স্মিতা দাস:

‘জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতুমে ভবতুমে ভবতুমে’

আজ একটা ইচ্ছাপূরণের গল্প বলব।

মেয়েটার বয়স তখন খুব বেশি নয়। ৮ কি ৯ হবে। ওড়িশি নাচের হাতেখড়ি সবে শুরু। তখনই জানতে পেরেছিল ওড়িশি হল ওড়িশার নাচ। জগন্নাথদেবকে সামনে রেখে এই নাচ করা হয় বা এমন আরও অনেক কিছু। ইতিমধ্যেই তার পুরীর জগন্নাথ দর্শন দু’বার হয়ে গেছে। ছোটো হলেও একটু একটু করে জগন্নাথের ওই অদ্ভুত কালো রূপের সামনে ওড়িশি নাচ করার বাসনা বুকের ভেতরে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল তার। স্টেজের এক পাশে জগন্নাথের মূর্তি রেখে তাঁর সামনে নাচ সে অনেক করেছে। কিন্তু তাতে মন ভরেনি। দিবাস্বপ্ন দেখেছে খোদ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে কালো মানিকের সামনে ওড়িশি নাচবে। একটু একটু করে সে বড়ো হয়েছে। স্বপ্নটাও ক্রমশ বড়ো হয়েছে। কিন্তু তা পূরণ হওয়ার সুযোগ আসেনি। রোজ ঘুমোনোর আগে চোখ বুঁজলেই একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠত তার। একটা আসমানি রঙের ওপর ওই কালো রঙের মন্দির পাড়ের একটা ড্রেস আর তাতে নাচের রুপোলি সব গয়না, মাথায় কাশ রঙের মুকুট পরে জগন্নাথবন্দনা করছে। আর তা যে-সে জায়গায় নয়। খোদ শ্রীক্ষেত্রের জগন্নাথধাম। কিন্তু হলে কী হবে। তার মা যে বড্ড ভয় পান, মেয়ে ওই মন্দিরে নাচলে যদি সেখানকার সেবকরা মেয়েকে দেবদাসী বলে ধরে নেয়। তাই মন্দিরে নাচের স্বপ্নপূরণ হওয়াটা দুরাশা হয়ে যায়।

কিন্তু ছ’বারের পর এ বার সুযোগ এল। এ বারে সে মনে মনে ঠিক করেই হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠেছিল। ওড়িশির একটা বোল, অন্তত একটা বন্দনাস্তোত্র হলেও নেচে দেখাবেই সাক্ষাৎ ভগবানকে।

হুম, এ বার সে করলও তাই। পুরীতে নামা ইস্তক তক্কে তক্কে থেকেছে কখন সুযোগটা আসে। বাবা-মা, সহযাত্রীদের চোখের আড়াল হলেই সেরে ফেলতে হবে ইচ্ছাপূরণের সেই কাজটা। ‘জগন্নাথের সামনে ওড়িশি’ – তা-ও আবার মন্দিরের ভেতর।

প্রথম দু’ দিন মন্দিরে গিয়েও সুযোগ আসেনি। কিন্তু সুযোগ এল তৃতীয় দিনে। মন্দিরে ঢুকে যে যার মতো প্রণাম করতে ব্যস্ত। সেই ফাঁকে কেঁপে উঠল তার সারা শরীর – ‘জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতুমে ভবতুমে ভবতুমে’। পূরণ হল তার বাসনা।

