কথাসাহিত্যিকের কৈশোরের দেবানন্দপুরে

0
6784

শিখা দত্ত

বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, শরত্চন্দ্রের জন্মস্থানে গিয়ে এক বার কথাসাহিত্যিকের চরণে প্রণাম ঠেকিয়ে আসব। ‌যাব-যাব করেও সময়াভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। তা এক রবিবার হাওড়া স্টেশন থেকে ব্যান্ডেল লোকালে চেপে বসলাম।

হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল ঘণ্টাখানেকের ট্রেন জার্নি। স্টেশন থেকে শরত্চন্দ্রের জন্মস্থান অটোতে ওই মিনিট কুড়ির পথ। শাটল আছে। আবার ইচ্ছা করলে আপনি একটা অটো কেবলমাত্র নিজের জন্যেও ভাড়া করতে পারেন।

দেবানন্দপুরের পথ।

দুপুর-দুপুর অটোওয়ালা নামিয়ে দিল দেবানন্দপুরের মোড়ে। দেবানন্দপুরে কথাসাহিত্যিক শরত্চন্দ্রের জন্মস্থানে ছোটোবেলায় একবার গিয়েছিলাম, স্কুল থেকে এক্সকারশনে। তখনকার পরিবেশের সঙ্গে এখনকার পরিবেশের পার্থক্য অনেক। মনে আছে, তখন দেবানন্দপুর ছিল বনবনানীতে থাকা। শান্ত পরিবেশ। সব মিলিয়ে স্কুলের বালক হিসাবে দেবানন্দপুর আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

এ বার দেবানন্দপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে অবাক হলাম। ত্রিশ বছরে জায়গাটার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। গাছপালা নেই সে দিনের মতো। সবুজে টান পড়েছে। চার পাশে বড়োবড়ো বাড়ি।

একজনকে জিজ্ঞেস কর‌লাম, শরত্চন্দ্রের ভিটেটা কোন দিকে?

ভদ্রলোক শুধোলেন, কলকাতা থেকে নাকি?

  • বললাম ‌হ্যাঁ। শরত্চন্দ্রের ভিটেটা কোন পথে তা একটু দেখিয়ে দেবেন?

ভদ্রলোক দেখিয়ে দিলেন। মিনিট দশেকের হাঁটাপথ। রাস্তা ভালো। দু’পাশে শৌখিন বাড়ি। দুপুরবেলায় ঘুঘু-র ডাক শুনতে শুনতে এগোচ্ছি। জমির এখানে আকাশছোঁয়া দাম। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সবই লভ্য।

দ‌েবানন্দপুর জায়গাটি অতি প্রাচীন। বাংলার রাজধানী সপ্তগ্রামের অন্তর্গত যে সাতখানি মৌজা ছিল দ‌েবানন্দপুর তার মধ্যে অন্যতম। য‌দিও গ্রামটির আয়তন ছোটো, কিন্তু নবাবি আমলে এটি ছিল একটি সমৃদ্ধশালী এলাকা।

কথা সাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দেবানন্দপুরে কেটেছে তাঁর কৈশোর। এ রপরে কথাশিল্পী ভাগলপুরে তাঁর মামার বাড়িতে চলে যান।

শরৎ স্মৃতি মন্দির।

দেবানন্দপুরে এখন কথাশিল্পীর নামাঙ্কিত একটি পাঠাগার রয়েছে। পাঠাগারে গিয়ে দেখা হল সেখানকার গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে। ভদ্রলোক জানালেন, গ্রন্থাগারে কর্মী মোটে একজন। ফলে কাজ চালাতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের প্রধান অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ মিত্র শরত্চন্দ্রের নামাঙ্কিত স্মৃতিমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্মৃতিমন্দিরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্রন্থাগারটি। প্রবেশপথে কথাসাহিত্যিকের মর্মরমূর্তি। গ্রন্থাগারটি একটি দোতলা বাড়ি। সামনে প্রশস্ত লন। লন পেরিয়ে বারান্দা। বারান্দার ধারে তিনটি ঘর। একটি ঘরে কথা সাহিত্যিকের জীবনের ঘটনাবলি বিশদে মাটির মডেলে প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশের ঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে কথাসাহিত্যিকের চিঠিপত্র, বাণী ও বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাঁর ভাবনা।

যেমন, সেকালে বাঙালি লেখকদের কী করুণ আর্থিক দুর্দশার মুখোমুখি হয়ে সারস্বত সাধনা করতে হত, তা নিয়ে উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন কথা সাহিত্যিক। কিন্তু রক্তে যাঁর সাহিত্যের বিষ প্রবেশ করেছে, তিনি তো লিখবেনই। কথাসাহিত্যিক বাঙালি পাঠকসমাজকে সাহিত্য পড়া ও সাহিত্যিকদের বই কেনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সম্পর্কিত উদ্ধৃতি দেখা গেল।

গ্রন্থাগার থেকে অনতিদূরে শরত্চন্দ্রের ভিটেটি। ছোটো একতলা বাড়ি। সেটিও সংরক্ষিত।

দেবানন্দপুরে কেটেছে কথা সাহিত্যিকের কৈশোর। এখানে তাঁর জীবনস্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু স্থান এখন পর্যটকদের দ্রষ্টব্য। যেমন, গড়ের জঙ্গল। এই জঙ্গলে কথাসাহিত্যিক তাঁর কৈশোরে সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে নির্জনে কাটাতেন। এর কাছেই দত্তমুনশিদের বাড়ি। দত্তমুনশিদের বাড়ির পশ্চিম দিকের উঁচু পাঁচিলের ধার ধরে সামান্য এগোলেই ডান দিকে হেদুয়া পুকুর। গড়ের জঙ্গল হেদুয়া পুকুরের পাশেই।

শরত্চন্দ্রের ঠাকুমা পাঁচ বছর বয়সে প্রতিবেশী প্যারী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠশালায় কথাসাহিত্যিককে ভর্তি করেন। পাঠশালার সহপাঠী কাশীনাথকে নিয়ে কথাসাহিত্যিক কাশীনাথ নামে একটি উপন্যাস লেখেন।

দেখার মধ্যে আছে সাজের দালান বা দুর্গাদালান। বকুলতলার দক্ষিণে মুনশি পরিবারের বড়োবাড়িতে বা পুরোনো দালানের পশ্চিম দিকে মুনশিদের সাজের দালান। দালানটি আয়তক্ষেত্রের মতো। এক সময়ে শঙ্খের কারুকাজ করা ছিল। বহু স্থান ভেঙেচুরে গেলেও এখনও শঙ্খের কিছু কারুকাজ অবশিষ্ট আছে। উচ্চকোটির স্থাপত্যের পরিচায়ক এই সাজের দালান।

এ ছাড়া দেবানন্দপুরে রয়েছে একটি দোলমঞ্চ, রায়গুনাকর ভারতচন্দ্রের পূজামণ্ডপ, বিশালাক্ষী মন্দির।

এখনও দেবানন্দপুরে রয়েছে এঁদো পুকুর।

এখনও দেবানন্দপুরে রয়েছে এঁদো পুকুর, ফাঁকা মাঠ। কথাসাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মারা গিয়েছেন ২ মাঘ, ১৩৪৪ সালে।

দেবানন্দপুরে গেলে আজ এত বছর পরেও শরতের স্মৃতি মনে উজাড় করে আসে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here