অর্ণব দত্ত

স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া উনিশ শতকের বাঙালি মনীষীদের ভিতর অনেকেই ছিলেন প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকাগুলি থেকে উঠে আসা বাঙালি মনীষা। সে হিসাবে সবার আগে নাম করতে হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রও ছিলেন মফস্‌সলে বেড়ে ওঠা মনীষা। ট্রেন ঠিকঠাক চললে শিয়ালদহ স্টেশন ঘণ্টাখানেকের ভিতরই আপনি পৌঁছে যাবেন নৈহাটি।

সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান স্টেশন থেকে হাঁটাপথে বড়জোর মিনিট দশেক। স্টেশনে নেমে ওভারব্রিজ ধরে ডানহাতে গিয়ে পাবেন রিকশা স্ট্যান্ড। রিকশাওয়ালাকে বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি দেখতে এসেছেন বললেই তিনি সাগ্রহে নিয়ে যাবেন কাঁঠালপাড়ার সাহিত্যসম্রাটের ভিটেয়। ইচ্ছা হলে হেঁটেও যেতে পারেন। জন্মভিটেয় যাওয়ার রাস্তায় পড়বে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ। এটি নৈহাটির বহু পুরনো নামকরা কলেজ। এখন এখানে চালু হয়েছে ছাত্রীদের জন্য আলাদা বিভাগ।

বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি, বাইরে থেকে।

সাহিত্যসম্রাটের জন্মভিটে বলে কথা! তা ছাড়া, কাঁঠালপাড়ার এই বাড়িতেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করেছেন। সে হিসাবে কাঁঠালপাড়ার বঙ্কিমচন্দ্রেরই পাড়া।

গন্তব্যপথে কিন্ত একটিও কাঁঠালগাছ চোখে পড়ল না। এলাকার মানুষজন আবার কাঁঠাল বলা পছন্দ করেন না। তাঁরা বলেন, কাঁটাল। আপনি যদি কখনও সাহিত্যসম্রাটের স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকায় আসেন, তা হলে যেন ‘কাঁঠালপাড়া’ উচ্চারণ করবেন না। তাতে এখানকার বাসিন্দা এ দেশীয়রা বিরক্ত হতে পারেন। স্টেশনের কাছে চায়ের দোকানি অনিমেষ সমাদ্দার যেমন বললেন, বাঙালরাই কেবল কাঁটালকে কাঁঠাল বলে। মশাই আপনি বাঙাল নাকি?

বাঙাল-ঘটির ঝামেলা সচরাচর আর হয় না। দিনকালও পালটে গিয়েছে। অনেক দিন পরে কাঁঠালকে উপলক্ষ করে ঘটি-বাঙালের দ্বন্দ্ব শুরু হতে হতেও হল না। একে এক রকম নিজগুণে মার্জনাই বলা যায়!

রিকশা না নিয়ে হাঁটাপথ ধরলাম। রিকশায় ভাড়া অবশ্য এমন কিছু বেশি নয়। মোটে ১০ টাকা। এ দিকে গরম পড়েছে ভালোই। কাঁটালপাড়ার এ দিকটায় এখনও রেলের কাজে নিযুক্ত হিন্দিভাষীদের বসবাস। রেলকর্মীদের বসবাসের জন্য কোয়ার্টারগুলির রং লাল। কাছের শিবমন্দিরে হিন্দুস্থানী মেয়ে-বউরা ভরদুপুরে শিবজির ভজনা করছেন। মাঝেমধ্যে ভজনের তাল কেটে কেটে যাচ্ছে। তাতে কী! শিবজির মূর্তি পাহারা দিচ্ছে অতিকায় একটা সাপ। জিনিসটা মাটির বলেই বাঁচোয়া!

স্থানীয় এক জন বাসিন্দা সোজা দেখিয়ে দিলেন, ওই বঙ্কিমবাবুর বাড়ি। জানাই ছিল, বঙ্কিমচন্দ্রের ভদ্রাসনে এখন বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্র কাজ করছে।

বৈঠকখানা বাড়ি।

দু’টি ভবন। দু’টিই সং‌রক্ষিত। একটি ভবনে সাহিত্যসম্রাট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেটির উলটো দিকে আর একটি ভবন, যেখানে বঙ্কিমচন্দ্র ব‌ৈঠকী আড্ডা দিতেন। ওটি বৈঠকখানা ভবন নামে প্রসিদ্ধ। বৈঠকখানা ভবনের লাগোয়া এক প্রাচীন শিবমন্দির। সেটি খ্যাত পঞ্চরত্ন শিবমন্দির নামে।

