভাই।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে দিঘার ট্রেন তাম্রলিপ্ত (সকাল ৬.৪০), পাহাড়িয়া (সকাল ৭.৫০), দিঘা সুপার এসি (বেলা ১১.১০) এবং কান্ডারি (দুপুর ২.১৫) এবং সাঁতরাগাছি থেকে দিঘা এমু (সন্ধে ৬.১৫)। বাঁকিপুট যেতে হলে কাঁথি স্টেশনে নামুন। কাঁথি আসতে সময় লাগে কম বেশি তিন ঘণ্টা। কাঁথি স্টেশন বাঁকিপুট সমুদ্রতট প্রায় ১৮ কিমি। গাড়ি বা জুনপুট হয়ে শেয়ার জিপে আসতে পারেন। কলকাতা বা হাওড়া থেকে কাঁথি আসার অজস্র বাস আছে। কলকাতা থেকে গাড়িতে এলে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে মেচেদা, তার পর হলদিয়া সড়ক ধরে নন্দকুমার, সেখান থেকে দিঘার পথে কাঁথি। এর পর জুনপুট হয়ে বাঘাপুটের পথে। দিঘা থেকেও বেড়িয়ে যেতে পারেন বাঁকিপুট, দূরত্ব ৪৯ কিমি।

কোথায় থাকবেন

বাঁকিপুটে থাকার মতো একটাই জায়গা, ঝিনুক রেসিডেন্সি। যোগাযোগ ০৯৯৩২৬ ৭৭২৫৮। কাঁথি স্টেশন থেকে এদের পিক আপের ব্যবস্থা আছে। আর দিঘায় থাকার তো অঢেল জায়গা।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here