পুরীতে আকর্ষণ দু’টো। জগন্নাথ আর সমুদ্র। সমুদ্রের টানকেও কোনো ভাবে এড়িয়ে যাওয় যায় না। গা না ভেজালেও তাতে মন ভিজতে বাধ্য। রাতের গহন অন্ধকারে যেমন সে রহস্যময়, দিনে তেমনই আনন্দ-উচ্ছ্বল। রাতে সমুদ্রের গভীর কালো অন্ধকারে মিটিমিটি জ্বলতে দেখা যায় জেলেদের নৌকোর লণ্ঠন। দিনরাত এক করে ভাসছে অজানা নিয়তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে। আবার পূর্ণিমার রাতে ঢেউয়ের সাদা ফেনা মুক্তোর মতো চিকচিক করে ওঠে। আর সকাল হলেই সমুদ্রকে ঘিরে কত ‘হাসি-কান্না হীরা-পান্না, দোলে ভালে’। বিশেষ করে স্নান করতে গিয়ে ছবি তোলার কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। মন ভরিয়ে দেয় সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের আকাশ-সমুদ্রে রঙের খেলা। আর ঢেউদের ওঠা-পড়া কানে কানে উদাসী মনকে বলে যাবে অনেক কিছুই। শুধু কান পেতে শুনতে হবে তাদের ফিসফিসানি।

এ বার পুরী গিয়ে ওই মেয়েটার আরও একটা ইচ্ছাপূরণ। ছোটোবেলায় এক বারই দেখেছিল কোনারকের সূর্যমন্দির। সাধ ছিল আবার যাবে। সকলে রাজি হতে যাওয়া হল কোনারক। পথটা খুব বেশি না। পথের দু’ ধারের দৃশ্য বেশ মনোরম। সবুজ গাছের সারি তার মাঝে পলাশের মতো ফুল ফুটে আছে। কিন্তু নাম জানা গেল না। আরও খানিকটা যেতে ফেলে আসা সমুদ্রের দেখা আবার মিলল। কিন্তু কিছু দূর যেতেই সেখানে জল স্থির। জলের ওপর কয়েকটা বোট ভাসছে। গাড়ির চালক বললেন, সমুদ্রের ধারে খানিকটা অংশে নাকি চড়া পড়ে এই জলাশয়। সেখানেই বোটিং-এর ব্যবস্থা।

যাই হোক পৌঁছোনো গেল কোনারক সূর্যমন্দিরে। খাজুরাহের মতো কোনারকের মন্দিরগাত্রেও রয়েছে নরনারীর যৌনআবেদন সমৃদ্ধ নানা ভঙ্গিমার মূর্তি। তবে বেশ মজাও হল আর অবাকও হলেন সকলে, যখন গাইড দেখিয়ে দিলেন গামবুট পরা স্টাইলিশ সূর্যদেবকে। প্রায় হাজার বছর আগের পুরোনো স্থাপত্যের নারীদের সঙ্গে কত মিল আধুনিকাদের। তাঁরা ভ্যানিটি ব্যাগ নিতেন, লং স্কার্ট পরতেন, পিঠে ব্যাগ নিতেন, হিল-উঁচু জুতোও পরতেন। তবে নজরে এল বহু জায়গায় কারুকার্য নেই। শুধু মন্দিরের কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য নতুন করে লাগানো হয়েছে সাদামাটা পাথর।

গাইডদাদা বললেন, আর বছর কুড়ি পরে এলে নাকি দেখার মতো তেমন কিছুই থাকবে না। যাঁরা আগে গেছেন তাঁরা বললেন, গত কুড়ি বছরে অনেক কিছু ধ্বংসের পেটে চলে গেছে। যে আনন্দ নিয়ে কোনারকে এসেছিল মেয়েটা তার অনেকটাই গ্রাস করল বিষাদ। ছিল অথচ নেই। মন খারাপ করে ফিরে চলল সে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া-সহ ভারতের যে কোনো বড়ো শহর থেকে পুরী যাওয়ার অনেক ট্রেন পাওয়া যায়। শুধু মনে করে চার মাস আগে টিকিট বুকিং করে ফেলতে হয়। এ ছাড়াও নানা জায়গা থেকে সরকারি বা বেসরকারি এক্সপ্রেস বাসও ছাড়ে। তবে সে ক্ষেত্রেও আগে থেকে বুকিং করে রাখলেই ভালো। এখন বাস বা ট্রেন, সবই অনলাইন বুকিং করার সুযোগ রয়েছে।

কোথায় থাকবেন

পুরীতে থাকার জন্য একাধিক হোটেল আর হলিডে হোম রয়েছে। রয়েছে ভারত সেবাশ্রম–সহ অনেক ধর্মশালাও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here