ইতিহাসের দলিল থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনের সময় একাধিকবার বঙ্কিমচন্দ্রের সাধের বৈঠকখানা ভবনটি রেলওয়ের এক্তিয়ারে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। ১৯২২ সালের ১৮ জুন কলকাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবম বিশেষ অধিবেশনে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, “অধিকাংশ জমিই রেলওয়ে গ্রাস করিয়াছে। সবই গ্রাস করিত। কেবল রায় শ্রীযুক্ত বংশীধর বন্দ্যোপাধ্যায় বাহাদুরের চেষ্টায় বঙ্কিমবাবুর বৈঠকখানা সংলগ্ন শিবমন্দিরটি রক্ষা পাইয়াছে। লর্ড কার্জন বঙ্কিমবাবুর বৈঠকখানাটি লইতে দেন নাই।”

বৈঠকখানা বাড়ি লাগোয়া পঞ্চরত্ন শিবমন্দির।

১৯৩৮ সালে সাহিত্যসম্রাটের জন্মশতবার্ষিকীতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের তদানীন্তন সভাপতি স্যার যদুনাথ সরকার বঙ্কিমবাবুর প্রিয় এই বৈঠকখানা বাড়িটিকে সংরক্ষণের জন্যে ও বৈঠকখানা বাড়িটিকে জাতীয় সৌধের মর্যাদা প্রদানের জন্যে বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালের ১০ মার্চ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের তদানীন্তন সভাপতি হীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই স্মারকভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করলেও যথাযথ ভাবে সংরক্ষ‌ণ করার মতো পরিকাঠামো সেই সময়ে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এক্তিয়ারে ছিল না।

বৈঠকখানা বাড়িটির উত্তরে সাহিত্যসম্রাটের ভদ্রাসন। ১৯৬২ সালের ৩০ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ভদ্রাসনটির জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর করা সম্ভব হয় না। এর পর ২০ জুন, ১৯৮৮ সালে ফের ওই জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

বৈঠকখানা বাড়িতে এখন মিউজিয়াম। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত নানাবিধ স্মারক সযত্নে সংরক্ষিত। বঙ্কিমচন্দ্রের ভদ্রাসন ও বৈঠকখানা বাড়িটি দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ঘরগুলি ক্রমশ সংস্কারের পরে ১৯৯৭ সালের ২৯ জুন বঙ্কিমচন্দ্রের ১৬০তম জয়ন্তীতে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী সত্যসাধন চক্রবর্তী ওই সংস্কার হওয়ার অংশের উদ্বোধন করেন। সেখানে ১৯৯৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা হয় বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্রের। এর পরে ভদ্রাসনের অন্যান্য অংশের সংস্কারের কাজ চলেছে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত।

বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্রে সংরক্ষিত রয়েছে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার দুর্লভ নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদি। প্রতিটি দুর্লভ নথির পাঠোদ্ধার করে সেগুলি ডি-অ্যাসিডিফিকেশন করে, উন্নত মানের কেমিক্যাল ও টিস্যু পেপার দিয়ে প্রয়োজনানুসারে ল্যামিনেশন করানো হয়েছে। এর পাশাপাশি মূল্যবান নথিগুলির ডিজিটাইজেশনও করা হয়েছে।

আঁতুড়ঘর।

কাঁটালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভদ্রাসনে এলে অবশ্যই দেখবেন ভদ্রাসনের দোতলায় বঙ্কিমচন্দ্রের শোওয়ার ঘর, একতলায় সাহিত্যসম্রাটের আঁতুড়ঘরটি কিংবা বৈঠকখানা ঘর ও বৈঠকখানা ঘরের লাগোয়া তাঁর লেখার ছোটো ঘরখানা।

এই বৈঠকখানা বাড়িতে বসেই সাহিত্যসম্রাট লিখেছিলেন বন্দেমাতরম গানটি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, দেশাত্মবোধের সঞ্চার আরও গভীর ভাবে ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বদেশি আন্দোলনের সময় কলকাতা থেকে একদল বিপ্লবী যুবককে স্টিমারে করে কাঁটালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের ভদ্রাসন পরিদর্শন করাতে নিয়ে এসেছিলেন।

আঁতুড়ঘরের ভিতর।

এখন প্রতি বছর বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে ১৩ আষাঢ় সাহিত্যসম্রাটের জন্মজয়ন্তী পালিত হয় তাঁর ভদ্রাসনে অবস্থিত সঞ্জীবচন্দ্র সভাঘরে। এ ছাড়া, ২৬ চৈত্র পালিত হয় তাঁর প্রয়াণ দিবস।

শনি, সোম ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে সংগ্রহশালা বন্ধ থাকে। সংগ্রহশালা দেখার জন্য প্রবেশমূল্য ৫ টাকা। এ ছাড়া, বঙ্কিম-গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সমস্ত বইপত্র এখান থেকে ৩০ শতাংশ ছাড়ে পেতে পারেন। পাওয়া যাচ্ছে বন্দেমাতরম গানের সিডি-ও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here